আসুন, গা ঘেঁষে দাঁড়ানোর পক্ষে বলুন

মুবিন খান

‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ বাক্যটা টিশার্টের বুকে-পিঠে লিখে কজন নারী প্রতিবাদে উচ্চকিত হয়েছেন। তাঁরা তাঁদের গা ঘেঁষে দাঁড়াতে দিতে চান না। কাদেরকে দাঁড়াতে দিতে চান না? হ্যাঁ, আপনাকেই!

কথা হলো, কেউ কারও গা ঘেঁষে দাঁড়ালে কোনও ক্ষতি হয় না। আপনি যদি ওই টিশার্ট পরা নারীটিরই গা ঘেঁষে দাঁড়ান, যদি অসাবধানে তাঁর শরীরে অনিচ্ছাকৃত স্পর্শ লেগেও যায়, নারীটির শরীরে নিশ্চয়ই ফোস্কা পড়বে না। তারপর আপনার দুঃখপ্রকাশে ক্ষমা চাওয়ার প্রত্যুত্তরে নারীটি হয়ত এক টুকরো স্মিত হাসি দিতে পারেন। হয়ত বলতে পারেন, ‘না না, ঠিক আছে।’

এই ‘না না, ঠিক আছে’ বাক্যটিতে আপনি উৎসাহিত হয়ে ওঠেন যদি তবে আপনি একজন অর্বাচীন। ওটি আপনাকে উৎসাহিত করতে নয়; আপনাকে বিব্রত হওয়া থেকে রক্ষা করতে নারীটির উচ্চারণ। ওই নারীটি একজন মানুষ বলেই আপনাকে বিব্রত হওয়া থেকে রক্ষা করতে চাইছেন। এবং আপনাকে বিব্রত হওয়া থেকে রক্ষা করতে চাইছেন তিনি একজন নারী বলেই। নারীসুলভ মমতা তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি বলেই। তিনি স্পর্শ চেনেন। নারী বলেই।

তিনি নারী বলেই আপনি মোটা মাথা নিয়েও তাঁর প্রতিভাকে অস্বীকার করে তাঁকে বঞ্চিত করে এসেছেন। তিনি নারী বলেই বুদ্ধিমত্তা নয়, শক্তিমত্তাকেই আপনি যোগ্যতা হিসেবে গণ্য করেছেন। তিনি নারী বলেই তাঁকে মানুষ নয়, ভোগ্যপণ্য হিসেবে মূল্যায়ন করে এসেছেন। আর এই নারী যখন আপনার মোটামাথার গোঁয়ার্তুমি মার্কা এই ভাবনার বিরুদ্ধে যখন ভদ্রজনোচিত ছোট্ট একটা বাক্য উচ্চারণ করল, ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’, আপনার সহ্য হলো না। আপনার গা জ্বালা

করে উঠল। আপনি স্থূলতায় মেতে উঠলেন। হাসি-ঠাট্টা করতে শুরু করলেন। বিদ্রূপ করতে শুরু করলেন। আজেবাজে কথাবার্তা বলতে, লিখতে শুরু করলেন। যেন নারীদের গা ঘেঁষে দাঁড়াতে পারা আপনার পৈত্রিক অধিকার। যেন নারীদের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পশুর মতো আচরণ করা আপনার জন্মগত অধিকার।

এখন যারা ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ প্রতিবাদটাকে বিদ্রূপ করছেন, বাজে মন্তব্য করছেন, নোংরা কথাবার্তা লিখছেন, তাঁরাই আসলে গা ঘেঁষে দাঁড়ানো দলের লোক। ফলে গা ঘেঁষে দাঁড়াতে না দেওয়ার প্রতিবাদী এই আন্দোলন তাদের আঁতে ঘা দিয়েছে। তারা ফুঁসে উঠেছে। তাঁরা গা ঘেঁষে দাঁড়ানোর পক্ষে অনেকরকম যুক্তি খাড়া করবার চেষ্টা করছে। তাঁরা প্রতিবাদ আর আন্দোলনটাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিতে চাইছে। তাঁরা নারীর গা ঘেঁষে দাঁড়াবার অধিকার চায়। তাঁরা নারীর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে যত্রতত্র স্পর্শে তাঁদের অসুস্থ লিপ্সা চরিতার্থ করতে চায়।

আমরা এঁদের গা ঘেঁষে দাঁড়ানোর পক্ষে অনেকরকম যুক্তি দেখতে চাই। তাঁদের গা ঘেঁষে না দাঁড়ানোর বিদ্রূপটা, বাজে মন্তব্যটা শুনতে চাই; চাই নোংরা কথাবার্তাগুলো বলা হোক, লেখা হোক। এইভাবেই তাঁদেরকে আমরা দেখে ফেলতে পারব। এইভাবেই তাঁদেরকে আমরা চিনে ফেলতে পারব। এইভাবেই তাঁদেরকে আমরা জেনে ফেলতে পারব।

তাঁদেরকে দেখা-চেনা-জানা আমাদের জন্যে খুবই দরকার।

এইসব অর্বাচীন শৌর্যবীর্যঅলা পুরুষত্বহীন কাপুরুষ লোকেদের গালাগালগুলো আমরা আর নিতে পারছি না।

One thought on “আসুন, গা ঘেঁষে দাঁড়ানোর পক্ষে বলুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *