অঙ্গনাঅনুবাদআন্তর্জাতিক

‘আমি ছিলাম আইসিসদের যৌনদাসী। আমি আমার সেই গল্পটাই বলি কেননা এটিই আমার সেরা অস্ত্র’

আইসিস ২০১৪ সালের আগস্টে উত্তর ইরাকের কোচো গ্রামটিতে হামলা চালায়। সেখান থেকে অন্যান্য ইয়াজিদি নারীদের সঙ্গে নাদিয়া মুরাদকেও অপহরণ করে আইসিস। তারা নাদিয়া মুরাদের ছয় ভাই আর মাকে হত্যা করে নাদিয়ার বোনদেরও বন্দী করে নিয়ে যায়। ২০১৮ সালে নাদিয়া মুরাদ প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ডেনিস মুকওয়েজের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। এই লেখাটি প্রকাশনা সংস্থা ভিরাগো প্রকাশিত নাদিয়া মুরাদের আত্মজীবনীমূলক ‘দ্য লস্ট গার্ল: মাই স্টোরি অব ক্যাপটিভিটি অ্যান্ড ফাইট এ্যাগেইনস্ট দ্য ইসলামিক স্টেট'গ্রন্থর নির্বাচিত অংশ। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার ৬ অক্টোবর সংখ্যার সৌজন্যে ইংরেজি থেকে অনুদিত।

 

নাদিয়া মুরাদ

অনুবাদ: মুবিন খান

যৌনদাসীদের বাজারটি রাতের বেলায় খোলা হতো। আমরা নীচের তলায় জঙ্গীদের কথাবার্তা শুনতে পেতাম যে তারা নাম লেখাচ্ছে, গোছগাছ করছে; এবং তারপর যখন প্রথম লোকটি আমাদের ঘরে ঢুকত, সকল মেয়েরা চিৎকার করে উঠত। দৃশ্যটা ছিল একটা বিস্ফোরণের মতো।

আমরা আহতর মতো আর্তনাদ করে কাঁদতাম, বমি করে ঘর ভাসিয়ে দিতাম  কিন্তু কিছুই জঙ্গীদের থামাতে পারত না। আমরা যখন আর্তনাদে চিৎকার করছি তখন তারা ঘরময় ঘুরে ঘুরে আমাদের দেখতে থাকত, সবচেয়ে সুন্দর মেয়েদের কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করত, ‘তোমার বয়স কত?’

মেয়েটার চুল পরিক্ষা করত, মুখ পরীক্ষা করত এবং রক্ষীর কাছে জানতে চাইত, ‘এরা সবাই কুমারী, তাই না?’

রক্ষী লোকটা দ্রুত মাথা নেড়ে বলত, ‘নিশ্চয়ই!’

একজন দোকানি যেভাবে নিজের পণ্যকে উৎকৃষ্ট জাহির করে গর্ব করে, ঠিক সেভাবেই। তখন জঙ্গীরা ইচ্ছেমত আমাদের শরীরের যত্রতত্র স্পর্শ করত, আমাদের বুকে, উরুতে তাদের হাত বুলিয়ে দিত যেন আমরা পশু। জঙ্গীরা ঘরে বিশৃঙ্খল পায়চারি করতে করতে মেয়েদের পরীক্ষা করত আর আরবি কিংবা তুর্কমেন ভাষায় প্রশ্ন করত, তখনই এসব ঘটত।

‘তোমরা শান্ত হও!’ জঙ্গীরা চেঁচিয়ে ধমকে উঠত, ‘চুপ কর তোমরা!’

কিন্তু তাদের সেই ধমক আমাদের আর্তনাদের তীক্ষ্ণতা আরও বাড়িয়ে দিত।

এই ভাবনাটা মোটামুটি অবশ্যম্ভাবী ছিল যে জঙ্গীরা হয়ত আমাকেই নিয়ে যাবে। আমি এত সহজে সেটা হতে দিতে পারি না। আমি আর্তনাদ করে উঠি,  চিৎকার করতে থাকি, আমাকে ধরতে এগিয়ে আসা হাতকে থাপড়ে সরিয়ে দিতে থাকি। অন্য মেয়েরাও এমনটাই করছিল। তারা মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল, নিজেদের শরীরটাকে তাদের বোন-বন্ধুদের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছিল, যেন তাদের রক্ষা করতে পারে।

আমিও মেঝেতে শুয়ে পড়লাম তখন আমাদের মাঝখানে আরেক জঙ্গী এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওই লোকটি ছিল উচ্চপদস্থ জঙ্গী। সে সঙ্গে করে একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছে। হার্দানের আরেক ইয়াজিদি তরুণী। তার পরিকল্পনা ছিল এই মেয়েটিকে বদলে এখান থেকে অন্য আরেকটা মেয়ে নিয়ে যাবে। লোকটা জোরে ধমকে ওঠে, ‘চুপ কর!’

কিন্তু আমি থামছি না দেখে সে আমাকে লাথি মারল, তারপর আবারও ধমকে উঠল, ‘অ্যাই তুমি! গোলাপি জ্যাকেট,  উঠে দাঁড়াও বলছি!’

লোকটার চওড়া মুখটার মাংসের গভীরে তার কুতকুতে চোখ দুটো ডেবে রয়েছে, আর সারা মুখটা যেন দাড়ি নয়, চুল দিয়ে আবৃত। লোকটাকে মানুষ নয়, একটা ভয়ঙ্কর দৈত্যর মতো দেখাচ্ছিল। উত্তর ইরাকের সিঞ্জার আক্রমণ করে সেখানকার মেয়েদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা যুদ্ধক্ষেত্রর আরোপিত সিদ্ধান্ত ছিল না, সিদ্ধান্তটা ছিল  লোভী সৈনিকদের।

এর পুরো পরিকল্পনাটিই আসলে ইসলামিক স্টেটের; তারা যেভাবে আমাদের বাড়ি এসেছিল, কীভাবে কোন্ মেয়েদের কেনাবেচা করবে, কোন্ কোন্ জঙ্গীরা সাবায়া বা যৌনদাসী হিসেবে প্রাপ্যতা অর্জন করবে, বা কাদেরকে যৌনদাসী প্রদান করা উচিত। এমনকি তারা যৌনদাসী নিয়োগের জন্যে তাদের চকচকে পত্রিকায় এ বিষয়ে অপপ্রচার চালিয়েছে, আলোচনা করেছে,  দাবি তুলেছে। কিন্তু এ বিষয়ে আইসিস বা তার সদস্যরাই আসলে প্রথম নয়। ধর্ষণকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে পুরো ইতিহাস জুড়েই ব্যবহার করা হয়েছে।

এসব কিছু ঘটে যাওয়ার আগে আমি কখনও ভাবতে পারি নি রুয়ান্ডা নারীদের সঙ্গে আমার কোনকিছুর সমিল থাকতে পারে। এমন কি আমি জানতামই না রুয়ান্ডা নামে কোনও দেশ আছে। অথচ এখন আমি কি নিদারুণভাবে তাদের সঙ্গে মিশে গিয়েছি! যুদ্ধাপরাধের শিকার যে কারও পক্ষেই এইসব নিয়ে কথা বলা সত্যিই খুব কঠিন, আইসিস সিঞ্জারে আসার ষোল বছর আগে এর জন্য কাউকে অভিযুক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয় নি।

নিচের তলায় জঙ্গীদের একজন আমাদের নাম, আমাদের কাকে কোন্ জঙ্গী নিয়ে যাচ্ছে সেসব আর মেয়ে-বিক্রির টাকা পয়সার লেনদেন খাতায় লিখে রাখছিল। আমি ভাবছিলাম সালওয়ান আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। তাকে প্রচন্ড শক্তিশালী দেখাচ্ছিল যেন খালি হাতেই আমাকে মেরে ফেলতে পারে। সে যাই করুক আর আমি যতই প্রতিরোধ করি, আমার পক্ষে ওর সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব নয়। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল ও যেন  একই সঙ্গে পচা ডিম আর সুগন্ধির গন্ধ পেয়েছে।

আমি মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিলাম, আমার পাশ ঘেঁষে হেঁটে চলা জঙ্গি আর মেয়েদের পায়ের পাতা আর গোড়ালির দিকে দেখছিলাম। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ ছেলেদের স্যান্ডাল চোখে পড়ল, পায়ের গোড়ালি চর্মসার, প্রায় মেয়েদের মতো। কি করছি সেটা বুঝে ওঠার আগেই সেই পা জোড়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমি। কাঁদতে কাঁদতে তার কাছে ভিক্ষা চাইতে লাগলাম, ‘আমাকে আপনার সঙ্গে নিয়ে যান, আপনি যা বলবেন আমি তাই করব, আমি ওই দৈত্যটার সঙ্গে যেতে চাই না।‘

কেন জানি না ওই হালকা পাতলা লোকটি রাজি হয়ে গিয়েছিল। শুধু আমার দিকে একবার দেখেই সালওয়ানের কাছে গিয়ে বলল, ‘এই মেয়েটা আমার।’

সালওয়ান কোনও তর্কে যায় নি।

সেই হালকা পাতলা লোকটা ছিল মসুলের একজন বিচারক। কেউ তার অবাধ্য হতো না। আমি তার পেছন পেছন নিচের টেবিল পর্যন্ত গেলাম।

‘তোমার নাম কি?’ তার কথার ভঙ্গি নরম হলেও কন্ঠস্বর নির্দয়ের মতো।

‘নাদিয়া।’ বললাম আমি। তারপর সে নিবন্ধনকারীর দিকে ঘুরে দাঁড়াল।

আমাদের নাম ধাম নিবন্ধন করতে থাকা লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন তাকে আগে থেকেই চেনে। সে আমাদের নাম এভাবে লিখল, ‘নাদিয়া, হাজি সালমান’- এবং যখন আমাদেরকে যে লোকটা বন্দী করে এনেছে তার নাম বলল, আমার মনে হলো যেন তার গলাটা একটু কেঁপে উঠল, যেন সে ভয় পেয়েছে। আর আমি তখন আবিষ্কার করলাম আমি বিশাল একটা ভুল করে ফেলেছি।

২০১৫ সালের নভেম্বরে, এক বছর তিন মাস পর। আইসিস আমার নিজের গ্রাম কোচো আসার পরে আমি সংখ্যালঘু বিষয় নিয়ে জাতিসংঘ ফোরামে কথা বলতে সুইটজারল্যান্ড যাব বলে জার্মানি ছাড়লাম। সেই প্রথমবার আমি আমার গল্প অনেক মানুষের সামনে বলেছিলাম।

আমি সবকিছু নিয়েই কথা বলতে চেয়েছিলাম- যেসব শিশুরা আইএসের কাছ থেকে পালাতে গিয়ে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মরে গেছে, যে পরিবারগুলো এখনও অসহায়ভাবে পাহাড় পর্বতে আটকা পড়ে আছে, হাজার হাজার যেসব নারী আর শিশু এখনও তাদের হাতে বন্দী হয়ে আছে, এবং আমার ভাইয়েরা একটা হত্যাযজ্ঞর জায়গায় কি দেখেছিল; আমি ছিলাম হাজার হাজার ইয়াজিদি বন্দীদেরই একজন। আমার সম্প্রদায়ের মানুষেরা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিল। ইরাকের অভ্যন্তরে, সীমান্তর ওপারে উদ্বাস্তু হয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচেছিল। অন্যদিকে কোচো তখনও আইসিস দখল করে রেখেছে। ইয়াজিদিদের কপালে কি ঘটছে তার অসংখ্য গল্প রয়েছে সেখানে যা পৃথিবীর শোনা দরকার।

আমি সেখানে বলতে চাইছিলাম, এখনও আরও অনেক কিছু করা দরকার। সিঞ্জারের সকলকে মুক্ত করে ইরাকের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্যে একটা নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা দরকার। নেতা থেকে শুরু করে যেসব সাধারণ নাগরিকেরা পর্যন্ত আইসিসকে সমর্থন করেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, গণহত্যা চালিয়েছে, তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো দরকার।

আমি সেদিন হাজি সালমানের কথা দর্শক-শ্রোতাদের বলতে চাইছিলাম, সে আমাকে কত অসংখ্যবার ধর্ষণ করেছে আর আমি সেই নির্যাতনের সাক্ষী হয়েছি। সত্যি বলতে তখনই আমাকে জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলাম।

আমি নিজের বক্তব্য পাঠ করে আমি নিজেই ঝাঁকুনি খেয়ে উঠেছি। সাধ্যমত শান্ত থাকার চেষ্টা করতে করতে বলে গেছি কীভাবে আমাদের কোচো থেকে ওরা আমাকে আর আমার মতো মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে গিয়ে সাবায়া বা যৌনদাসী বানিয়ে ফেলল। বলে গেছি কীভাবে আমাকে বারবার ধর্ষণ করেছে, নির্যাতন চালিয়েছে। অবশেষে কীভাবে আমি সেখান থেকে পালিয়ে আসতে পেরেছি।

আমি বলে গেছি, কীভাবে তারা আমার ভাইদের খুন করেছিল। আপনার যখন এইরকম গল্প থাকবে তখন সে গল্প বলাটা এতটা সহজ হবে না। যতবারই আপনি সে গল্প বলতে যাবেন, ততবারই আপনি সেই যন্ত্রণাগুলো নতুন করে অনুভব করবেন।

আমি যখন কাউকে সেই চেকপয়েন্টের গল্পটা বলি যেখানে ওরা আমাকে ধর্ষণ করেছিল, অথবা হাজি সালমান যেভাবে কম্বল চাপা দিয়ে আমাকে চাবুক দিয়ে মেরেছিল, কিংবা মসুলের নিকষ কালো অন্ধকার আকাশের নিচে প্রতিবেশিদের মাঝে সাহায্যর চিহ্ন খুঁজছিলাম, সেই মুহূর্তর স্মৃতিগুলো তখন সঙ্গে অন্যসব ইয়াজিদিদের মতো আমাকেও  তীব্র আতঙ্কর কাছে টেনে নিয়ে যায়।

আমার গল্পগুলো, সত্যিকার অর্থেই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমার সেরা অস্ত্র। এবং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই অস্ত্রকে ব্যবহার করব যতক্ষণ না সন্ত্রাসবাদ বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়। এখনও অনেককিছু করা বাকি যেগুলো করা দরকার। বিশ্বনেতৃবৃন্দরা, বিশেষত মুসলিম ধর্মীয় নেতারা নির্যাতিতদের পাশে এসে দাঁড়ান এবং  তাদেরকে রক্ষা করুন।

আমার পুরো জীবনীটা বলেছি। গল্প বলা শেষে  নিজের কথাগুলো বলছিলাম।  সবাইকে বলেছিলাম আমি এখানে বক্তৃতা দিতে আসি নি।

প্রত্যেক ইয়াজিদিরাই গণহত্যাকারী আইসিসের বিচার চায়, আর পুরো পৃথিবী জুড়ে এই শক্তিটিই দুর্বল মানুষদেরকে নিজেদের রক্ষা করতে শক্তি জুগিয়েছিল। যেসব পুরুষেরা আমাকে ধর্ষণ করেছিল  তাদের চোখে চোখ রেখে বিচারের কাঠগড়ায় তুলতে চাই।

এখন আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া,  আমি হতে চাই পৃথিবীর শেষ মেয়েটি যার এইরকম একটা গল্প আছে…

 

 

 

 

 

 

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension