কুইন অব পপ

মুবিন খান: ‘গান জিনিসটা নিছক সৃষ্টিলীলা। ইন্দ্রধনু যেমন বৃষ্টি আর রৌদ্রের জাদু, আকাশের দুটো খামখেয়ালি মেজাজ দিয়ে গড়া তোরণ, একটি অপূর্ব মুহূর্তকাল সেই তোরণের নিচে দিয়ে জয়যাত্রা করবে।…মেজাজের এই রঙিন খেলাই হচ্ছে গীতিকাব্য’

-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যাত্রী, পশ্চিম-যাত্রীর ডায়ারি।

সকাল সাতটা তখনও বাজে নি। আমরা কজন স্কুলের মূল ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছি। মূল ফটকটা বন্ধ। কিন্তু তার একটা পাল্লায় একটা ছোট্ট দরজা। সেটা খোলা। আমাদের দুয়েকজন তাতে একটা পা রেখে দাঁড়িয়ে। আমরা সবাইও অর্ধবৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে গল্প করছি।

এর মধ্যে ইরানি বংশোদ্ভূত সোহেল এল। সোহেলের চোখ দুটা বড় বড় আর লাল হয়ে রয়েছে। চুলও এলোমেলো। জানা গেল, সোহেল কাল সারারাত ঘুমোয় নি। সারারাত ভিসিআরে সিনেমা দেখছে। সিনেমার নাম ‘থ্রিলার।’ মাইকেল জ্যাকসনের মুভি। আসলে মিউজিক ভিডিও। কিন্তু ‘মিউজিক ভিডিও’ শব্দবন্ধর সঙ্গে আমরা তখনও পরিচিত নই। সোহেল তার রাতজাগা বড় বড় চোখ আরও বড় বড় করে প্রায় ভাঙা ভাঙা বাংলা উচ্চারণে  থ্রিলারের গল্প বলতে লাগল। আর আমরা আফসোস মিশ্রিত ঈর্ষা নিয়ে সোহেলের গল্পর বর্ণনা শুনতে লাগলাম।

মাইকেল জ্যাকসনকে আমরা চিনি। তার গান আমরা শুনেছি। ভাষাটা তখন না বুঝলেও বাদ্য বাজনা আর প্রচলিত ধারার বাইরে গায়কী ভঙ্গি আমাদের টানত। মুগ্ধ করত। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত মাইকেল জ্যাকসনের ষষ্ঠ একক অ্যালবাম ‘থ্রিলার’ বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সেসময় থেকেই মাইকেল জ্যাকসনক্ ‘কিং অব পপ’ ডাকা শুরু হয়।

মাইকেল জ্যাকসনের প্রতি আমাদের মুগ্ধতায় আমাদের কেউ কেউ গিটার কিংবা ড্রামস্ বাজালেও, তার সঙ্গে কেউ গান করলেও মাইকেল জ্যাকসনের মত নৃত্য-গীত করতে পারা গাইয়ে কিং অব পপ হতে পারার উৎসাহিত হতে পারে নি।

কিন্তু রাহমি মেয়েটা উৎসাহিত হয়েছে। আমাদের কিশোর বেলাকার এই গল্প আজ স্মরণ করিয়ে রাহমি খান নামের মেয়েটা মাইকেল জ্যাকসনের মত কিং হতে না পারুক, কুইন অব পপ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। অথচ আমাদের গল্পর সঙ্গে রাহমি খানের গল্পর কোন সমিল নেই। হতে পারে বাংলাদেশের মাটিতে ইরানি বংশোদ্ভূত সোহেল যেমন, তেমনই আমেরিকার মাটিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাহমি খান। অথবা রাহমি খানের কিং অব পপ মাইকেল জ্যাকসন হতে চাওয়ার স্বাপ্নিক বাসনা।

পনেরো বছরের রাহমি খান পপ সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে আমেরিকার আকাশে উদিত হয়েছে। রাহমি বাংলাদেশেরই মেয়ে, তবে জন্মেছে আমেরিকাতে। সে কারণে আমেরিকান হয়ে বেড়ে উঠেছে আমেরিকার হাওয়া মাটি জলে। লেখাপড়া করছে ওয়ালস্ট্রিটের অর্থায়নে পরিচালিত একটা স্কুলে। সে স্কুলে সেরা ছাত্রী নির্বাচিত হয়েছে রাহমি। তবে সকল কিছুকে ছাপিয়ে উঠেছে রাহমির সঙ্গীত প্রতিভা।

বাংলাদেশে না থেকেও, বাংলাদেশকে কখনও না দেখেও বাংলাদেশের মেয়ে রাহমি নামের এই কিশোরীর কণ্ঠের মাদকতা মনোযোগ কেড়েছে আমেরিকার মূলধারার বিভিন্ন সঙ্গীতের জায়গাগুলোতে। কারনেজ হল, জাজ অ্যাট লিংকন সেন্টার, ইউনিয়ন হল, টাইমস স্কয়ার আর তার সঙ্গে প্রায় অর্ধশত মঞ্চ মাতিয়েছে রাহমি। ওয়াইপিসি আগামী সাত বছরের জন্য ‘বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কণ্ঠ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে রাহমির নাম। গেল জুনে নিউইয়র্কের সিটি কাউন্সিল স্পিকার কোরে জনসন ও কাউন্সিলম্যান ড্যানিয়েল মিলার রাহমিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সিটি হলের এক অনুষ্ঠানে গাইতে।

রাহমি খানের বাবা লিটন খান বলছিলেন, রাহমির  তিন বছর বয়সে এক বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে গাড়িতে বাজতে থাকা এ্যাকনের গানের সঙ্গে রাহমি কন্ঠ মেলাচ্ছিল। খুব কঠিন একটি তালে রাহমি যখন পুরোটা দম টেনে গেয়ে উঠল, রাহমির বাবা গাড়ি থামিয়ে মেয়ের সঙ্গীত প্রতিভায় বিস্মিত হয়ে তাকিয়েছিলেন। সে বিস্ময়ই তখন  মেয়েকে গান শেখানোর সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করেছিল। রাহমির মাকেও বললেন সে কথা।  পরদিন বাসার টেলিভিশনের সকল হিন্দি চ্যানেল সরিয়ে ফেললেন। তিনি চাইছিলেন রাহমি মূলধারার আমেরিকান সঙ্গীতের সঙ্গেই পরিচিত হয়ে উঠুক। সেটা রাহমি হয়েছিল।

এরপর শুরু হল রাহমির সঙ্গীতময় জীবন। মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সেই প্রথমবারের মত স্কুলে স্টেজ পারফরমেন্স করল মেয়েটা। বাবা লিটন খান আগে থেকে জানলেও স্কুলের সেই অনুষ্ঠানে উপলব্ধি আর আবিষ্কার করলেন তার জাদুকরি কন্ঠর আপন কন্যাটি একজন আজন্ম শিল্পী!

রাহমির বলল সে একা একাই গান শিখেছে। এই একা একা শিখতে শুরু করার পর তার আনুষ্ঠানিক চর্চাটা শুরু হল সাত বছর বয়সে। ওর পছন্দ যে পপ সঙ্গীত সেটা তো আমরা শুরুতেই জেনেছি। সে কারণে আপন গায়কীতেও রাহমি পপ সঙ্গীতকেই বেছে নেয়ে। আর এই পছন্দ আর ভালো লাগা থেকেই  সঙ্গীতে রাহমির আদর্শ হয়ে উঠেছেন কিং অব পপ মাইকেল জ্যাকসন।

কিশোরী রাহমি তার সঙ্গীতের আদর্শ মানুষটির সম্পর্কে বলছিল, মাইকেল জ্যাকসন শুধু বিনোদনের জন্যে গান করতেন, তা নয়। তাঁর সকল গানেই কোনও না কোনও বক্তব্য থাকত। সেসব বক্তব্য অনেক সময় মানুষের ওপর এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে যে জীবনের ধারা পাল্টে যেতে পারে। যেমন মাইকেল জ্যাকসনের থ্রিলার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ সঙ্গীত তারকার গান যেটি এমটিভিতে প্রচার হয়েছিল। এমনকি সেসময় বর্ণবৈষম্য দূর করতেও থ্রিলার অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল। আর বর্তমানে আমরা যে মিউজিক ভিডিও দেখি, এর প্রচলনটিও শুরু হয়েছিল থ্রিলারের মাধ্যমেই। ফলে আমাদের রাহমিও যখন দৃঢ়কন্ঠে বলে ওঠে, গান দিয়ে জগৎ পাল্টে দেওয়া যায়, আমরা তার কথা উড়িয়ে দিতে পারি না।

রাহমি খান নামের মেয়েটা শুধু যে কন্ঠশিল্পী হতে চায়, তা কিন্তু নয়। রাহমি চায় আমেরিকার প্রতিষ্ঠিত আর সেরা সঙ্গীত শিল্পী হতে। তবে আগে লেখাপড়া। লেখাপড়া নিয়েই এখন ব্যস্ত সে। লেখাপড়া শেষ করবার পর সঙ্গীতে প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি একজন বিনিয়োগ বিষয়ক ব্যাংক কর্মকর্তা  হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে চাওয়ার কথা জানাল রাহমি। ফলে সঙ্গীত চর্চার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে রাহমি। কিংবা এভাবেও বলতে পারেন, লেখাপড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সঙ্গীতচর্চাও সমানভাবে চালিয়ে যাচ্ছে রাহমি। স্কুলের সেরা ছাত্রীর স্বীকৃতি সেই কথাটিই আমাদের জানিয়ে দেয়।

এখন রাহমির লক্ষ্য  আমেরিকান আইডলে অংশ নেওয়া। উঁহু, হল না, অংশ নেওয়া শুধু নয়, রাহমির আসলে লক্ষ্য আমেরিকার সঙ্গীত জগতের আদর্শ হয়ে ওঠা। আরেকটু নির্দিষ্ট করে বললে, রাহমি আমেরিকার এমন একজন সঙ্গীত শিল্পী হতে চান যেন পুরো আমেরিকাই রাহমিকে আদর্শ মনে করতে শুরু করে। …এবং আমরাও আমেরিকানদের সে মনে করায় ঘি ঢালতে চাই। তারপর আমরা সেখানে একটি বাক্য জুড়ে দেব- রাহমি হোক আমেরিকানদের আদর্শ, আমাদের তো মেয়ে, আমরা তখন বলব, ‘আমাদের বাংলাদেশের অহঙ্কার তোমাদের কুইন অব পপ।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *