অনুবাদযুক্তরাষ্ট্র

এফবিআই এজেন্ট ইরানের কিশ দ্বীপে হারিয়ে যাওয়ার চৌদ্দ বছর!

জেমস গরডন মিক এবং কনর ফিনেগান
অনুবাদ: জাহান আরা দোলন



এ সপ্তাহে অবসরপ্রাপ্ত এফবিআই বিশেষ এজেন্ট বব লেভিনসনের ইরানের কিশ দ্বীপে নিখোঁজ হওয়ার ১৪ বছর হতে যাচ্ছে। এক বছর আগে তার পরিবার তার বন্দী অবস্থায় মারা যাওয়ার মার্কিন মূল্যায়নকে অবশেষে মেনে নিয়েছে। কিন্তু তারা প্রিয় স্বামী, বাবা এবং দাদাকে ঠিকভাবে বিদায়টুকুও জানাতে পারে নি।
লেভিনসনের মেয়ে সারাহ মরিয়ার্টি এবিসি নিউজকে বলেন, ‘আমরা বাবার জন্য ফিউনারেলের আয়োজন পর্যন্ত করতে পারি নি।’

বব লেভিনসনের পরিবারের কাছে দাফন করার মতো কিছুই নেই। তেহরান এখনও পর্যন্ত লেভিনসনকে আটকের কথা স্বীকার করে নি, যিনি সিআইএ’র বিশ্লেষকদের জন্য ন্যক্কারজনক চুক্তির কাজে নিযুক্ত ছিলেন, অথবা তাদের সরকারের হাতে মারা গিয়েছিলেন।

ফলস্বরূপ, তার সর্বশেষ অবস্থানের বিষয়গুলোও তার মৃত্যুর সময় এবং কারণের মতোই একটি রহস্য হয়ে আছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তার বন্দি অবস্থায় মৃত্যুর মূল্যায়নটি হয়েছে মূলত লেভিনসনের নিখোঁজ হওয়ার সময়কাল, ডায়াবেটিস এবং বয়স বিবেচনায়। এই বুধবার তার বয়স ৭৩ হওয়ার কথা ছিল। এবং মূল্যায়নের আরেকটা কারণ, তার অপরিচিত অপহরণকারীদের প্রকাশিত একমাত্র ভিডিওটি তার সুদীর্ঘ নিখোঁজ অবস্থার শুরুর দিকে এসেছিল।

সারা মরিয়ার্টি লেভিনসনের জন্মদিনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এবিসি নিউজকে বলেছেন, ‘আমরা তাকে বিদায় জানানোর সুযোগ পাই নি। তাকে আর একবার ছুঁয়ে বলতে পারি নি তোমাকে আমরা ভালবাসি। যথাযথভাবে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সুযোগ পাইনি, পৃথিবী থেকে চিরতরে পরলোকের উদ্দেশ্যে যাত্রার জন্য। ইরানিরা আমাদের এবং তার সঙ্গে যে আচরণ করেছে তার জন্য তারা ঋণী থাকবে। আমরা কেবল তার সাথে যেটা ঘটেছে সেই সত্যটা জানতে এবং তাকে বিদায় জানাতে চাই।’

লেভিনসনের মতো ফলাফল এড়াতে জিম্মি হওয়া অন্য মামলাগুলোর দিকে বাইডেন প্রশাসন এখন মনোযোগ দিয়েছে। এই প্রচেষ্টার নেতৃত্বে আছেন ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকে মার্কিন রাষ্ট্রপতির জিম্মি বিষয়ক বিশেষ দূত রজার কার্সটেনস। ডিসেম্বরে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত রবার্ট লেভিনসন অ্যাক্টের কারণে কার্সটেনসের অবস্থান এখন রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে রয়েছে এবং কেবল সন্ত্রাসী অপহরণ নয়, শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক অবৈধ বন্দীদের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা পৌঁছেছে। বন্দি পরিবারগুলো তার এই পদোন্নতিকে স্বাগত জানিয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের গুরুতর উদ্বেগের বিষয় বর্তমানে আমেরিকান খ্রিস্টান মানবিক সহায়তাকর্মী জেফরি উডের পরিণতি, তাকে ২০১৬-তে নাইজারে ইসলামপন্থী জঙ্গিদের দ্বারা অপহরণ করা হয়েছিল, এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ঠিকাদার মার্ক ফ্রেরিচ’র পরিণতি, তাকে ১৩ মাস আগে আফগানিস্তানে অপহরণ করা হয়েছে এবং ধারণা করা হয় যে তালেবানদের একটি দল তাকে বন্দি করে রেখেছে। কার্সটেনস দামেস্কের আসাদ শাসকগোষ্ঠীর সাথে আমেরিকান সাংবাদিক এবং প্রাক্তন মেরিন অস্টিন টাইস সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন, তিনি ২০১২ সালে সিরিয়ায় রিপোর্টিংয়ের সময় নিখোঁজ হন।

তবে লেভিনসন মামলাটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং অবন্ধুত্বপূর্ণ শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক বিদেশে অপহৃত নাগরিকদের জন্য আমেরিকার দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের স্বল্প আলোচিত একটি দিককে সবার সামনে তুলে ধরেছে। সেটা হলো, প্রিয়জনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে না পারার ব্যথা অথবা তাদের দেহের পুনরুদ্ধার অথবা ফেরত না পাওয়ার বেদনায় মৃত্যুকে পুরোপুরি মেনে নিতে না পারার বেদনাময় দিক।

২০০২ সালে ফিলিপাইনে হত্যা করা মিশনারি মার্টিন বার্নহ্যাম এবং আল কায়েদার হাতে নিহত সাংবাদিক লিউক সামার্সের মতো রেসকিউ মিশনে মারা না গিয়ে থাকলে জিম্মিদের বন্দিদশা থেকে উদ্ধারের ঘটনা খুব বিরল। ইউএস নেভি সিল ২০১৪ সালে ইয়েমেনে তাকে আল কায়েদার কবল থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল।

ইনটেলিজেন্স কর্তৃক মৃত জিম্মিদের দেহাবশেষ পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা প্রায়শই হতাশ এবং বিক্ষিপ্ত হয়। গত বছর, ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুদি বিদ্রোহীদের কাছে থাকা মার্কিন জিম্মির দেহাবশেষ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল একইসঙ্গে সদ্য মুক্তি পাওয়া দু’জন জীবিত আমেরিকান বন্দীর সঙ্গে। মার্কিন সাংবাদিক জেমস ফোলি এবং স্টিভেন সোটলফ এবং মানবিক সহায়তাকর্মী পিটার ক্যাসিগ এবং কায়লা মুলার সহ ২০১৪-১৫ সালে আইএসআইএসের বন্দীদশায় নিহত হওয়ার পরে সিরিয়া বা ইরাকের কোনও মার্কিন জিম্মি আর কখনোই উদ্ধার পায় নি।

২০১৮ সালে মুলারের দেহাবশেষ অনুসন্ধানের জন্য গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এজেন্ট এবং মার্কিন স্পেশাল ফোর্সগুলোকে সিরিয়ায় সাইটগুলি খনন করতে পরিচালিত করে। কিন্তু ডিএনএ টেস্টে পরিচিত পশ্চিমা জিম্মিদের খুঁজে পাওয়া কোনও হাড়ের সাথেই তার মিল পাওয়া যায় নি।

কায়লা মুলারের মা অ্যারিজোনার প্রেসকোটের মার্শা মুলার বুধবার এবিসি নিউজকে বলেন, ‘আমি এখনও বলছি, মূল বিষয়টা হলো ঈশ্বরের ইচ্ছা, কায়লাকে খোঁজ করুন, সত্যিকারভাবে তার সঙ্গে কি ঘটেছে সেটা খুঁজে বের করুন এবং তাকে তার বাড়িতে ফিরিয়ে আনুন যেখানে তার থাকবার কথা। অনেককিছুই আছে যেগুলো আমরা জানি না, কিন্তু আমরা হাল ছাড়ব না এবং আলী সৌফান [সাবেক এফবিআই সন্ত্রাসবাদ বিরোধী এজেন্ট], তার দল এবং আরও অনেকের সমর্থনের আশীর্বাদ রয়েছে আমাদের ওপর।’

বিদেশে জিম্মি মার্কিনিদের মুক্তি এবং বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের সুরক্ষার প্রচারের জন্য ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকদের পরিবার কর্তৃক নির্মিত জেমস ডব্লু ফোলি লিগ্যাসি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মার্গাক্স ইউয়েন বলেছেন, প্রিয়জনের দেহাবশেষ বাড়িতে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারি সমর্থন জরুরি ‘সামগ্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে জিম্মি হিসেবে গ্রহণের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা অর্জনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।’

ইউয়েন বলেন, ‘যে প্রিয়জনকে হত্যা করা হয়েছে অথবা যিনি বন্দী অবস্থায় মারা গেছেন তাদের দেহাবশেষ উদ্ধার করা এই সম্পূর্ণ নিরাময় প্রক্রিয়ার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।’

লেভিনসন মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো তাঁর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া নিয়ে মার্কিন সরকারের দ্বারা প্রকাশ্যে ব্যবহৃত শব্দের ব্যবহারিক অর্থের পরিবর্তন। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা লেভিনসনকে ‘ইরানে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া’ বলে বর্ণনা করেছিলেন যা তার পরিবারের সদস্যদের ক্ষুব্ধ করেছিল।

তবে ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট মাইক পম্পেও ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি বলেছিলেন লেভিনসনকে ‘অপহরণ করা হয়েছে’, যেটা লেভিনসনের পরিবারকে ফোন করার পরে জো বাইডেনের সেক্রেটারি অব স্টেট টনি ব্লিংকেনের মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতেও গৃহীত হয়েছে।

ব্লিংকেন আরও বলেছেন,’কেস ক্লোজ করা হয় নি’ এবং একটি সমাধানের জন্য তেহরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

লেভিনসনের কন্যা গোত্রীয় আরেকজন, সামান্থা বোম্যান এখন গর্ভবতী এবং ফোনকলে ব্লিংকেনকে বলেন, লেভিনসনের কোনও সমাধি থাকবে না যেখানে তিনি তার ভবিষ্যত সন্তানকে নিয়ে যেতে পারবেন।

‘ছুটির দিনগুলোয় বাবার সঙ্গে ‘দেখা করার’ কথা ভেবে আমি কাঁদছি। আমার স্বামীর বাবার সমাধিতে আমরা আমেরিকান পতাকা রেখেছি এবং আমি এভাবে তার সঙ্গে আমার সন্তানদের যোগাযোগ রাখতে চাই’ বোম্যান তার ফেসবুক পেইজে লিখেছেন।

এবিবি নিউজের সাক্ষাৎকারে তার বোন সারা বলেন, ‘এটা এমন কিছু যেখানে আপনি নিজেকে ব্যক্তিটির সংস্পর্শে অনুভব করবেন।’

লেভিনসনকে জীবন্ত ফিরিয়ে আনার জন্য বুশ, ওবামা ও ট্রাম্প প্রশাসনকে কয়েক বছর ধরে অনুরোধের পরে, শেষ পর্যন্ত পরিবার তার মৃত্যুকে মেনে নিয়েছে।

একসময়কার বিতর্কিত সরকারের বন্দী অবস্থায় লেভিনসন মারা গেছেন এই ধার্যকরণ, যা বছরের পর বছর গোয়েন্দা তথ্যের পরিবর্তে বরং তার বয়স এবং স্বাস্থ্যের মতো পরিস্থিতিগত প্রমাণের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে। এমনকি ২০১৬ সালে ইরান পারমাণবিক চুক্তির সময় ওবামার আলোচক এবং তাদের ইরানি অংশীদাররাও লেভিনসনের বিষয়ের উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকে অথচ শাসকগোষ্ঠী তখন অসংখ্য মার্কিন বন্দিদের মুক্তি দিয়েছিল।

২০০৭ সালে কিশ দ্বীপে লেভিনসনকে গ্রেপ্তার করেছিল এই প্রশ্নের জবাবে ২০১৯ সালে ইরানের লাদান আর্চিনের সাবেক বুশ পেন্টাগন নীতি পরিচালক এবিসি নিউজের পক্ষে ইরানি সামরিক দলিলপত্রগুলি অনুমোদন এবং অনুবাদ করেছে।

তবে লেভিনসনদের সঙ্গে এক বছর আগে হোয়াইট হাউসের বেসরকারি বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত তার পরিবার তার মৃত্যুর এই মারাত্মক মূল্যায়নকৃত তথ্য মেনে নেয় নি। এফবিআই ডিরেক্টর ক্রিস রে, সিআইএর পরিচালক জিনা হাস্পেল, তৎকালীন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রিক গ্রেনেল এবং ট্রাম্পের জাতীয় সুরক্ষা উপদেষ্টা রবার্ট ও ব্রায়ান, পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্র এবং মার্কিন কর্মকর্তারা এ সপ্তাহে এবিসি নিউজকে এই তথ্য জানিয়েছেন।

লেভিনসনের ইরানি বন্দী হিসাবে মারা যাওয়ার নিশ্চয়তা শতকরা কত শতাংশ, পরিবারের এই প্রশ্নের উত্তরে, কর্মকর্তারা শূন্য শতাংশের সন্দেহের অবকাশ রয়েছে বলে জানান এবং তখন লেভিনসন যে সত্যিই চলে গেছেন এটা তাদের মেনে নিতেই হলো, প্রাইভেট মিটিংয়ের বিষয়ে পরিচিত একজন জানিয়েছেন। ক্রিস রে এফবিআইকে দেওয়া মেমোতে এই বৈঠকের সময়কাল একবছর আগের ইঙ্গিত করেছেন, তবে তাঁর সাথে আসা অন্যান্য শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নাম বলেন নি।

রে’-এর মেমোর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘লেভিনসন পরিবারের সাথে দেখা করে, আমরা ব্যাখ্যা দিয়েছিলাম, গত ১৩ বছরে আমরা যতটুকু সম্ভব নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছি, সবগুলোই ববের বন্দি অবস্থায় মারা যাওয়ার সম্ভাবনাকে নির্দেশ করে। এই সংবাদ পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমার জন্য যন্ত্রণাদায়ক, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমরা ববের পরিবারের কাছে সংগৃহীত তথ্যের স্পষ্ট প্রকাশের বিষয়ে ঋণী ছিলাম’।

রে’ আরও যুক্ত করেছেন, কেউই এই মামলাগুলো বন্ধ করবে না এবং বলেছেন যে তার এজেন্টরা উত্তর খুঁজে পাওয়ার জন্য ‘কুকুরের মতো’ কাজ চালিয়ে যাবে। রে লিখেছেন, ‘আমরা হাল ছাড়ব না, কারণ আমরা পরিবারের ব্যাপারে হাল ছাড়তে পারি না, এবং বব, তার স্ত্রী ক্রিস্টিন, এবং তাদের সন্তানরা সবসময় এফবিআই পরিবারের অংশ হয়ে থাকবে।’❐

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension