অঙ্গনা

কর্মজীবী নারীর দুঃখ

পিয়ারা বেগম


‘মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়া যে কত কষ্টের’—এই উক্তিটি করা হয় ভারতীয় চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেনের ‘একদিন প্রতিদিন’-ছবিতে। কর্মজীবী এক নারী মাঝেমধ্যে রাতে দেরি করে বাসায় ফিরত। এই নিয়ে পাড়াপড়শিদের সে-কী কানাঘুষা আর ফিসফাস! এতে তার পরিবারের রাতভর এক অস্বস্তিকর অবস্থার কথা তুলে ধরা হয়েছে ছবিটিতে।

আমাদের সমাজে কানকথা পাঁচকান করা অনেক মানুষের মজ্জাগত দোষ। নিষ্কর্মা মানুষের অবসর কাটানোর জন্য এর চেয়ে যুঁতসই কাজ আর তাদের নেই। এতে মজাও পায় বিয়ের বোরহানির মতো। সংগত কারণে, বাঙালি নারী কানাঘুষা হজম করায় অভ্যস্ত। প্রকান্তরে মিথ্যা বানোয়াট বিষয়টাকেও সত্য মেনে নিতে বাধ্য করা হয়। প্রবাদ আছে, দশচক্রে ভগবান ভূত! শুধু তাই নয়, কর্মজীবী নারীর সন্তানরা মানুষ না হলে মায়েদের অন্যায় শাসনকে দায়ী করা হয়। পক্ষান্তরে সন্তান উচ্চশিক্ষিত হলে বাবার কর্মজীবনই গৌরবের মালা পায়। কর্মজীবী মায়েরা ঘরসংসার সামলান। অফিসের দায়িত্বপালন করেন। উপরন্তু সংসারের সচ্ছলতা আনেন; কিন্তু সংসারের ঘানি টানার কোনো বাজারমূল্য সমাজ স্বীকৃতি দেয় না। কারণ, আমরা সম্পদের পরিমাণকে মাপতে শিখেছি বাজারমূল্য দ্বারা। তাই গুণপনায় একজন গৃহিণীর গুণের কোনো বাজারমূল্য নেই। একজন পুরুষের শ্রমের বাজারমূল্য আছে। সেই অর্থে কর্মরত একজন পুরুষ দেশের শ্রমসম্পদ; কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে বলা হয় নারীর দৈহিক গঠন ও মানসিক বিকাশ গৃহকর্মের জন্যই যথোপযুক্ত করে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই নারী গৃহকর্মের জন্যই শোভনীয়।

সুতরাং গৃহকর্মে নারীর আজন্ম শ্রমের কোনো বাজারমূল্য নেই। উপরন্তু স্ত্রীকে ‘হাউজওয়াইফ’ পদবিতে ভূষিত করা হয়। পোস্ট, পদবি আছে কিন্তু মাইনে নেই। পেটে ভাতে চাকরি। ভাবখানা এমন দেখানো হয় যে, ঘর সামলানো আর সন্তান লালনপালন যেন কোনো কাজই নয়। তাই শ্রমসম্পদ হওয়ার যোগ্যতাও নারীর নেই। কোনো কোনো পরিবারে স্ত্রীকে শ্রমদাস মনে করে। কথায়, আচরণে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। অবজ্ঞার চোখে দেখে। তাদের দৃষ্টিতে নারী বাঁদির কপাল নিয়েই জন্মায়। তবুও আবহমান কাল থেকে নারী তা হাসিমুখে পালন করে আসছেন। কারণ, স্বামী-সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করাটাকে তারা গৌরব মনে করেন। কাজ আর সেবা করতে করতে একসময় সংসারটাকে তারা ভালোবেসে ফেলেন।

করোনাকালে ৩০ শতাংশ নারী শ্রমিক সামাজিক নির্যাতনের শিকার
সম্প্রতি মেয়েরা শিক্ষায় অনেক দূর এগিয়েছে। কর্মক্ষেত্রেও বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত আছেন নারী। তারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায়ও নারীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান স্বীকার্য। এভারেস্ট চূড়ার শীর্ষেও নারী আজ বিজয়ী। কোথায় নেই নারীর পদচারণা? মেয়েরা পিএইচডি, এফসিপিএস করছেন। ব্যারিস্টারি পাশ করে আইন পেশায় কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তবে যত গুণাবলিসম্পন্ন হোক না কেন তা স্বামীর পরিবারে পরিচিতি কেবলি গৃহিণী।

এবার আসি পোশাকশ্রমিক প্রসঙ্গে। এই নারী পোশাকশ্রমিকরা আছেন মহাসংকটে। তারা কেউ কেউ স্বামী পরিত্যক্তা। কিংবা বিত্তহীন পরিবারের মেয়ে। টাকাপয়সার অভাবে বিয়ে দিতে পারছেন না বাবা। কিংবা বিধবা মা। তারা ভাড়া থাকেন কয়েক জন মিলে। গরিব স্বামীর স্ত্রীও পোশাকশিল্পে কাজ করেন। ভোর ৪টায় উঠতে হয়। কারণ, গ্যাসের চুলায় সিরিয়াল। ভাত-তরকারি রান্না করতে হয়। গোসলেও সিরিয়াল। পায়খানায়ও লাইন। নির্ধারিত সময়ে হাজির না হলে লেট মার্ক। দুই দিন লেট করলে এক দিনের বেতনকাটা। গরমে হাঁসফাঁস করে কাজ করতে হয়। মাথা ঘোরা, সর্দিজ্বর গা ব্যথা নিয়েও কাজে যান তারা। কাজে ভুল হলে সুপারভাইজারের বকাঝকা। বাসায় ফিরতে দেরি হলে স্বামীর চোটপাট। না ঘরে শান্তি, না বাইরে শান্তি। সংসার টিকিয়ে রাখতে বেতন-ভাতা স্বামীর হাতে তুলে দিতে হয়।

অবৈতনিক শ্রমে রয়েছে ২৯ শতাংশ নারী
বাসায় কাজ করলে বলে চাকরানি, কাজের মাইয়া। গার্মেন্টসে কাজ করলেও বলে, ‘গার্মেন্টসের মাইয়ারা খারাপ’—কোথায় যাবেন ওরা? পেটের দায়ে কাজ করেন। আসলে পোশাকশিল্প তো খারাপ নয়। পোশাকশিল্পের ভেতরে ছেলেদের সঙ্গে কোনো কথাই বলতেও দেয় না। সুপারভাইজার কাজ আদায়ের জন্য চাপে রাখেন। অভিভাবকের মতো ধমক দেন। এটাতে তারা খারাপ মনে করেন না। কারণ, তাদের চোখে ভেসে ওঠে জীর্ণ দেহ, শীর্ণ বস্ত্রের ক্ষুধার্ত স্বজনদের করুণ আকুতি! এদের মুখে একটু হাসি ফোটানোর কাছে এসব সমস্যা অতি তুচ্ছ; কিন্তু রাস্তঘাটে যত বিপত্তি! আসা-যাওয়ার পথে অশ্লীল মন্তব্য। ওভারটাইম করতে হয় বাড়তি আয়ের জন্য। রাতে দল বেঁধে ফিরেন। তবুও শুনতে হয় ভর্ত্সনা। এখন ওরা বোরকা পরেন। মুখোশ পরেন। তবুও নিষ্কৃতি নেই তাদের। সহজলভ্য মেয়ে হিসাবে কখনো তাদের সম্ভ্রমহানির ঘটনাও ঘটে। তবু তারা নিস্পৃহ, নীরব। পোশাকশিল্পে কঠোর নিয়মনীতি মেনে চাকরি করেও তারা খুশি। এতে শত শত পরিবারে দুমুঠো ভাত-কাপড়ের সংস্থান হয়। তাই নির্বিবাদে মেনে নেন অধীনস্ততা। মেনে নেন রাস্তাঘাটের পদেপদে কুিসত মন্তব্য। তবুও প্রতিবাদ আসে কখনোসখনো। কারণ, তারাও তো রক্তমাংসের মানুষ! এতেও বাঁধে বিপত্তি! গৃহে প্রতিবাদ করলে বিবাহবিচ্ছেদ বাড়ে। তাই সংসার বাঁচাতে গায়ের চামড়াটকে গন্ডারের চামড়া বানিয়ে ফেলেন। পোশাকশিল্পে প্রতিবাদ করলে চাকরিচ্যুত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা। তখনি বৃদ্ধা মা-বাবার ক্ষুধার্ত চেহেরা ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠে গর্ভে রেখে স্বামী পরিত্যক্তা মেয়েটির অবুঝ সন্তানের কথা। ভেসে ওঠে স্বামীর নেশার টাকা জোগানোর কঠিন হুঁশিয়ারির কথা! ভেসে ওঠে রোগশয্যায় শায়িত প্যারালাইজড বাবার কথা। ক্যানসারে আক্রান্ত ছোট ভাইটার করুণকাতর অনুনয়ের কথাও কানে বাজে। বুবু, আমি বাঁচতে চাই! কষ্টে বুক ফাটে তবুও মুখ ফোটে না! নীরবে নিভৃতে কাঁদে তাদের প্রতিবাদের ভাষা!!

তাই তো মৃণাল সেনের ভাষায় আবারও বলছি, ‘মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়া যে কত কষ্টের।’


লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension