মুক্তমত

চোখে দেখা কানে শোনা

ঠিকানার পাশাপাশি কর্মসংস্থানও জরুরি

এম.জে কাদেরী


মুজিববর্ষের শুরুটা ভালোই ছিল। প্রচারণায় মানুষের দৃষ্টি কাড়ার আয়োজনও ছিল। কিন্তু করোনা সবকিছু ভেস্তে দিয়েছে। সীমাবদ্ধ হয়েছে অনুষ্ঠানমালা। তবে মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার থেমে থাকে নি। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, মুজিববর্ষে কেউ গৃহ ও ভূমিহীন থাকবে না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নেয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে। প্রথম পর্যায়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৬৯ হাজার ৯০৪টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবার বসবাসের স্থায়ী ঠিকানা পেয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে জুন মাসে এক সঙ্গে ঘর পেয়েছে দেশের আরও ৫৩ হাজার ৩৪০টি পরিবার। আগামী ডিসেম্বরে আরও এক লাখ পরিবারকে দুই শতক জমিসহ সেমিপাকা ঘর দেয়ার কাজ এগিয়ে চলেছে।

এর আগে ১৯৯৭ সালেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে একই ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তখন সর্বমোট পৌনে দুই লাখ ঘর দেয়া হয়েছিল। বর্তমান উদ্যোগে সারা দেশে প্রায় নয় লাখ পরিবারের ঘর পাবার কথা। এই উদ্যোগের ফলে প্রতি পরিবারে গড়ে পাঁচজন করে মোট উপকারভোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৫৪ লাখ।

তবে এর মধ্যেই এই প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। হস্তান্তরের পর পরই বেশ কিছু ঘরে ফাটল দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে প্রকল্প এলাকা। ভেঙে পড়েছে দেয়াল। এ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমের সচিত্র রিপোর্ট কারও চোখ এড়ায়নি। ঘটনার তদন্তে আপাতত ৩৬টি উপজেলায় অনিয়মের তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট শতাধিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও এসিল্যান্ড শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়েছেন। এখন তাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন। মাত্র এক লাখ ৭১ হাজার টাকায় এত স্বল্প সময়ে এমন আধাপাকা বাড়ি করে দেয়া নিয়ে প্রশ্ন অন্যদের মাঝেও। প্রকল্পের গোড়াতেই গলদের কথাও বলছেন অনেকে। শুরুতেই এসব প্রশ্ন তোলার সাহস না দেখানোর মাশুল এখন গুনতে হচ্ছে তাদের।

আমাদের মত দুর্যোগপ্রবণ দেশে বিশেষ করে নদী ভাঙনে প্রতি বছরই ভূমিহীন-গৃহহীনের সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে দারিদ্র্য-বেকারত্বের কারণেও প্রতিনিয়ত মানুষ নিঃস্ব ও বাস্তচ্যুত হয়। শিল্প ও প্রশিক্ষণের অভাবে ন্য়িমিত কাজ না পেয়ে এসব মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবর্ণর্নীয় দুঃখ কষ্টে মানবেতর জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। করোনাকালে এদের সংখ্যা বেশ বেড়েছে। সরকার এসব পরিবারের পুনর্বাসনে প্রকল্প হাতে নিয়েছে ভালো কথা। কিন্তু সমস্যার গোড়াতে হাত না দিলে কি সমাধান আশা করা যায়? এ জন্য জনপ্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে আমলানির্ভরতার কারণই বা কি?

প্রথমত মানুষের নিঃস্ব, বাস্তুচ্যুত হবার প্রক্রিয়া থামাতে হবে। আর ঠিকানা দেবার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। নইলে কাজের সন্ধানে মানুষ আবারও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে, এতে সন্দেহ নেই। একইভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন ও নদী ভাঙন, ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্যও অনেককিছুই করার বাকী। তাহলেই ভূমিহীন-গৃহহীনদের সংখ্যা কমে আসবে। উন্নয়নের ধারায় যুক্ত হবে তৃণমূলের মানুষও। এক্ষেত্রে উপেক্ষা-অবহেলার দৃশ্য কি অস্বীকার করা যায়? স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও এমন দৃশ্য আর কতদিন দেখতে হবে?

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়
এক সময়ে বাংলাদেশের মাংসের বাজার বিশেষ করে কোরবানির বাজারে ভারতীয় গরু ছাড়া চাহিদাপূরণের কথা চিন্তা করা যেত না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। দেশীয় গরুই অতিরিক্ত হয়ে গেছে। অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে গরু। চলতি বছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ছিল এক কোটি ১৯ লাখ। এ বছর কোরবানি হয়েছে ৯০ লাখ ৯৩ হাজার পশু। অবিক্রিত রয়েছে ২৮ লাখ ২০ হাজার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এসব তথ্যেই দেশের পশু ব্যবসায়ী ও লালন পালনকারী খামারিদের দুরাবস্থার কথা উঠে আসে। গত কয়েক বছর ধরে এই ধারা অব্যাহত থাকায় দেশের অনেক কৃষক যারা পশুপালনকারী ও খামারিদের উদ্যোগে ভাটা পড়েছে। পুঁজি হারিয়ে হতাশায় ভেঙে পড়েছেন এই ক্ষুদে উদ্যোক্তাদের অনেকেই। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেবার পাশাপাশি রক্ষা করার ব্যবস্থা না থাকলে এই হতাশাজনক অবস্থার অবসান আশা করা যায় না। শুধু তাই নয়, খামারি ও পশু ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন সমস্যার দিকেও নজর দিতে হবে।

গত কোরবানির আগে বাড়িতে পোষা গরু ট্রাকে করে হাটে নিয়ে যাবার সময় চেকপোস্টে আটক করে ভারতীয় গরু হিসেবে নিলামে বিক্রি করে দেয়ার ঘটনাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলা যাবে না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর থেকে ট্রাকে ২২টি গরু নিয়ে হাটে বিক্রি করতে যাচ্ছিলেন চার খামারি। বাঙ্গাবাড়ি ইউনিয়নের এই খামারিদের মধ্যে একজন ইউপি সদস্যও ছিলেন। তার কাছে গরুগুলো যে খামারে পালিত ইউপি চেয়ারম্যানের এমন প্রত্যয়নপত্রও ছিল। কিন্তু রাজশাহীর রাজাবাড়িতে বিজিবি, কাস্টমস-এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগের যৌথ চেকপোষ্টে টাকা না দেয়ার কারণে গরুগুলো ভারতীয় বলে আটক করা হয়। পরে নিলামে তুলে পানির দরে বিক্রি করে দেয়ার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, স্থানীয় খামারিদের ২২টি গরু বহনকারী ট্রাক চেকপোস্টে আটকানো হলে নিজেদের পরিচয়সহ ইউপি চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে তা ছিঁড়ে ফেলা হয়। টাকা না পেয়েই তারা এমনটা করেছে। গরুগুলো কাস্টমস গুদামে নিয়ে ‘মালিক পাওয়া যায় নি এবং ভারতীয় গরু বলে সবাই পালিয়ে গেছে’ উল্লেখ করে প্রতিটি গরুর দাম আনুমানিক ৮০ হাজার টাকা বলা হয়েছে। কিন্তু নিলামে ২২টি গরু মাত্র ৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। এ নিয়ে রাজশাহী বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তদন্তে গরুগুলো ভারতীয় নয়, স্থানীয় খামারে পালিত বলা হয়েছে। গোমস্তাপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বিধবা নারী ও কৃষকের বাড়িতে পালিত গরুগুলো কিনে নিয়ে হাটে বিক্রির উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন, তাও প্রমাণিত। চেকপোষ্টে আটকের পর নিলামে বিক্রি করে দেয়ায় এখন এসব গরু ব্যবসায়ীর পরিবারে শোকের মাতম চলেছে। ঈদের আনন্দ শুধু পরিণত হয় নি, সারা বছরের আর্থিক হিসাব পাল্টে গেছে এই প্রান্তিক লোকদের। এসবই পত্রিকায় প্রকাশিত খবর।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের তাদের এমন কাজ দেশের সামাগ্রিক জননিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এমন ঘটনা যে কত হয় তার হিসাব কেউ রাখে না। রাখার প্রয়োজনও বোধ করে না। বছর জুড়েই এমন অবস্থা!

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension