ক্ষমতার সঠিক ব্যবহার করতে পারেন নি, বিস্ফোরক মন্তব্য হার্দিকের

রূপসী বাংলা কলকাতা ডেস্ক: সদ্য কংগ্রেসে নাম লিখিয়েছেন পাতিদার নেতা হার্দিক প্যাটেল। মাত্র এক মাস গড়িয়েছে। এরমধ্যেই তাঁকে তুরুপের তাস করে গুজরাতের জামনগর থেকে প্রার্থী করার কথা ঘোষণা করে দিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী। হার্দিক আসায় গুজরাতে অক্সিজেন ফিরে পেয়েছে কংগ্রেস। কারণ, ২০১৪ সালের নির্বাচনে গুজরাতের ২৬ টি আসনেই জয়লাভ করে বিজেপি। তাই হার্দিককে শিখণ্ডী করে গুজরাতে নোঙ্গর ফেলার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছেন কংগ্রেস সভাপতি। হার্দিকও নির্বাচনে দাঁড়িয়ে যথেষ্ট আশাবাদী।

ময়দানে নেমে ইতিমধ্যেই নিজের প্রভাব বোঝাতে চাইছেন তিনি। বিভিন্ন দলীয় পদ থেকে সদ্য ইস্তফা দেওয়া নেতা অল্পেশ ঠাকুরকে কড়া ভাষায় তোপ দাগলেন তিনি। এএনআইকে দেওয়া এক বিবৃতিতে রবিবার হার্দিক বলেন, কংগ্রেসের দেওয়া সম্মান ও ক্ষমতার সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেন নি অল্পেশ। ” কংগ্রেস তাঁকে যথেষ্ট সম্মান ও ক্ষমতা দিয়ে ছিল। কিন্তু তিনি এগুলোর সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেন নি। তিনি অভিযোগ-অভিযোগ খেলায় মেতেছিলেন। “

২০১৭ সালে গুজরাত বিধানসভা ভোটের সময় কংগ্রেসে যোগ দেন অল্পেশ। কিন্তু গত বুধবার তিনি সিদ্ধান্ত নেন সমস্ত দলীয় পদ থেকে ইস্তফা দেবেন। সেই প্রসঙ্গেই অল্পেশকে একহাত নেন কংগ্রেসের জামনগর প্রার্থী। ২০১৫ সালে পাতিদার আনামত আন্দলন শুরু হয় গুজরাতের আমেদাবাদে। যার নেতৃত্ব দেন তৎকালীন ২১ বছরের তরুণ হার্দিক। তখন থেকেই বিজেপির গড় গুজরাতে বিজেপি বিরোধী মুখ হিসেবে উঠে এসেছিলেন তিনি। কংগ্রেসে যোগদান না করলেও, তিন যুব সৈনিক হিসেবে কংগ্রেস সভাপতি ময়দানে পান হার্দিক, জিগনেশ ও অল্পেশ ঠাকুরকে। অতঃপর অল্পেশ ও জিগনেশ রাজনীতির ময়দানে এলেও, রাজনীতির ময়দান থেকে বিরতই ছিলেন হার্দিক। তাই মাঠে নেমে প্রথমেই তাঁর বাক্যবানের বড়শিতে অল্পেশ।

অন্যদিকে, বিজেপির বিরুদ্ধেও সরব হন হার্দিক। নির্বাচনে যাতে হার্দিককে বিরত রাখা যায়, সেই জন্য সকল প্রকার চেষ্টা চালিয়েছে বিজেপি, এমন অভিযোগ করতেও ছাড়েন নি, তরুণ নেতা। বিজেপিকে কটাক্ষ করে তাঁর মন্তব্য, ” বিজেপি মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। কংগ্রেস বলেছে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ সরিয়ে নেবে। কিন্তু জাতীয়তাবাদ বিরোধীতা মেনে নেবে না। বিজেপির ভোটে লড়ার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা নেই, তাই তারা জাতীয়তাবাদ বিরোধিতার মত সমস্যা নিয়ে হাজির হয়েছে।”

২০১৫ সালে পাতিদার কোটা সমস্যা যখন আলোচনার শীর্ষে পৌঁছেছিল, তখন আন্দলনের নেতৃত্ব দিয়ে সবার নজরে আসেন পাতিদার পরিবারের ছেলে হার্দিক । সরকারি চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে পাতিদার সম্প্রদায়ের কোটার দাবিতে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তিনি। তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা রাতারাতি তাঁকে নায়ক বানিয়ে দেয়। বাণিজ্যে বিভাগে স্নাতক হার্দিক আহমেদাবাদের এক গ্রামে তাঁর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বাবাকে, তাঁর কাজে সহায়তা করেন। তিনিই পাতিদার আনামত আন্দোলন সমিতির আহ্বায়ক। পাতিদার সম্প্রদায়ের বিক্ষোভে উত্তাল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাট। আন্দোলন এক সময় সহিংসতায় রূপ ধারণ করে। সংঘর্ষে প্রান যায় ২৭ জনের। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়। গুজরাটের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ পাতিদার। এই সম্প্রদায়ের লোকজন হী্রে প্রক্রিয়করন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। অনেকে হী্রের ব্যবসা ছাড়াও কৃষিকাজে জড়িত। অর্থনৈতিকভাবে তারা যথেষ্ট প্রভাবশালী।

বিক্ষোভকারীদের দাবি, অন্যান্য অনগ্রসর জাতি গোষ্ঠীর (ওবিসি) জন্য কোটার বিধান রাখায় পাতিদার সম্প্রদায়ের লোকজন অসুবিধায় পড়ে। ভারতের জটিল সামাজিক কাঠামোতে কোটা প্রথা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্যদের জন্য বাধা সৃষ্টি করে। কলেজে ভর্তি বা ছোট ও মাঝারি মানের শিল্প প্রতিষ্ঠান সহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গেলে এই প্রথার কারণে অনেককে সমস্যায় পড়তে হয়। শিক্ষা ও চাকরি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই অসুবিধার মুখোমুখি হওয়ায় তারা কোটার দাবি জানায়। দাবি আদায়ে পাতিদার সম্প্রদায়ের কয়েক লাখ সদস্য গুজরাটের প্রধান শহর আহমেদাবাদে জড়ো হয়। সেখানে হার্দিক প্যাটেল অনশনে বসেন। রাতে তাঁকে অনশন মঞ্চ থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের ওপর চলে পুলিশের নির্বিচার লাঠিচার্জ। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। চলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। পরে পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দিলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। টানা ১৯দিন অনশন আন্দোলন করার পর অবশেষে আন্দোলনের ইতি টানেন হার্দিক প্যাটেল।

হার্দিকের মতে, প্রচলিত ওবিসি কোটার কারনে পাতিদাররা উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে পড়ছে। তাঁর যুক্তি, পাতিদার সম্প্রদায়ের কোনো ছাত্র ৯০ শতাংশ নম্বর পেলেও মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পারে না। অথচ ওবিসি কোটাধারীরা ৪৫ শতাংশ নম্বর পেয়েই মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী হতে পারে। তিনি বলেন, তিনি ওবিসি কোটার বিরুদ্ধে নন, তিনি শুধু নিজের সম্প্রদায়কে কোটায় অন্তর্ভুক্ত করতে চান। ভারতে পশ্চাৎপদ শ্রেণীভুক্ত বা ওবিসি-কোটার আওতায় যে ২৭ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে, তাতে পাতিদারদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

কারণ ৯০ শতাংশ নম্বর পেয়েও পাতিদার ছাত্ররা কলেজে ভর্তি হতে পারছেন না, অথচ মাত্র চল্লিশ শতাংশ মার্কস পেয়েও তফসিলি জাতি বা উপজাতিভুক্তরা কলেজে ঢুকে পড়ছেন। এই আন্দলনের জেরে তাঁকে জেলেও যেতে হয়। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে গুজরাত হাইকোর্ট এই মামলায় হার্দিকের কারাদন্ড স্থগিত করলেও অব্যাহতি দেয় নি। নানা টালবাহানার পর, ২০১৯ এর ১৪ জানুয়ারি লোকসভা এই আন্দলনের স্বপক্ষে বিল পাশ করে। ১২ মার্চ কংগ্রেসে যোগদান করেন হার্দিক এবং লোকসভা নির্বাচনে গুজরাটের জামনগর থেকে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে বেছে নেয় কংগ্রেস।

হার্দিক লক্ষ্য করেছেন, তিনি কংগ্রেসে যোগদান করায় পাতিদার সম্প্রদায়ের মানুষ খুব সন্তুষ্ট। ” বিশাল সংখ্যক মানুষ আমায় এবং আমার নেতৃত্ব পছন্দ করেন। পাতিদার সম্প্রদায়ের মানুষ, আমি কংগ্রেসে যোগদান করায় খুশি। আমি জানি তারা আমায় সমর্থন করবেন এবং এই যুদ্ধে লড়তে আমায় সহায়তা করবেন। “

তরুণ নেতা আরও বলেন, তিনি লোকসভা নির্বাচনের জন্য ৪২ টি সমাবেশ করবেন। এবং কংগ্রেস নির্বাচনে জয়ী হবে তাতে তিনি নিশ্চিত। তিনি উল্লেখ করেন, কংগ্রেস দরিদ্র এবং কৃষকদের পক্ষে। দল সভাপতি রাহুল গান্ধী ভারতবাসীকে ” আচ্ছে দিন ” উপহার দেবেন।

প্রসঙ্গত, লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছেন না হার্দিক। কারণ রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় অভিযুক্ত হার্দিকের কারাদণ্ডের আদেশে স্থগিতাদেশ দিলেও, তা অব্যাহতি পায় নি। যদিও এই রায়কে চ্যলেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছেন তিনি। সুপ্রিম কোর্টও তাঁর এই আবেদন খারিজ করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *