প্রধান খবরবাংলাদেশরাজনীতিসাক্ষাৎকার

‘গণহীন গণতন্ত্র আর রাষ্ট্রায়ত্ত নির্বাচন’

বাংলাদেশে যে অল্প কয়েকজন বাম ধারার আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আছেন, পঙ্কজ ভট্টাচার্য তাদের অন্যতম একজন। মাটি ও মানুষের জন্যে রাজনীতি করেছেন, সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সমতাভিত্তিক একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছেন। সেই বাস্তবতা থেকে বহুদূরে অবস্থান করলেও, ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল তার রাজনৈতিক জীবন। কখনও আপস করেন নি।

দেশের চলমান পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অবস্থাসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অনেক চড়াই-উৎরাই, আন্দোলন, সংগ্রাম দেখে আসা ৮১ বছর বয়সী এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের কথায় উঠে এসেছে দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশের বিরোধী দল ও ক্ষমতাসীন দলের অবস্থান, করণীয়, ‘৭১ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী নির্বাচনের অবস্থাসহ নানা বিষয়। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজা। দ্য ডেইলি স্টারের সৌজন্যে পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি এখানে প্রকাশ করা হলো।


গোলাম মোর্তোজা: আপনার পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝতে চাই।

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: জনকল্যাণের রাজনীতি, মানুষের জীবন সংশ্লিষ্ট রাজনীতি, মানুষের স্বার্থে, মানুষের জন্য, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনীতি, শোষণহীন সমাজ-ব্যবস্থার রাজনীতির ধারা আকস্মিকভাবে অনুপস্থিত হয়ে গেল।

গোলাম মোর্তোজা: আকস্মিকভাবে কেন বলছেন?

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: ৭৫’র ১৫ আগস্টের পরে এর একটা ধারা শুরু হয়েছিল। যে শক্তি বাংলাদেশ মানে নি, তারা ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী শক্তি, স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তি মিলে এটি ঘটিয়েছে। সেই পরিবর্তনের পরে স্বাভাবিকই ছিল পাকিস্তানমুখী অভিযাত্রা। পাকিস্তানের ধারায় আবার দেশটাকে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু, তার বিরুদ্ধে লড়াই করে পরিবর্তন এসেছে, আওয়ামী লীগ সেখানে ক্ষমতাসীন হয়েছে তিন তিনবার। এবং বর্তমানেও তারা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় রয়েছে।

কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধের যে পরিবর্তনটুকু ৭৫’র পটপরিবর্তনে ঘটল, সেই ধারার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ধারায় কেন এখন দেশ পরিচালিত হবে? এক্ষেত্রে আমার এটাকে আকস্মিক মনে হয়। এটা তো কথা ছিল না! বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক। সেই বাংলাদেশ কেন হোঁচট খাচ্ছে বারবার? এই জায়গাতেই আমার দুশ্চিন্তা যে মানুষ-নির্ভর যে রাজনীতিটা আমরা করেছিলাম, জনমুখী যে রাজনীতি চলছিল, সেই রাজনীতিটায় আজ আকস্মিক ছন্দপতন ঘটেছে। আমি পাকিস্তান আমলে নির্বাচন দেখেছি, এখনও নির্বাচন দেখছি। বর্তমান নির্বাচন জনতার সংশ্লিষ্টতাহীন নির্বাচন। এটা গণহীন গণতন্ত্রের নামান্তর। কেউ যদি ঠাট্টা করে বলে এটা রাষ্ট্রায়ত্ত নির্বাচন, সেটা যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করা খুব কঠিন। গণহীন গণতন্ত্রের ধারায় কেন দেশ চলবে, সেটা আমার বিস্ময়ের বিষয়। এখানেই আমি লক্ষ্য করি বঙ্গবন্ধুর ধারা থেকে ছন্দপতন ঘটেছে।

গোলাম মোর্তোজা:: এই ছন্দপতন ধারা থেকেই কি এসেছে ‘গণতন্ত্র না উন্নয়ন’ ধারণা?

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: উন্নয়ন ও গণতন্ত্র মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটা হয় না। এই দুটো জিনিস পরস্পর বিরোধী না। এই দুটো মিলিয়েই হয় উন্নয়ন। গণতন্ত্রহীন উন্নয়ন সাময়িক উন্নয়ন, ভিত্তি দুর্বল। আমাদের রাষ্ট্র, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ, সংসদসহ সবটা মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর নীতির দ্বারা, সংবিধানের মূলনীতির দ্বারা দেশ চলবে, সেটাই আকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু, আকাঙ্ক্ষিত পথে পদযাত্রা হচ্ছে না। এই আকাঙ্ক্ষিত পথে ছন্দপতন হচ্ছে।

গোলাম মোর্তোজা: ভোটারবিহীন নির্বাচন বা গণহীন গণতন্ত্র সামরিক স্বৈরশাসকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাদের জনভিত্তি থাকে না। কিন্তু, আওয়ামী লীগ এমন একটি দল যাদের জনভিত্তি আছে। তারা সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। তাহলে তারা জনবিচ্ছিন্ন কোন্‌ বিবেচনায়?

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য, সত্যিকারের জন সমর্থিত বিরোধী দলের মুক্তিযুদ্ধের ধারায় একটি প্রধান ভূমিকা পালনের যে দায়িত্ব ছিল, সেটা অদৃশ্য হয়ে গেল। সেখানে বিএনপির ব্যর্থতা অনেকাংশে দায়ী এবং জামায়াত-আশ্রিত বিএনপি সেই দায়িত্ব পালন করতে পারে কিনা, এটা একটা বড় প্রশ্ন হয়ে তাদের সামনে এখনও ঝুলে আছে। এর মীমাংসা তারা যদি না করেন, তাহলে ভবিষ্যতে বিএনপির অস্তিত্ব থাকবে কি না, বলা কঠিন।

গোলাম মোর্তোজা: একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে বিরোধী দলের যে ভূমিকা হওয়া উচিত সেটা কি বিএনপির কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন?

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: এটা সময়ের দাবি। বিএনপি তো ষড়যন্ত্রের মধ্যেই ছিল। প্রকাশ্য রাজনীতিতে গিয়ে বিএনপি যখন ক্ষমতাসীন হলো, তখন তারা মানুষের মধ্যে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে এবং কিছু একটা করারও চেষ্টা করেছে। সেক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের কথা মুখে বলা হোক আর যাই হোক, মানুক আর না মানুক, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেছে। তারা পরিবর্তনের সম্ভাবনাও দেখিয়েছিল। বিএনপির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আছে বলে তারা বলছে। কিন্তু, সেক্ষেত্রে তারা কেন পরিবর্তন করবে না নিজেদের? কেন জামায়াত-আশ্রিত থাকবে? জামায়াত লালিত-পালিত হয়ে তারা কেন চলবে? এই প্রশ্ন তো আছেই। এই ব্যর্থতার সুযোগে আওয়ামী লীগ টেকনিক্যালি অগ্রসর হচ্ছে বলে আমার ধারণা।

গোলাম মোর্তোজা: বিএনপির কাছে যে প্রত্যাশা, তা তারা করল না বলে আওয়ামী লীগ সুযোগটা পেয়ে গেল। তার মানে কি বাংলাদেশের অবস্থা কেমন হবে তা বিএনপির ওপর নির্ভর করছে?

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: ৩৫ শতাংশ ভোট বিএনপি পায়। এটা তো সহজ কথা না। যেভাবেই হোক, ৩৫ শতাংশ মানুষ এখনও তাদের পক্ষে আছে। সেই মানুষের সমর্থন নিয়ে বিএনপি যদি পরিবর্তনের পথে অগ্রসর হয়ে মুক্তিযুদ্ধের পথে চলত, তাহলে বিষয়টি সহজ হতো। কিন্তু, এই সুযোগটি আওয়ামী লীগ নিয়েছে।

গোলাম মোর্তোজা: বিএনপি যে ৩৫ শতাংশ ভোট পায় বা বড় রাজনৈতিক দল, তার প্রমাণ কী? গত নির্বাচনে মোট আসন পেয়েছে মাত্র ছয়টি।

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: সেই নির্বাচনটা নির্বাচন হয়েছে কি না, বড় রকমের প্রশ্নবিদ্ধ ছিল কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। সেজন্য আমি বলছিলাম, পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালেও নির্বাচন দেখেছি, এখনও দেখছি। এখন নির্বাচন কমিশনের চেহারাও দেখতে পাচ্ছি। মেরুদণ্ডহীন, আজ্ঞাবহ। পাকিস্তান আমলেও নির্বাচন কমিশনকে এত মেরুদণ্ডহীন মনে হয় নি।

গোলাম মোর্তোজা: এই সুযোগে আপনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে জেনে নিতে চাই, ১৯৭০ সালের নির্বাচনটি পাকিস্তানের সামরিক শাসকরা কেন নিরপেক্ষ করলেন? কেন মানুষকে ভোট দিতে দিলেন? তাদের কি ভোট কারচুপি বা ভোট ডাকাতির সুযোগ ছিল? নাকি তারা বুঝতে পারে নি? তারা কি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনই চেয়েছিল?

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: তারা বুঝতে পারে নি। তারা মনে করেছিল দক্ষিণপন্থি সাম্প্রদায়িক দলগুলোর একটি ভালো সংখ্যক ভোট তারা পূর্ব পাকিস্তানে পাবে। এতে পূর্ব পাকিস্তানে তাদের দখল মজবুত থাকবে। এটাই তাদের হিসাব ছিল। সেই হিসাব ভণ্ডুল করে দেয় জনগণ।

গোলাম মোর্তোজা: আপনি বিএনপির ব্যর্থতার কথা বলছিলেন। আমার প্রশ্ন, একটা সময় বাংলাদেশের বাম রাজনীতিবিদরা জনগণকে খুব আশাবাদী করে তুলেছিলেন। মানুষ মনে করত তৃতীয় শক্তি হিসেবে বামরা হয়ত একটি জায়গায় আসবে। কিন্তু, আপনারা যে এই জায়গাটিতে আসতে পারলেন না, তার মূল কারণটা কী?

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: বামরা সমালোচনার ঊর্ধ্বে না। তাদের শক্তিহীনতার কারণ তাদের উপলব্ধিতে আনতে হবে। তারা নিজেরাই যদি উপলব্ধিতে আনে এবং মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে যদি কাছে টেনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিকল্প তৈরি করতে পারে, তাহলে তাদের সফলতা আসবে। তাছাড়া, আমি সফলতার কোনও সম্ভাবনা দেখি না।

গোলাম মোর্তোজা: সেই সম্ভাবনা কি আপনি দেখছেন?

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: এখনও আমি মনে করি তারা ঘুরে দাঁড়াবে, মোড় পরিবর্তন হবে বাংলাদেশের। কারণ, সমাজতান্ত্রিক দুর্গ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হয়ে গেছে বলার সুযোগ এলেও শোষণহীন সমাজ-ব্যবস্থা ব্যর্থ, তা বলার যুক্তি নেই। সুতরাং, শোষণহীন সমাজ-ব্যবস্থার পক্ষে কীভাবে, কোন্‌ পদ্ধতিতে, সৃজনশীল উপায়ে দেশে পরিবর্তন আনা সম্ভব, সেই মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক রাস্তা যদি ধরা যায়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে একটি আদর্শিক বিকল্প শক্তি গড়ে উঠবে। সেখানে বাম শক্তির সঙ্গে গণতান্ত্রিক শক্তিও থাকতে পারে। সেই বিকল্প শক্তি যদি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে এবং আওয়ামী লীগও জনসম্পৃক্ত একটি রাজনৈতিক দলের ভূমিকা পালন করে, তাহলে তা দেশের জন্য ভালো।

গোলাম মোর্তোজা: জানতে চেয়েছিলাম, আওয়ামী লীগকে আপনি জনবিচ্ছিন্ন মনে করছেন কেন?

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: আওয়ামী লীগ এখন অনেকটা সামরিক সরকারের মতো। তারা প্রশাসনিকভাবে কাজ করছে। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের যে শক্তি, তা কাজে লাগানো হচ্ছে না। কারণ, প্রশাসনিকভাবে পদ-পদবি দখল করে মোটামুটি একটি নেতৃত্ব আছে এবং সেটা প্রশাসনিক সহায়তা নিয়ে দেশ পরিচালনা করছে।

গোলাম মোর্তোজা: এই আওয়ামী লীগই তো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বিচার করল, অপরাধীদের শাস্তি কার্যকর করল। এত কঠিন অবস্থার মধ্যেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করল, শাস্তি কার্যকর করল। এতটা আশাবাদের জায়গা তৈরি করার পর সেটা ধরে রাখা গেল না কেন?

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: সাফল্য নেই তা তো না। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার ইনডেমনিটি দিয়ে বাতিল করা হয়েছিল। সেগুলোকে বিচারযোগ্য করে বিচার করা এবং তাদের শাস্তি দেওয়া ঐতিহাসিক কাজ। সেই জায়গা ধরে রাখা যাচ্ছে না তার একটি কারণ হলো, প্রশাসনিক বা আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা অনেকটা রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে এখন। সেখানে জনগণের মতামত নিয়ে, সংসদে বিরোধী দল এবং সরকারি দলের বোঝাপড়া এবং প্রতিযোগিতামূলক সংশ্লেষণের মধ্য দিয়ে যে রাজনীতি বের হয়ে আসে, সেটা বর্তমানে অনুপস্থিত। ফলে, মূলত প্রশাসনিক, আমলাতান্ত্রিক এবং সরকারি ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই দলটি পরিচালিত হচ্ছে। দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা শঙ্কিত। আওয়ামী লীগের ক্ষতি হলে দেশেরও ক্ষতি হবে।

গোলাম মোর্তোজা: এখন বলা হয়, বাংলাদেশে গত কিছু বছর ধরে এক ধরনের সুশাসনহীন ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আপনার বিশ্লেষণ কী?

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: কিছুটা সত্য। এমন অবস্থা কিছুটা তো সৃষ্টি হয়েছে। মাঠের রাজনীতির উত্তাপ, সংসদে রাজনীতির উত্তাপ, জবাবদিহিমূলক সরকার, প্রশাসন এবং আমলাতন্ত্রের জবাবদিহিতার ব্যবস্থায় না গিয়ে সরকার এবং প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ধারায় যদি চলে, তাহলে জনগণ নিয়ে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগ নিয়ে আমরা শঙ্কিত হই। আরেকটা শঙ্কার জায়গা হলো, ‘৭৪-এ বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সম্মেলনে বলেছিলেন, এখন আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা করতে হবে, চাটার দল সব খেয়ে ফেলে, আত্মশুদ্ধি করতে হবে এবং দলের আপাদমস্তক শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে।

এখন কোনও কোনও ক্ষেত্রে পদ-পদবি দেওয়া হয় অর্থের বিনিময়ে। সেই সুযোগে অন্য দলের নেতাকর্মীরাও এই দলে এসে নেতা হয়ে বসে থাকতে পারে অর্থের বিনিময়ে। এখন দলটির সর্বাধিক দরকার শুদ্ধি অভিযান। চাঁদাবাজি, দখলদারি, ধর্ষণ, নির্যাতন, উৎখাত, দখলের ঘটনা ঘটছে দেশে। সেখানে রাশেদ, সম্রাট, পাপিয়া, পাপলু, পরিমলদের যে ধারাটা, সেটা তো আকস্মিক না। আওয়ামী লীগে তারা একটি উর্বর জমি পেয়েছে। সেটা পরিষ্কার করতে হবে, সেখানে জন্মানো আগাছাগুলো উপড়ে ফেলতে হবে। প্রশাসনিক উদ্যোগে কয়েকটা বিচার অনুষ্ঠান করে শেষ করলে হবে না। এটা নিয়ে একটি ধারাবাহিক সংগ্রাম দরকার। যেহেতু বিরোধী দল অকার্যকর, সেহেতু আরও সচেতন হয়ে আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে।

গোলাম মোর্তোজা: আওয়ামী লীগ তো বলছে দেশ খুব ভালো চলছে, দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন হচ্ছে, তারা যে কোনও সংকট মোকাবিলা করতে পারছে।

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: সেটা ঠিকই। ২০ বছর আগের তুলনায় হিসাব করলে তো অনেক উন্নয়ন হয়েছে। উন্নয়ন তো হচ্ছেই। উন্নয়ন হচ্ছে একদিকে, কিন্তু সেটা ধরে রাখার জন্য যে কাঠামোগুলো অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সংসদ, নির্বাহী বিভাগ সেগুলো পরস্পর পরস্পরের সহযোগিতা এবং জবাবদিহিতার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। তবেই তা একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের উপকারে আসবে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় করোনার কথা। এটা আওয়ামী লীগের সৃষ্টিও না, বিএনপির সৃষ্টিও না। এটা বিশ্বজনীন একটা বিপদ। রাষ্ট্র সেটার মোকাবিলা করছে। করোনার এই মহামারীর মধ্যেও কিছু কিছু উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু, করোনা খেয়ে ফেলছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে। নতুন করে প্রায় দেড় কোটি মানুষ গরিব হয়েছেন, নিঃস্ব হয়েছেন। আর আগে যারা ছিলেন, তারা তো আছেনই। ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে এখন এটা বিরাট এক সংখ্যায় পরিণত হয়েছে। করোনাকালীন প্রায় ৩০ থেকে ৩৩ শতাংশ মানুষের চাকরি চলে যাচ্ছে। ঢাকা থেকে মানুষ গ্রামে চলে যাচ্ছেন।

গোলাম মোর্তোজা: এখানে সরকারের কী করার আছে? সরকার তো বলছে তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করছে।

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: আমরা এককভাবে সরকারকে দায়ী করতেও চাই না। পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একযোগে তার স্ব স্ব ভূমিকা সুনির্দিষ্টভাবে পালন করবে। এর তো কোনও বিকল্প নেই। এখন স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার যে চিত্র এসে গেছে, সেখানে স্বাস্থ্য-ব্যবস্থায় উন্নয়নের দাবী করা খুব কঠিন। স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা যে ভেঙে পরেছে, সেটা অনস্বীকার্য।

গোলাম মোর্তোজা: স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার একটি প্রশ্ন দিয়ে শেষ করি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যরা বারবার বলেছেন, আমাদের চিকিৎসা-ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানের। এই কথা বলার কয়েকদিন পরে অর্থমন্ত্রী চিকিৎসার জন্য লন্ডন চলে গেলেন, আমাদের রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য সম্প্রতি গেলেন দুবাই। তাদের ভাষায় দেশে ‘আন্তর্জাতিক’ মানের চিকিৎসা রেখে লন্ডন বা দুবাই যাওয়ার কারণ কী?

পঙ্কজ ভট্টাচার্য: দেশের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা এত ভালো যে আমার এমপি, মন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা বিত্তশালীদের চিকিৎসার জন্য যেতে হয় অন্য দেশে। এটা তো দুর্ভাগ্য আমাদের। সেজন্যই আমি বলছি, এটা নিরপেক্ষভাবে একটু চিন্তা করা দরকার। স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার সমস্যা নিয়ে বলা শুধু আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করার জন্য না। এমনকি শিক্ষা-ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে সামনে। তার লক্ষণগুলো ফুটে উঠছে। এভাবে ভেঙে পড়ার বিষয়গুলো জাতীয় সংকট। এটা দলীয় সংকট শুধু নয়। সব ঠিক না বলে বা না ভেবে, কিছু কাজ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।❐

দ্য ডেইলি স্টারের সৌজন্যে

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension