জিম্মি

মুবিন খান

হঠাৎ করেই ডাক্তার লোকেরা খুব খেপে উঠেছেন। ফলে কদিন ধরে ডাক্তার লোকেদের জ্বালাময়ী লেখালেখিতে দেয়াল ভরে উঠেছে। লেখাগুলোর সকলেই প্রতিবাদ। একজন সংসদ সদস্য নাকি কোনও এক ডাক্তার লোককে অপমান করেছেন। এখন অনেক ডাক্তার লোকেরা মিলে সে অপমানের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। এটা খুব ভালো।

প্রতিবাদের ব্যাপারটা আমার সবসময়ই খুব ভালো লাগে। এবারও খুব ভালো লেগেছে। অন্যায়কে মেনে নিতে নিতে আজ আমরা বাংলাদেশটার বারোটা বাড়িয়ে দিয়েছি। কন্ঠে প্রতিবাদ তুলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চকিত হওয়া খুবই দরকার। প্রতিবাদগুলো করা দরকার। অন্যায়ের প্রতিকার হওয়া দরকার। কিন্তু প্রতিবাদটা কোন্ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সেটাই তো জানা হলো না। আমি জানতে চাইলাম। জানতে চাওয়ার ইচ্ছাটা কজনকে জানালাম। তাঁরা বরাবরের মতোই সহযোগিতায় এগিয়ে এলেন।

তাঁরা জানালেন, একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেখানে একজন সংসদ সদস্য এক সরকারি হাসপাতালে ঝটিকা সফর করেছেন। নারী ও শিশু ওয়ার্ডে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের কাছ থেকে নানা ধরনের সমস্যা শুনেছেন। সংসদ সদস্য দেখলেন ওই সময় পুরো হাসপাতালের দায়িত্ব পালন করছিলেন মাত্র একজন ডাক্তার। অন্য ডাক্তার লোকটা নাকি ছুটি ছাড়াই কাজে আসছেন না। হাসপাতালে অনুপস্থিত রয়েছেন। আসেন নি। আসছেন না গেল তিনদিন ধরেই। সংসদ সদস্য নিজেই রোগী হয়ে ফোনে কথা বললেন সেই ডাক্তার লোকটির সঙ্গে। ডাক্তার লোকটি রোগীকে রোববারে আসতে বললেন। তিনি রোগীকে রোববারে দেখবেন। সেদিন বৃহস্পতিবার। রোববার আসতে তখনও তিনদিন বাকি।

ডাক্তার লোকটা যখন ছুটি ছাড়াই তিনদিন ধরে হাসপাতালে আসছেন না। এবং যখন ফোনে বললেন তিনি আরও তিনদিন পরে আসবেন! সংসদ সদস্য তখন কথাবার্তা এখানেই মূলতবী করে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে পারতেন। বিষয়টা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু সেটি হলো না। হয়ত বিষয়টা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট বলেই এখানেই শেষ হলো না। সংসদ সদস্য মানবিক জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। ক্ষিপ্ত হলেন। বললেন, যদি ওই মুহূর্তে যদি কোনও রোগীর অপারেশন করবার দরকার হয় তাহলে কি হবে? রোগীর অপারেশনটা কে করবে? জরুরি রোগীর প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটা কে দেবে? এবং রোগী যদি চিকিৎসার অভাবে মরেই যায় তাহলে সে দায়টা কে নেবে?

অতি যৌক্তিক কথাবার্তা। এই যৌক্তিকতায় বিতর্কের কোনও অবকাশ নাই। একজন পুলিশের কাজে না আসা, একজন শিক্ষকের কাজে না আসা, একজন আমলার কাজে না আসা এবং একজন ডাক্তারের কাজে না আসার মাঝে আসলে বিস্তর ফারাক। চিকিৎসার অভাবে রোগী যদি মরেই যায় এবং সে দায় নেওয়ার লোকও যদি পাওয়া যায়, তাতে লাভটা কি হবে? দায়বদ্ধ লোকটাকে শাস্তি দিলে মরে যাওয়া রোগী বেঁচে উঠবেন?

বিষয়টা তাহলে কি দাঁড়াল? বিষয়টা যে আসলে কি দাঁড়াল কিছুই বুঝতে পারছি না।

একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত লোক তাঁর দায়িত্ব অবহেলা করেছেন। কাজে ফাঁকি দিয়েছেন। এবং এই লোকের কাজে ফাঁকি দেওয়াটা আর দশটা পেশাজীবীদের কাজে ফাঁকি দেওয়ার মতো নয়। শারীরিকভাবে আর্ত কোনও মানুষ কখনও পুলিশের কাছে গিয়ে করজোড়ে বলবে না তাঁকে কিংবা তাঁর পরিজনকে সুস্থ করে তুলতে। রাজস্ব বোর্ডের কোনও কর্মকর্তা যদি একটানা পনেরো দিনও কর্মক্ষেত্রে না যান তবে সাধারণ মানুষের প্রাণ সংশয় হবে না। মানুষের মরে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হবে না। শিক্ষক-রাজনীতিক-আমলা- যে কোনও পেশাজীবী লোকেদের কথাই বলেন না কেন, এঁদের কারও সঙ্গেই মানুষের সুস্থতা-অসুস্থতা কিংবা মৃত্যুর যোগ নেই। ডাক্তার লোকেদের সঙ্গে আছে। ফলে এই একটি ক্ষেত্র বিবেচনায় চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত লোকেরা মহত্তম। এই একটি ক্ষেত্রে তাঁরা কখনও কখনও শিক্ষকদেরকেও অতিক্রম করেন।

কিন্তু সকল পেশার মতো চিকিৎসাসেবার মতো মহত্তম পেশাতেও কলুষিত লোকজন আছে। এরা এই মহত্তম পেশায় নিয়োজিত মহৎ মানুষদের আন্তরিকতাকে আমাদের মতো খুব সাধারণ লোকেদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। বিভ্রান্ত করে তোলে।

আর এই বিভ্রান্তিতে ঘি ঢালেন ওই মহত্তম পেশারই আরও কিছু মানুষ। তাঁরা যখন দায়িত্ব পাওয়া ডাক্তার লোকটির দায়িত্বে অবহেলা করবার দায়ে শাস্তির প্রতিবাদে উচ্চকিত হন। যখন নিজেদের পেশার মহত্তম দিকটি ভুলে গিয়ে উকিল মোক্তার আমলা শিক্ষক পুলিশ দারোগা ব্যাংকারের সঙ্গে নিজেদেরকে মিলিয়ে ফেলেন, গুলিয়ে ফেলেন, কাজে ফাঁকি দেওয়া ডাক্তার লোকটাকে সংসদ সদস্যর ওভাবে বলাবলি করা সংবিধান সন্মত কিনা বলে প্রশ্ন তোলেন। সংসদ সদস্যকে মূর্খ বলে অভিহিত করেন। আইন বহির্ভূত বলে দাবী তোলেন। অজ্ঞানের ডাক্তার নেই বলে সার্জনের অনুপস্থিত থাকাকে বৈধতা দিতে খোঁড়া যুক্তি নিয়ে বিতর্কে নামেন। হাসপাতালের ২৭টা পদের ২০টা পদ শূন্য বলে আচমকা এতদিন বাদে চেঁচিয়ে গলার রগ ফুলিয়ে ফেলেন। এবং খুব করে বোঝাতে চান ২৭ জন ডাক্তারের হাসপাতালে ৭ জন ডাক্তারের একজন ইচ্ছে করলেই অনুপস্থিত থাকতে পারাটা দোষের কিছু না, এবং বারডেমের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ একজন চিকিৎসক যখন খুব নোংরাভাবে ঘোষণা দিয়ে বলেন, নড়াইলের লোকেদের ইয়ে মারা গেল, তখন…

তখন এই ডাক্তার লোকেদের এইভাবে আঁতে ঘা লাগা দেখে আমরা খুব সাধারণেরা খুব বিভ্রান্ত বোধ করি। তখন খুব সাধারণ এই আমাদেরকে অবাক হয়ে লক্ষ্য করতে হয়- মহত্তম পেশায় নিয়োজিতদের একজনের দায়িত্বে অবহেলার কথা বলাতে ওই পেশার কত কত লোকে একসঙ্গে খেপে উঠলেন! আমরা উপলব্ধি করতে থাকি এই খেপে ওঠা লোকগুলো আজ তাদের যত স্থাবর-অস্থাবর তর্ক-বিতর্ক আর যুক্তি নিয়ে নেমেছেন, সেটি কেবলই একটা অনিয়মতান্ত্রিকতাকে সমর্থন করতে। মহৎ পেশায় নিয়োজিত হয়েও এঁদের ন্যায়-অন্যায়বোধ মানসিকতা কতটা সীমাবদ্ধ। ধাঁধায় ফেলেন আমাদের মনকে।

আমাদের দুর্বল আর ভীতু মন আমাদেরকে বলতে চায় দায়িত্বে অবহেলা করা ওই ডাক্তার লোকটা একলা লোক না। অনেক। আর আমরা খুব সাধারণেরা, সাধারণেরও সাধারণেরা এঁদের কাছে জিম্মি। আমাদের মন আমাদের ধাঁধায় পড়ে এই ভাবনায়- এঁরা সকলেই কি তবে ওই ‘অনিয়মতান্ত্রিক’ ভাবে চলাচলের বৈধতা চাইছেন!?

আমরা এবার সত্যিই খুব ভয় পেয়ে যাই। সত্যি সত্যিই আমরা খুব ভয় পেয়ে যাই।

২৯.৪.১৯

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *