বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভারতরাজনীতি

আঁখি দাসকে ফেসবুক ছাড়তে হলো কেন?

ভারতে মুসলিমবিদ্বেষকে ব্যবহার করে ক্ষমতাসীন বিজেপির পক্ষে কাজ করেছে বলে চলতি বছরের আগস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠে।

এতে চরম বিতর্কের মুখে পড়েন ভারতে ফেসবুকের পাবলিক পলিসি বিষয়ক প্রধান আঁখি দাস। এমন পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার পদত্যাগ করেন তিনি।

বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে ফেসবুকের নীতি ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির রাজনৈতিক নেতাদের ওপর প্রয়োগ না করতে দেখা যায় আঁখিকে। বিষয়টি উঠে আসে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে।

৪৯ বছর বয়সী আঁখি দাস ছিলেন ফেসবুকের দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান কর্মকর্তা, সেইসঙ্গে ভারতে কোম্পানিটিতে যুক্ত হওয়া প্রথম দিককার একজন শীর্ষ কর্মী। নয় বছর ধরে ফেইসবুকের সঙ্গে ছিলেন তিনি।

আঁখি দাস ফেসবুক কোম্পানির দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দায়িত্বেও। এ অঞ্চলে ফেসবুকের বিশাল বাজার তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

ফেসবুকের ডেটা সুরক্ষা, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়েও কাজ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ছিলেন টেক জায়ান্ট মাইক্রোসফটের ভারতের পাবলিক পলিসি, লিগাল অ্যান্ড কর্পোরেট বিষয়ক প্রধান।

১৫ বছর ধরে তথ্য-প্রযুক্তি খাতে পাবলিক পলিসি নিয়ে কাজ করা আঁখি দাস পড়াশোনা করেন কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। উচ্চতর ডিগ্রি নেন দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

তবে গত ২-৩ বছরে যখন ভারতে ফেসবুকের নীতিনির্ধারক হন তখন কোম্পানিটিকে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে কাজে লাগান বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে থাকে।

মার্চ মাসে ভারতের ফেসবুক কর্মীরা সিদ্ধান্ত নেয় তেলেঙ্গানা রাজ্যের বিজেপি এমপি টি রাজা সিংয়ের কিছু পোস্ট খুবই বিপজ্জনক, যা তাদের কোম্পানির ঘৃণা ছড়ানো সম্পর্কিত নীতিমালার লঙ্ঘন। ওই পোস্টগুলোতে দেখা গেছে, চরম মুসলিম বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন রাজা সিং।

কিন্তু ভারতে ফেসবুকের পাবলিক পলিসি বিভাগের প্রধান আঁখি দাস ওই বিজেপি এমপি এবং আরও অন্তত তিনজন হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকের ক্ষেত্রে কোম্পানির নীতি প্রয়োগের বিরোধিতা করেন।

আঁখি দাস ফেসবুক কর্মীদের বলেন, নরেন্দ্র মোদির দলের লোকজনের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিলে ভারতে কোম্পানিটির ব্যবসা বিপদে পড়তে পারে।

ভারত ফেসবুকের সবচেয়ে বড় বাজার। ৩৪ কোটি ভারতীয় ফেইসবুক ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ভারতে কম মূল্যের মোবাইল ইন্টারনেট সরবরাহের জন্য ফেসবুক ৫৭০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।

ওয়াল স্ট্রিটের ওই প্রতিবেদন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে বিরোধীদলীয় নেতারা ফেসবুকের ভূমিকা নিয়ে তদন্তের দাবী তোলেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, ‘বিজেপি এবং তাদের অভিভাবক সংগঠন আরএসএস ভারতের ফেসবুক নিয়ন্ত্রণ করছে।’ তখন এক বিবৃতিতে ফেসবুক তাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।

একইসঙ্গে অনলাইন পোস্টের মাধ্যমে হুমকি পেয়ে দিল্লি পুলিশের সাইবার সেলে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন আঁখি দাস। তার অভিযোগ, ‘একাধিক ব্যক্তি অনলাইনে এমন সব পোস্ট বা কনটেন্ট পাবলিশ করছেন যা খুবই হিংসাত্মক। এগুলো আমার জীবনের প্রতি হুমকি।’

পুলিশের কাছে দায়ের করা চার পাতার অভিযোগপত্রে আঁখি দাস বলেন, ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন ভারতে বিভিন্ন প্রকাশনায় ভুল ও বিকৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। যা পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যায়।’

তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরপর রাজা সিংয়ের মুসলিমবিদ্বেষী পোস্ট সরিয়ে নেয় ফেসবুক। পুরো ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক নেতা ও মানবাধিকার কর্মীরা সোচ্চার হলে সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে বিজেপি এমপির অ্যাকাউন্টই মুছে দেওয়া হয়।

তখন এক বিবৃতিতে ফেসবুক জানায়,‘ঘৃণা এবং উস্কা‌নিমূলক পোস্ট আমাদের নীতির পরিপন্থী। আমরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পোস্টগুলো মূল্যায়ন করে দেখেছি, সেগুলো আমাদের নীতি লঙ্ঘন করছে। তাই আমাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে তার অ্যাকাউন্ট সরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

সেসময় পুরো বিষয়টা নিয়ে তদন্ত নামে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, যার চেয়ারম্যান আবার কংগ্রেস নেতা শশী থারুর। সেপ্টেম্বরের শুরুতে তলব পেয়ে ফেইসবুক ইন্ডিয়ার ম্যানেজিং ডিরেক্টর অজিত মোহন কমিটির বৈঠকে হাজির হয়েছিলেন। ফেসবুক প্রধান জাকারবার্গকে কেন্দ্রীয় তথ্য-প্রযুক্তিমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদের পাঠানো একটি চিঠি ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বৈঠক।

রবিশঙ্করের চিঠির প্রসঙ্গ তুলে বিজেপি সদস্যরা অভিযোগ তোলেন, কংগ্রেসসহ বিরোধীদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে ফেসবুক। এমনকি ফেসবুকের নীতি এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিয়োগ পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা।

এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতে আরও বেশি চাপের মুখে পড়ে ফেসবুক। গোটা বিষয়টির কোনো সদুত্তর দিতে পারছিল না কোম্পানিটি। সেইসঙ্গে গোটা বিষয়টার জন্য ঘুরে ফিরে নাম উঠে আসছিল আঁখি দাসের।

তার বোন রশ্মি দাস দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজেপি সমর্থিত এবিভিপির সভানেত্রী ছিলেন। সেই তথ্য সামনে আসায় পুরো বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়।

রাজনৈতিক কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে কি তিনি মুসলিমবিদ্বেষের পক্ষ নিয়েছিলেন? এ প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছিল রাজনৈতিক নেতা ও মানবাধিকার কর্মীদের থেকে। যার জেরে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক থেকে পদত্যাগ করতে হলো আঁখি দাসকে।

তবে পদত্যাগের বিষয়ে এখনও কিছু বলেন নি তিনি। ফেসবুক ইন্ডিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক অজিত মোহন এক বিবৃতিতে জানান, ফেইসবুক থেকে আঁখি দাস পদত্যাগ করেছে জনসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে। আঁখি ভারতে ফেসবুকের প্রথম কর্মীদের একজন। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে গত নয় বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। গত দুই বছর ধরে তিনি আমার নেতৃত্বদানকারী দলের সদস্য ছিল, এখানেও তার অবদান অনেক, আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ এবং ভবিষ্যতে তার সর্বোচ্চ মঙ্গল কামনা করি।❐

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension