প্রতিক্রিয়ামুক্তমত

প্রবাসীদের দেশপ্রেম বরং বেশি

যারা প্রবাসী হয়েছেন, তারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান নি। যারা দেশে বাস করছেন, তাদের মতো প্রবাসীরাও দেশকে ভালোবাসেন। দেশকে ভালোবাসের ক্ষেত্রে প্রবাসীরা কখনও পিছিয়ে নেই। বরং কখনও কখনও প্রবাসীদের দেশপ্রেম বেশি বলে মনে করি।
 
এর কারণ, তারা দেশে থাকেন না বলে দেশকে বেশি মিস করেন। যেমন মাকে দেখেন না বলে বুকের ভেতর হু-হু কান্নার রোল চেপে রাখেন, তেমনি চাপা কান্না সর্বদা প্রবাসীদের অন্তরে। দেশের মাটি-জল-আবহাওয়া, নিজ বাড়ি-গ্রাম বা নানা স্মৃতির প্রতি সম্মোহন রয়েছে প্রবাসীদের। দেশের ঋতু বা উৎসব নিয়ে ‘দীর্ঘশ্বাস’ ছাপিয়ে থাকে তাদের মনে।
 
একজন প্রবাসী যখন দেশে ফেরেন, দেশের প্রতি চেপে রাখা টান পেখম ছড়িয়ে যায় নানা কথা-স্বপ্নের বর্ণচ্ছ‌টায়। যেদিন দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে আসেন, সেদিন একতাল বোবা কান্নায় জমে যেতে হয়। এই আনন্দ ও বেদনার নাম দেশপ্রেম।
 
আরও আছে, দেশে যখন অনিয়ম-অন্যায় বা দুর্নীতির খবর যখন জানতে পারেন, প্রবাসীরা দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন। দেশে সফলতায় উল্লাস-উচ্ছ্বাসে বিভোর হয়ে থাকেন। দেশের রাজনীতির খবরাখবর, সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে প্রবাসীদের কৌতুহল অন্তহীন। দেশে যে কোনও বিপন্নতায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে প্রবাসীরা একমুহুর্তও ভাবেন না। এর মধ্য দিয়েই প্রবাসীদের দেশপ্রেম স্বমহিমায় উজ্জ্বল।
 
বিশ্বায়নের যুগে কে, কোথায় বাস করল, সেটা দিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে বলে ‘দেয়াল’ তোলার চেষ্টা ঠিক নয়। আমরা প্রবাসে থাকি বলে দেশের প্রতি মায়া/টান হারিয়ে ফেলেছি-এমন ভাবা হাস্যকর। আবার যারা বলেন, বিদেশ থেকে অর্থ পাঠিয়ে নিজের পরিবারকে দিচ্ছে প্রবাসীরা-এটা দেশের কী? এমন কথাও বোকার প্রলাপ। রেমিট্যান্স প্রাপ্তি দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি। একটি পরিবার স্বচ্ছল হলেই সমষ্টির বিচারে দেশের স্বচ্ছলতা-এটা বুঝতে হবে। আর যদি ভিন্নভাবেও অর্থ দেশে যায়-সেটাও কিন্তু প্রাপ্তি। শুধু সরকার কিছু অর্থ পায় না। সুতরাং প্রবাসীদের অর্থ প্রেরণের বিষয়টি হালকা করে দেখছেন যারা, তারা ভেবে দেখবেন।
 
দেশের প্রয়োজনে প্রবাসীরাও ভূমিকা রাখেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রবাসীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। এখনও জাতিসংঘ থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রবাসীরা সংযোগ স্থাপন করেন। সভা-সেমিনার বা মিছিল করে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেন।
 
একটি উদাহরণ, বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষা আন্দোলনকে সামনে রেখে ‘২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালনের যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইউনেস্কো, তা কিন্তু সম্ভব হয়েছে প্রবাসীদের উদ্যোগেই। তাই বিদেশে থাকলেই দেশপ্রেম নেই-বা আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি-এমন কথা আমাদের জন্য চরম বেদনাদায়ক।
 
কথাগুলো বললাম, ইটালি ফেরত একজন প্রবাসীকে ‘গালি’ দেওয়ার পর সোস্যাল মিডিয়ায় এর প্রতিক্রিয়া দেখে। ওই প্রবাসীকে গালি দেওয়া ঠিক হয় নি। মানুষ মাত্রই ভুল হয়, তাই বলে একটি গালির জন্য তার দেশপ্রেম নিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার কিছু নেই। যারা দেশে থাকছেন, তারা কি কখনও দেশের নানা নাজুক পরিস্থিতিতে গালি দেন না? কেউ যখন ন্যায় বিচার পান না, ঘুষ দিতে বাধ্য হন বা হতাশার তিমিরে তলিয়ে যেতে থাকেন, তখন কিন্তু অনেকে দেশের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করার মতো গালি দেন। নাকি দেন না?
 
তো, আপনি দেশের কোনও ঘটনা বা সিস্টেমের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করতে পারলেন না বলে গালি দিলে আপনার দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ হলো না। আর একজন প্রবাসী গালি দেওয়ার কারণে পুরো প্রবাসীদের নিয়ে নানা নেতিবাচক কথা বলতে থাকলেন। এটা কি ঠিক?
 
বলা বাহুল্য, প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাস করছেন-ধারণা করা হয়। এই এক কোটি মানুষকে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী ভাববেন না কেউ। এমন ভাবনা বিভ্রান্তিকর।♦
 
 লেখক: নিউজ এডিটর, এটিএন বাংলা, ইউএসএ
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension