মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২০যুক্তরাষ্ট্র

আমেরিকার গণতন্ত্রে ঘুণ ধরিয়ে গেলেন ট্রাম্প

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোটের লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার পরও ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার জন্য নিজের সমর্থকদের বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু তার সেই বিচারবিভাগীয় ‘অভ্যুত্থানচেষ্টা’ সফল না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তীব্র অনিচ্ছুক মনোভাবে সোমবার ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য সম্মতি দেন তিনি।

নির্বাচনের ২০ দিন পর পর্যন্ত ক্ষমতা কামড়ে থাকার বাসনা মার্কিন রাজনীতির ইতিহাসে বিরল। শেষ পর্যন্ত সরে যেতে হলেও এর মধ্য দিয়ে মার্কিন গণতন্ত্রকে রোগা ও ভোগান্তির শিকার বানিয়ে গেছেন ট্রাম্প। মার্কিন গণতন্ত্রে ঘুন ধরিয়ে গেলেন তিনি। 

ট্রাম্পের ক্ষমতা হস্তান্তরের সম্মতির পর পেন্টাগনের পক্ষ থেকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনকে ক্ষমতা হস্তান্তরে সহযোগিতা করা হবে বলে ঘোষণা করা হয়। এর পরই একে একে জ্যেষ্ঠ রিপাবলিকান নেতারা (বিশেষত দুর্বলচিত্তের) নির্বাচনের ফলাফলকে স্বীকৃতি দেওয়া শুরু করেন।

তবে এতে সন্দেহ নেই যে, এরই মধ্যে মার্কিন গণতন্ত্র যথেষ্ট ভোগান্তির শিকার হয়ে গেছে। গণতন্ত্রের প্রতি আসা সবচেয়ে বড় হুমকি ধীরে ধীরে ধূসর হতে শুরু করলেও জটিল ও দুরূহ নির্বাচন প্রক্রিয়ার ভেতরে যারা কাজ করেন, তাদের বিষয়ে এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। তারা কি প্রত্যাশা মতো কঠোর ছিলেন, নাকি কেবল ভাগ্যের জোরে এ যাত্রা রক্ষা পেল যুক্তরাষ্ট্র।

বিচার বিভাগের জাতীয় নিরাপত্তা ডিভিশনের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কাটরিনা মুলিগান বলেন, ‘আমি দীর্ঘ সময় ধরে ওই সব মানুষের কাতারে আছি যারা বিশ্বাস করে, গণতন্ত্রের সুরক্ষা দেয়ালগুলো কাজ করছে। কিন্তু সর্বশেষ কয়েক সপ্তাহে আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে।

কারণ, এই লোকটির (ডোনাল্ড ট্রাম্প) কর্মকাণ্ড আমি পর্যবেক্ষণ করছিলাম। এখন আমার মনে হয়, আমরা আমাদের গণতন্ত্রের ভঙ্গুর অংশগুলোর ওপর নির্ভর করছি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যেসব কাজ করার কথা ছিল, সেগুলোর জন্য প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি।’

নির্বাচনের আগ থেকেই ট্রাম্প তার পরিকল্পনার বিষয়ে কোনও রাখঢাক করেন নি। তখন থেকে তিনি তার খেপাটে ইচ্ছাগুলোকে একের পর এক তীক্ষ্ণ করেছেন। ডাক ভোটের ওপর সন্দেহ তৈরি করেছেন, বেশীরভাগ ভোট গণনার আগেই নির্বাচনের রাতে নিজেকে জয়ী ঘোষণা করেছেন।

তারপর অনেক অভিযোগ এনে যথেষ্ট সন্দেহের বীজ বপণ করেছেন। সর্বোপরি, নির্বাচনের ফলাফল সত্যায়ন প্রক্রিয়া বিলম্ব করিয়েছেন বিচার বিভাগের তদন্ত ও রাস্তায় উগ্র ডানপন্থী সমর্থকদের নামিয়ে দিয়ে।

এ ধরনের বিলম্বের মধ্য দিয়ে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত রাজ্যসভাগুলোর হাতে সুযোগ এসে যেত ইলেকটোরাল কলেজে নিজেদের মনোনীত ইলেক্টর পাঠানোর জন্য। আর এই ইলেকটোরাল কলেজের হাতেই থাকে কে প্রেসিডেন্ট হবেন- আনুষ্ঠানিকভাবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব।

এমনটি হলে শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক সংকট তৈরি হতো এবং সুপ্রিমকোর্টের হাতে চলে যেত নির্বাচনের বিজয়ী নির্ধারণের দায়িত্ব। আর সুপ্রিমকোর্টে ৬-৩ ব্যবধানে রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।

এই লক্ষ্য থেকেই সুপ্রিমকোর্টে রাজনীতিকরণ করেছেন ট্রাম্প, যাতে রাজনৈতিক কৌশল ব্যর্থ হলে কোর্টের ঘাড়ে বন্দুক রেখে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায়। অর্থাৎ এটি হতো এক ধরনের বিচারবিভাগীয় অভ্যুত্থান।

সাধারণত, ক্ল্যাসিক অভ্যুত্থানের উপকরণ হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সামরিক বাহিনী। কিন্তু এখানে সেটি অনুপস্থিত ছিল শুরু থেকেই। যদিও ট্রাম্পের মনে সে ধরনের ইচ্ছাই দানা বেঁধেছিল।

ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গ্রীষ্মকালজুড়ে রাস্তায় সেনা নামিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প।

কিন্তু প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইক এসপার এক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করেছেন। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ তৈরি ও জটিল মুহূর্তে এসপারকে বরখাস্ত করে নিজের পছন্দের লোককে ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী করেছেন ট্রাম্প।

তারপর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান মার্ক মিল্লির একটি বিবৃতি থেকে বিষয়টির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আমরা শপথ নিই সংবিধানের ওপর। কোনো রাজা, রানী, নিপীড়ক বা একনায়কের ওপর না।❐

দ্য গার্ডিয়ান

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension