খুলনা নগরীতে প্রতিদিন গড়ে ভাঙে চারটি সংসার

পাঁচ বছর আগে খুলনা নগরীর খালিশপুর নয়াবাটি এলাকার শারমিন আকতারের (ছদ্মনাম) বিয়ে হয় টুটপাড়ার বেসরকারি চাকরিজীবী মেহেদী হাসানের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। কিন্তু টেকেনি তাদের সংসার। মেহেদী হাসান জানালেন, তার স্ত্রী শারমিন একটি ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার ছিলেন। ওই ব্যাংকের এক কর্মকর্তার সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন শারমিন। স্ত্রীর ফেসবুক মেসেঞ্জার দেখে বিষয়টি নিশ্চিত হন মেহেদী।
 
এ নিয়ে শুরু হয় দাম্পত্য কলহ। একপর্যায়ে গত বছরের শেষ দিকে স্ত্রীকে তালাক দেন তিনি। তিন বছরের ছেলেকে রেখে শারমিন চলে যান পরকীয়া প্রেমিক ওই ব্যাংক কর্মকর্তার ঘরে।
 
নগরীর বাস্তুহারা কলোনি এলাকার লিপি খাতুনকে (ছদ্মনাম) ছয় বছর আগে তার বাবা বিয়ে দেন গোবরচাকা এলাকার বাসিন্দা ফটোস্ট্যাটের দোকানি রেজাউল করিমের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। কিন্তু প্রায় প্রতি রাতেই মাদক সেবন করে ঘরে ফিরত রেজাউল। লিপি জানান, তুচ্ছ ঘটনায় তাকে প্রায়ই মারধর করত তার স্বামী। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে গত সেপ্টেম্বরে স্বামীকে তালাক দিতে বাধ্য হন লিপি। দুটি শিশু নিয়ে তিনি এখন থাকেন বাবার বাড়িতে।
 
শুধু এ দুটি ঘটনাই নয়; সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খুলনা মহানগরীতে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা বেড়েছে। দশ বছরের ব্যবধানে বিবাহ বিচ্ছেদ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। গড়ে প্রতিদিন নগরীতে ভেঙে যাচ্ছে চারটি সংসার। এর নেপথ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি কারণ। খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে নগরীতে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে ৯৩২টি। ২০১০ সালে ৯৩৩টি, ২০১১ সালে এক হাজার ৭৪, ২০১২ সালে এক হাজার ১৮১, ২০১৩ সালে এক হাজার ২৫৪, ২০১৪ সালে এক হাজার ৪১৯, ২০১৫ সালে এক হাজার ৪০৪, ২০১৬ সালে এক হাজার ৪৮৭, ২০১৭ সালে এক হাজার ৫৯৫ ও ২০১৮ সালে এক হাজার ৭১৯টি সংসার ভেঙেছে। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭০৬টিতে।
 
কেসিসি সূত্রে জানা গেছে, আগে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষরাই স্ত্রীদের তালাক দিতেন। এখন অনেক নারীও তার স্বামীকে তালাক দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে খুলনার সরকারি বিএল কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম বলেন, বেশ কয়েকটি কারণে তালাকের ঘটনা বেড়েছে। মোবাইল ফোন ও ফেসবুকের কারণে পরকীয়া বেড়ে যাওয়ায় অনেকের সংসার ভেঙে যাচ্ছে। যৌথ পরিবার ও সামাজিক বন্ধন কমে যাওয়ায়ও তালাকের ঘটনা বাড়ছে। শিক্ষার হার বেড়ে যাওয়ায় অনেক নারী বিভিন্ন কারণে এখন তার স্বামীকে তালাক দিচ্ছেন, যে প্রবণতা আগে অনেক কম ছিল। তিনি জানান, এর বাইরে যৌতুক, মাদকাসক্তি প্রভৃতি কারণেও তালাকের সংখ্যা বেড়েছে।
 
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একাধিক শিক্ষক জানান, কেউ ভালোবেসে আবার কেউ পরিবারের সিদ্ধান্তে বিয়ে করছেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে আগের তুলনায় পারস্পরিক বিশ্বাস কমে গিয়ে দাম্পত্য কলহ বেড়েছে। ফুটফুটে সন্তান, সুন্দর সংসার ও মধুর সম্পর্কের স্মৃতি কোনও কিছুই বিচ্ছেদ আটকাতে পারছে না। যৌতুক, মাদকাসক্তি, বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্ব, পরকীয়া, সন্দেহ, একাধিক বিয়ের প্রবণতা প্রভৃতি কারণে সংসার ভেঙে যাচ্ছে। উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারে এ বিচ্ছেদের হার বেশি। এর প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *