অনুবাদযুক্তরাষ্ট্ররাজনীতি

ডিএনসি ২০২০: হিলারি ক্লিনটনের পূর্ণাঙ্গ বক্তৃতা

হিলারি ক্লিনটন, চার বছর আগে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুটি দলের মধ্যে একটি বড় দলের পক্ষে প্রথম মার্কিন মহিলা রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন প্রাপ্ত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। এখন, ২০২০ সালে, তিনি ডিএনসিতে ফিরে এসেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতিতে। আমরা সবাই জানি, ২০১৬'র নির্বাচনে ট্রাম্প জিতেছিলেন। এমন কিছু যেন আর কখনও না ঘটে এটা নিশ্চিত করতেই ক্লিনটন এখন এখানে কাজ করছেন।

রূপসী বাংলা অনুবাদ ডেস্ক: সাবেক রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা এবং উপ রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্ত কমলা হ্যারিসের সঙ্গে, কনভেনশনের তৃতীয় রাতে সাবেক এই রাষ্ট্র সচিব তার বক্তব্য প্রদান করেন। ক্লিনটন তা্র বক্তৃতায় রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের বক্তব্য উল্লেখ করে বলেন, “আপনারা ২০১৬’র কথা স্মরণ করুন, যখন ট্রাম্প আপনাদের প্রশ্ন করেছিলেন,’আপনাদের হারানোর কী আছে?’ হ্যাঁ, এখন আমরা জানি, আমাদের স্বাস্থ্যসেবা, চাকরি, আমাদের প্রিয়জন, বিশ্বে আমাদের নেতৃত্ব এমনকি আমাদের পোস্ট অফিস পর্যন্ত।”

হ্যারিসের মনোনয়নে ঐতিহাসিক ধরণ নিয়েও কথা বলেছেন হিলারি ক্লিনটন। তিনি বলেন, ‘আজ রাতে আমি সেই সব মেয়ে ও ছেলেদের কথা ভাবছি যারা কমলা হ্যারিসের কারণে নিজেদেরকে ভবিষ্যত আমেরিকায় দেখতে পাচ্ছেন। কমলা হ্যারিস- একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী, জ্যামাইকান আর ভারতীয় অভিবাসীর কন্যা এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আমাদের মনোনীত প্রার্থী। এটাই আমাদের দেশের গল্প: সব বাধা বিপত্তিকে ভেঙেচুরে সম্ভাবনার বৃত্তকে প্রসারিত করা।’

নীচে হিলারি ক্লিনটনের সম্পূর্ণ বক্তৃতাটি দেওয়া হলো:

গত নির্বাচনের পরের সকালেই আমি বলেছিলাম, ‘আমরা ডোনাল্ড ট্রাম্পের খোলা মনমানসিকতা এবং নেতৃত্বের সুযোগের কাছে ঋণী।’ আমি এটাই বোঝাতে চেয়েছিলাম। প্রত্যেক রাষ্ট্রপতিরই এটা প্রাপ্য। ট্রাম্প তার নির্বাচনী ইশতেহারে অনেক অনেক ব্যবস্থা নিয়ে এসেছিলেন: একটি শক্তিশালী অর্থনীতি, সংকট কাল পরিচালনার পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা সঙ্গে নিয়ে, যার ভেতরে একটা মহামারীও ছিল।

হ্যাঁ, আমরা ডেমোক্র্যাটরা অনেক বিষয়েই তার সঙ্গে একমত হতে নাও পারি। তবে যদি তিনি নিজের স্বার্থ এবং অহংকে একপাশে সরিয়ে রেখে মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো দেখতেন, যখন কিনা সীমান্তে কোনও বাবা-মায়ের কাছ থেকে সন্তানকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে, বা বিক্ষোভকারীরা যখন ন্যায়বিচারের আহ্বান জানিয়েছে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন কোনও পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তাহলে সেটা রাষ্ট্র আমেরিকার পক্ষে এবং বিশ্বের পক্ষেও ভালো হতো। ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি জানতেন একজন রাষ্ট্র নায়কের কেমন হওয়া উচিত! কেননা, এখন, এই মুহূর্তে আমেরিকার একজন রাষ্ট্রপতি প্রয়োজন।

সংকটের পুরোটা সময় জুড়ে মার্কিন জনগণ প্রতিবেশিদের কাছে গিয়েছে, খোঁজ খবর নিয়েছে। হাসপাতাল, মুদি দোকান এবং সেবা কেন্দ্রগুলোর কাজে সর্বপ্রথম সাড়া দিয়ে এগিয়ে এসেছে। হ্যাঁ, এখনও একটা গ্রাম দরকার ( একটি আফ্রিকান প্রবাদ বাক্য যার অর্থ- সর্বস্তরের জনগণের সেবা, ত্যাগ, সচেতনতা এবং পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য রাষ্ট্র ও তার জনগণের একযোগে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়।)

এবং আমাদের এই মুহুর্তে ত্যাগ ও সেবায় সমান ভূমিকা পালন করার মতো নেতৃত্ব প্রয়োজন। আমাদের প্রয়োজন জো বাইডেন এবং কমলা হ্যারিস।

জো-র যত্নশীলতা এবং সহানুভূতিশীলতা নিয়ে আমাদের  প্রত্যেকের নিজস্ব একটা গল্প আছে। মনে আছে, আমার মা ডরোথি মারা যাওয়ার পরে তাকে ফোন করেছিলাম। আমরা দৃঢ়তাসম্পন্ন নারীদের হাতে বেড়ে ওঠা সন্তানদের নিয়ে কথা বলেছিলাম। জো-র পক্ষে সবচেয়ে  ভালো সাক্ষ্যপ্রমাণ হলো সে কীভাবে তার পরিবারের যত্ন নেয় সেটা এবং ড. জিল বাইডেনের পক্ষে ফার্স্ট লেডি হিসাবে শিক্ষকতা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাটা কতখানি মহতী উদ্যোগ বলে আপনাদের মনে হয়?

জো তার জন্য উপযুক্ত সহকর্মী বাছাই করেছেন কমলাকে। কমলা ন্যায়বিচার এবং ন্যায্যতার সাধনায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং দয়ালু। যখন তার প্রেস সেক্রেটারি টাইরন গেইল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পথে যাত্রা করছিল, কমলা সবকিছু ফেলে চলে গিয়েছিল শেষ মুহূর্তে তার পাশে থাকবার জন্য।

আমি জানি তাকে অনেক তীব্র শর নিক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই প্রাক্তন জেলা অ্যাটর্নি এবং অ্যাটর্নি জেনারেল তাদের সবাইকেই সামলে নিতে পারবেন।

সুতরাং, এরাই সেই দল যারা আমাদের পুরো মার্কিন জাতিকে আবার শেষ কিনারা থেকে টেনে তুলতে পারে। কিন্তু আমাদের সবার সহযোগিতা ছাড়া তারা এটা করতে পারবে না।

গত চার বছর ধরে, মানুষ আমাকে বলেছে, ‘সে যে কি পরিমাণ বিপজ্জনক তা আমি ধারণাই করতে পারি নি,’ ‘আমি যদি সব একেবারে শেষ করে দিতে পারতাম!’ অথবা আরও ভয়াবহ, ‘আমার ভোট দেওয়া উচিত ছিল।’ এটা আরেকটা অনুমান, সম্ভাবনা এবং উচিত অনুচিত নির্ভর হতাশাজনক ফলাফলের নির্বাচন হতে পারে না। আপনারা ই-মেইলের মাধ্যমে ভোট দিতে চাইলে এখনই নিজেদের ব্যালটের অনুরোধ করুন এবং সেটাকে পাঠিয়ে দিন। যদি সশরীরে ভোট দিতে চান, সকালবেলাই কাজটা সেরে ফেলুন। মাঠকর্মী হয়ে যান। সবচেয়ে বড় কথা, যাই হোক না কেন, ভোট দিন।

মিশেল ওবামা এবং বার্নি স্যান্ডার্স যেমন আমাদের সতর্ক করেছেন: ট্রাম্প যদি আবার নির্বাচিত হন, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। এজন্য আমাদের এখন আগের চেয়ে আরও অনেক বেশী ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন । আবার স্মরণ করুন, ২০১৬  সালে ট্রাম্প আপনাদের জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আপনাদের হারানোর মতো কি আছে?’ হ্যাঁ, এখন আমরা জানি: আমাদের স্বাস্থ্যসেবা, আমাদের চাকরি, আমাদের প্রিয়জনদের, বিশ্বে আমাদের নেতৃত্ব, এমনকি আমাদের পোস্ট অফিস পর্যন্ত।

কিন্তু আমাদের লক্ষ্যমাত্রা শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিকে হোয়াইট হাউজ থেকে বের করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত হবে না। আরও উচ্চস্তরে দৃষ্টিসীমাকে প্রসারিত করতে হবে। জো বাইডেন এবং কমলা হ্যারিস আমাদের ভোটে অংশগ্রহণ করবার জন্য অনেক কিছু দিতে যাচ্ছেন। আসুন, আমরা জো-র পরিকল্পনায় তৈরি হওয়া চাকরির ক্ষেত্রটির জন্য ভোট দিই। জলবায়ু পরিবর্তন করার  লড়াইয়ের জন্য এনার্জি ক্লিনের চাকরি, ন্যায্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পরিচর্যামূলক চাকরি। জরুরী ত্রাণের জন্য ভোট দিন, যেন ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো দাঁড়িয়ে যায় এবং পরিশ্রমী মানুষগুলোকে কাজ বন্ধের পূর্বাভাস এবং উচ্ছেদ থেকে বাঁচতে সাহায্য করে। মহামারীর সময়ে যখন অতিরিক্ত বেকারত্বের ফলে কয়েক মিলিয়ন মানুষ তাদের সপ্তাহে  ৬০০ ডলারের রোজগার হারিয়েছে, তখন কোটিপতিরা ৪০০ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আয় করেছে, এটা অন্যায্য, ভুল।

বাচ্চাদের শিক্ষা এবং সুরক্ষার ভারসাম্য রক্ষার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া বাবা-মা এবং শিক্ষকদের জন্য ভোট দিন। হোয়াইট হাউজের সামান্য সহায়তায় কোভিড -১৯ এর সাথে লড়াই করা স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের জন্য, বেতনভুক্ত পারিবারিক ছুটি এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার পক্ষে ভোট দিন। সামাজিক সুরক্ষা, চিকিৎসা এবং পরিকল্পিত সন্তান পালনের জন্য ভোট দিন।

স্বপ্ন দেখা মানুষ এবং তাদের পরিবারের জন্য ভোট দিন। জাতিগত পক্ষপাতমুক্ত আইন প্রয়োগের জন্য ভোট দিন যেন আমাদের রাস্তাগুলো নিরাপদ থাকে। জর্জ ফ্লয়েড, ব্রোনা টেইলর এবং আহমদ আরবেরির পক্ষে ন্যায়বিচারের জন্য ভোট দিন। কারণ, কৃষ্ণাঙ্গদের জীবন সমানভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।

সৎ নির্বাচনের জন্য ভোট দিন যেখানে আমরাই আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করব, কোনও বিদেশী প্রতিপক্ষ নয়।

বিগত রাতে দেখা অজস্র আশাবাদী, বিচিত্র আমেরিকান নাগরিকদের জন্য ভোট দিন।

ভুলে যাবেন না, জো এবং কমলা ত্রিশ লক্ষ ভোটে জিততেও পারে এবং এখনও হেরে যেতে পারে। আমার কাছ থেকে শুনুন আপনারা। আমাদের উপচে পড়া সংখ্যার ভোট প্রয়োজন যেন ট্রাম্প কোন ভাবেই তার বিজয়কে ছিনিয়ে নিতে বা চুরি করতে না পারে। ভোট শুরু করতে ৩০৩৩০ নম্বরে ‘VOTE’ লিখে টেক্সট মেসেজ করুন।

একশ’ বছর আগে ১৮ আগস্ট ১৯২০, সংবিধানের ঊনিশতম সংশোধনীর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সাত দশক ধরে ভুক্তভোগীরা পদযাত্রা, পিকেটিং এবং জেলে গিয়ে আমাদের আরও নিখুঁতভাবে একত্রিত হতে বাধ্য করেছিল। পঞ্চান্ন বছর আগে, জন লুইস পদযাত্রা করে সেলমা’য় রক্তাক্ত হয়েছিলেন। কারণ, তখনও অনেক কাজ বাকি ছিল।

আজ রাতে আমি সেই সব মেয়ে ও ছেলেদের কথা ভাবছি যারা কমলা হ্যারিস এর কারণে নিজেদেরকে ভবিষ্যত আমেরিকায় দেখতে পাচ্ছে। কমলা হ্যারিস- একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী, জ্যামাইকান এবং ভারতীয় অভিবাসীর কন্যা এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আমাদের মনোনীত প্রার্থী। এটাই আমাদের দেশের গল্প: সব বাধা বিপত্তিকে ভেঙেচুরে সম্ভাবনার বৃত্তকে প্রসারিত করা।

তরুণরা যারা এখন এটা দেখছেন: হাল ছেড়ে দেবেন না। সমস্যা এবং ভুল থাকা সত্ত্বেও আমরা এত দূর এসেছি। আমরা এখনও ন্যায়সঙ্গত এবং সমতার দেশ হতে পারব সেই সব সুযোগ সুবিধা নিয়ে যা পূর্বের প্রজন্মের কল্পনাতেও আসে নি।

আমেরিকায় এখন অনেক ভেঙে পড়া মানুষ। আসল সত্যিটা হলো, মহামারী আসবার আগেই অনেক কিছু ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু, কথা যেমন চলতেই থাকবে, ঠিক তেমন ভাবে, পৃথিবী সবাইকেই ভাঙে এবং তারপরে, সেই ভাঙা জায়গায় অনেকে আছেন যারা পূর্বের তুলনায় আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। জো বাইডেন তেমনি একজন। তিনি জানেন কীভাবে চলমান থাকতে হয়, ঐক্যবদ্ধ করতে এবং নেতৃত্ব দিতে হয়। কারণ তিনি নিজের পরিবার ও দেশের জন্য এটা করেছেন।

সুতরাং নভেম্বরে আসুন, আমরা একসঙ্গে শক্তিশালী হতে পারলে, আমরা একসাথে আরোগ্য লাভও করব। আমরা রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন এবং উপ-রাষ্ট্রপতি কমলা হ্যারিসের নেতৃত্বে আমাদের দেশের নিজস্বতা এবং প্রতিশ্রুতিকে আবার ফিরিয়ে আনবো।

অনুবাদ: জাহান আরা দোলন

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension