অনুবাদনির্বাচিত কলামভারত

দ্য প্যানডেমিক ইজ আ পোর্টাল

কিছুদিন পরে সরকারের মাথায় আসে, ধাবমান এই জনগোষ্ঠী গ্রামগুলোতে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে। তখন সরকার প্রদেশ সীমান্ত সিল করে দেয় পথে চলাচলকারীদের জন্যও। দিনের পর দিন পায়ে হেঁটে আসা মানুষগুলোকে থামিয়ে দেওয়া হয়। যে শহর থেকে তাদের মাত্র কিছুদিন আগে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল, তাদের আবার জোর করে সেখানে ফেরত পাঠানো হয়। 

অরুন্ধতি রায়

 

ইদানিং ‘ভাইরাস আক্রান্ত’ শব্দে একটু হলেও কেঁপে উঠছে না এমন কে আছেন? একটা দরজার হাতলে, কার্ডবোর্ডে অথবা একটা সবজির ব্যাগের দিকে তাকালেই  সেগুলোতে ঘিনঘিনে দলবাঁধা  অদৃশ্যমান, অ-মৃত, অ-জীবিত স্তন্যপায়ী বিন্দুযুক্ত ব্লবগুলো আমাদের  ফুসফুসকে আক্রমণের জন্য অপেক্ষারত ছাড়া আমরা কে এখন  কল্পনা করতে পারি?    

আমরা কে এখন একটা গণপরিবহনে উঠতে, একজন সদ্য পরিচিতকে চুমু খেতে কিংবা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাতে সত্যিকারের ভয় পাচ্ছি না? একটা সাধারণ বিনোদনের কথা চিন্তা করে, তার ঝুঁকির পরিমাণটা কে এখন হিসেব করছি না? আমাদের মধ্যে কে এখন হাতুড়ে গবেষক, ভাইরাস বিশেষজ্ঞ, পরিসংখ্যানবিদ কিংবা ধর্মের পথে আহ্বানকারী নই? কোন্ বিজ্ঞানী অথবা ডাক্তার গোপনে  হঠাৎ কোনও চমকপ্রদ কিছু একটা ঘটবার প্রার্থনা করছেন না? কোন্‌ পুরোহিত প্রকাশ্যেই , শেষ পর্যন্ত নিজেকে বিজ্ঞানের কাছে  সমর্পিত করছেন না?

এবং এভাবে যখন ভাইরাসের সংক্রমণ বহুমাত্রিক গতিতে  বাড়ছে  আমরা কে তখন শিহরিত হচ্ছি না শহরের মধ্যে শুনতে পাওয়া পাখির কূজনে, ট্রাফিক সিগন্যালে ময়ূরের নাচে অথবা আকাশের নৈঃশব্দের শব্দে? 

এ সপ্তাহে শনাক্তের সংখ্যা দশ লক্ষ ছাড়িয়েছে। ইতোমধ্যেই পঞ্চাশ হাজারের বেশী লোক মারা গেছে।
অভিক্ষেপ যন্ত্র’র (Projection) ধারণা, সংখ্যাটি আরও কয়েক শত হাজার অথবা তারচেয়েও বেশি হবে। ভাইরাসটি বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক পুঁজির প্রবাহের পথ ধরে স্বচ্ছন্দে ঘোরাঘুরি করছে। ফলে, যে ভয়াবহ অসুখ চলে এসেছে, সেটা মানুষকে তাদের নিজের দেশে, শহরে এমনকি নিজের ঘরেই বন্দি করে ফেলেছে।

পুঁজির পথ ধরে এলেও এর ধরণ পুঁজির প্রবাহের একেবারেই উল্টো। মুনাফার পরিবর্তে সম্প্রসারণের চেষ্টা তার। ফলাফল, অসাবধানতাবশত, কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে প্রবাহের গতিপথ পুরনো পথে ফিরে এসেছে। 

এটি সমগ্র ইমিগ্রেশন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বায়োমেট্রিক, ডিজিটাল নজরদারি এবং সব ধরনের ডাটা গবেষণা ও বিশ্লেষণ ব্যবস্থাকে উপহাস করে তার চরম আঘাত হেনেছে মূলত পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী এবং  ক্ষমতাধর দেশগুলোতে। পুঁজিবাদ যন্ত্রটিকে স্থবির করে দিয়েছে এক প্রবল স্থগিতাদেশের মাধ্যমে। হয়ত অল্পকিছু সময়ের জন্য কিন্তু এর দীর্ঘসূত্রিতার মেয়াদ সমস্ত কলকব্জা পরীক্ষা নিরীক্ষা, মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা আমাদের এ ব্যবস্থাকে সারিয়ে তুলতে সাহায্য করব নাকি এরচেয়েও ভালো কিছু খুঁজব।

এই মহামারীর নিয়ন্ত্রক ম্যান্ডারিনরা (চীনারা) যুদ্ধের কথা বলে চলেছে। রূপক অর্থে যুদ্ধ নয়, আক্ষরিক অর্থেই । কিন্তু যদি আসলেই এটা যুদ্ধ হয়, আমেরিকার চেয়ে যুদ্ধের  ভালো প্রস্তুতি আর কার আছে তাবৎ পৃথিবীতে?
মাস্ক এবং গ্লাভস্ না হয়ে যদি সম্মুখসমর সেনা, বন্দুক, অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র, সাবমেরিন, জঙ্গিবিমান, কিংবা পারমাণবিক বোমার দরকার পড়ত, কোথাও কি কিছুর অভাব হতো? 

রাতের পর রাত, পৃথিবীর অপর প্রান্ত থেকে, আমরা অনেকেই মুগ্ধতার সাথে নিউ ইয়র্কের গভর্নরের প্রেস ব্রিফিং দেখি যার ব্যাখ্যাটা কঠিন। আমরা পরিসংখ্যানগুলো দেখি আর যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পবেতনে কর্মরত অতিশ্রান্ত নার্সদের আবর্জনার ঝুড়ির পাশ এবং পুরনো বর্ষাতি থেকে মুখোশ তৈরির, সবকিছু ঝুঁকিতে ফেলে আক্রান্তদের সুস্থ করার গল্পগুলো শুনি। রাজ্যগুলো ভেন্টিলেটরের জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দাম হাঁকছে, কোন্‌ রোগী মরে যেতে পারে  আর কে বাঁচবে সেটা নিয়ে চিকিৎসকদের উভয়সঙ্কট।  আমরা মনে মনে বলি, ‘হায় ঈশ্বর! এটাই আমেরিকা!’

এ দুঃখজনক ঘটনাগুলো এখনকারই, বাস্তব এক মহাকাব্যের মতোই আমাদের সামনে স্পষ্ট। এটা কোনও নতুন ঘটনা নয়। এটা হলো সেই ট্রেনের ধ্বংসলীলা যা বহুবছর ধরে একপাশে কাত হয়ে  চলছে। ‘পেশেন্ট ডাম্পিং’ এর সেই ভিডিওগুলো কার মনে নেই? – পেছনভাগ উন্মুক্ত থাকা হাসপাতালের বিশেষ পোশাক পরে থাকা অসুস্থ সেই মানুষগুলোকে, গোপনে রাস্তার কোণায় ফেলে রেখে যাওয়ার ভিডিও। আমেরিকার অসহায় নাগরিকদের জন্য হাসপাতালের দরজা খুব কমই খোলা থাকে। তাতে তারা যতই অসুস্থ থাকুক বা ভোগান্তির শিকার হোক, এটা হাসপাতালের বিবেচ্য নয়।

অন্তত এখন পর্যন্ত নয়, কারণ এখন, এই ভাইরাসের সময়ে, গরীব কোনও একজন ব্যক্তির অসুস্থতাও একটা পুরো ধনী সমাজের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আক্রান্ত করে ফেলতে পারে। এখন পর্যন্ত, এমনকি এখনও, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা’র পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাওয়ার কারণে  সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচিত হচ্ছেন সমগ্র হোয়াইট হাউস থেকে, এমনকি নিজের দল থেকেও।

আমার নিজের দেশের অবস্থাটা কেমন, আমার দরিদ্র-সমৃদ্ধ ভারত, সামন্তবাদ, মৌলবাদ, বর্ণবাদ এবং পুঁজিবাদের মধ্যে কোথাও আটকে পড়ে, ডানপন্থী হিন্দুজাতীয়তাবাদীদের দ্বারা শাসিত হচ্ছে?

ডিসেম্বর মাসে চীন যখন উহানে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে লড়াই করছে, ভারত সরকার তখন নির্লজ্জভাবে   সংসদে সদ্য পাস হওয়া পক্ষপাতমূলক মুসলিম বিরোধী নাগরিকত্ব  আইনের বিরোধিতার প্রতিবাদে তৈরি হওয়া শত সহস্র নাগরিকের গণঅভ্যুত্থানকে মোকাবিলা করছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারতে কোভিড-১৯ এর প্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল ৩০ জানুয়ারি। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডে সম্মানিত অতিথি, ‘অ্যামাজন ফরেস্ট-ইটার’ এবং কোভিড-প্রত্যাখ্যানকারী  জায়ার বলসোনেরো’র দিল্লি ত্যাগের কিছুদিনের মধ্যেই।

কিন্তু এরপরেও ক্ষমতাসীন দলের সময়সূচিতে ভাইরাসের বিষয়টি যুক্ত করার জন্য ফেব্রুয়ারিতে অনেক কিছুই করা যেত। সেখানে মাসের শেষ সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারতে আনুষ্ঠানিক সফর নির্ধারিত ছিল। তাকে গুজরাটের খেলার স্টেডিয়ামে এক মিলিয়ন দর্শকের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রলুব্ধ করা হয়েছিল। পুরোটাই ভীষণরকম ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

এর পরেই ছিল দিল্লির বিধানসভা নির্বাচন যেখানে ভারতীয় জনতা পার্টির হেরে যাওয়া নির্ধারিত ছিল যদি না তারা তাদের নির্দিষ্ট খেলাটা চালিয়ে যায়। তারা খেলাটি চালিয়েছিল, অপ্রতিরোধ্য হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের মাধ্যমে বর্বর নিষ্ঠুরতা ছড়ানো প্রচারণা চালিয়ে, সহিংসতাপূর্ণ ভয় দেখিয়ে এবং ‘দেশদ্রোহী’দের ওপর গুলি চালিয়ে।

যেভাবেই হোক তারা হেরে গেল। তখন দিল্লির মুসলমানদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হলো অবমাননার দায়ে। সশস্ত্র সদাজাগ্রত হিন্দুরা পুলিশের পাহারায় উত্তর-পূর্ব দিল্লির প্রতিবেশী মুসলিম শ্রমিকদের ওপর আক্রমণ চালায়। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, মসজিদ এবং স্কুল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। মুসলমানদের মধ্যে যারা আক্রমণের আশা করেছিল, তারা লড়াই করেছিল। ৫০ এর বেশি মানুষ, মুসলমান এবং কিছু হিন্দু নিহত হয়েছিল। 

হাজারও মানুষ আশ্রয় নেয় স্থানীয় কবরখানার উদ্বাস্তু শিবিরে। মৃতদেহগুলো নোংরা প্যাঁচপ্যাঁচে দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেন থেকে টেনে বের করা হলো তখন, যখন সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দের কোভিড-১৯ বিষয়ক প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং অধিকাংশ ভারতীয় প্রথম হ্যান্ড স্যানিটাইজার নামক কিছু একটার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পায়।

মার্চ মাসও  ব্যস্ততায় কাটল। প্রথম দু সপ্তাহ কেন্দ্রীয় ভারত রাজ্যের মধ্যপ্রদেশ থেকে কংগ্রেস সরকার  হটিয়ে বিজেপি সরকার  প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যয় করা হলো। মার্চের ১১ তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা করল, কোভিড-১৯ একটা মহামারী। দুদিন পরে, মার্চের ১৩ তারিখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলল, করোনা কোনও ‘স্বাস্থ্য এমারজেন্সি নয়।’

অবশেষে, মার্চের ১৯ তারিখে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি তখনও পর্যন্ত খুব একটা ঘাঁটাঘাঁটি করেন নি। শুধু ফ্রান্স এবং ইটালি থেকে প্লেবুক আনিয়ে নিয়েছিলেন। তিনি আমাদের ‘সামাজিক দূরত্ব’ (সকলের চর্চার  জন্য সহজবোধ্য নিয়মকানুন)  প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন এবং ২২ মার্চ একদিনের জন্যে ‘জনগণের  কারফিউ’র আহ্বান করলেন। দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় তার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে কিছুই বললেন না তিনি। কিন্তু তিনি ঠিকই জনগণকে ব্যালকনিতে বেরিয়ে আসতে বললেন, সেখানে দাঁড়িয়ে ঘণ্টা অথবা তাদের হাড়ি-বাসন শব্দ করে বাজিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সালাম জানাতে বললেন। 

তিনি ওই সময় পর্যন্তও একবারও উল্লেখ করলেন না যে, ভারত রোগ প্রতিরক্ষার সরঞ্জাম এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের সরঞ্জামাদি নিজেদের হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্যে রেখে দেওয়ার বদলে রফতানি করে যাচ্ছিল।

আশ্চর্যের কিছু নেই, নরেন্দ্র মোদির অনুরোধ সাগ্রহে পালিত হয়েছিল। কলসি বাজানো, সম্প্রদায় নৃত্য এবং মিছিল করা হয়েছিল। খুব একটা সামাজিক দূরত্ব ছিল না। পরবর্তীতে পুরুষেরা পবিত্র গোবরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং বিজেপি সমর্থকরা গো-মূত্র পানের পার্টি দিতে শুরু করল। অনেক মুসলমান সংগঠনই নিজেদের সক্রিয় রাখতে ঘোষণা করল যে, সর্বস্রষ্টাই ভাইরাসের একমাত্র প্রতিরোধকারী, সুতরাং বিশ্বাসীগণ যেন দলে দলে মসজিদে জড়ো হয়।

মার্চের ২৪ তারিখ, রাত আটটায়, মোদী আবার টিভিতে এসে ঘোষণা দিলেন, মধ্যরাত থেকে সমস্ত ভারত লকডাউন। বাজার বন্ধ থাকবে, সমস্ত পরিবহন ব্যবস্থা -গণপরিবহন এবং ব্যক্তিগত পরিবহন নিষিদ্ধ।

তিনি বললেন, এই সিদ্ধান্ত তিনি শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিচ্ছেন না বরং আমাদের পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে নিচ্ছেন। রাজ্য সরকার, মূলত যাদেরকে যে কোনও বিপর্যয় মোকাবিলা করতে হবে তাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা ছাড়াই হুট করে ১৩৮ কোটি জনসংখ্যার জন্য শূন্য প্রস্তুতি নিয়ে এভাবে মাত্র চার ঘন্টার নোটিশে লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া আর কার পক্ষে সম্ভব? তার এ পদ্ধতি এই ধারণা দেয়, প্রধানমন্ত্রী মনে করেন  ভারতের জনগণ হলো এমন এক বৈরী শক্তি, যাদেরকে ফাঁদে ফেলে অবাক করে দেওয়া যায় কিন্তু বিশ্বাস করা যায় না।

আমরা লকডাউন ছিলাম। অনেক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, রোগ বিশেষজ্ঞ এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। হয়ত তারা তত্ত্বানুযায়ী ঠিক আছেন। কিন্তু তারা কেউই নিশ্চয়ই বিপজ্জনক রকম প্রস্তুতিবিহীন  অথবা উদ্যতিবিহীন ভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম, সবচেয়ে শাস্তিমূলক লকডাউনকে সমর্থন করবেন না। আর যে লক্ষ্য অর্জনের জন্য এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, ফলাফল এসেছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

যিনি চশমা পরতে পছন্দ করেন, তিনিই চশমার সকল নির্মাতা তৈরি করলেন।

সারাবিশ্বকে হতবাক করে দিয়ে, ভারতের সমস্ত লজ্জাগুলো প্রকাশিত হলো-  তার পাশবিকতা, কাঠামোগত, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য, তার জনগণের ভোগান্তির প্রতি নির্মম উদাসীনতা।

একটা গোপন রাসায়নিক পরীক্ষার মতো লকডাউনের ঘটনাটি হঠাৎ করে সবার সামনে এসে পড়ল। যখন সমস্ত দোকানপাট, রেস্তোরাঁ, কলকারখানা এবং নির্মাণশিল্প বন্ধ ঘোষিত হলো, ধনী এবং মধ্যবিত্তরা কলোনির দরজার ভেতরে নিজেদের বন্দি করে ফেলল, আমাদের শহরগুলো এবং বৃহৎ শহরগুলো তাদের শ্রমজীবী নাগরিক এবং  প্রবাসী কর্মজীবীদের এমনভাবে বহিষ্কৃত করতে শুরু করেছিল-যেন এইসব অযাচিত মানুষগুলো হঠাৎ করে এখানে জনসংখ্যায় বেড়ে গেছে।

অসংখ্য মানুষ বাড়ির মালিক এবং কর্মকর্তাদের দ্বারা বিতাড়িত হলো। লাখো দরিদ্র, ক্ষুধার্ত মানুষ, শিশু এবং বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ, ছেলেমেয়ে, অসুস্থ মানুষ, অন্ধ-প্রতিবন্ধী মানুষ যাদের যাওয়ার কোনও জায়গা নেই, চোখের সামনে কোনও গণপরিবহনের ব্যবস্থা নেই, পায়ে হেঁটে পথ চলতে শুরু করল নিজ গ্রামে, বাড়ির উদ্দেশ্যে। দিনের পর দিন তারা হাঁটতে লাগল বুদাউনের পথে, আগ্রা, আজমগড়, লক্ষ্ণৌ,গোরাখপুরের দিকে -শত শত কিলোমিটার দূরত্বের যাত্রাপথে। পথেই কিছু মানুষ মারা গেল।

তারা জানত, তারা তাদের ভবিষ্যত অনাহারের দিনগুলো একটু পিছিয়ে নেওয়ার জন্য বাড়িতে যাচ্ছে। হয়ত তারা এটাও জানত, তারা হয়ত নিজেদের সঙ্গে করে ভাইরাস নিয়ে যাচ্ছে যা কিনা তাদের পরিবারকে আক্রান্ত করে ফেলবে যেখানে তাদের বয়স্ক বাবা-মা, দাদা-দাদী রয়েছেন। কিন্তু তারপরেও তারা যাচ্ছিল, তাদের নিদারুণ প্রয়োজন ছিল একটা পরিচিত পরিবেশের, আশ্রয় এবং মর্যাদার। ভালোবাসা না পেলেও পেটের খাবারের প্রয়োজনে।

তাদের পায়ে হেঁটে চলার পথে, কিছু মানুষ পুলিশের নির্মম পিটুনি এবং লাঞ্ছনার শিকার হয়। পুলিশের ওপর কারফিউ বলবৎ রাখার কঠোর নির্দেশ ছিল। তরুণদেরকে হাইওয়ে দিয়ে নিচু হয়ে ব্যাঙলাফ দিতে বাধ্য করা হয়। বেরেইলি শহরের বাইরে, একটা দলকে একত্রিত করে রাসায়নিক স্প্রে’ করা হয়।

কিছুদিন পরে সরকারের মাথায় আসে, ধাবমান এই জনগোষ্ঠী গ্রামগুলোতে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে। তখন সরকার প্রদেশ সীমান্ত সিল করে দেয় পথে চলাচলকারীদের জন্যও। দিনের পর দিন পায়ে হেঁটে আসা মানুষগুলোকে থামিয়ে দেওয়া হয়। যে শহর থেকে তাদের মাত্র কিছুদিন আগে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল, তাদের আবার জোর করে সেখানে ফেরত পাঠানো হয়। 

বয়স্কদের মনে ১৯৪৭ এর দেশত্যাগের স্মৃতি জেগে ওঠে, ভারত বিভাজনের মাধ্যমে পাকিস্তান সৃষ্টির পরে এভাবে আশ্রয়ের সন্ধানে ক্রমাগত ছুটে চলার সেই সময়। পার্থক্য হলো, এখনকার এই দলবদ্ধ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে চলার কারণ ধর্ম নয়, শ্রেণীগত বৈষম্য। যদিও এরা ভারতের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী নয়। এরা তারা, যাদের শহরে চাকরি আছে (অন্তত এখন পর্যন্ত) এবং ফিরে আসার মতো ঘর আছে। কর্মহীন, আশ্রয়হীন, নিরাশ জনগোষ্ঠী যেখানে ছিল, সেখানেই থেকে গিয়েছিল, শহরে অথবা গ্রামাঞ্চলে, এই ভীষণ দুঃখজনক সময় আসার বহু আগে থেকেই যারা গভীর মর্মপীড়ায় রয়েছে। এইসব ভয়াবহ দিনগুলো অতিক্রমকালে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বরাবরই  জনসংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলেন।

যখন দিল্লিতে পায়ে হেঁটে পথ চলা শুরু হয়, আমি আমার নিয়মিত লেখালেখি করা পত্রিকা থেকে প্রেস পাশ সংগ্রহ করি। দিল্লি এবং উত্তর প্রদেশের সীমান্তে অবস্থিত গাজীপুরে যাওয়ার জন্য।  

দৃশ্যগুলো ছিল বাইবেলে উল্লিখিত সময়ের মতো। অথবা হয়ত নয়। বাইবেলের পক্ষে এত বিশাল জনগোষ্ঠীর সংখ্যার ধারণা করা সম্ভব নয়। মানুষের শারীরিক দূরত্ব তৈরিতে বাধ্য করতে যে লকডাউন, সেটি বিপরীত ফলাফল তৈরি করেছে। শারীরিক দূরত্বের কথা এখানে চিন্তাও করা যায় না।  ভারতের শহর এবং মফস্বলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। মূল সড়কগুলো হয়ত ফাঁকা, কিন্তু হতদরিদ্ররা তাদের বস্তি এবং খুপড়ি ঘরের বদ্ধ ঘরের ভেতর বন্দি হয়ে আছে সবাই একসঙ্গে।

আমি যে সকল হেঁটে চলা মানুষের  সাথে কথা বলেছি তাদের সবাই-ই ভাইরাস নিয়ে চিন্তিত ছিল। কিন্তু বেকারত্ব, অনাহার এবং পুলিশের সহিংসতার তুলনায় তাদের জীবনে এটা কম বাস্তব, আবছায়ার মতো উপস্থিত ছিল। এদিন আমি যে সমস্ত লোকের সাথে কথা বলেছি তাদের মধ্যে একদল মুসলিম দর্জি ছিল যারা মাত্র সপ্তাহখানেক আগে মুসলিমবিরোধী আক্রমণ থেকে বেঁচে গিয়েছিল, তাদের একজনের কথা বিশেষভাবে আমাকে নাড়া দিয়েছিল। সে ছিল রামজিৎ নামের একজন ছুতোর, যে কিনা নেপাল সীমান্তের নিকটবর্তী গোরাখপুর পর্যন্ত  সমস্ত পথ হেঁটে যাওয়ার  পরিকল্পনা করেছিল।

‘হয়ত মোদিজী যখন এটা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাঁকে কেউ আমাদের কথা বলে নি। হয়ত তিনি আমাদের কথা জানেনই না’, সে বলেছিল।

‘আমাদের’ মানে প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ মানুষ। 

ভারত রাজ্য সরকারগুলো (মার্কিনদের মতো) আপদকালে আন্তরিকতা ও বোধশক্তির পরিচয় দিয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন, বেসরকারী নাগরিক এবং অন্য আরও সংগ্রহশালা খাদ্য এবং জরুরী রেশন বিতরণ করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার তহবিলের জন্য মরিয়া আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ধীরগতিতে এগিয়েছে। দেখা গেল যে, প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিলের জন্য নগদ টাকা প্রস্তুত নেই। বরং, রহস্যজনক নতুন তহবিল  প্রধানমন্ত্রী-কেয়ারস এ শুভাকাঙ্ক্ষীদের দেওয়া  অর্থ দিয়ে পূরণ করা হচ্ছে । মোদীর চেহারার ছবিযুক্ত  প্রি-প্যাকেজ খাবারগুলো তখন উপস্থিত হতে শুরু করেছে।

এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তাঁর যোগ নিদ্রার ভিডিওগুলি শেয়ার করেছেন, যেখানে মোদী রূপান্তর ক্ষমতাসম্পন্ন, সেখানে একজন স্বপ্নে পাওয়া দেহযুক্ত মোদী জনগণকে সেলফ-আইসোলেশনের চাপ মোকাবেলায় যোগব্যায়ামের আসন প্রদর্শন করছেন।

এই আত্মরতি প্রচন্ড বিরক্তিকর। সম্ভবত এর একটি আসন অনুরোধ-আসন হতে পারে, যেটা মোদি, ফরাসি প্রধানমন্ত্রীকে রাফালে জঙ্গিবিমান সংক্রান্ত চুক্তি পুনর্নবীকরণের অনুমতি দেওয়ার এবং কয়েক মিলিয়ন ক্ষুধার্ত মানুষকে সহায়তা করার জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ৭.৮ বিলিয়ন ডলার ব্যবহার করার অনুরোধ জানান। ফরাসিরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে।

লকডাউন দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করতেই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ল। ওষুধ এবং জরুরি রেশন ফুরিয়ে যেতে লাগল। হাজারও ট্রাকচালক তখনও সামান্য কিছু খাবার আর পানি সম্বল করে হাইওয়ে বন্দি হয়ে রইল। ঘরে তোলার উপযোগী ক্ষেতের ফসলগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যেতে লাগল।

এখানে অর্থনৈতিক সংকট। চলছে রাজনৈতিক সংকটও। মূলধারার মিডিয়া কোভিডের গল্পটিকে তার ২৪/৭ বিষাক্ত মুসলিম বিরোধী প্রচারণায় পরিণত করেছে। তাবলিগী জামাত নামক একটি সংস্থা লকডাউন ঘোষণার আগে দিল্লিতে একটি বৈঠক করেছিল, যেটি ‘সুপার স্প্রেডার’ হিসাবে পরিণত হয়েছে। এটি মুসলমানদের কলঙ্কিত ও দানবাকৃতি বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। সামগ্রিক স্বর থেকে মনে হচ্ছে মুসলমানরা এই ভাইরাস আবিষ্কার করেছে এবং জিহাদ হিসাবে এটা ছড়িয়ে দিয়েছে।

কোভিড সংকট আসার এখনও বাকি আছে। অথবা নেই। আমরা জানি না। যদি এটা আসেই, যখন আসবে, আমরা নিশ্চিতভাবেই এর মোকাবিলা করব। ধর্ম, বর্ণ এবং শ্রেণীর সমস্ত প্রচলিত কুসংস্কারগুলো সম্পূর্ণ স্থির করে দিয়ে এর মোকাবেলা করা হবে। 

আজ (২ এপ্রিল) ভারতে প্রায় ২,০০০ টি নিশ্চিত শনাক্তকরণ রোগী রয়েছে এবং ৫৮ জন মারা গেছে। শোচনীয়তায় পর্যবসিত হওয়া কিছু পরীক্ষানিরীক্ষার ভিত্তিতে করা হিসাবগুলো অবশ্যই আস্থাযোগ্য নয়। বিশেষজ্ঞদের মতামত খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়। কেউ কেউ কয়েক মিলিয়ন রোগীর পূর্বাভাস দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, মাশুলটা আরও কম হবে। সংকটের আসল রূপ হয়ত আমরা কখনই জানতে পারব না, এমনকি তা যখন আমাদেরকে আঘাত করেছে তখনও। আমরা শুধু জানি যে হাসপাতালগুলোতে দৌড়ানোর পরিস্থিতি এখনও শুরু হয় নি।

ভারতের পাবলিক হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলো, যেগুলোয় সংক্রমণ না হওয়া রোগ-ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যায় প্রতি বছর প্রায় ১ মিলিয়ন শিশুমৃত্যু ঠেকাতে অক্ষম, লক্ষ লক্ষ যক্ষ্মার রোগী (বিশ্বের এক চতুর্থাংশ) রক্তস্বল্পতা সহ পুষ্টিহীন এক বিশাল জনগোষ্ঠী যারা যেকোন ছোটখাট অসুস্থতাতেও ঝুঁকির মধ্যে থাকে যে রোগগুলো তাদের জন্য মারাত্মক প্রমাণিত নয় – তারা এমন একটা সংকট মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে না যার সঙ্গে এখন ইউরোপ এবং আমেরিকার মতো দেশ লড়াই করছে।

সমস্ত স্বাস্থ্যসেবা কমবেশি হাসপাতালগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে রয়েছে কারণ হাসপাতালগুলো ভাইরাসটির সেবা বন্ধ করে দিয়েছে। দিল্লির কিংবদন্তি অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সের ট্রমা সেন্টার বন্ধ হয়ে আছে, সেই বিশাল হাসপাতালের শত শত ক্যান্সার রোগীকে গবাদি পশুর মতো তাড়িয়ে বের দেওয়া হয়েছে, তারা এখন হাসপাতালের বাইরের রাস্তায় বসবাসকারী ক্যান্সার শরণার্থী হিসাবে পরিচিত। 

মানুষ এখন অসুস্থ হয়ে ঘরেই মারা যাবে। আমরা হয়ত আর কখনই তাদের গল্পগুলো জানতে পারব না। তারা এমনকি পরিসংখ্যানেও আসবে না। আমরা কেবল এই আশা করতে পারি যে, এই ভাইরাস ঠান্ডা আবহাওয়া পছন্দ করে এটা যে গবেষণা বলছে, তারাই সঠিক (যদিও অন্যান্য গবেষকরা এতে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন)। এখানের মানুষ আগে কখনই যন্ত্রণাদায়ক ভারতীয় গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহের জন্য এতটা উন্মুখ হয়ে থাকে নি।

আমাদের হলোটা কী? হ্যাঁ, এটা একটা ভাইরাস। এর কোনও নৈতিক বৈশিষ্ট্য থাকার কথা নয়। কিন্তু এটি অবশ্যই ভাইরাসের চেয়ে বেশি কিছু। কেউ কেউ বিশ্বাস করে এটি  ঈশ্বরের আমাদেরকে সজ্ঞানে আনার পন্থা। অন্যরা বলে যে এটি বিশ্ব দখল করার চাইনিজ ষড়যন্ত্র।

এটা যাই হোক না কেন, করোনাভাইরাস সমস্ত শক্তিকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেছে এবং সমগ্র বিশ্বকে এভাবে থামিয়ে দিয়েছে যা অন্যকিছুর পক্ষে কখনই সম্ভব হতো না। আমাদের মন এখনও পিছনে যেতে চায়, সবকিছুর ‘স্বাভাবিকতা’ ফিরে আসার আশায়। অতীতকে ভবিষ্যতের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে বিচ্ছেদকে স্বীকার করতে অস্বীকার করতে চেষ্টা করছে। কিন্তু ফাটল আছে। এবং এই ভয়াবহ হতাশ সময়ের মাঝেও, এটি আমাদের সুযোগ দিচ্ছে আবার ভেবে দেখবার জন্য যে পৃথিবী ধ্বংসের যন্ত্রটি আমাদের নিজেদের হাতেই তৈরি। তাই, স্বাভাবিকতা ফিরে আসার চেয়ে খারাপ আর কিছু হতে পারে না।

ঐতিহাসিক মতে, সব মহামারীগুলোই মানুষকে দিয়ে তার অতীত ভাঙতে বাধ্য করেছে এবং নতুন বিশ্বের কল্পনা করতে বাধ্য করেছে। এটিও ভিন্ন কিছু নয়। এটি একটি তোরণদ্বার, একটি বিশ্ব এবং পরবর্তী বিশ্বের মধ্যেকার একটি প্রবেশদ্বার।

আমরা এর মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাওয়াকে বেছে নিতে পারি, আমাদের সমস্ত পূর্বসংস্কার এবং ঘৃণা, আমাদের লোভ, আমাদের ডেটা ব্যাংক এবং মৃত ধারণাগুলো, আমাদের মরা নদী এবং ধোঁয়াচ্ছন্ন আকাশের সমস্ত  ভারগুলো টেনে নিয়ে। অথবা আমরা সামান্য কিছু সঙ্গে নিয়ে  হালকাভাবে চলতে পারি, অন্য একটি পৃথিবীর কল্পনা করে। এবং এর জন্য লড়াই করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে।

অনুবাদ: জাহান আরা দোলন

ভারতের দ্য ফিনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত অরুন্ধতি রায়ের ‘দ্য প্যানডেমিক ইজ আ পোর্টাল’ নিবন্ধটির মূল ইংরেজি থেকে অনুদিত।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension