সম্পাদকীয়

কোন পথে যুক্তরাষ্ট্র?

তারেক শামসুর রেহমান

যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যর্থতা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, ঠিক তখনই মিনিয়াপোলিসে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েডের ‘হত্যাকাণ্ড’ সারা দেশে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকে আবারও উসকে দিয়েছে। নিউইয়র্ক, শিকাগো ও ওয়াশিংটন ডিসির মতো বড় বড় শহরে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে একটা প্রশ্নের মাঝে ফেলে দিয়েছে। এই আন্দোলন ইতোমধ্যে ইউরোপের অনেক দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।

বর্ণবাদ যুক্তরাষ্ট্রের একটা পুরনো ‘রোগ’- ১৯৬৩ সালে দেয়া মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই বিখ্যাত ভাষণ ‘I have a dream’ (আমার একটি স্বপ্ন আছে), এরপর এতটা বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু বর্ণবাদকে সেখানে সমাজ থেকে উৎখাত করা সম্ভব হয়নি। জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ড এর সর্বশেষ উদাহরণ। টিভির বদৌলতে সারা বিশ্বের মানুষ দেখেছে জর্জ ফ্লয়েডের ঘাড়ের ওপর হাঁটু চেপে ধরে একজন শ্বেতাঙ্গ অফিসার কিভাবে শ্বাসরোধ করে ‘খুন’ করেন ফ্লয়েডকে। ফ্লয়েডকে বলতে শোনা গেছে, ‘আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, আমি শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছি না।’ কিন্তু তারপরও ওই শ্বেতাঙ্গ অফিসার ফ্লয়েডের ঘাড়ের ওপর থেকে হাঁটু সরিয়ে নেন নি। দীর্ঘ আট মিনিট ওই অবস্থায় থেকে ফ্লয়েড মারা যান। ফ্লয়েডের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দ্রুত আগুনের ফুলকির মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। শুধু কৃষ্ণাঙ্গরাই যে আজ Black Lives Matter-এর ব্যানারে সংগঠিত হয়েছে তেমনটি নয়, বরং শ্বেতাঙ্গরাও এই বিক্ষোভে শরিক হয়েছে। শুক্র-শনিবার পর্যন্ত বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল যে, একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসের বাংকারে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল তার নিরাপত্তারক্ষীরা।

শুধু একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে এ ধরনের একটি আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, যা সারা যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে গেছে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। প্রথমত, চার বছর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যেভাবে ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসি’র ধারণা প্রমোট করছেন, তাতে করে একদিকে কৃষ্ণাঙ্গরা, অন্যদিকে এশীয় ও হিসপানিক বংশোদ্ভূতরা এক ধরনের আতঙ্কে ভুগছেন। তারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান তাদের যে অধিকার দিয়েছে, তা ট্রাম্প খর্ব করছেন বা খর্ব করতে চাচ্ছেন। বিক্ষোভের পেছনে এটা একটা কারণ।

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গরা বরাবরই অবহেলিত। তাদের চাকরির বাজার সীমাবদ্ধ। বেকারত্বের হার তাদের মাঝে বেশি। পিউ (Pew) রিসার্চ সেন্টারের মতে, জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অসমতার হার সবচেয়ে বেশি। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মাঝে আয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ১৯৬৩ সালে শ্বেতাঙ্গ পরিবারপ্রতি আয় ছিল সর্বোচ্চ ১,২১,০০০ ডলার (বছরে), ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় শ্বেতাঙ্গ পরিবারপ্রতি ৯,১৯,০০০ ডলার, আর কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারপ্রতি মাত্র ১,৪০,০০০ ডলার (আর হিসপানিক বা স্প্যানিশ বংশোদ্ভূতদের ১,৯২,০০০ ডলার)। এতে দেখা যায়, একটি কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারের চেয়ে একটি শ্বেতাঙ্গ পরিবার ৭০০,০০০ ডলার বেশি আয় করে। এত বছরেও এই বৈষম্য কমে নি, বরং বাড়ছে। এর অর্থ হচ্ছে, সমাজের শীর্ষ পদগুলো শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্যই অলিখিতভাবে নির্ধারিত। কৃষ্ণাঙ্গদের সেখানে কোনো প্রবেশাধিকার নেই। এতে করে কৃষ্ণাঙ্গদের মাঝে ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। এই ক্ষোভটি বারবার এ ধরনের আন্দোলনের জন্ম দেয়। যদিও এটা ঠিক, ৩০ কোটির অধিক জনসংখ্যার দেশ যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর আধিক্য বেশি, শতকরা ৭২.৪১ ভাগ, আর কৃষ্ণাঙ্গ মাত্র ১২.৬১ ভাগ। তুলনামূলক বিচারে কৃষ্ণাঙ্গদের ‘চাকরির নিরাপত্তা’ কম।

তৃতীয়ত, আয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার একটি পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে আরবান ইন্সটিটিউটের একটি প্রতিবেদনে (Nine Charts about Wealth Inequality in America)। এতে দেখা যায় কীভাবে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। তৃতীয়ত, করোনাভাইরাসেও শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মাঝে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত, মৃত্যুহার ও চাকরি হারানোর হার বেশি (আরবান ওয়ার, ১০ এপ্রিল ২০২০)। গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন (২০ মে ২০২০) থেকে জানা যায়, করোনাভাইরাসে যুক্তরাষ্ট্রে যত মানুষ মারা গেছে (আক্রান্ত ১৯,৬৫,৯১২, মৃত্যু ১,১১,৩৯৪, ৬ জুন), তার মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ মৃত্যুহার শ্বেতাঙ্গ মৃত্যুহারের চেয়ে তিনগুণ বেশি। ব্রুকিংস ইন্সটিটিউটের (Brooking Institute) তথ্যমতে, প্রতি পাঁচজন কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানের মধ্যে একজনের কোনো হেলথ ইনস্যুরেন্স, অর্থাৎ স্বাস্থ্যবীমা নেই। তারা নিয়মিত চিকিৎসা পান না। মৃত্যুর এটা একটা বড় কারণ। ফলে কৃষ্ণাঙ্গদের মাঝে যে ক্ষোভ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।

চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির দেশ (২১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার, ২০১৯)। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারেনি। করোনাভাইরাসের সময় এ বিষয়টি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রকট যখন বৃদ্ধি পায়, তখন দেখা গেল হাসপাতালগুলোতে যথেষ্ট পরিমাণ আইসিইউ বেড নেই। ভেন্টিলেটর নেই। মাস্ক নেই। ডাক্তার তথা নার্সদের জন্য পিপিই নেই। শুধু ভেন্টিলেটরের অভাবে শত শত মানুষ সেখানে মারা গেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ৬ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছে আফগানিস্তান ও ইরাকে যুদ্ধের পেছনে। এ পরিমাণ অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা আরও উন্নত করা যেত, সবার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যেত। এতে করে স্বাস্থ্য সেক্টরে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মাঝে যে বৈষম্য তৈরি হয়েছিল তা কমিয়ে আনা যেত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতি, বিশেষ করে ‘ওবামা কেয়ার’ বাতিল করে দেয়ায় এই বৈষম্য আরও বেড়েছে। ট্রাম্প স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী বীমা কোম্পানি তথা ওষুধ কোম্পানিগুলোর পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে কোভিড-১৯-এ মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও এ ক্ষেত্রে তার কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ লক্ষ করা যায় না।

পঞ্চমত, কৃষ্ণাঙ্গ অসন্তোষ উস্কে যাওয়ার পেছনে ‘ট্রাম্পের অনেক বক্তব্যও দায়ী। আন্দোলনকারীদের তিনি হুমকি দেন। তিনি এই আন্দোলনকে চিহ্নিত করেছেন ‘domestic terror’, অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস হিসেবে (নিউইয়র্ক টাইমস)। যেখানে জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডে তার সহানুভূতি দেখানোর কথা, সেখানে তিনি তাদেরকে সন্ত্রাসী, এমনকি সেনাবাহিনী নামিয়ে আন্দোলন দমন করার কথাও বলেছেন। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প প্রশাসনের অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বার ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট ও’ব্রায়েনও আন্দোলনকারীদের ‘বহিরাগত জঙ্গি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ ধরনের বক্তব্য মূল ঘটনাকে আড়াল করার শামিল।

ষষ্ঠত, জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু ও মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনাবলিকে পর্যবেক্ষকরা আখ্যায়িত করেছেন ‘Racism and Racial Terrorism Has Fueled Nationwide Anger’ হিসেবে (অ্যামি ওডম্যান, ট্রুথআউট, ১ জুন) অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে যে বর্ণবাদ এখনও আছে, তা-ই উস্কে দিয়েছে জর্জ ফ্লয়েডের এই মৃত্যু। আরেক বিশ্লেষক উইলিয়াস রিভার্স পিট এই আন্দোলনকে একটি ‘বিপ্লবের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। এক ধরনের ‘কালার রেভ্যুলেশনের’ কথাও বলছেন কেউ কেউ।

নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় ধরনের সংকটে আছে। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যর্থতা চরমে উঠেছে। ইতোমধ্যে ট্রাম্প বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে এনেছেন। অথচ করোনাভাইরাস একটি বৈশ্বিক সংকট সৃষ্টি করেছে। এখানে চীন, যুক্তরাষ্ট্র তথা শীর্ষ ধনী দেশগুলোর মাঝে একটা সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা না করে ট্রাম্প একা চলতে চান, যা করোনাভাইরাস মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট নয়। এমনই এক পরিস্থিতিতে ‘Black Lives Matter’ ট্রাম্পবিরোধী আন্দোলনে নতুন এক রূপ পেয়েছে।

এই আন্দোলন ইউরোপসহ অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, ট্রাম্পের বর্ণবাদী নীতির ব্যাপারে বিশ্বের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সমর্থন নেই। ট্রাম্প জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন হোয়াইট হাউসে। কিন্তু জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেল তাতে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

আগামী ৪ মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখেই ট্রাম্প একের পর এক বর্ণবাদী বক্তব্য রাখছেন। এদিকে পিউ রিসার্চের এক জরিপে (৩২ দেশে) দেখা গেছে, শতকরা ৬৪ ভাগ লোকের ট্রাম্পের ওপর কোনো আস্থা নেই (ভারতে আস্থা আছে ৫৬ ভাগের, পোল্যান্ডে ৫১ ভাগের)। এখন জর্জ ফ্লয়েডের ‘মৃত্যু’ নভেম্বরের নির্বাচনে আদৌ কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা, সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক: প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension