অঙ্গনাব্যক্তিত্বমুক্তিযুদ্ধ

নারীনেত্রী ও মুক্তিযোদ্ধা আয়েশা খানম

২ জানুয়ারি ভোরে আয়শা খানম মহিলা পরিষদের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আয়শা খানম মারা গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ছাত্র নেতা মুক্তি সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করতে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন তাঁদেরই একজন আয়েশা খানম। পরে আগরতলায় গিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন তিনি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও নিজেকে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, সমান অধিকার ভিত্তিক সমাজ গড়ার কাজে জড়িয়ে রেখেছিলেন নারীনেত্রী আয়েশা খানম। এছাড়া নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলস কাজ করে গেছেন তিনি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্যাতনের শিকার নারীদের পুনর্বাসন এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় কাজ করেন তিনি। শুরু থেকেই বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত। প্রথমে ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সহ-সাধারণ সম্পাদক। আমৃত্যু সভাপতি হিসেবে দায়িত্বটি পালন করে গেছেন আয়েশা খানম।

নেত্রকোনা ও দুর্গাপুরের মাঝখানে গাবড়াগাতি গ্রামে ১৯৪৭ সালের ১৮ই অক্টোবর জন্ম আয়েশা খানমের। পিতা গোলাম আলী খান এবং মা জামাতুন্নেসা খানম৷ হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাতিলের দাবিতে ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকেই ছাত্র রাজনীতির সাথে সম্পর্ক আয়েশার৷ তবে ১৯৬৬ সাল থেকে ছাত্র আন্দোলনে পুরোপুরি সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ফলে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনসহ স্বাধীনতা যুদ্ধের পথে এগিয়ে যেতে যেসব আন্দোলন-সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল সেসবগুলোতেই তিনি সামনের সারিতে ছিলেন।

১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং সংগ্রামী নেত্রী আয়েশা খানম। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন তিনি। এছাড়া রোকেয়া হলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ও সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ঢাকায় ছাত্রছাত্রীদের সংগঠিত করার দায়িত্ব ছিল মূলত আয়েশা এবং তাঁর সহকর্মী ছাত্র নেতাদের ওপর। এছাড়া ছাত্র নেতা হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধিকার আন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা ও সচেতনতার কাজেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন তিনি।

জার্মানির পত্রিকা ডয়চে ভেলের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আয়েশা খানম বলেছিলেন, ছাত্র সংগ্রাম কমিটির ওপর দায়িত্ব ছিল সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে পক্ষে জনমত সৃষ্টি করা। ফলে সেই কাজের সাথে বেশী জড়িত ছিলেন তিনি। বিশেষ করে সাতই মার্চের পর থেকে ঢাকা শহরকে সংগঠিত করা এবং যোগাযোগ রক্ষা ও সচেতনতা সৃষ্টির কাজও তিনি করেছেন। সে সময়ের বন্দুক কাঁধে করা একটি ছবি এখন সবাই দেখতে পান সেখানে আয়েশা খানমও রয়েছেন।

সংগৃহীত ছবি

এপ্রিল মাসের শেষদিকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলায় যান আয়েশা খানম। সেখানে কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত শরণার্থী শিবির ও মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ক্রাফটস্‌ হোস্টেলে ওঠেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে যাঁরা ভারতে আসতেন, তাঁদের এক অংশের সাময়িক আবাসস্থল ছিল ক্রাফটস্‌ হোস্টেল। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থী শিবিরগুলোতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে যোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখা, প্রণোদনা দান এবং শরণার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগাতে কাজ করেন আয়েশা এবং তাঁর সহকর্মীরা।

আগরতলায় আয়েশা খানম চিকিৎসা সেবার ওপর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেন। এরপর আগরতলার প্রতিটি ক্যাম্পে গিয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সহায়তা করতে আত্মনিয়োগ করেন। এছাড়া বিভিন্ন অভিযানে মুক্তিযোদ্ধাদের পাঠানোর আগে তাদের জন্য সংক্ষিপ্ত ওরিয়েন্টেশনের ব্যবস্থা করা হতো। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের ওরিয়েন্টেশন দেওয়ার কাজ করতেন আয়েশা খানম। আগে থেকেই সচেতনতা সৃষ্টির কাজে এবং বক্তৃতা ও কথা বলার ক্ষেত্রে জড়িত ছিলেন বলে হয়ত এ ধরণের কাজেই বেশী করে জড়িত রাখা হয়েছিল। এছাড়া ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐতিহাসিক বক্তৃতা দিয়েছিলেন আয়েশা খানম।

আয়েশা খানম বলেছিলেন, ‘আমি প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে যেদিন প্রথম আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় যোগ দিলাম, সেটি ছিল আমার কাছে খুবই স্মরণীয়। কারণ আমি সেদিন খুব আনাড়ি হাতে হলেও আহত কিশোর-তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষতস্থানগুলো পরিষ্কার করে যখন ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিচ্ছিলাম তখন আমার কাছে মনে হয়েছিল আমি সত্যিই দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য সরাসরি কোনও কাজ করছি।’

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension