ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে মৌলবাদের উত্থান ঘটবে: মেনন

রূপসী বাংলা নিউজ ডেস্ক: ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে দেশে মৌলবাদের উত্থান ঘটবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন।

শুক্রবার বিকেলে ওয়ার্কার্স পার্টির চট্টগ্রাম জেলার ১৩তম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেনন এ কথা বলেন। নগরীর আন্দরকিল্লায় যাত্রা মোহন (জে এম) সেন হলে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

দেশে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার খেলা বন্ধ করার দাবি জানিয়ে মেনন বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হত্যা-খুনের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। কিন্তু তার অর্থ কোনোভাবেই ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা নয়। আমরা ছাত্র রাজনীতির প্রোডাক্ট। আমি ছাত্র রাজনীতি করেছি। তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু ছাত্র রাজনীতি করেছেন। শেখ হাসিনা ছাত্র রাজনীতি করেই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু আজ মাথাব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলার দাবি উঠছে। আমরা এটা মানতে রাজি নয়। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার খেলা বন্ধ করতে হবে। কারণ ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে মৌলবাদীরা সুযোগ নেবে, কারণ অতীতেও তারা নিয়েছে।

বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে ছাত্রদের ক্ষোভের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে মেনন বলেন, সারাদেশের ছাত্ররা আজ বিক্ষোভমুখর। প্রতিদিন মিছিল হচ্ছে। আজ (শুক্রবার) বিকেলে বুয়েটের ছেলেদের সঙ্গে উপাচার্যের বৈঠক হয়েছে। এটা স্বাভাবিক, ছাত্ররা ক্ষুব্ধ। সহপাঠীর জন্য বেদনাবোধ থেকে তারা রাস্তায় নেমেছে। আমি বিশ্বাস করি, সরকার হত্যার বিচার সঠিকভাবে করবে, এতে যেন কোনো ভুল না হয়।

বিএনপি-জামায়াত আবরার হত্যাকে রাজনীতিকরণ ও ধর্মীয়করণ করছে দাবি করে ১৪ দলের এই শীর্ষ নেতা বলেন, ছাত্রদের প্রতিবাদ স্বাভাবিক। কিন্তু যখন দেখি বিএনপি-জামায়াত আবরার হত্যাকে রাজনীতিকরণ আর ধর্মীয়করণ করছে, তখন বুঝতে হয় ডাল মে কুচ কালা হ্যায়। জামায়াতের ইউটিউবে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটা কথা, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রথম শহীদ নাকি আবরার। যেন মনে হয় জিহাদে গিয়েছিল আবরার, আর এজন্য তাকে খুন হতে হয়েছে। বিএনপির খন্দকার মোশাররফও দেখি বললেন, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রথম শহীদ আবরার। আবরারের মৃত্যুর প্রতি শ্রদ্ধা ও শোক জানিয়ে বলতে চাই, এই ক্ষুদ্র রাজনীতি যেটা চিরকাল আপনারা করে এসেছেন, সেটা করবেন না।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হত্যাকাণ্ড নতুন নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, এরশাদ শাসনের শেষদিকে ছাত্রমৈত্রী নেতা ফারুককে হত্যা করা হয়। শিবিরের ছেলেদের হাতে হাত কাটা পড়ে হামিদের। বিএনপি-জামায়াত যখন জোট বেঁধে ক্ষমতা নিল, এরপর থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কলেজ চলে গেল শিবিরের দখলে। তখন বহু কথা বলেছি আমাদের কথা শোনা হয়নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এ পরিস্থিতি একদিনের নয়। মৌলবাদীরা যখন ক্ষমতায় গিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখলে নিয়েছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রমৈত্রীর নেতা রিমু চৌধুরীকে খুন করেছিল শিবির। রোজার মাস ছিল। রিমু রোজা রেখেছিল। সে অবস্থায় তাকে খুচিয়ে খুচিয়ে তারপর জোর করে মুখে চিড়া ও পানি ঢুকিয়ে শ্বাসরোধ করে মারে। গান পাউডার দিয়ে তারা আবদুল লতিফ হল পুড়িয়ে দেয়। তখন সংসদীয় দলের নেতা আবদুস সামাদ আজাদের নেতৃত্বে রাজশাহী গিয়েছিলাম। পার্লামেন্টে সমস্ত ঘটনার ভিডিও হস্তান্তর করে বলেছি জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করতে হবে। তৎকালীন বিএনপির উপনেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছিলেন সংবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে আর হয়নি। জামিল, আক্তার, রতন খুন হয়েছিল। দেবাশীষ, রুপম জাসদের জুয়েলসহ অনেককে আমরা হারিয়েছি। সেদিন সারাদেশের মানুষের কাছে আমরা বিচার চেয়েছি।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু পর তার গায়ে কালিমা লেপনের চেষ্টা হয়েছে মন্তব্য করে মেনন বলেন, আজ দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। দুর্নীতি কি কেবল জুয়া আর ক্যাসিনো ? আমাদের সংবিধানে জুয়া নিষিদ্ধ, গণিকাবৃত্তি নিষিদ্ধ, ঘোড়দৌড় নিষিদ্ধ। কিন্তু প্রশাসনের নাকের ডগায়, মতিঝিল থানার ২০০ গজের মধ্যে সমস্ত ক্লাবগুলো আর সেখানে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্যাসিনো চলেছে। আর ওই ক্যাসিনো তুলতে গিয়ে আমাদের গায়ে কালির ছিটা দেয়া যায় কি না তারও চেষ্টা চলেছে।

আমরা বলতে চাই, এই অভিযান কেবলমাত্র এখানেই থামলে চলবে না। বড় বড় প্রকল্পে যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে, যারা বিদেশে হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে, গত ১০-১১ বছরে ৯ লক্ষ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে যা দিয়ে দুটি বাজেট হতে পারত এই বাংলাদেশের, সেই টাকা ফিরিয়ে আনতে হবে। যারা মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোমে বৌ-বাচ্চা পাঠিয়ে দিয়েছে, তাদের নামগুলো সামনে আনেন না কেন, দেখবেন সংসদের অনেকের চেহারা বেরিয়ে আসবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, উঁইপোকারা বড় বড় প্রকল্প খেয়ে ফেলছে। আপনার চারপাশে বড় বড় উঁইপোকা আছে, তাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন।

এর আগে জে এম সেন হল প্রাঙ্গণে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন রাশেদ খান মেনন। পরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এতে কৃষক, পাটকল শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, গার্মেন্টস শ্রমিক, ছাত্র মৈত্রী ও যুব মৈত্রী এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্যরা অংশ নেন। উদ্বোধনী অধিবেশনে সম্মাননা জানানো হয় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, শিল্পী আলোকময় তলাপাত্র এবং আবৃত্তি শিল্পী রাশেদ হাসানকে।

ওয়ার্কার্স পার্টির চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি আবু হানিফের সভাপতিত্বে এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শরীফ চৌহানের সঞ্চালনায় উদ্বোধন পরবর্তী অধিবেশনে আরও বক্তব্য রাখেন ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আমিরুল হক আমিন, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাসান ফেরদৌস, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম চৌধুরী, যুব মৈত্রীর সভাপতি কায়সার আলম, ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক এস এম আলাউদ্দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *