প্রতিক্রিয়ামুক্তমতযুক্তরাষ্ট্র

প্রশ্নবোধকে বাংলাদেশ সোসাইটি ইনক

মুবিন খান

 

‘কেমন আছেন?’ আমি জানতে চাইলাম।

‘ভালো আছি। তবে মন মেজাজ খুব খারাপ ভাই।’ ভদ্রলোকের কন্ঠে হতাশা।

আমার কৌতুহল হল। আমি কৌতুহল প্রকাশ করলাম, ‘মন মেজাজ খুব খারাপ কেন ভাই?’

‘আরে ইলেকশন বন্ধ করে দিছে।’ ক্ষোভে ফেটে পড়লেন ভদ্রলোক।

‘কে বন্ধ করেছে!’ আমার কৌতুহল বাড়ল।

‘সোসাইটির সাবেক সভাপতি কোর্টে মামলা করে দিছে, কোর্ট বন্ধ করে দিছে।’ ভদ্রলোক ক্ষোভ আর হতাশায় ফুঁসতে থাকেন।

এটি নিউ ইয়র্ক প্রবাসী জীবন শফীকের সঙ্গে কথপোকথন। জীবন শফীক আমেরিকার বৈধ অভিবাসী। এখন আমেরিকার নাগরিক হয়েছেন। নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকের ভোটার তিনি।। বাংলাদেশ সোসাইটি ইনক আমেরিকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠন। এই সংগঠনটির বয়স প্রায় চল্লিশ বছর। গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকের নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হয়।

গেল ২১ অক্টোবর ছিল বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকের নির্বাচনের দিন। কিন্তু নির্বাচনটি অনুষ্ঠানটি হয় নি। হতে দেওয়া হয় নি আসলে। নির্বাচন কমিশন দুজন সদস্য প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করে দিয়েছে বলে নয়ন-আলী প্যানেলের সদস্য প্রার্থী আলী আকবর ও জেড আর চৌধুরী এবং সোসাইটির সদস্য শরিফুল ইসলাম মামলা করে দিয়েছেন। তারা নিউইয়র্ক ষ্টেট সুপ্রীম কোর্টে গিয়ে সোসাইটি আর নির্বাচন কমিশনকে অভিযুক্ত করে সোসাইটির নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত করতে অনুরোধ করেন।

কুইন্স সুপ্রিম কোর্ট তাদের অনুরোধ রক্ষা করেছে। সোসাইটির নির্বাচন স্থগিত করে দিয়েছে। মামলা করে দেওয়ার কারণ হিসেবে তারা বলছেন যে, সোসাইটির ভোটার তালিকা থেকে শুরু করে ভোট গ্রহণের বিষয়ে তাদের নানারকম অভিযোগ রয়েছে। মজা না?

যে কোন প্রতিষ্ঠানেরই একটা গঠনতন্ত্র থাকে। সে গঠনতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের কর্মকান্ড থেকে শুরু করে সদস্যদের আচরণবিধি নির্ধারণ করে দিতে পারে। দেয়ও। পাড়া মহল্লায় যে সমিতি গড়ে ওঠে, তাদেরও একটা গঠনতন্ত্র থাকে। সদস্যদের ভেতরে অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকলে সেগুলো সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা মিটিয়ে ফেলেন। ফেলতে হয়। নইলে প্রতিবেশীরা আঙুল তুলে দেখাবে আর হাসাহাসি করবে।

বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকেরও একটা গঠনতন্ত্র থাকার কথা। আছেও। আছে যে সেটাও নিশ্চিত হওয়া গেল। কেননা গেল বছর সোসাইটির এক সভায় সংগঠনের আয়ব্যয় বিষয়ক স্বচ্ছতায় আরও গুরুত্বারোপ করার পাশাপাশি সভায় সোসাইটির গঠনতন্ত্র সংশোধনেরও প্রস্তাব উঠেছিল।  পাঁচ সদস্যর নির্বাচন কমিশন বদলে সাত সদস্যর কমিশন গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

গেল শনিবার সাংবাদিক সন্মেলনে সোসাইটির নেতৃত্বরা জানালেন আদালত নির্বাচন স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি সোসাইটির ফান্ড থেকে ডলার খরচ না করার কথাও বলে দিয়েছেন। এবং তারা সেটা করবেন না। বোঝা গেল সমস্যা শুধু গঠনতন্ত্রে নয়, অর্থনৈতিক দিকটার দিকেও নির্দেশ করছে।

এখন কথা হল, তারা আদালতে নালিশ করতে গেলেন কেন? তারা কেন সোসাইটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা লোকেদেরকে তাদের অভিযোগগুলো বললেন না?

সোসাইটির প্রতি তাদের আস্থা নেই বলে? কেন নেই? তাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে বলে? সোসাইটি এবং নিউ ইয়র্কের বাঙালিরাও কিন্তু সে কথাই বলছেন। তারা বলছেন, নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন তাদের মনোনয়ন বাতিল করেছে বলেই তারা খেপে গিয়ে মামলা করে দিয়েছেন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জামাল ইউ আহমেদ তো বলেই দিয়েছেন বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকের গঠনতন্ত্র ও বাই-ল’জকে শতভাগ অনুসরণ করেই নির্বাচন পরিচালনা করা হচ্ছে। তাহলে কি আমরা ধরে নেব সোসাইটির গঠনতন্ত্রেই মামলাকারীদের আস্থা নেই? এখন প্রশ্ন হল, যে সোসাইটির নেতৃত্ব এবং গঠনতন্ত্রে তাদের আস্থাই নেই, সেখানে কেন তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এলেন? কেন এমন একটি আস্থাহীনতার সংগঠনে সদস্য হতে চাইলেন! নয়ন–আলী প্যানেলের সভাপতি পদপ্রার্থী কাজী নয়ন বলছিলেন, ‘দুরভিসন্ধি করে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।’ সবিনয়ে বলতে চাই, তারা কি দুরভিসন্ধি’ বিষয়টা সর্বসাধারণের কাছে পরিষ্কার করে জানাবেন?

বাংলাদেশ সোসাইটি ইনক নিয়েও কথা আছে। বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশ সোসাইটি  ইনক নিউ ইয়র্কে ‘আমব্রেলা সংগঠন’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু নিউ ইয়র্কের বাঙালি পাড়ায় সে দাবির সত্যতা মেলে না। নাহিদা আক্তার বিশ বছর ধরে নিউ ইয়র্কে থাকেন। তিনি বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকের নাম কখনও শোনেন নি। নাহিদা আক্তারের মত আরও অনেকই চল্লিশ বছরের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকের অস্তিত্বটিই জানেন না। যারা সোসাইটির খবরাখবর রাখেন তারা জানালেন, বাংলাদেশ সোসাইটি নিজেদের ‘আমব্রেলা’ হিসেবে ঘোষণা করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। তারা প্রবাসী বাংলাদেশিদের ছাতা হয়ে উঠতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সোসাইটির ব্যস্ততা নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সাধারণ প্রবাসীদের সঙ্গে তারা উল্লেখ করার মত কোন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন নি। অভিযোগ রয়েছে, আমেরিকায় জন্ম নেওয়া, বেড়ে ওঠা  প্রজন্মর সঙ্গে সোসাইটির যোগাযোগ কিংবা সম্পর্ক আশাবাদ জাগায় না। আরও অভিযোগ রয়েছে মূলধারার আমেরিকার সঙ্গে এই সোসাইটির কোন যোগাযোগ নেই।

আমেরিকায় আইনজীবী নিয়োগ করে মামলা পরিচালনা করাতে গেলে অ্যাটর্নিকে মোটা অঙ্কের টাকা ফি দিতে হয়। মামলা, পাল্টা মামলা করে যারা মোটা টাকা খরচ করছেন, তারা ভাবছেন না বিদেশি প্রতিবেশীরা তাদের এই ছেলেমানুষিতে নিজেরা নিজেরা হাসাহাসি করতে করতে তাদের ডলারগুলো পকেটে পুরে পকেট ভারী করছে। অথচ তারা যদি এভাবে নিজেরা একে অন্যের পেছনে মনগড়া অভিযোগে এভাবে না লেগে মিলেমিশে বাংলাদেশ কম্যুনিটির জন্যে কাজ করতেন, তাহলে আমেরিকায় বাংলাদেশটা ভিন্ন আমেজে পরিচিত হতে পারত। আমেরিকায় ভিন্ন দেশের অভিবাসীরা তখন বাংলাদেশের মানুষদের দিকে আঙুল তুলে মুখ টিপে হাসত না, ঈর্ষা আর সমীহর দৃষ্টিতে দেখত।

নিউ ইয়র্কে চার লক্ষ বাংলাদেশি বসবাস করেন। আর সোসাইটির নিবন্ধিত ভোটার ২৭ হাজার ৫০০ জনের কিছু বেশি। বাকি প্রায় তিন লক্ষ তিয়াত্তর হাজার বাংলাদেশি কেন ভোটার নয়?

অসংখ্য ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করতে আমেরিকা যান। সেখানে লেখাপড়ার খরচ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দেশ থেকে টাকাপয়সা নিয়ে ওখানে লেখাপড়া করা সম্ভব নয়। ফলে তাদেরকে লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ করতে হয়। বাংলাদেশের সুস্থ ও উচ্চ কাজের পরিবেশ এবং সঠিক পারিশ্রামিকের জন্য সোসাইটি ভূমিকা রাখতে পারত।

অসংখ্য বাংলাদেশি অভিবাসন চেয়ে বছরের পর বছর ঝুলে আছেন। অনেক দশ-পনের-বিশ বছর দেশে ফিরতে পারছেন না, কেননা দেশে এলেই বৈধ কাগজপত্র নেই বলে আর আমেরিকায় ফিরতে পারবেন না। বাংলাদেশ সোসাইটি এটা নিয়েকাজ করতে পারত। করলে লোকজন ধরে ধরে নিজেদের পকেট থেকে বিশ ডলার পরিশোধ করে তাদেরকে ভোটার করতে হত না। কর্মঠ লোকজন নিজেরাই সে ডলার দিয়ে আন্তরিকভাবেই ভোটার হতেন। নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশিরা বলছেন, বাংলাদেশ সোসাইটির কর্মকান্ড কেবল দেশের বিশেষ দিবস পালন আর অভ্যন্তরীন রাজনীতিতেই আটকে আছে।

আমার ইকবালের কথা মনে পড়ে। নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অসংখ্য সংগঠন। জেলার নামে সংগঠন, থানার নামে সংগঠন, পাড়ার নামে, মহল্লার নামে ইত্যাদি অজস্র সংগঠন। আছে দলাদলি, আছে মারামারি, ইত্যাদি চলতেই থাকে। ইকবাল এসব দেখে নিউ ইয়র্ক ছেড়ে টেক্সাসে পাড়ি জমিয়েছিল।

আমব্রেলা সংগঠন বলে পরিচিত বাংলাদেশ সোসাইটি ইনক নামের সংগঠনটি এসব পাড়া-মহল্লা-জেলা ভিত্তিক সংগঠন করা লোকেদের ‘বাংলাদেশ ছাতা’র নিচে আনতে পারে নি। তাদের বোঝাতে পারে নি তারা যে পাড়া-মহল্লা-জেলার মানুষই হোন না কেন আসলে তো সকলে বাংলাদেশেরই মানুষ। ভিন্ন ভিন্ন মতার্দশ থাকবেই কিন্তু দেশের প্রশ্নে

তো সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ তো দূর, বিদেশের মাটিতে বসে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা যাবে না- এই দায়বদ্ধতা, উপলব্ধিটা পর্যন্ত কারও মাঝে নেই। এবং যতদিন পর্যন্ত নয়ন-আলী প্যানেলের সদস্য প্রার্থী আলী আকবর ও জেড আর চৌধুরী এবং সোসাইটির সদস্য শরিফুল ইসলামের মত বাংলাদেশের জাতিসত্ত্বা নিয়ে চিন্তাভাবনা না করতে পারা লোকেরা বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকের প্রতিনিধিত্ব করবেন ততদিন পর্যন্ত দায়বদ্ধতাটা, উপলব্ধিটা নির্মিত হবেও না।

লেখক: সাংবাদিক

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension