কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর সাক্ষাৎকার

মায়ের কথা, বাবার কথা মনে পড়ে?
শওকত আলী: আমি জন্মেছি পশ্চিম বাংলার দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জে, ১৯৩৬ সালে। আমাদের সংসারটা বড় ছিল, অর্থনৈতিক সঙ্কটও ছিল। জমিজমা যা ছিল, আধিয়ারদের (অর্ধেক পাবেন জমির মালিক, বাকিটা কৃষক এই নীতিতে যাঁরা জমি চাষ করতেন) আবাদ করতে দেওয়া হতো। ধানও বেশি পাওয়া যেত না। বাবা খোরশেদ আলী সরকার হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিস করতেন। কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় সংসারের দিকে খুব বেশি নজর দিতেন না। সে কারণে মা সালেমা খাতুনকেই সংসার সামলাতে হতো। মায়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে কিছুই ছিল না। তবে মাকে লেখাপড়ার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন বাবা। তিনি মাকে এক খ্রিস্টান মহিলার কাছে প্রাইভেট পড়ানো শুরু করলেন। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায় শ্রীরামপুর বলে একটা জায়গা আছে। সেখানে একটি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট খোলা হয়েছিল। মা সেই ইনস্টিটিউটে ইন্টারভিউ দিয়ে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হলেন। কোর্স শেষে ডিগ্রির জন্য আবেদনও করেছিলেন মা। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতার কাছে বোমা পড়তে শুরু করলে মা রায়গঞ্জে ফিরে এলেন। বাবার বন্ধুরা মাকে প্রাইমারি স্কুলে বাচ্চাদের পড়ানোর একটা চাকরি দিয়ে দিলেন। পরে মা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হয়েছিলেন। তো আমাদের বাড়িতে পড়াশোনার ব্যাপারটি ছিল।
এলাকার লোকাল যে লাইব্রেরি ছিল, বাবা তার উদ্যোক্তাদের একজন ছিলেন। সেখান থেকেই একখানা-দুইখানা করে বই আনতাম। কিন্তু আমার বড় ভাইয়ের আবার এদিকে খেয়াল ছিল না। তিনি আইএসসি পাস করে বিএসসি পড়ার জন্য রংপুরে গিয়ে ভর্তিও হয়েছিলেন। কিছুদিন পরে ছেড়ে দিয়ে পশ্চিম ভারতে গিয়ে একটা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিলেন। এরপর তাঁর আর কোনও খোঁজ নেই। বহু খোঁজাখুঁজি করেও তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। বাবা রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। ডাক্তারি করার জন্য কিছুক্ষণ বসতেন। এরপর শুরু হতো রাজনৈতিক আলাপ। যা করার মা-ই করতেন। এ রকম একটা অবস্থার মধ্যেই বাল্যকালটা কেটেছে। রায়গঞ্জ তো একটা ছোট্ট মফস্বল শহর ছিল। ওটাকে থানা শহর বলা যায়-একটা হাই স্কুল আছে। মেয়েদের স্কুল সবে শুরু হয়েছে। আমি যখন ক্লাস সেভেনে, তখন কলেজ আরম্ভ হলো। এই অবস্থার মধ্যেই আমাদের মানুষ হতে হয়েছে। এর মধ্যে ছিল পুলিশের খবরদারি। একদিন বাবা কোথায় চলে গেলেন। কোনও খোঁজ নেই। পুলিশ এসে খোঁজ করে। তখন আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। আধিয়ার ঠিকমতো ধান দিত না। বাড়িতে ধান মাড়াইয়ের পরিমাণ অর্ধেকের মতো হয়ে গিয়েছিল। পরে বাবা ফিরে এলেন। তাঁকে কিছুদিনের জন্য গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।
 
প্রথম কী লিখেছিলেন?
শওকত আলী: ছোটবেলায় ছড়া লেখার চেষ্টা করতাম। সেগুলো সব হারিয়ে গেছে, কিছুই নেই। আমাদের রায়গঞ্জ করনেশন ইংলিশ হাই স্কুলে একটি প্রতিযোগিতা হচ্ছিল। এই স্কুলে ক্লাস থ্রি থেকে পড়াশোনা শুরু করি। তো ক্লাস নাইনে বা টেনে উঠেছি, স্কুলের ম্যাগাজিনে বাংলায় একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম। ওই ম্যাগাজিনে স্কুলের ছাত্র এবং বাইরের লোকেরাও লেখা দিয়েছিল। তবে আমার লেখাটাই ওরা প্রথম অবস্থানে রেখেছিলেন। এরপর থেকে স্যারেরা একটু অন্য চোখে দেখা শুরু করলেন। লেখালেখির ব্যাপারে তাঁরা উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। লেখালেখি করতে ভালোও লাগত। ক্লাসের পড়াশোনা শেষ হয়ে যাওয়ার পর গল্প-উপন্যাস নিয়ে বসতাম। তখন থেকেই গল্প-উপন্যাস পড়ার চেষ্টা শুরু হয়েছিল। এরপর প্রবন্ধের বইও পড়তে শুরু করলাম।
 
১৯৫২ সালে পূর্ব বাংলায় চলে এলেন। আপনার মা নাকি আসতে চান নি?
শওকত আলী: শুধু মা নন, বাবাও আসতে চান নি। মা তো আসতেই চান নি। তিনি মুসলিম লীগ সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু পার্টিশন হওয়ার পর মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বলেছিলেন, ওই পাকিস্তানে আমরা যাব না। যেখানে দেশ ভাগ হয়, মাটি ভাগ করা হয় সেখানে আমি যাব না। পার্টিশনের পর মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কিডনিতে সমস্যা হয়েছিল। চিকিৎসার জন্য মাদ্রাজে নিয়ে গেলাম। সেখানেই ১৯৫১ সালে মারা গেলেন। ডাক্তার অপারেশন করবেন বলে ঠিক করেছিলেন। আমি একটা কিডনি মাকে দিয়ে দেব বলে ঠিক করেছিলাম। ডাক্তার বলেছিলেন, অপারেশন করতে এক মাসের মতো সময় লাগবে। সেজন্য সেখানে একটা বাসা ভাড়া করে থাকতাম। একদিন দুপুরে মা ঘুমিয়ে আছেন। বিকেলে ডাকাডাকি করছি। মা আর ওঠেন না। ডাক্তারকে ডাকলাম। এসে বললেন, উনি আর নেই। মায়ের ডেডবডি নিয়ে রায়গঞ্জে চলে এলাম। দাফন হলো। মা যে বলেছিলেন, পাকিস্তানে যাবেন না, সে কারণে আমরাও ঠিক করেছিলাম আর কোথাও যাব না। বড় ভাইয়েরও পাত্তা নেই। মা নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন কিন্তু গোঁড়া ছিলেন না। বাবা ছিলেন একেবারে সর্ব ধর্ম সমন্বয়বাদী, পাকিস্তানবিরোধী। এসব কারণে ওখানকার মুসলিম সমাজ আমাদের পছন্দ করত না। তখন মাত্র ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি।
 
পূর্ব পাকিস্তানে এলেন কেন?
শওকত আলী: ১৯৫১ সালের দিকে জায়গাজমি সব বেদখল হয়ে গেল। বাবা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পারেন নি। বাবাকে দিয়ে জোর করে দলিল করিয়ে নিল। কেউ টাকা দিল, কেউ দিল না। তখন ওখানে খুনোখুনি হচ্ছে। বাবা বললেন, তোরা পাকিস্তানের দিনাজপুরে চলে যা। আমার গার্ডিয়ান বলতে ইমিডিয়েট বড় দুই যমজ বোন। তাঁদের একজন মর্জিয়ানা খাতুন। অন্য লোক তাঁর কথা বুঝতে পারত না, আমরা পারতাম। তাঁর ছোটজনের নাম সুফিয়া খাতুন, ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছেন। চলে আসার সময় বাবা দিনাজপুরের ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে একটা চিঠি লিখে দিয়েছিলেন।
 
এখানে কিভাবে জীবন শুরু হলো?
শওকত আলী: বড় বোন দুটি টিউশনি শুরু করলেন। আমি কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম। চলে আসার সময় বাবা বোধহয় আমাদের হাতে তিন-চার হাজার টাকা দিয়েছিলেন। বোনের টিউশনির পয়সা দিয়ে কিছুদিন চললাম। এর মধ্যে বোন একটি স্কুলে চাকরিও পেয়ে গেলেন। আমিও টিউশনি শুরু করেছি। এভাবেই আমাদের সংসার চলতে লাগল। তখনও বড় ভাইয়ের কোনও পাত্তা নেই। পরে অবশ্য আমার এই ভাই (মোহাম্মদ আলী সরকার) ফিরে এসেছিলেন। যাই হোক, বাবার দেওয়া সেই টাকা দিয়ে বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে একটা বাড়ি কেনা হয়েছিল। রায়গঞ্জ থেকে বাবা বাড়িটা রেজিস্ট্রি করেছিলেন। বাড়ি কেনার ছয় কী আট মাস পরে এক অন্ধকার রাতে বাবা এসে নতুন বাড়ির দরজায় ধাক্কা দিচ্ছেন। দরজা খুলে দেখি, পাঞ্জাবি পরে কাঁধে একটা ব্যাগ নিয়ে বাবা দাঁড়িয়ে। শুধু বললেন, এখানে আমি থাকব। রায়গঞ্জে কী হয়েছে কিছুই বললেন না। পরে শুনেছিলাম, সেখানে বাবার ডিসপেনসারিটা এক হিন্দু ভদ্রলোক বেদখল করে নিয়েছিলেন। বাবা আর রায়গঞ্জ ফিরে যান নি।
 
১৯৫৩ সালে দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ছাত্রজীবনে রাজনীতি করতেন?
শওকত আলী: দিনাজপুরে তেভাগা আন্দোলন খুব জোরদার হয়েছিল। এ আন্দোলন পার্টিশনের আগে শুরু হয়েছিল। হাজি দানেশ তখন আমাদের গ্রামের দিকে গিয়ে কাজ করতে বলেছিলেন। আমরাও যেতে শুরু করলাম। দিনাজপুরের বীরগঞ্জ বলে এক থানা শহরে ছিলাম। সেখানে সাঁওতালদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হলো, নিম্ন শ্রেণির হিন্দু, স্থানীয়ভাবে ওদের পোলিয়া বলা হতো যাদের ভদ্র নাম আবার ক্ষত্রিয়, ওদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেছি। তখন তো ওদের সামাজিক মর্যাদা বলে কিছু ছিল না। আমার সাঁওতালদের নিয়ে লেখা দু-একটা গল্প আছে। এভাবেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা শুরু হলো। রায়গঞ্জে থাকতেও মিশতাম। কিন্তু তখন তো ছোট ছিলাম, অত বুঝতাম না। এ সময় এসে জ্ঞানবুদ্ধি হলো। রাজনীতি, ইতিহাস সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক ধারণা হয়েছে। এই জ্ঞানগুলো ওদের সঙ্গে মেলামেশার ফলে আরও ব্যাপক হলো। মানুষের জীবনযাপন, শ্রেণি, পেশা ইত্যাদি জানতে লাগলাম।
কৃষকের জীবনটা দেখলাম। ধান-পাট চাষের সময় চারা গজানোর পরে কিছু ঘাসও গজায়। সেগুলোকে খুপরি দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়। যখন ওদের সঙ্গে ছিলাম, এ রকম কিছু কাজও করতাম। তখনই কৃষিবিজ্ঞানের সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় হলো। মনে হয়েছে, যারা কৃষক তারাই কিন্তু আসল কৃষিবিজ্ঞানের খবরটা জানে। সার এলে কৃষি বিভাগ থেকে কোন ফসলে কোন সার লাগবে বলা হতো, কিন্তু কৃষকরা বলত, আমরা এটা দেব না। তারা এক্সপেরিমেন্ট করে দেখে যেটাতে কাজ হতো সেটা দিত। তখনই মনে হয়েছিল, সাধারণ মানুষকে আমরা যতই অজ্ঞ মনে করি, তারা কিন্তু অজ্ঞ নয়। তাদের গান হতো, আসর হতো, নাচ হতো। আমার মনে হয়েছে, এগুলো তো ভদ্রলোকদের তৈরি নয়, তাহলে এসব কারা করেছে? তার মানে সেন্স অব আর্ট এই সাধারণ মানুষের মধ্যেও আছে। সেটাকে তারাও প্রকাশের চেষ্টা করে। তখন মনে হয়েছে, পিপলস্‌ আর্ট বলে একটা জিনিস সব দেশেই আছে। আর এই যে ভাষা, ঐতিহ্য, এটা ধারণ করে রাখে কারা? মৃত্তিকালগ্ন মানুষ যারা আছে, তাঁরাই আসলটাকে ধরে রাখে। তারপর তার সঙ্গে আরও জিনিস মিশ্রিত হয়ে সেটা উন্নত হয়।
 
১৯৫৪ সালে কেন জেল খাটতে হলো?
শওকত আলী: তখন ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। ছাত্র ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টিকে সমর্থন করত। একই সঙ্গে মুসলিম লীগবিরোধীও ছিল। ধর্মীয় রাজনীতিরও বিরোধিতা করত। তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করত। আমি স্থানীয় ছাত্র ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলাম। তখন মাত্র বিএ ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছি। কমিউনিস্ট নেতা মোহাম্মদ ফরহাদ আর আমি একসঙ্গে জেল খেটেছি। আরও কয়েকজন সিনিয়র নেতাও ছিলেন। আমাদের সঙ্গে হাজি মোহাম্মদ দানেশ ছিলেন। তিনি আবার ইতিহাসের অধ্যাপক। ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর অনেক জ্ঞান। আমাদের সঙ্গে বসে নানা রকম গল্প করতেন। তিনি আমাকে জেলে বসে বিএ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন। বলেছিলাম, জেল থেকে কবে বের হব, তার তো কোনও ঠিক নেই। উনি বললেন, যখনই বের হবে, তখনই পরীক্ষা দেবে। তার কথায়ই ইন্সপায়ার্ড হয়েছি।
 
বিএ পাসের ব্যাপারেও তো গল্প আছে।
শওকত আলী: জিসি দেব (গোবিন্দচন্দ্র দেব) তখন সুরেন্দ্রনাথ কলেজের প্রিন্সিপাল। তখন তো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি খুব জোরদার হয়েছে। সে সময় তাঁকে প্রিন্সিপালের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। জেল থেকে ‘৫৪ সালের নভেম্বরে বের হলাম। ছাড়া পাওয়ার পর জিসি দেবের সঙ্গে দেখা। আমাকে দেখে খুব খুশি। জিজ্ঞেস করলেন বিএ পরীক্ষা দেবে? বললাম, সুযোগ পেলে দেব। দুই-তিন দিন পর আবার দেখা। বললেন, চলো কলেজের প্রিন্সিপালের কাছে যাই। প্রিন্সিপালের কাছে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন। প্রিন্সিপাল কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে বললেন, পরীক্ষার ফরম পূরণ করো। কিন্তু রেজাল্ট খুব একটা ভালো হলো না। মানে যা আশা করেছিলাম হলো না। সেকেন্ড ডিভিশনে পাস করেছি। এভাবেই আবার লেখাপড়া শুরু। বিএ পাস করে নিজের চেষ্টায় ঢাকায় এলাম। আসার সময় বাবা কিছু টাকা দিয়েছিলেন। বড় বোনও কিছু দিয়েছিলেন। ঢাকা এসে টিউশনি শুরু করলাম। দু-একটা লেখাও ছাপা হচ্ছে।
 
১৯৫৫ সালে মিল্লাতে সাংবাদিকতা শুরু করলেন।
শওকত আলী: কোনদিন দুপুর ১টার দিকে, কোনদিন ২টার দিকে আসতাম। রাত ৮টায় চলে যেতাম। চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানের ছোট ভাই বদরুল হাসান আমাদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল এবং সে সাংবাদিক ছিল। একটু পাগলাটে ধরনের লোক হলেও খুব সৎ মানুষ ছিল। বদরুলের মতো লোক খুব কম দেখা যায়। অল্প বয়সে, মাত্র ৩৫-৩৬ বছর বয়সে মারা গেছে। দৈনিক মিল্লাতে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। দৈনিক বাংলার আগের নাম ছিল দৈনিক পাকিস্তান। সেখানেও সে কাজ করেছে। পাকিস্তানের বিরোধিতা শুরু হলে বলেছিল, এই পত্রিকার নাম দৈনিক বাংলা করতে হবে। এ নিয়ে সেই সময় একটা আন্দোলনও হয়েছিল। তাতে বদরুল হাসানের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। ওর কথা কেউ এখন মনে করে না।
 
ঢাকায় কবি-সাহিত্যিকের সান্নিধ্য পেলেন, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঙ্গে মেশার সুযোগ পেলেন।
শওকত আলী: মফস্বলে তো গ্রামের লোকদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা হতো। এখানে শিক্ষিত তরুণদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হলো। তাদের প্রেম-ভালোবাসার ব্যাপারগুলো দেখতে শুরু করলাম। জানার চেষ্টা করলাম, মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা যে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, কেন হচ্ছে? সবাই কিন্তু হচ্ছে না। একজন ভালোভাবে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে অনার্সে ভর্তি হয়ে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে গেল। আরেকজন ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ডিভিশনে পাস করে অনার্সে ভর্তি হয়েছে। সে সিএসপি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। সে ইংরেজি ভাষা শিখতে শুরু করল, সমাজের উঁচু শ্রেণিতে মেলামেশা শুরু করল, পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার স্বপ্ন দেখল। এভাবে একটি শ্রেণি গড়ে উঠল। আরেকটা শ্রেণি আবার মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে শুরু করল। মানুষের সঙ্গে মিশতে শুরু করল। এখন হিসাব করে দেখলে মনে হয়, এদের সংখ্যাটা ছিল বেশি। আর তা যদি না হতো তাহলে বাংলাদেশ হতো না। এই যে জাগরণটা হয়েছে, এটার কারণ হচ্ছে এখানকার মাটি আর মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকা। তাদের সঙ্গে মিশেছি। যদিও তখন পয়সাকড়ি ছিল না, এরপরও মাঝেমধ্যে সিনেমা দেখতাম, গল্পের বই পড়তাম। আসলে আগে সিরিয়াস বই বেশি পড়েছি। ইংরেজি ভাষায়ও মোটামুটি ভালো দখল ছিল। সে সময় ইংরেজিতেও দু-একটা লেখা লিখেছিলাম।
 
এমএ পাস করে কী করলেন?
শওকত আলী: ১৯৫৮ সালে এমএ পাস করার পর কাজকর্ম কিছু না পাওয়ায় আবার দিনাজপুরে ফিরে গেলাম। বীরগঞ্জ থেকে ১৭-১৮ মাইল দূরে একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করলাম। পরের বছর ঠাকুরগাঁও কলেজ শুরু হলে বাংলার শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলাম। ১৯৬১ সালে বিয়ে। ঠাকুরগাঁওয়েই দুই কামরার একটা বাসা, টিনের ঘর ভাড়া করে ছিলাম। ২৫০ না ৪০০ টাকা বেতন পাই। স্ত্রী তো রান্নাবান্না কিছুই করতে পারত না। কারণ শওকত আরা ছিল সবচেয়ে ছোট সন্তান। তার মা ছিল না। বড় ভাইবোনরা ছিল। যার কারণে তাকে কাজকর্ম কিছুই করতে হয় নি। আর বিয়ে তো ওর বাবা পছন্দ করে দেন নি। নিজে পছন্দ করে করেছে। আমার সঙ্গে আগে থেকেই পরিচয় ছিল।
 
এক সময় তো সমকালেও কাজ করেছেন।
শওকত আলী: ১৯৬১ সালের শেষের দিকে আবার ঢাকায় চলে এলাম। হাসান ভাই (হাসান হাফিজুর রহমান) কয়েকদিন দেখার পর একদিন জাফর ভাইকে (সিকানদার আবু জাফর) বললেন, ‘ও তো খুব অসুবিধার মধ্যে আছে, একটা চাকরি হলে ভালো হতো।’ জাফর ভাই বললেন, ‘ঠিক আছে ও সমকালে আসুক, বসুক।’ সাহিত্য পত্রিকা তো মাসে একবার বের হয়। কাজ ছিল লেখা জোগাড় ও ছাপানো। বেতন ঠিক করা হলো ১২০ টাকা। বললাম, একটু বাড়াতে হবে। বলল, ১৫০। রাজি হয়ে কাজ করতে শুরু করে দিলাম।
 
জগন্নাথ কলেজে যোগদান করলেন কিভাবে?
শওকত আলী: একদিন হঠাৎ হাসান ভাই বললেন, ‘আলাউদ্দীন আল আজাদ তো স্কলারশিপ পেয়ে লন্ডনে চলে যাচ্ছে। বাংলা ডিপার্টমেন্টটা খালি হচ্ছে। তুমি দরখাস্ত করো।’ তিনিই দরখাস্ত করালেন। অন্যান্য ডিপার্টমেন্টেও লোক নিল। বাংলা ডিপার্টমেন্টে অনেক সিনিয়র ছিলেন। জগন্নাথ কলেজে তখন বেশি সিনিয়র শিক্ষক নিয়োগ হতো। দুবার ইন্টারভিউ দিতে হতো। প্রিন্সিপালসহ একবার বোর্ডে, আরেকবার ক্লাসরুমে ছাত্রদের সামনে। আমাকে নিয়ে নিল। আমি তো চিন্তাই করতে পারি নি। তখন আমার বয়স সবে ২৫ হবে হবে করছে, জগন্নাথ কলেজে চাকরি হয়ে গেল! প্রথমে হলো দিনের বেলা। এরপর রাতের বেলায় পার্টটাইম। সব মিলিয়ে বেতন ৫৫০ টাকা। বাড়িভাড়া দিতাম ২০০ টাকা। আর ৩৫০ টাকা দিয়ে সংসার চালাতাম।
 
হাসান হাফিজুর রহমান ও সিকানদার আবু জাফর লেখকজীবনে ভূমিকা রেখেছিলেন বলে শুনেছি।
শওকত আলী: তাঁরা মনে করেছিলেন, ওর লেখা ভালো হচ্ছে। কিন্তু ছাপছে না কেন? সে জন্য তাঁরা অন্যদের আমার লেখা পড়ে দেখতে বলতেন। যেমন হাসান ভাই গাফ্ফার চৌধুরীকে বলেছিলেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তখন নামকরা লোক। তাঁরা এ রকম আরও দু-একজন লেখককে বলেছিলেন, এখন নাম মনে পড়ছে না। আমার যে সাংবাদিক বন্ধু ছিল বদরুল হাসান, সে তো প্রকাশ্যেই বলত। প্রকাশকদেরও বদরুল বলেছে, নতুন লেখক, ভালো লেখক, তাকে নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। এভাবে সিনিয়ররা সহযোগিতা শুরু করলেন। অন্যরা লেখা পড়তে শুরু করলেন। অজিত গুহ আমার লেখা অন্যদের পড়তে বলতেন।
 
কিভাবে ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ লেখার আগ্রহ হলো?
শওকত আলী: আমার চিন্তাটি ছিল, দক্ষিণ এশিয়ার এই প্রান্তে মুসলমানদের সংখ্যা এত বেশি হওয়ার কারণ কী? এই প্রশ্নটি অনেককে করেছিলাম। কিন্তু কোনও ঠিক উত্তর পাই নি। মুসলমান যাঁরা দিগ্বিজয় করতে এসেছিলেন, তাঁরা তো ওই দিক দিয়েই এসেছেন। মোগল-পাঠানরাও পশ্চিম দিক দিয়েই এসেছে। এক সময় মুসলমানরা ওই অঞ্চলে আধিপত্য করেছে, শাসন করেছে কয়েক শ’ বছর। তারা ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ওখানে মুসলমানের সংখ্যা বাড়ে নি। এ সম্পর্কে বইপত্র পড়েছি। এক সময় একটি সংস্কৃত বই হাতে আসে। বইটির নাম ‘শেখ শুভদয়া’। সংস্কৃত মোটামুটি পড়তে পারি। লেখা আরম্ভ করার পর এই বই থেকে কিছু তথ্য দিয়েছি।
 
একে কি ঐতিহাসিক উপন্যাস বলবেন?
শওকত আলী: আমি এটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলতে চাই না। কারণ এতে ঐতিহাসিক বিবরণ প্রধান হয়ে ওঠে নি। কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা আছে, সেই সময়টাকে ধরার জন্য কিছু কল্পনা করা চরিত্র-ঘটনা আছে, কিছু জীবনধারা আছে-এগুলো আনা হয়েছে। এগুলো তো কল্পিত জিনিস। কিন্তু ইতিহাসের সঙ্গে সেটা মিলে গেছে।
 
ছোটগল্প থেকে উপন্যাস লেখার দিকে ঝুঁকলেন কেন?
শওকত আলী: প্রথমে ছোটগল্প দিয়েই তো শুরু করেছিলাম। গল্প লেখার ফর্ম বা কাঠামোটা এতে স্পষ্টতর হয়েছিল। কিন্তু উপন্যাস লেখার তাগিদটা এত বড় হলো যে, ছোটগল্পের দিকে মনোযোগটা থাকল না। তখন যেভাবে শ্রমিক-কৃষকদের নিয়ে, মধ্যবিত্তের প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে লিখেছিলাম, সেটা আর পরে মনে স্থান পায় নি। ওই ইতিহাসের দিকে, অতীতের দিকে মনটা ঝুঁকে গেল। শুধু ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ নয়, আমার অন্যান্য উপন্যাসেও কিন্তু প্রাচীনকালের কথা কিছু না কিছু উল্লেখ আছে।
 
কলকাতার সাহিত্যচর্চার সঙ্গে আমাদের পার্থক্য?
শওকত আলী: আধুনিক বাংলা সাহিত্যচর্চার শুরুটা তো কলকাতা থেকেই। এ বিষয়ে তো অস্বীকার করার কিছুই নেই এবং সেটাই চলে এসেছে এখন পর্যন্ত। আমরা যারা এখানে আধুনিক সাহিত্য রচনা করছিলাম বা আমাদের আগে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে কাজী আবদুল ওদুদ, সিকানদার আবু জাফর, আহসান হাবীব-তাঁরা কলকাতার আধুনিকতাকে গ্রহণ করেছেন। তবে তাঁরা চিন্তা করেছিলেন এখানে সাহিত্যের ভিত্তিটা কোথায় হবে? নগরজীবন হবে না কি গ্রামজীবন হবে? নগরজীবন হলে কোন জীবনটা? সে জীবন বাস্তব হবে কি না? তাঁদের লেখার মধ্যে এই বাস্তবতা আসতে শুরু করেছিল এবং এই বাস্তবতাই পরবর্তী সময়ে প্রেম-ভালোবাসার মধ্যে হোক বা জীবনযাপনের মধ্যে হোক, স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে হোক-এগুলোর মধ্য দিয়েই বড় হয়েছে এবং এসবের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতীয়তাবাদের ব্যাপারটা আরও স্পষ্টতর হয়েছে। আরেকটি কথা বলি, বাংলাদেশের বই কি কলকাতায় যায়? খুবই কম যায়। কিন্তু বাংলাদেশের বইয়ের ইন্ডাস্ট্রি কি তাতে কমে গেছে? ভারতের সাহিত্যচর্চার ভবিষ্যৎ কী হবে এটা আমি বলতে পারব না। এত পত্রপত্রিকা বেরোচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে নানা রকম ঘাপলামি আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই সাহিত্যের ব্যাপারটা এখনও জাগ্রত আছে বলে আমার মনে হয়।
 
সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসসহ অনেকে আছেন। তাঁদের ব্যাপারে…
শওকত আলী: সবার সম্পর্কে বলতে পারব না, তবে ইলিয়াসের সঙ্গে আমার চিন্তার অনেক মিল ছিল। তাঁর যে বিখ্যাত বই ‘খোয়াবনামা’ ও আমার ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এর মধ্যে কিন্তু খানিকটা মিল পাওয়া যায়। ইলিয়াস বিখ্যাত ঔপন্যাসিক। এ রকম ঔপন্যাসিক বাংলা সাহিত্যে অল্প কয়েকজন আছেন। ইলিয়াসকে নিয়ে তো কলকাতায় তেমন কিছুই হয় নি। এখানেও হয় নি। এখন তোমরা শওকত আলীকে নিয়ে মাতামাতি করছ। মাঝখানে তো কেউ কোনদিন আমার কাছে আসে নি। দু-একজন এসেছে। দু-একটা লেখা বের হয়েছে। ব্যস, ওই পর্যন্তই।
 
টিকাটুলী, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *