মুক্তিযুদ্ধসম্পাদকীয়

আজ থেকে স্বাধীনতার মাস

আজ ১ মার্চ। স্বাধীনতার মাস। রক্তঝরা মার্চ। অগ্নিঝরা ইতিহাসের মাস। বিষাদ ও বেদনার মাস। এই মাসের ২৫ তারিখ থেকে লেখা শুরু হয় এক অমর মহাকাব্য; এ মহাকাব্যর নাম- ‘বাংলাদেশ।’ বাঙালির জীবনে ভাষা আন্দোলনের স্মারক মাস ফেব্রুয়ারির পর মার্চের গুরুত্ব অপরিসীম। স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াই এই মার্চেই শুরু হয়। একাত্তরের গোটা মার্চ মাসটাই অত্যন্ত ঘটনাবহুল। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পর এ দেশ যে স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে এগিয়ে চলছিল সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই মার্চে। ‘৭১-এর ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এই ভাষণেই বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই বজ্রনিনাদ ঘোষণার পর এ দেশের মানুষের বুঝতে বাকি রইল না স্বাধীনতা আর দেরি নেই। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেই বঙ্গবন্ধু যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বললেন। শত্রুর মোকাবেলা করার নির্দেশও ঘোষিত হয় তাঁর বজ্রকণ্ঠে।

পাকিস্তানের শোষণ, নির্যাতন আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে জাতি স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ হয়েছিল। এ দেশের তরুণ-তরুণী, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সেদিন এই একটি কণ্ঠের মন্ত্রমুগ্ধে আবিষ্ট হয়ে মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য যার যার মতো করে প্রস্তুতি গ্রহণ করে। স্বাধীনতা এবং মুক্তির ঐকতানে জাতি এক হয়। এরই মধ্যে নানা কূটকৌশল চালাতে থাকে তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী। প্রথমেই তারা নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করতে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। এভাবেই আসে ২৫ মার্চের কালরাত। পাকবাহিনী ভারি অস্ত্র, কামান নিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের নামে এ দেশের ছাত্র, জনতাসহ নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্মম হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। তারা রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে হামলা চালায়। সেই রাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রাম। অসীম ত্যাগ, অসংখ্য ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম আর ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মদান বাঙালিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এনে দিয়েছে। প্রতিরোধ যুদ্ধের মধ্য দিয়েই বাঙালি তার মুক্তির সংগ্রামে জয়ী হয়। অম্লান সেইসব দিন।

নষ্ট রাজনীতি আর একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের পুনরুত্থানের কারণে দেশে আজও সন্ত্রাস আর জঙ্গীবাদের কালো ছায়ার বিস্তার ঘটছে। এই অপশক্তির বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে হবে, স্বাধীনতার পরাজিত শক্তিকে নতুন করে চিহ্নিত করতে হবে।

আজ পয়লা মার্চ। জাতির কাছে মার্চ মাস এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ উদ্গিরণকারী মাস। এই মাসেই জাতি তার চেতনাকে নতুন করে শাণিত করে। নতুন শপথে বলীয়ান হয়। অত্যাচার, নিপীড়ন আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্মারক মাস হিসেবে মার্চ প্রতিবারই আমাদের নতুন করে পথ দেখায়। এ বছর স্বাধীনতার ৪৮ বছর পূর্ণ হবে। আমরা আজকের দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই বীর শহীদদের, যাঁরা স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁদের মূল্যবান জীবন দান করে প্রতিরোধ সংগ্রামে প্রেরণা যুগিয়েছিলেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension