নির্বাচিত কলামপ্রধান খবরযুক্তরাষ্ট্র

ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি

নিউ ইয়র্ক টাইমস্‌ থেকে: ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইমপিচমেন্ট বিস্মিত হওয়ার মতো কোনও বিষয় নয়, এটি কোনও সন্ধিক্ষণও নয়। আমরা জানতাম যে, প্রতিনিধি পরিষদ ইমপিচমেন্টের পক্ষে ভোট দেবে।

আমরা আরও জানি, রাজনীতিতে যে কোনও কিছু যেমন নিশ্চিতভাবে জানা যায়, রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেট ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করবে না; এমনকি এ সিনেট সাক্ষ্য-প্রমাণগুলোকে বিবেচনায় নেওয়ার ভানও করবে না। সুতরাং পুরো ব্যাপারটি নিয়েি নিরাশ হওয়া যেতেই পারে।

আসলে এই ব্যাপারটাকে যেভাবে ভাবা হচ্ছে, বিষয়টি তা নয়। দিনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন ছিল। আশা আর নিরাশা মেশানো একটি দিন। আর নিরাশার কারণগুলোও এখানে সুস্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্র সচরাচর যেসব বিষয়ের পক্ষ নেয়, আমরা খুব সহজেই সে বিষয়গুলো বিস্মৃত হতে পারতাম। সব আদর্শ ঝেড়ে ফেলার মাত্র কয়েক মাস আগে স্বাধীনতার জন্মস্থানটি আরও অনেক ভালো হতে পারত। তবে এখানে আশাবাদী হওয়ার মতোও কিছু কারণ কিন্তু রয়েছে।

বিভিন্ন দেশে- হাঙ্গেরি থেকে তুরস্ক পর্যন্ত যতটুকু হওয়া সম্ভব ততটুকু নির্লজ্জ ও দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েই স্বাধীনতার শত্রুরা তৈরি হয়েছে। সেখানে গণতন্ত্র খুব সফলভাবেই ভেঙে পড়েছে।

তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে  তাদের  থেকে আমেরিকার গণতন্ত্রের রক্ষকরা বিদেশি প্রতিপক্ষর তুলনায় আরও ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ। কিন্তু বড় প্রশ্নটি হচ্ছে, এ ভিন্নতা আমাদের সুরক্ষা দিতে যথেষ্ট কিনা?

ট্রাম্প তার ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন, এমন সন্দেহ কখনওই ছিল না। একেবারে শুরু থেকেই আইনের শাসনকে অবজ্ঞা করার বার্তা ট্রাম্প দিয়ে আসছিলেন।

অংশীদারীত্ব: অন্য কথায় বলতে গেলে রিপাবলিকানরা রক্ষা পাওয়ার পথ পেছনে ফেলে গেছে। তারাও নেতার নীতি অনুসরণকারী আরেকটি দল হয়ে উঠেছে।

তারাও ভিন্ন দেশের রিপাবলিকান দলের মতোই একইভাবে অসদুপায় অবলম্বন করে ভবিষ্যতে নির্বাচনে ভোট কারচুপি ও ভোটারদের বঞ্চিত করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে যায়। কিন্তু যদি ট্রাম্পের সমর্থকদের অন্যদেশের ব্যর্থ গণতন্ত্রগুলোর সমর্থকদের মতো বিবেচনা করা হয়, সেক্ষেত্রে তার বিরোধীদের সেভাবে বিবেচনা করা হয় না।

হাঙ্গেরির ফিডেস্জ এবং পোল্যান্ডের ল’ অ্যান্ড জাস্টিস দলটির মতো একনায়কতান্ত্রিক দলগুলোর উত্থানের ক্ষেত্রে হতাশাজনক বিষয়গুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছে তাদের বিরোধীদের অক্ষমতা- অনৈক্য, অসংঘবদ্ধ এবং কার্যকর চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারার ব্যর্থতা।

এমনকি অজনপ্রিয় স্বৈরশাসকদেরকেও তারা কিছু করতে পারছে না, কারণ তারা নিজেদের ক্ষমতাকে অংশীদারীত্বে ভাগ করে নিয়েছে।

অপরদিকে শুরু থেকেই ট্রাম্পের ক্ষেত্রে (ট্রাম্পিজম) দৃঢ়সংকল্প, ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর বিরোধিতা এসেছে – যা প্রতিধ্বনিত হয়েছে গণজমায়েত এবং ডেমোক্রেটদের নির্বাচনী বিজয়ের উভয়দিকে। যেখানে ২০১৭ সালে রিপাবলিকান দলের ৩৫ জনের বিপরীতে ডেমোক্রেট গভর্নর ছিলেন ১৫ জন, সেখানে এ সংখ্যা এখন বেড়ে রিপাবলিকান ২৬, ডেমোক্রেট ২৪।

অন্যদিকে গেল বছর ডেমোক্রেটরা প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে বড় ধরনের জয়লাভ করেছে, যার ওপর ভর করে ইমপিচমেন্টের শুনানি ও ভোটের আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে।

সাংবিধানিক দায়িত্ব: কংগ্রেসের নতুন ডেমোক্রেটিক সদস্যদের বেশিরভাগই রিপাবলিকান-ঝুঁকিপ্রবণ ডিস্ট্রিক্টগুলো থেকে বিজয়ী হয়েছেন। পর্যবেক্ষকরা আশা করছেন এ সংখ্যা আরও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।

এর বাইরে দলটি প্রায় সংঘবদ্ধভাবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু সত্য হলো, এর বিরোধীরাও ঠিক এমনটিই করেছে। কিন্তু যখন রিপাবলিকানরা ট্রাম্পকে রক্ষা করতে তাদের বিকৃত আওয়াজ তুলেছে, তখন ডেমোক্রেটরা ঐক্যবদ্ধ, আন্তরিক ও দৃঢ়সংকল্পভাবে এগিয়ে এসেছে তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে। এমনকি রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পড়ার মুখেও তারা অটল থেকেছে।

এটি আসলে অপরিহার্যভাবে এটাই প্রমাণ করে না যে, গণতন্ত্র টিকে থাকবে। এমনকি তারা নির্বাচনে হারতে থাকলেও রিপাবলিকানরা আদালত ও অন্যান্য জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করছে। কংগ্রেসের ডেমোক্রেটিক নেতারা অপ্রত্যাশিতভাবে, এমনকি কিছুটা বাজেভাবে হলেও প্রভাব বিস্তার করছে। তবে ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্সিয়াল মাঠ তেমনটি নয়।

আর একটি লক্ষ্যের প্রতি যে ঐক্য আমরা দেখছি, আগামী নভেম্বর পর্যন্ত তেমনটি সমুন্নত থাকবে না। যদি ডেমোক্রেট দল এলিজাবেথ ওয়ারেন বা বার্নি স্যান্ডার্সের মতো প্রগতিশীল প্রার্থীদের প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দেয়। তাহলে কি ধনী ডেমোক্রেটরা তাদের কর হার কম রাখার চেয়ে গণতন্ত্রকে রক্ষা করাকে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে সিদ্ধান্ত নেবেন?

দল যদি জো বাইডেনের মতো উদারপন্থী কাউকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে কি কি স্যান্ডার্সের সমর্থকরা ২০১৬ সালের মতো ভোটের দিন ঘরে বসে থেকে অথবা তৃতীয় কোনও দলের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার মাধ্যমে তাদের হতাশা প্রকাশ করবেন- আমি খুব সাবলীলভাবেই এমন উদ্বেগকে বাতিল করে দিতে চাইছি। কিন্তু আমি সেটি  পারছি না।

তবে এটুকু যুক্ত করা যায় যে, আগামী বছরের নির্বাচনে ভোটারদের নিপীড়ন ও ইলেক্টোরাল কলেজকে একদিকে ঝোঁকানোর প্রক্রিয়া তৈরির মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের পক্ষে কারচুপি করা হবে।

সিনেটের একটি রূপরেখার মাধ্যমে এমনকি বড় ধরনের ঝোঁক তৈরি করা হতে পারে , যেন ছোট ও বেশিরভাগ রক্ষণশীল রাজ্যগুলোতে উদারপন্থী রাজ্যগুলোর চেয়ে বেশি প্রতিনিধি দেওয়া যায়। এর মাধ্যমে ট্রাম্পিজমের আরেকবার জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করা খুবই সম্ভব।

আমরা যা শিখেছি সেটা হলো- কেবল বিশেষ একটি গোষ্ঠীর প্রভাব নয়, যারা আমেরিকাকে তার আদর্শগুলো রক্ষার মাধ্যমে সুরক্ষা দেবে, তারা সহজে ছেড়ে দেবে না। তবে খারাপ খবর হচ্ছে, আমাদের খারাপ মানুষগুলো যে কোনও স্থানের চেয়ে খারাপ মানুষের মতোই খারাপ।

আর সুখবর হলো, আমাদের ভালো মানুষগুলো প্রচলিত প্রথার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে হয়ত সঠিক কাজটি করার জন্য সংকল্পবদ্ধ।

পল ক্রুগম্যান : নোবেলজয়ী মার্কিন বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতির শিক্ষক: সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension