বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

ই-বুকের অর্ধশত বছর ও বিশ্বজনীন মুক্ত পাঠাগারের স্বপ্ন

সৈয়দ মূসা রেজা


প্রজেক্ট গুটেনবার্গের স্থপতি, মাইকেল হার্ট, সবার জন্য অবাধ এবং মাগনা গ্রন্থাগারের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর নিজের সেই স্বপ্ন-প্রকল্প বাস্তবায়িত না হলেও অন্যদেরকে ডিজিটাল পাঠাগার প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে মাতিয়ে তোলেন তিনি । তাঁর সবচেয় বড় সাফল্য হলো, তিনি অন্যদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠেন।

ফাইনান্সিয়াল টাইমসে এক নিবন্ধে নীলাঞ্জনা রায় এসব কথা লিখেছেন। পঞ্চাশ বছর আগের কথা। তিনি আমাদের জানাচ্ছেন চমকপ্রদ সব তথ্য।

১৯৭১ সালের ৪ জুলাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’কে ইলেনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জেরক্স সিগমা ভি মেইনফ্রেম কম্পিউটারে টাইপ করেন। তখনও ইন্টারনেটের সূচনা হয়নি। তারপর এ সংক্রান্ত একটি চিরকুট প্রায় ১০০ ব্যবহারকারীর জন্য ছেড়ে দিলেন। তাতে উল্লেখ করলেন, এই টাইপ করা ঘোষণাপত্রটি বিনামূল্যে যে কাউকে পেতে পারবে। এ ভাবেই দুনিয়ার প্রথম ই-বই জন্ম নিলো। এ বইটি পরে ছয় ব্যবহারকারী নামান বা ডাউনলোড করেন।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ৬৪ বছর বয়সে পরোলোকগমন করেন হার্ট। তবে দুনিয়ার প্রথম ডিজিটাল পাঠাগার তৈরির কাজে জীবনের ৪০টি বছর ব্যয় করেন তিনি। বইয়ের গ্রন্থস্বত্ব, সীমিত প্রবেশাধিকার, নানা বাধ্য-বাধকতা এবং নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে একরোখাভাবে লেগে ছিলেন তিনি। তবে তিনি যে মহান স্বপ্ন দেখেছিলেন শেষতক সেটার বিরুদ্ধেই চলে যায় এই তৎপরতা। তাঁর স্বপ্ন ছিলো, যত বেশি সম্ভব মানুষের কাছে যত বেশি সম্ভব বই পৌঁছে দিতে হবে।

হার্টের স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে গত দুই দশক ধরে, ই-বুকের গলাকাটা বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। এটি এখন পাঠক এবং গ্রন্থাগার উভয়ের জন্যেই বড় মাথাব্যথা হয়ে দেখা দিয়েছে। ই-বইয়ের বাজারের বড় একটি অংশ রয়েছে অ্যামাজনের দখলে। কিন্তু গ্রন্থাগারগুলোর জন্য অ্যামাজন তার ই-বই যোগান দিতে অস্বীকার করে। ২০১৯ সালে আমেরিকান গ্রন্থাগার সংস্থা তীব্র ভাষায় অ্যামাজনের সমালোচনা করে। সমালোচনায় বলা হয়, ‘যে কোনো দামে বা যে কোনো শর্তে ধার দেওয়ার’ জন্য ই-বই যোগায় না অ্যামাজন। এ ছাড়া, গ্রন্থাগার-বাজারে দেরি করে ই-বই প্রকাশের জন্যেও অন্যান্য প্রকাশকের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয় এই সংস্থা।

[উল্লেখ্য, ই-বুক বা ই-বই হলো মুদ্রিত বইয়ের ইলেকট্রনিক সংস্করণ কিংবা ইলেকট্রনিকভাবে তৈরি করা বই যা ই-বুক রিডার বা ই-বই পাঠযন্ত্রে সংরক্ষণ করে পড়া যায়। এতে করে একটি ই-বই পাঠযন্ত্র হাজার হাজার ই-বই ধারণ করতে পারে।]

চলতি দশকের গোড়া থেকেই আমি নীলাঞ্জনা রায় হার্টের প্রজেক্ট গুটেনবার্গ (www.gutenberg.org) নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকেন। প্রথমে আইন সংক্রান্ত গবেষক এবং পরে সাংবাদিক হিসেবে অভিলেখগার বা আর্কাইভ এবং তথ্যভাণ্ডার বা ডাটাবেজ ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে তিনি যেন এক গুপ্তধনের খোঁজ পান । দিল্লি ও কলকাতা পাঠক-বান্ধব নগরী আর এই দুই নগরীতেই তাঁর বেড়ে ওঠা যেখানে চমৎকার বইয়ের দোকান এবং ঐতিহাসিক আর্কাইভ আছে। তবে গণ-গ্রন্থাগার আগেও দুলর্ভ ছিল, এখনো রয়েছে।

গণপাঠাগারের ঘাটতি আছে এমন দেশে বেড়ে ওঠা পাঠক মাত্রই জানেন, গ্রন্থাগারের চাবির গোছা হাতে পেলে গুপ্তধন পাওয়ার ফূর্তি হবে। শুধু চাবিই নয়, এমন এক পাঠাগার যেখানে ইচ্ছে হলেই ঢোকা যাবে এবং যতখুশি বই নামিয়ে আজীবনের জন্য নিজের কাছে জমিয়ে রাখা যাবে! তার আনন্দ যেয়ে আকাশে ঠেকবে সে কথা হয়ত বই পাগল পাঠকমাত্রই অনুভব করতে পারছেন। ২০০৩ সালে হটমেলে কোয়েম্বাতুর এবং মুম্বাইর মধ্যে বই-প্রেমিক পাঠক বন্ধুদের সাথে অনেক বার্তা আদান-প্রদান করেন নীলাঞ্জনা। মহাজগতের চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যে যাঁরা মোহমুগ্ধ হয়েছেন, সে সময় তাঁরা নিজেদেরকে সে সব মহাকাশচারী হিসেবে মনে করতাম। প্রজেক্ট গুটেনর্বাগের পুস্তক তালিকা দেখে এক বন্ধু তাঁকে ইমেইল করেন, “তোমার কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি বই রয়েছে। আমরা (পাঠকরা) ‘ধনী’ বনে গেছি!”

হার্টের অনলাইন পাঠাগারের কাজ চলেছে খুবই ধীর গতিতে। ১৯৭০ এবং ১৯৮০’র দশকের প্রথম দিকে ডিস্কের ধারণক্ষমতা ছিল খুবই সীমিত। একটা গোটা বইকে সেখানে রাখা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু ১৯৯৯ সালের মে মাসের মধ্যেই গুটেনবার্গ প্রকল্প দুই হাজার বই যোগাড় করতে পারে। পাঁচ বছরের মধ্যে গ্রন্থস্বত্বহীন বইয়ের সংখ্যা ১০ হাজারে গিয়ে ঠেকে। অনলাইনে পাঠযোগ্য এ সব বইয়ের মধ্যে দ্যা কিং জেমস বাইবেল এবং অ্যালিস ইন দ্যা ওয়ান্ডারল্যান্ড ছিল।

বর্তমানে গুটেনবার্গ প্রকল্পের প্রধান সাইটে ইংরেজি থেকে শুরু করে ফিনিশ পর্যন্ত নানা ভাষার ৬০ হাজারের বেশি বই রয়েছে। তবে হার্টের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো, গুটেনর্বাগের তৎপরতায় উদ্দীপ্ত হয়ে অনেকেই নিজেদের ডিজিটাল গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছেন ও তা বিনামূল্যে অন্যকে ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছেন। এর মধ্যে ঐরাবতের মতো বিপুল কলেবরের ‘ইন্টারনেট আর্কাইভ’ থেকে শুরু করে ‘ওয়ার্ল্ড ডিজিটাল লাইব্রেরি’ পর্যন্ত নানা ধরণের সাইট রয়েছে। গড়ে উঠেছে লাইব্রেরি জেনেসিসের মতো সাইট। সেখানে খ্যাতনামা প্রায় সব বইয়ে পাওয়া যায়। এ ছাড়া, বিজ্ঞান উৎসাহী পাঠকের জন্য রয়েছে সাই হাব। বাংলা ভাষায়ও আমার বই থেকে শুরু করে অনেক সাইট আছে। ফেসবুকেও বইয়ের হাট থেকে শুরু করে অনেক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। সেখানে বই নিয়েই কথা হয়। চালাচালি হয় বই। এ সবই ডিজিটাল বই।

ই-বই বললেই অনেকের কাছে অ্যামাজনের কথা মনে হয়। এর কারণও সহজ, বাণিজ্যিকভাবে ই-বই বিক্রির কাজে প্রথম নামে অ্যামাজন যার কিন্ডেল হলো প্রথম ই-বুক রিডার। অ্যামাজনের সাথে সাথে কোনো এবং দুনিয়ার বড়ো বড়ো ই-বুক প্রকাশকরা তাদের পাঠকদের সংখ্যা বাড়াতে থাকে। গত ১০ বছরে তাদের প্রকাশিত বইয়ের তালিকা বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে পাঠকের সন্তোষ ও আনন্দ। তবে অনেক ক্ষেত্রে কাগজের ছাপা সফল বইয়ের ই-সংস্করণ বের হতে বেহুদা দেরি করা হয়। ই-রিডার বা অন্যকোনোভাবে ই-বই পড়া চট করে আরামদায়ক হয় না। চোখ ক্লান্ত হয়ে যায় এবং এ ভাবে বই পাঠে চোখের ক্ষতি হয় বলে নানা কথা প্রচলিত আছে। এ সব সত্ত্বেও ই-বইয়ের রমরমা ব্যবসা থেমে থাকেনি। মোরডোর ইন্টেলেজিন্সের হিসাব অনুযায়ী ২০২০ সালের ই-বইয়ের বাজার ছিল ১৮ বিলিয়ন ডলারের।

বাংলা প্রবাদের শাপে বর হওয়ার প্রবচনকে এবারে ই-বইয়ের জগতে সফলতা দিয়েছে করোনা বিশ্বমারি। এ সফলতা হয়ত স্থায়ী নয়, হতে পারে বিশ্বমারি চলে গেলে আর টিকবে না তবে সফলতাটা বেশ উল্লেখযোগ্য। ওভারড্রাইভ নামে এক মার্কিন সংস্থা ই-বুক এবং অডিওবুক পরিবেশনার ব্যবসা করছে। জানুয়ারি মাসে তাদের প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, বিশ্ব জুড়ে গণপাঠাগার ব্যবস্থা থেকে ই-বই ধার নেওয়ার তৎপরতা বেড়েছে কয়েকগুণ। বিশেষ করে শিশুতোষ বই এবং কিশোর সিরিজের বই ধার নেওয়ার হার বেড়েছে। এ জাতীয় বইয়ের নামানোর হারও বেড়েছে। বিশ্বমারিতে পরিবারগুলো ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে তাই হয়ত বই পড়ে সময় পার করছে, জীবনকে একঘেঁয়ে হতে দিচ্ছে না।

ই-বইয়ের অর্ধশত বার্ষিকী উপলক্ষ্যে এবারে আবার হার্টের কথায় ফিরে আসতে হয়। পেটি বুজোয়া যুক্তি, অভিযোগকারী, বেশির ভাগ গ্রন্থস্বত্ব আইন, ডিজনি ও মার্কিন স্কুল ব্যবস্থা সবকিছুর উপরই তিতা-বিরক্ত ছিলেন। এ নিয়ে নিজ ব্লগে লিখেছেন। মাগনা ই-বুকের কথা বলেছেন তিনি। হার্ট মনে করতেন এ সব বইয়ের নিজেদেরই মূল্য আছে।

হার্ট আরো মনে করতেন, সে সব পাঠক কাগুজে বইয়ের দৃষ্টি নন্দন চেহারা এবং স্পর্শকে গুরুত্ব দেন তাঁরা বিষয়বস্তুর বদলে বইয়ের প্রকাশ-মাধ্যমকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি লিখেছেন, ‘আমি সবচেয়ে বেশি দাম দেই সেই লেখকদের হৃদয় ও মনকে যাঁরা জীবনের বড় অংশ ব্যয় করেছেন তাদের নিজেদের মনের কথা, তাদের নিজস্ব চিন্তধারা, ভাবনা ও অনুভূতি সম্পর্কে আমাকে বলার জন্য।’

নীলাঞ্জনা রায়ের মতে, ই-বইয়ের গণ-বিপণন এখনো তরুণ সময় অতিক্রম করছে। আগামী দশকে গ্রন্থগার, প্রকাশক, অ্যামাজন এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাজারের বিস্তার ঘটনো নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা করবে।

ই-বইয়ের নির্মাতা কিন্তু অবাণিজ্যিক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেখানে গণগ্রন্থাগার নেই, নেই বই বিক্রির দোকান সেখানে ই-বই পৌঁছে যাবে বলে ধারণা করেছিলেন তিনি। হার্টের এ স্বপ্নের অনেকটাই হয়ত অলীক ও অবাস্তব ছিল। কিন্তু বিশ্বমারি কোভিড-১৯-র তাড়া খেয়ে আজ আবার ফিরে আসতে হয়েছে স্ক্রিনে বই পড়ার দিকেই। এ অবস্থায় হার্টের স্বপ্ন সম্বল করে অন্য কোনো স্বপ্নদ্রষ্টা এগিয়ে আসবেন, গড়ে তুলবেন সর্বজনীন মাগনা পাঠাগার, যা সব সময়ই সক্রিয় থাকবে।


[এফটি অবলম্বনে, দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সৌজন্যে।]

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension