মনের প্রতিধ্বনিমুক্তমত

করোনা নিয়ে যত ভাবনা

রকিবুল ইসলাম মুকুল

করোনা কবে যাবে এটি এখন সারা দুনিয়ার ভাবনার বিষয়। কেউ কেউ বলছেন বছরজুড়ে থাকতে পারে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি। কেউ আবার বলছেন এটা দেড় থেকে দুই বছরও থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যান্থনি ফাউসি তো আগ বাড়িয়ে বলেছেন, মানুষ আর স্বাভাবিক জীবনে নাও ফিরতে পারে।

এখন আমার প্রশ্ন, স্বাভাবিক জীবন বলতে আমরা কি বুঝি? যা দৈনন্দিন, যা রোজকার অভ্যেস তাই তো? আমাদের সেই রোজকার অভ্যেস, আমাদের সেই স্বভাব বদলে দেবার জন্যই হয়ত প্রকৃতির এই এত বড় একটা ঝাঁকুনি।

আমরা- এই তথাকথিত সভ্য জগতের বাসিন্দারা জীবন বলতে বুঝি আরাম, আয়েশ, ভোগ-বিলাস, কাড়ি কাড়ি টাকা, ক্ষমতা, বন্দুক, ক্যাডার, শোষণের নানা হাতিয়ার, মারণাস্ত্র, ব্যাংক ব্যালেন্স ইত্যাদি। আসলে সেসবের এই মুহুর্তে কানাকড়ি দামও নেই। যাকে বলে ইয়া নফসি, ইয়া নফসি। আমেরিকার হাতে দুই হাজারেরও বেশি পারমাণবিক বোমা আছে, চীনের আছে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি নকল করার ক্ষমতা, মারণাস্ত্র, কথিত কমিউনিজমের আড়ালে বিশাল বপুর ক্যাপিটালিজম।

কোনটাই কি কাজে আসছে? না। আমরা মানুষরা যারা মিথ্যে মোহ, মিথ্যে অহমের পেছনে ছুটে জীবনের আসল মানেগুলোকে হারিয়ে ফেলেছি, সামাজিক বন্ধনকে টুকরো কাগজের মতো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করেছি তাদের কিন্তু ফিরে যেতে হয়েছে সেই বন্ধনের দিকেই।

বিশ্ব এখন যে পরিস্থিতির মুখোমুখি এটা একটা ইফেক্ট মাত্র। এর আফটার ইফেক্ট আরও ভয়াবহ। আজকে দুটো খবর পড়লাম/দেখলাম- এক. ট্রাক থেকে ত্রাণ ছিনিয়ে নিচ্ছে বুভুক্ষু মানুষ, মাটিতে ছড়িয়ে পড়া এক দু কেজি আলু নিয়ে যে যুদ্ধ দেখলাম, তাতে ওই মানুষগুলোর আসল অবস্থাটা সহজেই অনুমান করা যায়। এক কেজি আলুর বাজার দর এখনও সর্বোচ্চ ত্রিশ টাকা। সেই ত্রিশ টাকা দামের আলু ছিনিয়ে নিশ্চয়ই কেউ লুটেরা হবে না, জঠরের জ্বালাই ক্ষণিক মেটাবে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ঘরের মাটি খুড়ে চালের বস্তা তুলছে পুলিশ, গোডাউন থেকে বেরুচ্ছে গরীবের টনে টনে চাল। বাস্তবতাটা এখানেই।

খবর-২. বাংলাদেশে তথা ঢাকায় করোনা সংক্রমিতদের চিকিৎসায় এখনও পর্যন্ত একমাত্র হাসপাতাল কুয়েত মৈত্রী। সেখানকার নার্স ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদছেন। কালকে হয়ত ওই নার্সকে বরখাস্ত করা হবে। এটাই পারা যায়। কিন্তু একটা এত বড় দায়িত্বে থাকা হাসপাতালের মানুষজনের নূন্যতম চাহিদাটুকু মেটাতে আমরা যে অক্ষম তা তো বলাইবাহুল্য। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে, হাজার হাজার মানুষের হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়লে কি হবে তা আঁচ করা মামুলি ব্যাপার। মর্নিং শোজ দ্য ডে।

গতকাল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সিং করে চাল চোরদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছেন। এটা ভালো খবর। সঙ্গে তিনি একটা ব্যাপার বলেছেন, যেটা আমার ভালো লেগেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এক টুকরো জমিও যেন অনাবাদী না থাকে, আপনারা ছাদেও চাষ করুন, ওখান থেকে যা আসবে তাও কাজে লাগবে। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আসলেই অনেক প্রাজ্ঞ ও দুরদৃষ্টিসম্পন্ন। আমি আফটার ইফেক্টের কথা বলছিলাম শুরুতেই। করোনা সাধারণভাবে দুটো জিনিস করে যাবে। একটা হলো – মানুষের মনোজগত ও মনস্তত্ত্বে বড় ধরনের একটা পরিবর্তন আনবে যেটা অনেকের হয়ত দৃষ্টিগোচর হবে না। ‍দুই- সারা বিশ্বে বড় ধরনের একটা অর্থনৈতিক সঙ্কট, খাদ্যসঙ্কট তৈরি করে দিয়ে যাবে। এখন থেকে মিতব্যয়ী না হলে, এখন থেকে পরিকল্পনা না থাকলে শুধু মুখের বড় বড় বুলি দিয়ে ওই অবস্থা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। 

আর মানুষের মনস্তত্ত্বে যে পরিবর্তন আসবে তা মানুষকে আরও অন্তর্মুখী করে ফেলবে, মানুষকে আরও একঘেয়ে, সন্দেহবাতিক করে ফেলবে। মানুষ নিজেকেই আর বিশ্বাস করতে চাইবে না। সামাজিক অনেক পরিবর্তনও আসবে। কোলাকুলি, হ্যান্ডশেক করতেও মানুষ বহুকাল ভুলে যাবে। মাস্ক ছাড়া কারও সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতেও মানুষের অস্বস্তি হবে ভেতর থেকে। মানব মনস্তত্ত্বের অন্যান্য বিষয়ের মতো রোগব্যাধির ক্ষেত্রে আচরণের বিষয়টি বোঝার জন্য ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা আবিষ্কারের আগে সংক্রামক ব্যাধি ছিল মানুষের টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। তখন মানুষের শরীরে যে প্রতিরোধব্যবস্থা কাজ করত, তার ফলে মানুষ খানিকটা ক্লান্ত, ঘুমকাতুরে বোধ করত। তখন আমাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের নিয়মিত কার্যকলাপ—যেমন শিকার করা, জড়ো হওয়া বা শিশুদের লালন-পালন করার মতো কাজগুলো ঠিকভাবে করতে পারত না।

হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের মধ্যে সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে মানুষের এই ভীতি তৈরি হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে আচরণগত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা। যা কিছু আমাদের শরীরের জন্য খারাপ হতে পারে, সেটা আমরা এড়িয়ে যেতে চাই, তার বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিরোধমূলক আচরণ তৈরি করি।

ভ্যাংকুভারের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার অধ্যাপক মার্ক স্কলার বলছেন, এটা অনেকটা মেডিক্যাল ইনস্যুরেন্সের মতো। এটা থাকা ভালো, কিন্তু যখন আপনি সেটা ব্যবহার করা শুরু করবেন, তখন দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব জিনিস আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা দিয়েছে, সেগুলো আমাদের মনের ভেতরে থেকে যায়। ফলে এ ধরনের কোনও পরিস্থিতি তৈরি হলে, যা আমাদের ভবিষ্যতে বিপদে ফেলতে পারে, সেগুলো আমরা এড়িয়ে যাই।

এসব পরিস্থিতিকে বাস্তবতা মেনে নিয়ে আসুন আমরা মন খুলে হাসতে শিখি, খুঁজে নেই জীবনের সত্যিকারের মানে।

আচ্ছা আপনার কি এখন খুব ইচ্ছে করে না শনশন বাতাসে দুলে ওঠা কাশবন লাগোয়া পারভাঙা একটা চর জেগে ওঠা নদীতে নৌকার গলুইয়ে বসে সূর্যাস্ত দেখতে?

আপনার কি ইচ্ছে করে না দু ধারে সবুজ ক্ষেতের মাঝখানের স্যাঁতস্যাঁতে নোনা ধরা আল ধরে দূরের গ্রামে হেঁটে যেতে, যেখানে হয়ত আপনার বৃদ্ধা মা, দাদা-দাদি পথ চেয়ে তাকিয়ে আছে আপনার প্রত্যাগমনের আশায়।

আপনার কি ইচ্ছে করে না রোদে ঘাম লেপ্টানো জামায় বট পাকুড়ের ছায়ায় দু দন্ড জিরিয়ে নিতে। আপনার কি ইচ্ছে করে না মুড়ি মুড়কি বাতাসা জিলেপি, হাটের ধোঁয়া ওঠা চা পেঁয়াজুর গন্ধ নিতে।

আপনার কি ইচ্ছে করে না জোনাক জ্বলা গেঁয়ো পথে আবছা অন্ধকারে গা ছমছমে মুহুর্তগুলোতে কাঁচা সড়ক ধরে হেঁটে যেতে, দূরে একটা দুটো বাড়ি, জানালায় মৃদু আলো, শেয়ালের ডাক, নিশিথের পাখনা ঝাপটে গায়ে শিহরণ জাগানো পাখি, আবছা আলোয় কোনও উঠোন বা দাওয়া থেকে ডাক- কে? এই তো আমি, আমি। ও। কই যাস এত রাতে। এই তো চাচা হাঁটছি। ও ভালো। দেখে চলিস। সাপখোপ আছে কিন্তু এদিকটায়।

আপনার কি ইচ্ছে করেনা মাফলার মুড়ি দিয়ে কুয়াশা ঘেরা শীতের রাতে মাটির চুলোর পাশে বসে গরম পিঠে পুলির আশায় বসে থাকতে।

আপনার কি ইচ্ছে করে না, শহুরে ইট কাঠ কংক্রিকেটর জঞ্জালের ফাঁকফোকর গলে হুহু বয়ে আসা গহীন রাতের ছাদে প্রিয়জনের হাত ধরে দূরের নিস্তব্ধ জনপদের দিকে তাকিয়ে থাকতে। 

আপনার শুধুই কি ছুটতে ইচ্ছে করে অর্থবিত্ত ক্যারিয়ার ক্ষমতার পেছনে? জীবনের বাকি ওই ধামাচাপা ইচ্ছেগুলো জাগিয়ে তুলতেই হয়ত বড় একটা সময় ঘরবন্দী করে নিজেকে প্রশ্নগুলো ছুঁড়ে দেবার ফুরসত দিয়েছে করোনা।

নিজেকে জানুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন। হাসুন। সবাইকে নিয়ে ভালোভাবে বাঁচুন। উপরে যে ইচ্ছেগুলোর কথা বললাম, আমার খুব মনে হয়। আমি খুব মিস করি ওই জিনিসগুলো। আরও কত কি। আপনারও কি জীবনের অন্য পিঠটা একটু নেড়েচেড়ে দেখতে ইচ্ছে করে? ওটাও তো আমাদের জীবন। আয়নার ঝলমলে দিকটার পেছনে যে একটা লুকোনো প্রলেপ থাকে, সেই প্রলেপটা উঠিয়ে নিলে তো আয়নাই বৃথা।

 

লেখক: সাংবাদিক

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension