আমি হই গড্ডল

মুবিন খান

এক কনসালটেন্ট ডাক্তার আমার ওপর ভয়াবহরকম খেপে উঠলেন। তিনি তাঁর উচ্চতম কনসালটেন্সি বিদ্যা নিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাঁর খেপে উঠবার কারণ হলো কাজে ফাঁকিবাজি করে ধরা খাওয়া আলোচিত ডাক্তার লোকটার পক্ষ নিয়ে প্রতিবাদ করতে থাকা যে ডাক্তাররা খুব করে হৈচৈ বাঁধিয়ে দিয়েছেন, সেই ডাক্তার লোকেদের নিয়ে একটা লেখা আমি লিখে ফেলেছি।
 
তো ওই কনসালটেন্ট ডাক্তার লোকটা ব্যাঙ্গাত্বকভাবে আমাকে ‘হিরু’ সম্বোধন করে বললেন, আমি নাকি গাঁজা খেয়ে লেখাটা লিখেছি। কনসাল্টেন্ট কোন্‌ লেভেলের সেটা জানি কিনা প্রশ্ন করলেন। সে অনুযায়ী আবাসন ও কাজের পরিবেশ ডাক্তারদের দেওয়া হয় কিনা তাও জিজ্ঞেস করলেন। বললেন, আসল সমস্যা না বুঝেই নাকি সস্তা স্টান্টবাজি করছি। জাত তুলে গাল দিলেন। বললেন, হুজুগে বাঙালি সব একেকটা। বোঝা গেল তিনি হুজুগে বাঙালি নন। সেই কারণেই সেই যে তালগাছের দাবী তুলে বসেছেন, আর ছাড়ছেন না। একজন লোক ডাক্তার বলেই তাঁর অন্যায় ও অনিয়মকে মোটেই অন্যায় ও অনিয়ম বলতে রাজি হচ্ছেন না। যিনিই বলছেন তার খবর করে দিচ্ছেন। এই লোকটাকে আমি ভয়াবহ লোক হিসেবে চিহ্নিত করলাম।
 
কিন্তু দেখা গেল কনসালটেন্ট ডাক্তার লোকটা একলা না। আরও অনেক অনেক ডাক্তার লোকেরা সংসদ সদস্য লোকটার ওপর খেপে উঠেছেন। এঁরা সকলে কিম্ভূত রকমের সব অযুক্তি আর কুযুক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সংসদ সদস্য লোকটার মতো আমারও গুষ্টি উদ্ধার করতে শুরু করলেন। এবং শুরু যে করলেন, আর থামাথামি নাই। করতেই থাকতে লাগলেন।
 
তো সংসদ সদস্য লোকটা যেহেতু আমার ‘তালই’ লাগেন না, এবং শাস্তি পাওয়া ডাক্তার লোকটাও যেহেতু আমার শত্রু পক্ষ না, তাহলে ও নিয়ে আমার মাথাব্যথা থাকবার কোনও কারণ নাই। তাঁরা আসলে আমাকে গালাগাল করে নিজেদের অক্ষমতা আর সীমাবদ্ধতাকে আড়াল করতে চাইছেন। তা করুন। আমার ভাবনা নাই।
 
আমাকে ভাবনায় ফেলল ‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাই’ প্রবাদটা। আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, তাহলে কি প্রতিবাদ করা এই হাজার হাজার ডাক্তারদের সকলে নিরলসভাবে ডিউটি ফাঁকি দেন? তা না হলে এত এত লোকেরা মিলে যেটা করতে চাইছেন, সেটা হলো একটা অনিয়মের বৈধতা দাবী। সৎ এবং শিক্ষিত লোকেরা কেন একটা অনিয়মকে সমর্থন করবেন? এই এত এত লোক পেশাগতভাবে একটা অনিয়মকে সমর্থন করছেন দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তাহলে এই এত এত ডাক্তার এই অনিয়মকে অন্যায় মনে করেন না। তারমানে এই অন্যায়কে অন্যায় মনে না করার কাজটি এঁরা সকলেই করেন। এবং কেউ যখন প্রশ্নটি করে তখন বলেন, হাসপাতালে সুঁই নাই, সুতা নাই, অজ্ঞান করবার লোক নাই, এই যন্ত্র নাই, ওই যন্ত্র নাই, সরঞ্জাম নাই, টিমওয়ার্ক করবার মতো টিম নাই, তাই ডিউটি না যাওয়া হালাল।
 
এসব লিখিয়ে ডাক্তাররা নিজের সকল মেধা আর মননকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বোঝাতে লাগতে চাইতে থাকলেন যে, তিন তিনটা দিন দায়িত্ব অবহেলা করে ফেলা এবং পরের আরও তিন তিনটা দিন দায়িত্ব অবহেলা করতে চাওয়া ডাক্তার লোকটা আসলে সঠিক কাজটিই করেছেন। তাঁরা বলতে লাগলেন, হাসপাতালে ২৭টা ডাক্তার থাকবারর কথা কিন্তু আছে ৭টা, তাহলে অনুপস্থিত থাকা ডাক্তার লোকটা অনুপস্থিত থাকতেই পারেন।
 
তাঁরা বলতে লাগলেন, যিনি তিনদিন ধরে অনুপস্থিত আছেন তিনি একজন সার্জন, কিন্তু হাসপাতালে অজ্ঞান করবার কোনও ডাক্তার নাই। তাহলে সার্জন ডিউটিতে এসে কি চুল কাটবেন? ডিউটিতে না আসা সার্জন ডাক্তার লোকটার অধিকার। আর সংসদ সদস্য রোগী লোকেরে তিন দিন পরে রোববারে আসতে বলা সেই অধিকারের প্রয়োগ। তো এইভাবে কাজে ফাঁকি দেওয়াটাকে বৈধ দাবী করে তাঁরা শাস্তি দাতা সংসদ সদস্য লোকটাকে বাপ মা তুলে গালাগালি করতে লাগলেন। মূর্খ বলতে লাগলেন। আরও আরও অনেক কথাবার্তা বলতে লাগলেন যেগুলো ওই পর্যায়ের লেখাপড়া জানা লোকেদের কাছ থেকে শুনতে আমরা প্রস্তুত না।
 
বিষয়টা আসলে ভয়াবহ। এই বিষয়ের চেয়েও অধিক ভয়াবহ এই এত এত ডাক্তার যেভাবে খোঁড়া যুক্তি কলমের মাথায় তুলে খেপে উঠেছেন। আমি যে আমার দুর্বল গদ্য নিয়ে বিষয়টা উল্লেখ করে একটা লেখা লিখে ফেললাম এবং লেখাটা লিখে ফেলে পোস্ট করে ফেলবার পর ডাক্তার লোকেরা আমাকে উপলব্ধি দিতে চাইতে লাগলেন যে, আমি যেন একটা বিরাট পাপ করে ফেলেছি। ছোটখাট পাপ না, কবিরা গুনাহ্‌।
 
তাঁরা বিভিন্নভাবে আমাকে আক্রমণ করতে লাগলেন। আমাকে নাস্তানাবুদ করতে চাইতে লাগলেন। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ডাক্তার এসে আমারে নতুন পাগল বলে আখ্যায়িত করলেন। পরে জানা গেল ডাক্তারকে ‘ডাক্তার লোক’ বলেছি বলে তাঁর আঁতে লেগেছে। ডাক্তাররা যে ‘লোক’ না এটা আমার মগজে আসবে তো দূর! ধারণাতেই আসে নি!
 
আরেকজন এসে বললেন, ‘এহেন হুমকি/থ্রেট মূলক ভাষা একজন জনপ্রতিনিধি ব্যবহার করতে পারেন না; পাড়ার টোকাই কিংবা মাস্তানরা হয়তো ব্যবহার করে।’
 
এটা খুবই সত্য কথা। কিন্তু তিনি পাড়ার টোকাই কিংবা মাস্তানদের সঙ্গে ডাক্তারদের কথা বললেন না। কেননা জনপ্রতিনিধিকে তো বটেই, আমাকেও যে ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে সেটাকে কি ভাষা বা কাদের ভাষা বলে, সেটা জানা দরকার।
 
আমার লেখাটার তলে এইভাবে মোটামুটি একটা বাকবিতণ্ডা চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই একজন ডাক্তার সেখানে আমাদের কথাবার্তা বলাকে বন্ধ করে দিলেন।
 
গেল ডিসেম্বরে ভিকারুননিসা স্কুলের শিক্ষকের কাছে অভিভাবক অপমানিত হওয়ার পর একজন ছাত্রীর আত্মহননের ঘটনায় স্কুলের সামনে সমাবেশ করে বিক্ষোভ জানিয়েছেন সকলে। পরে ওই শিক্ষক গ্রেফতার হলেন। পদচ্যুত হলেন। কিন্তু ওই শিক্ষকের হয়ে তাঁর পক্ষে অন্য স্কুলের শিক্ষক লোকেদের কেউ তো নয়ই, খোদ ভিকারুননিসা স্কুলের শিক্ষকদেরকেও আমরা প্রতিবাদ করতে দেখি নি। অথচ আমরা সচেতন এই ডাক্তার লোকেদেরকেও তখন ভিকারুননিসার শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানাতে দেখেছি।
 
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সড়কে গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করেছেন। সেই চেকের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন বাস ও ট্রাকের ড্রাইভার লোকেরা। কিন্তু তাঁরা হয়ত ডাক্তার লোকেদের মতো অতটা পড়তে লিখতে পারেন না বলে এভাবে খোঁড়া যুক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন নি। বৈধ লাইসেন্স করতে ছোটাছুটি করেছেন। তখনও আমরা এইসব সচেতন ডাক্তার লিখিয়েদেরকে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে বাহবা দিতে দেখেছি। কেউ বলেন নি সেতুমন্ত্রী ওভাবে ড্রাইভারদের আঁতে ঘা দিয়েছেন। তাঁদের কাছে লাইসেন্স চেয়ে তাঁদের অপমান করেছেন।
 
একজন সাংবাদিক যখন গোপন ক্যামেরায় পুলিশের ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল করেন, তখনও আর সকল পুলিশ লোকেরা হৈহৈ করে এভাবে তেড়ে আসেন না। প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিলে প্রশাসনের গুষ্টি উদ্ধার করেন না। আর তখনও এই ডাক্তার লিখিয়েদেরকেই আমরা দেখেছি অসৎ পুলিশের খবর করে ফেলতে।
 
শিক্ষক-ড্রাইভার-পুলিশ লোকেদের সঙ্গে ডাক্তারদের তুলনা করবার জন্যে ক্ষমা চাইছি। ডাক্তার লোকেরা এঁদের চাইতে অনেক অনেক ঊর্ধ্বে। আরও যেসব পেশাজীবীরা আছেন, তাঁদের থেকেও অনেক অনেক ঊর্ধ্বে। মোটকথা যত যত পেশাজীবী আছেন, তাঁদের সকলের চেয়েই ঊর্ধ্বে।
 
একজন ডাক্তার আমাকে বললেন, ‘এই সেক্টর সম্বন্ধ আপনি আসলে ঘোড়ার ডিম জানেন।’
 
এটাও খুবই সত্যি কথা। আমি আসলেই তাঁদের ওই সেক্টর সম্বন্ধে কিছুই জানি না। এই কারণেই আমি আজকে বুঝতে পারি না কেন তাঁরা এভাবে সকলে মিলে উল্টা পালে হাওয়া দিচ্ছেন। তার সঙ্গে সকল ডাক্তারদের হামলে পড়াটাও বুঝতে পারি না।। ন্যায় আর অন্যায় জানা জ্ঞান দিয়ে এই এত এত লেখাপড়া জানাদের জানা-বোঝা বোধহয় সম্ভব না।
 
স্কুলে আমাদের এক শিক্ষক নিত্যই বলতেন, ‘বাবারা, লেখাপড়া জানা আর শিক্ষিত হওয়া এক জিনিস না। তোরা খালি লেখাপড়া শিখিস্‌ না, শিক্ষিত হইছ।’
 
আমার বিদ্যা, শিক্ষা, জ্ঞান এখনও ওই স্কুলের গণ্ডিতেই আটকে রইল।
 
হায়! আমার আর শিক্ষিত হওয়া হলো না। লেখাপড়াও শেখা হলো না।
 
ফলে আমার ভাবনাগুলোও গড্ডলের ভাবনা হয়েই রয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *