‘কোথা জল কোথা কূল’

মূল লেখা: ইকবাল বাহার

অনুবাদ: মুবিন খান

 

বিশেষজ্ঞরা তাদের ধারণা থেকে জানিয়েছেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধটি নাকি পানির জন্যেই হবে। পৃথিবী জুড়ে মানুষের সংখ্যা বেড়ে  চলেছে আর তার সঙ্গে বেড়ে চলেছে পানির চাহিদাও। বিশ্বাসযাগ্য মনে হলেও কিছু তথ্য দেই। সত্য তথ্য। যদিও আমাদের এই পৃথিবীর প্রায় ভাগই পানি, কিন্তু আপনি শুনে অবাক হবেন যে এর মাত্র আড়াই ভাগ মিষ্টি বা সুপেয় যেগুলো হিমবাহ, বরফ,  পুকুর, হ্রদ, নদী এবং ভূগর্ভে রয়েছে। আর বাকি সাড়ে সাতষট্টি ভাগ পানি লবণাক্ত। সাগর-মহাসাগরের পানি। মার্কিন ভূতত্ত্ব জরিপ জানাচ্ছে, ওই আড়াই ভাগ  পানযোগ্য পানির মাত্র এক ভাগ আমাদের হাতের নাগালে রয়েছে। আর বাদ বাকি দেড় ভাগ হিমবাহ আর তুষারের মাঝে। আমাদের নাগালের বাইরে। দুষ্প্রাপ্য।

আমরা প্রায়ই হাহাকার করে বলতে থাকি, পানির অভাবে বাংলাদেশ মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে! সত্যিকার অর্থে  ব্যাপারটা আসলে সেরকম নয়। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মিষ্টি পানির প্রাপ্যতার হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান পৃথিবীতে এক নম্বরে। ব্রাজিলের রিজার্ভ আট হাজার দু শ’ তেত্রিশ কিউবিক কিলোমিটার যা পৃথিবীতে সর্বাধিক। অন্যদিকে আমাদের রিজার্ভ এক হাজার দু শ’ তেইশ কিউবিক কিলোমিটার। ব্রাজিলের আয়তন বাংলাদেশের চেয়ে আটান্ন গুণ। সেই হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ব্রাজিলের চেয়ে আমাদের পানির প্রাপ্যতা ছয় দশমিক সাত গুণ বেশি।

আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর রিজার্ভ ভারত এক হাজার নয় শ’ এগার কিউবিক কিলোমিটার, চীন দু হাজার আট শ’ কিউবিক কিলোমিটার, পাকিস্তান দু শ’ ছেচল্লিশ  কিউবিক কিলোমিটার। রাশিয়ার আয়তন বাংলাদেশের একশ’ পনের গুণ। তাদের রিজার্ভ চার হাজার পাঁচ শ আট কিউবিক কিলোমিটার। বাংলাদেশের মাত্র সাড়ে তিন গুণ। আঠাশটি দেশের সমন্বয়ে গঠিত ইউরোপিয় ইউনিয়নের রিজার্ভ দুই হাজার সাতান্ন কিউবিক কিলোমিটার। বাংলাদেশের দ্বিগুণের কম। অস্ট্রেলিয়ার রিজার্ভ চার শ’ বিরানব্বই কিউবিক কিলোমিটার, যা বাংলাদেশের রিজার্ভের অর্ধেকেরও কম। এই পরিসংখ্যান থেকে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে আমরা আসলে পানিতে ডুবে আছি, যদিও বছরের চার মাস দেশের একটা বড় অংশ পানি শূন্যতায় থাকে।

তবে এই সংবাদে সন্তুষ্টির ঢেঁকুর তুলবার কোনও কারণ নেই, কেননা আমাদের পানির রিজার্ভের চিত্রটা আনন্দদায়ক হলেও পুরো পৃথিবীতে কিন্তু এই চিত্রটা ভয়াবহ। উত্তর আমেরিকা থেকে ভারত হয়ে আফ্রিকা থেকে ইউরোপ পর্যন্ত সকলেই খরায় আক্রান্ত। ১৯৭০ সাল থেকে ২০১২ সালের সময়কার খরায় মারা গেছে প্রায় ছয় লক্ষ আশি হাজার মানুষ। আমাদের সঙ্গে যেমন ভারতের, ভারতের সঙ্গে যেমন চীনের; তেমনি পৃথিবীর সকল দেশেরই কারও না কারও সঙ্গে পানি নিয়ে দ্বন্দ্ব একটা সময়ে খুব জনপ্রিয় একটা ধারণা ছিল যে মহাসমুদ্রগুলো দূষণের পক্ষে অনেক বিশাল। মানে দূষণ হবে না। আজকে, এই গ্রহটিতে প্রায় আট বিলিয়ন মানুষ। ফলে এটা এখন সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে সবকিছুরই একটা সীমা আছে। দূষণ হল সেসব সীমার একটা যা মানুষ অতিক্রম করে ফেলেছে। পানি দূষণের এই ব্যাপারটা পানি নিজে নিজেই কখনও শুরু করে না। আমাদের মানুষদেরই কোনও না কোনও কর্মকান্ড পানির গুণগত মানের ওপর কোনও না কোনভাবে প্রভাব ফেলে। কৃষকেরা যখন তাদের চাষবাসের কাজে সার ব্যবহার করেন, সেসব সারে থাকা রাসায়নিকগুলো ধীরে ধীরে বৃষ্টির সঙ্গে ধুয়ে গিয়ে ভূগর্ভস্থ বা ভূপৃষ্ঠের পানির সঙ্গে গিয়ে মেশে।

কখনও কখনও পানি দূষণের কারণগুলো খুবই বিস্ময়কর। কলকারখানার স্মোকেস্ট্যাক্স বা চিমনি দিয়ে নির্গত ধোঁয়ার সঙ্গে রাসায়নিক গিয়ে  মিশে যেতে পারে আর তারপর বৃষ্টির সঙ্গে, সমুদ্র, নদী, এবং হ্রদের পানিতে গিয়ে মেশে। এবং এরপর পানি দূষণ ঘটায়। এই গ্রহের কোটি কোটি মানুষের সঙ্গে, তাদের তৈরি করা নিকাশী (সুয়ারেজ) বর্জ্যর সমাধান একটি প্রধান সমস্যা। যখনই আমরা সাগর-মহাসাগরের দূষণের কথা ভাবি, একটা বিশাল কালো তেলের প্রস্তর আমাদের মনে ভেসে ওঠে। সমুদ্রের সত্তর ভাগ তেল দূষণ নিয়মিত চলাচল করা জাহাজগুলো থেকে আসে এবং

অন্যদিকে তেল কোম্পানির লোকেরাও তাদের তেলের বর্জ্যগুলোও সরাসরি নর্দমায় ঢেলে দেয়। এই ব্যাপারে প্লাস্টিক অনেকদূরে, যেটা কিনা দূষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রচলিত পদার্থ।কেননা প্লাস্টিক পচনশীল নয়।

দূষণ বিষয়টা, যেহেতু মানুষ পরিবেশের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে, তাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পরিবেশ বিষয়টা আমাদের জীবন থেকে আলাদা কিছু নয়।  পরিবেশ মানে শুধু শত মাইল দূরে বসে বসার ঘরে টেলিভিশনে দেখতে থাকা চমৎকার নজরকাড়া সৌন্দর্যর উপকূলীয় কোনও দৃশ্য নয়। পরিবেশ হল আমাদেরকে ঘিরে থাকা চারপাশের সকল কিছুই যা আমাদের জীবন আর সুস্বাস্থ্য দিয়ে চলেছে। এই পরিবেশকে ধ্বংস করে ফেলার অর্থ হল অবধারিতভাবেই আমাদের নিজেদের জীবনের মান কমিয়ে ফেলা- আর এই কারণেই, প্রচন্ড স্বার্থপরের মতই, পরিবেশ দূষণের দায়টা আমাদের সকলেরই। ভবিষ্যতে এমন একটা সময় হয়ত আসবে যখন আমরা পূর্ণ প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠব। ঘরের ফ্রিজটা খাবারে ভরতি হয়ে থাকবে কিন্তু পান করতে পারার মত কোনও বিশুদ্ধ পানির উৎস আর বাকি থাকবে না।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *