পয়লা বৈশাখ

মুবিন খান

 
এক.
মাইক্রোফোনটা টেনে মুখের কাছে নিয়ে হুজুর বলতে লাগলেন,
‘পহেলা বৈশাখের গান গাইবা, পান্তাভাত ইলিশ মাছ খাইবা, ঝাকানাকা গাইবা, ওইদিনটা আইতাছে; ওইটা মোছলমানের অনুষ্ঠান না।…কথা বল না কেন?’
 
সবাই সমস্বরে বলে উঠল, ‘ঠিক ঠিক।’অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা। আমরা নড়েচড়ে বসলাম।
 
হুজুর আবার বলতে শুরু করলেন, ‘পহেলা বৈশাখ হিন্দুদের পুজার দিন। আজকে সেই পুজাকে মোছলমানে মাথায় নিছে। পহেলা বৈশাখের পোশাক বানাচ্ছে।’ তারপর গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘কছম আল্লাহর! যারা পহেলা বৈশাখ পালন করার জন্য পাঞ্জাবি জামা বানাবি, জাহান্নামি জাহান্নামি জাহান্নামি জাহান্নামি।’
 
হুজুর জাহান্নামি হবার অভিশাপটা এত জোরে দিলেন যে আমার ভয় হলো হুজুরের গলার রগ ছিঁড়ে না যায়। কিন্তু হুজুরের কিছুই হল না।
আলহামদুলিল্লাহ্।
তারপর হুজুর অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে শান্ত কন্ঠে বললেন, ‘এইডা হইল হিন্দুগো পুজা, তাইলে আমরা কির লেইগা এবাদত করব? ঠিক না বেঠিক?’
 
সবাই সমস্বরে আবার বলে উঠল, ‘ঠিক ঠিক ঠিক।’
 
হঠাৎ আমার পাশে বসা কামালউদ্দীন দাঁড়িয়ে পড়ে বিপুল তেজে চিৎকার করে উঠল, ‘নারায়ে তাকবির।’
প্রস্তুত থাকা সমবেত কন্ঠরাও সমান তেজে চিৎকারে বলে উঠল, ‘আল্লাহু আকবর।’
 
কামালউদ্দীনের ঠিক পেছনেই বসে থাকা জাকির ভাই কামালউদ্দীনের লুঙ্গি ধরে টান দিলেন। কামালউদ্দীন সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ল। জাকির ভাই বললেন, ‘হারামজাদা বাটপারি কইরা ওয়াজে আইনা বিদাত ফতোয়ায় জোশ দেখাও? মাইরা সিধা কইরা ইস্ত্রি কইরা দিব।’
 
কামালউদ্দীন চোখ গরম করে তাকায়। কিছু বলে না। জাকির ভাই বললেন, ‘আজকা তুই আমার সঙ্গে যাবি। আমার বাসায় কোরানের বাংলা অনুবাদ আছে, হাদিসের বই আছে, আমারে দেখাবি পয়লা বৈশাখ পালন করা হারাম, পয়লা বৈশাখ হিন্দুদের পুজার দিন, এইটা কোথায় লেখা আছে দেখাবি। দেখাইতে না পারলে তোর টাকে গরম আলকাতরা মাইখা গোবর মাখায়ে দিব।’
 
শুনে আমার খুব হাসি পায়। আমি তাড়াতাড়ি মুখে হাতচাপা দেই। জাকির ভাই আর কামালউদ্দীন দুই পাটাপুতা আমার দিকে চোখ গরম করে তাকায়। আমি মিইয়ে যাই। আমার ইচ্ছে হয় রামছাগলের মতো ‘ম্যাঁএএএ’ ডাক ছাড়ি।

 
জাকির ভাই যে সত্যি সত্যিই কামালউদ্দীনকে ধরে নিয়ে আসবেন সেটা আমি বুঝতে পারি নি। বেচারা ভয়াবহ খেপেছেন। খেপে যাওয়ারই কথা। কামালউদ্দীন আমাদের বলেছিল, পালাগানের আসর আছে। আমরা খুব উৎসাহিত হলাম। আমাদের উৎসাহ দেখে কামালউদ্দীন বলল, কবির লড়াইও হবে। আমরা তখন ওর সঙ্গে যেতে এক পায়ে খাড়া।
 
তারপর গিয়ে যখন মঞ্চের সামনে বসেছি, দেখি পাঞ্জাবি জোব্বা পরা লোকজন মঞ্চে উঠে বসেছেন। এটা সমস্যা না। পালাগান যারা করেন তাদেরও পাঞ্জাবি পরতেই দেখেছি। কিন্তু তাদের হাতে একতারা দোতারা থাকে। মঞ্চের কোথাও কারও হাতেও কোনও বাদ্য বাজনা দেখা গেল না।
 
তারপর যখন ওয়াজ শুরুর ঘোষণা হলো তখন আমরা উঠে আসতে চাইলাম। কামালউদ্দীন আমাদের বোঝাল, এখন উঠে গেলে ওয়াজকারীগণ অপমানিতবোধ করতে পারেন। আর তখন পাবলিকেও খেপে উঠতে পারে। অগত্যা আমাদের বসে বসে বিষাক্ত ফতোয়া শোনা ছাড়া উপায় রইল না।
 
 
 
দুই.
জাকির ভাই বেশ কয়েকটা বই কামালউদ্দীনের সামনে রাখলেন। তারপর বললেন, ‘শালা ফতোয়াবাজের চামচা, নে দেখা। পয়লা বৈশাখ হিন্দুদের পুজা কোথায় লেখা আছে দেখা।’
 
কামালউদ্দীন মিনমিন করে সিলেটের ভাষায় বলল, ‘এত্তো মুটকা মুটকা বই, কৎক্ষণে পড়ি বাইর করমু!’
 
জাকির ভাই আরও রেগে গেলেন। রাগে তার কালো মুখটা লাল হয়ে উঠল। বললেন, ‘শালা বাটকু, বাইট্টা লোকে যে আল্লাহর শত্রু এইটা জানস্?’
 
শুনে কামাল চোখ পাকিয়ে তাকায়, গরুর গুঁতা দেওয়ার যে ভঙ্গি করে ঠিক সেই ভঙ্গি। বেচারাকে হাস্যকর দেখায়।
 
জাকির ভাই ধমকে ওঠেন, ‘কস্ না জানস্ কিনা? ক!’
 
‘জানি।’ গম্ভীর কন্ঠে বলে কামালউদ্দীন।
 
‘শোন রামছাগল…’
 
‘খুক্ খুক্ খুক্।’জাকির ভাই তাঁর বক্তব্য শুরু করতে গেলে আমি কেশে উঠি। আরোপিত কাশি। জাকির ভাই আমার দিকে তাকান। তারপর আবার কামালউদ্দীনকে বলতে লাগলেন, ‘শোন বলদ…’ বলে আবার আমার দিকে তাকান। আমি মাথা ঝাঁকিয়ে সমর্থন করি। তখন আবার বলতে থাকেন, ‘…এইটা তোর মতো আরেক বলদের ফতোয়া। সেই বলদ তোর মত বাটকু ছিল না বইলা এই ফতোয়া জারি করছিল। এখন বই খোল্, পয়লা বৈশাখ হারাম কোথায় লেখা আছে বাইর কইরা দেখা।’
 
কামালউদ্দীন এতক্ষণে একটু ধাতস্থ হয়েছে যেন। আপোষের সুরে বলল, ‘তুই এত রাগ করস্ ক্যান। আর পয়লা বৈশাখ কি নবীর আমল থেইকা পালন হয় যে হাদিসের বইয়ে থাকবে?’
 
জাকির ভাই প্রচণ্ড উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দড়ি নিয়া আয়। মোটা দেখে একটা বাঁশও আনিস্।’
 
আমার রামছাগলের মতো ‘ম্যাঁএএএ’ ডাক ডাকতে ইচ্ছে করে। আমি বলি, ‘ জাকির ভাই, আপনি এত উত্তেজিত হন ক্যান। বলদা ভাই বোঝে নাই, তারে বুঝায়ে দিলেই তো হয়।’
 
জাকির ভাই কিছু বললেন না। আগের জায়গায় বসলেন। চুপ করে রইলেন। বেচারাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় দেখাচ্ছে। আবার উঠে দাঁড়ালেন। হেঁটে গিয়ে দেয়ালের সামনের বুক শেলফ্ থেকে একটা বই তুলে নিয়ে এসে টেবিলে রাখলেন। সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত বাংলাপিডিয়ার একটা কপি। সেটার পাতা উল্টে এক জায়গায় থামলেন। পড়লেন কিছুক্ষণ।
 
তারপর বলতে লাগলেন, ‘নববর্ষ এই উৎসবটি বাঙালির সার্বজনীন উৎসবগুলোর মাঝে অন্যতমর জায়গাটা জুড়ে রয়েছে। সার্বজনীনের মানে জানস্ বলদ? মানে হইল কোনও ধর্মের না, কোনও গোত্রের না, মুলসমান, হিন্দু, বোদ্ধ, খ্রিস্টান, পাহাড়ি-মোটকথা যারা যারা বাংলায় কথা বলে, পয়লা বৈশাখ তাদের সকলের উৎসব। এইটা একটা ঋতুধর্মী উৎসব। কৃষকেরা ফসল চাষ করে ঋতুর ওপর নির্ভর কইরা। কৃষকের সুবিধা করতেই পুরা বছররে ছয়টা ভাগে ভাগ করে ছয়টা ঋতু বানানো হইছে। প্রথম ঋতু হইল গ্রীষ্ম। প্রথম মাস বৈশাখ। বৈশাখের প্রথম দিনটারে পয়লা বৈশাখ বলে। নতুন বছরের প্রথম দিন। বুঝলিরে ছাগলা?‘
 
‘খুক্ খুক্ খুক্।’ আমি আবারও কেশে উঠি। আরোপিত কাশি। জাকির ভাই আমার দিকে তাকান। তাকিয়ে বলেন,
‘তুই কাশস্ ক্যান! রামছাগল ডাকি নাই তো।’
 
‘প্রজাতি তো একই। এরে ছাগল বা রামছাগল যা-ই ডাকেন, জাতির অপমান। এই অপমান মাইনা নেওয়া যায় না।’ আমি অপমান ব্যাখ্যা করি।।
 
কামালউদ্দীন গজগজ করতে থাকে, ‘এহ্, স্কুল খুইলা বসছে, সবজান্তা শমশের হইছে একেকজনে…’ আরও কি কি যেন বলল বোঝা গেল না।
 
জাকির ভাই বললেন, ‘ওই, তুই কি কস্?’
 
কামালউদ্দীন কোনও কথা বলল না। ঘাড় ত্যাড়া করে চুপ করে রইল। জাকির ভাই আবারও বাংলাপিডিয়া খুললেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন বইটার দিকে। তারপর আমাদের দিকে ঘুরে বলতে লাগলেন, ‘তো কৃষি কাজের সুবিধা করতেই সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করছিলেন। এইটা ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দর কথা। সেবার ১০ বা ১১ মার্চে পয়লা বৈশাখ হইছিল। হিজরি মানে আরবি চান্দের বছর আর বাংলা সৌরবছরকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত করা হইল। বাংলা সনকে শুরুতে ‘ফসলি সন’ ডাকা হইত। দেখলি বলদা, উদ্দেশ্যটা ফসল, পুজা পার্বণ না। পরে আস্তে আস্তে বঙ্গাব্দ নামে ডাকাডাকি শুরু হয়।
 
আরও আছে, বাংলার কৃষকরা চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীদের খাজনা দিয়া দিত। পরদিন নতুন বছরের পয়লা মাস বৈশাখের পয়লা দিনে ভূ-স্বামীরা তাদের সকলেরে মিষ্টি খাওয়াইতো। দেখ হারামজাদা, খালি হিন্দু কৃষকে খাজনা দিত, অথবা হিন্দুরে মিষ্টি খাওয়াইতো, এমন কথা বলা নাই।

 
কামালউদ্দীন আবারও গজগজ করে বলতে লাগল, তাইলে জমিদার তালুকদার ভূ-স্বামীরা হয়ত হিন্দু আছিল। এইটাও তো বলে নাই…।’
 
কথাগুলো জাকির ভাইয়ের কানে পৌঁছুল না। জাকির ভাই বললেন, ‘ওই তুই কী কস্?’
 
আমি তাড়াতাড়ি বললাম, ‘কিছু কয় না। আপনি বলেন।’
 
জাকির ভাই বলতে থাকেন, ‘বাংলা নববর্ষর মূল ব্যাপারটা হইল হালখাতা। ওই বেলমাথা, হালখাতা চিনস্ তো?’
 
‘না, চিনুম না, দুনিয়ার সবকিছু তুই একলাই চিনস্ জানস্।’ কামালউদ্দীন ত্যাড়া ঘাড়ে চোখ পাকায়।
 
‘ওরে বাবা! রামছাগলে দেখি আবার খ্যাপেও!’ জাকির ভাই আবার বিস্মৃত হন।
 
‘খুক্ খুক্ খুক্ খুক্ খুক্ খুক্।’ এবার আমার আত্মসম্মানে লাগে। রাগও ওঠে খানিকটা।
 
জাকির ভাই সেটা বুঝতে পেরে বলেন, ‘থাক থাক, ছাগল-রামছাগল কিছুই ডাকি নাই। মুখ ফস্কে বাইর হইয়া গেছে…এখন শোন্, হালখাতা পুরাই একটা অর্থনৈতিক ব্যাপার। মানে ব্যবসার ব্যাপার। গ্রামে গঞ্জে ব্যবসায়িরা নতুন বছরের শুরুতে পুরান হিসাব শেষ কইরা ফেইলা পয়লা বৈশাখে নতুন খাতা খুলত।’
 
কামালউদ্দীনের সহ্য হয় না। বলে ওঠে, ‘মাইয়ালোকেরা পয়লা বৈশাখে নতুন জামাকাপড় পইরা কোন্ ব্যবসা করতে বাইর হয় তইলে? তোরাই বা সাজগোজ কইরা ভোর সকালে তাগো পিছন পিছন ঘুর ঘুর করস্ ক্যান?’
 
জাকির ভাই এবার কামালউদ্দীনকে কিছু বলল না। চিৎকার করে আমাকে ধমক দিয়ে বলল, ‘ওই রামছাগল, তোরে না দড়ি আর বাঁশ আনতে বলছিলাম? আনতে যাস্ নাই ক্যান!’
 
আমার আনন্দ হল। আনন্দে আমার ‘ম্যাঁএএএ’ বলে রামছাগলীয় ডাক ডাকতে ইচ্ছে করল। কামালউদ্দীন তখন উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে দুহাত উঁচু করে আড়মোড়া ভাঙল। তারপর বলল, ‘তগো এইসব আজাইরা ফাও প্যাঁচাল ভালো লাগতেছে না। আমার মুতে ধরসে। মুততে গেলাম। জাকির, তোর কাছে তো কুলুপ নাই, তুই তো বেদ্বীন, টিস্যু পেপারের বাক্সটা দে।’
 
আমার খুব হাসি পেয়ে যায়। হাসি চেপে বলি, ‘কামাল ভাই, টিস্যুর বাক্স দিতে পারি যদি কাল পয়লা বৈশাখে আমাদের সঙ্গে টিএসসিতে ‘গুনাই বিবি’ পালা দেখতে যান।’
 
কামালউদ্দীন আমার দিকে দুচোখ গোল করে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, ‘লা হাওলা ওয়ালা কু’আতা ইল্লা বিল্লা…এই বেদ্বীন জাকিরে তোমার মাথাটা খাইছে। এক্কেরে শ্যাষ কইরা দিছে।’ বলেই ঘুরে একটা দৌড়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
 
জাকির ভাই হাসতে হাসতে পেছন থেকে বললেন, ‘ও কামাল! টিস্যু নিয়া যা। রাস্তার ইটের টুকরা জীবাণু দিয়া ভরা, তোর দ্রব্য সংক্রমণ হবে।’
 
আমি দুই ঠোঁট চেপে দাঁড়িযে রইলাম। এখন হাসা যাবে না। বড়দের বিষয় নিয়ে ছোটদের প্রকাশ্য হাসাহাসি করা বেয়াদবি।
 
 
 
তিন.
শেরিল কম্পিউটারের সামনে গভীর মনোযোগ দিয়ে কাগজপত্র দেখছে। একটু পর পর পাতা ওল্টাচ্ছে। আমি কাছে গিয়ে বলি, ‘শেরিল, একটা প্লেইন পেপার দেও তো।’
 
শেরিল মুখ তুলে তাকালো। তাকিয়ে সুন্দর করে হাসল। মাপা হাসি। আমি শেরিলের এই হাসিটার নাম দিয়েছি প্রফেশনাল হাসি। বেচারি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রফেশনে ব্যস্ত থাকতে থাকতে ওর সত্যিকার হাসিটাও প্রফেশনাল হাসির নিচে চাপা পড়ে গেছে। শেরিল বলল, ‘তুমি কি এখন লিখবা?’
 
আমি ওপর-নিচ মাথা ঝাঁকাই। কিছু বলি না। শুধু শেরিলের প্রফেশনাল হাসি নকল করি। শেরিল এবার হাহা করে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে বলে, -‘হোয়াটস্ অন ইওর মাইন্ড? কি নিয়া লিখবা? পলিটিক্স?’
 
‘আমি পলিটিক্স বুঝি না শেরিল।’
 
‘হাহা, জোক করবা না। সারাদিন সবাইকে তাদের দেশের রাজনীতির খবর জিজ্ঞেস কর, আর বলছ রাজনীতি বোঝ না?’
 
‘আসলে তা নয়। শোন, নিউজ পেপারে যা পাওয়া যায়, সেটা হল বিশেষজ্ঞদের মতামত। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। আমি অর্ডিনারি দৃষ্টিভঙ্গিটা জানতে চাই। আমি তোমার ভাবনা জানতে চাই। আমি এভলিনের ভাবনা জানতে চাই। আবদুল ইলাহর ভাবনা জানতে চাই।’
 
‘তুমি এখন যা বলছ, যেভাবে বলছ, তা কি রাজনীতি না?’ ভুরু কুঁচকে বলে শেরিল।
 
‘নারে; তবে তোমার এই প্রশ্নটা রাজনীতি।’
‘ইউ ক্রেইজি! তুমি সবসময় যে কোনভাবেই হোক আমার ওপর দোষ চাপাও।’ দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় শেরিলকে আনন্দিত মনে হয়।
আমি বলি, ‘জানো শেরিল, কালকে আমার দেশে নিউ ইয়ার।’
 
‘নিউ ইয়ার! কালকে! এটা কোন্ নিউ ইয়ার!’ শেরিলের কন্ঠে আগ্রহ মেশানো বিস্ময়।
 
‘এটা আমাদের নিউ ইয়ার। বাঙালি অরিজিনের।’ আমি কন্ঠে অহঙ্কার ফুটিয়ে বলি।
 
‘বাহ্! দারুণ তো! চায়নিজদের ফেব্রুয়ারিতে।’
 
‘শেরিল, তোমাদের নিউ ইয়ার কবে?’
 
‘কবে আবার! জানুয়ারিতে!’
‘জানুয়ারির হিসাবটা তো গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জীর। যেমন আর্মেনিয় বর্ষপঞ্জী, অ্যাসিরীয় বর্ষপঞ্জী, বুদ্ধ বর্ষপঞ্জী, তেমনই। আমাদেরটা বাংলা বর্ষপঞ্জী। আমাদের নিজস্ব। তোমার দেশের নিজস্ব কোনও বছর নাই? থাকার তো কথা।’
 
‘না, নাই। তোমরা কি কর তোমাদের নিউ ইয়ারে?’ আগ্রহ ভরে শেরিল জানতে চায়।
 
আমার উৎসাহ বাড়ে। শেরিলকে কম্পিউটারের সামনে থেকে সরে যেতে বলি। সে সাগ্রহেই সরে গেল। গুগল খুলে ইংরেজি বর্ণে পি-ও-এইচ-ই-এল-এ টাইপ করতেই বৈশাখ শব্দটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাশে এসে দাঁড়িয়ে গেল। ক্লিক করে ইমেজে ঢুকতে বৈশাখী উৎসব বিমূর্ত হয়ে উঠল। আমি ছবি বেছে নিয়ে খুলে খুলে দেখাই। উৎসবের ছোট ছোট অংশগুলোর সঙ্গে শেরিলের পরিচয় করানোর চেষ্টা করি। ‘এই যে দেখ, এখানে মেয়েরা যে পোশাকটা পরে আছে, এর নাম শাড়ি…’
 
‘সা-রি আমি চিনি।’ বলে ওঠে শেরিল। বলে আমার দিকে তাচ্ছিল্যর দৃষ্টি দেয়।
 
আমার হাসি পায়। আমি বলতে থাকি, ‘মেয়েদের শাড়ির রঙটা দেখেছ?’
 
‘পেল ইয়েলো।’
 
‘এই রঙের নাম বাসন্তী। বাসন্তী হল তারুণ্যর রঙ। নবোদ্ভিন্ন। জুভেনাইল।’
 
‘ওয়াও!’ শেরিল হা করা বিস্ময় প্রকাশ করে।
 
অনেকে সাদা শাড়িও পরে। সাদা হল শুভ্রতা। তুষারের মত। কিন্তু দুটা রঙের শাড়িতেই লাল রঙের বর্ডার থাকবে। এই বর্ডারকে বলে পাড়। এই লাল রঙটার একটা হিস্টোরিক্যাল ব্যাখ্যা আছে। এটা হল হালখাতার রঙ। হালখাতা ব্যবসায়ীদের অ্যাকাউন্টিং বুক। নিউ ইয়ারের প্রথম দিনে নতুন হিসাবের খাতা খোলে।’
 
ইন্টারেস্টিং তো!’ শেরিলের কণ্ঠে সত্যিকার আগ্রহ।
 
‘এই ছবিটা দেখ, বিশাল গাছটা দেখছ, এটা ব্যানিয়ান ট্রি। অনেক প্রাচীন। গাছের নিচে সারি দিয়ে ছেলেমেয়েরা বসে আছে। এরা গান করে। বর্ষবরণের গান। আর্লি মর্নিংয়ে গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে বরণ করে।’
 
‘আর্লি মর্নিংয়ে!’
 
‘হ্যাঁ, ভোর বেলায়। ইংরেজি নিউ ইয়ারের মতো জিরো আওয়ারে না। সবাই ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠে গোসল করে পরিষ্কার পোশাক পরে বেরিয়ে পরে। বেড়ায়, আনন্দ করে।’
 
‘আচ্ছা এগুলো কি? কি লেখা ওখানে?’ একটা ছবিতে আঙুল ছুঁইয়ে জানতে চাইল শেরিল।
 
‘এগুলার নাম কুলা। লেখা ওয়েলকাম। বাংলা বর্ণমালায় লেখা।’
 
‘জানো, আমাদেরও একটা বর্ণমালা ছিল। তাগালোগ। কিন্তু এখন তাগালোগ বর্ণমালায় কেউ লেখে না। সবাই ইংরেজি বর্ণ দিয়ে লেখে।’ বিষাদ কণ্ঠে বলে শেরিল।
 
‘বল কি!’ বিস্ময়ে আমি বড় বড় চোখ করে শেরিলের দিকে তাকাই। শেরিলকে দুঃখিত দেখায়। আবার উৎসাহীতও। একটা কাগজ টেনে নিয়ে দ্রুত লিখল, এম-এ-জি-এ-এন-ডি-এ, তারপর বলে, ‘এই যে মাগান্দা শব্দটা লিখতে হলে আমরা এভাবে লিখি। তাগালোগ বর্ণে কিভাবে লিখতে হয় সেটা এখন অনেকেই জানে না।’
 
‘শেরিল, তোমাদের জন্যে এটা খুব লজ্জার। তোমাদের ভাষাকে তোমরা সন্মান করছ না।’
 
‘হুঁ, জানি। এটা মোটেও মাগান্দা নয়।’
 
শেরিল মন খারাপ করে। কদিন আগে কেনিয়ার তোরা’র সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তোরা’র মাতৃভাষা সোয়াহিলি। আমি তোরা’র কাছে সোয়াহিলি বর্ণমালা দেখতে চাইলাম। ওকে কিছু লিখে দেখাতে বললাম। তোরা খুব অবাক হয়ে বলল, ‘আমরা তো ইংরেজি বর্ণমালায় লিখি!’
 
‘সেটা তো এখন লেখ। কিন্তু সোয়াহিলি বর্ণমালাটা কেমন সেটা আমাকে দেখাও।’
 
তোরা বলে, ‘সোয়াহিলি ভাষার কোনও বর্ণমালা নাই। আমাদের বইপত্রে সব ইংরেজি বর্ণমালায় লেখা হয়।’
আমি বিশ্বাস করলাম না। আমি এডগার রাইজ বারোজ পড়েছি। বারোজ সেখানে সোয়াহিলি ভাষায় লেখার কথা বলেছেন। সোয়াহিলি বর্ণমালা এডগার রাইজ বারোজ তার বিখ্যাত টারজান গল্পেও উল্লেখ করেছেন। আমরা গুগল করে সোয়াহিলি বর্ণমালা বের করে সেদিন দেখেছিলাম। আমার আর তোরা’র জীবনে প্রথমবার সোয়াহিলি বর্ণমালা দর্শন।
 
কেনিয়া একসময় ঋদ্ধ ছিল। সম্পদে, সংস্কৃতিতে, অর্থনীতিতে। নাইজেরিয়ার মতো। সম্পদ লুন্ঠিত হয়েছে, সংস্কৃতি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে, অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। আর লেখ্যভাষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নাইজেরিয়ার মতোই।
 
কেনিয়া-নাইরেজিয়ার লোকেরা ইংরেজি বলে আমেরিকান উচ্চারণে। সেখানে প্রচুর আমেরিকানরা স্কুল গড়ে তুলেছে। ইংরেজির শিক্ষাটা সেসব স্কুলেই হয়।
 
ভারতের অবস্থাও ভালো না। হিন্দি ভাষাটা কেবল হিন্দি সিনেমা আর টিভি সিরিয়ালে চর্চা চলে। আমি দেখেছি, ভারতীয় মধ্যবিত্ত ভারতীয় উচ্চারণে নিজেদের মাঝে ইংরেজিতে কথাবার্তা চালায়। ইংরেজি বর্ণমালায় হিন্দি লেখেও।
 
বাংলাদেশেও এখন প্রচুর ইংরেজি স্কুল। ছোট ছোট বাচ্চারা আমেরিকান উচ্চারণে কথাবার্তা বলে। যখন বলে, শুনে আমরা অভিভূত হই। বিস্মিত হই। আহ্লাদিত হই। সেটা আনন্দ দিয়ে প্রকাশ করি। বাংলা ভাষাকে এই তাচ্ছিল্যে সন্তানেরা বাংলার প্রতি উদাসীনতা নিয়ে বড় হয়। বড় হয়ে এরা অদ্ভুত একটা ভাষায় কথাবার্তা বলে। এই ভাষা না ইংরেজি, না বাংলা। এরা ইংরেজি বর্ণে বাংলা লেখেও।
 
দুইশ’ বছর আগে চাবুক মেরে নীল চাষে বাধ্য করে শোষণ করা হতো। শক্তি প্রয়োগ করে আগ্রাসন চালানো হতো। এখন আধুনিক যুগ। শোষণের প্রক্রিয়াও আধুনিক হয়েছে। আগ্রাসনের ধরন পাল্টেছে। ভাষাটা-সংস্কৃতিটা দখল করা গেলে বাকি সব আপনিই দখলে চলে আসে। ধর্মভীরু বাঙালিকে কাবু করতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হচ্ছে। বিশ্বায়নের কথা বলে ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হতে বলা হচ্ছে।
 
তারপর ধর্মভীরু বাঙালিকে বলছে, পয়লা বৈশাখের সংস্কৃতি তোমার ধর্ম সমর্থন করে না। এই সংস্কৃতি তোমার নয়। এটা পালন করা তোমার জন্যে হারাম। যারা পালন করে তাদের বাধা দাও। তাদের দালালরা শৌর্যবীর্যধারীর ভূমিকায় নামে। বাধা দেয়। একুশে ফেব্রুয়ারিতেও তারা একই কাজ করে। কেননা শোষণ ও আগ্রাসন চালানোর প্রধান বাধা ভাষা ও সংস্কৃতি।
 
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উপনিবেশবাদ বোঝাতে ড্যানিয়েল ডিফো’র রবিনসন ক্রুসো উপন্যাসটির উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন। নির্জন দ্বীপে রবিনসন স্থানীয় একটা লোককে খুঁজে পায়। তো লোকটার একটা নাম থাকলে ডাকাডাকি করতে সুবিধা হয়। রবিনসন লোকটার একটা নাম রাখল। ফ্রাইডে। নাম দিয়ে ফ্রাইডেকে ইংরেজ বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হলো। তারপর তাকে ভাষা শেখাতে লাগল। ভাষার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতি আসতে লাগল।
 
উপনিবেশের প্রথম শক্তিটাই ভাষার ওপর আধিপত্য; ধর্ম নয়। এই আধিপত্যর বিস্তার হলে বাকিটা আর কষ্ট হয় না। যেমন ফ্রাইডেকে খ্রিস্টান করার ব্যাপারে রবিনসনের আগ্রহ নাই। সে জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে এমনিতেই খ্রিস্টান হয়ে যাচ্ছে। সকাল-সন্ধ্যা রবিনসনের সঙ্গে প্রার্থনা করছে। বাইবেলের শ্লোক মুখস্ত করছে।
 
বাঙালির নির্মল সার্বজনীন সংস্কৃতি পয়লা বৈশাখকে যারা হারাম বলছে, হিন্দুর সংস্কৃতি বলছে, যদিও হিন্দুধর্ম বলে কিছু নাই, ধর্মটা সনাতন। সেইসব প্রতিক্রিয়াশীল দালালরা ধর্মকে টেনে এনে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। চালাতে পারছে কারণ বাঙালি ধর্মভীরু।
 
কিন্তু এরা ভুলে যায় বাঙালি ধর্মভীরু বটে, তবে ধর্মান্ধ নয়।
 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *