কবিতাসাহিত্য

দুটি কবিতা

ফারজিনা মালেক

দিনকে দিন আমি কি
সিজোফ্রেনিক হয়ে যাচ্ছি, রূপা?
খুব সকালে যখন ওরা স্কুলে, অফিসে যায়
সদর দরজা ভেজালেই
ছোট্ট বসার ঘর হয়ে যায়
আমাদের উঠোন বাড়িটা।
উঠান মাড়িয়ে চাচীমা স্কুলে পড়াতে যায়
দু’আঁটি লাউশাক বাছতে বাছতে
সংসারের নিকুচি করে আম্মু
ওরা দুই ভাই বেঘোরে ঘুমায়
‘আমি রাতে কী স্বপ্ন দেখছি, জানো?’
চোখ কচলাতে কচলাতে পিঁড়ি পেতে বসে শৈলী।
চার সেকেন্ডের স্বপ্নের ফিরিস্তি আধাঘন্টা ধরে 
দেয়ার বিরল প্রতিভা আছে এই মেয়ের।
তুমি তো সেটা জানতেই! জানতে না?
ছাদ-ঘেঁষা নারিকেল গাছটার কথা মনে আছে তোমার?
সেই ছাদের কার্নিশে পা ঝুলিয়ে আমাদের ফিসফাস?
ওইটা এখন আমার পিছন উঠানে যাবার সিঁড়ি
এই সিঁড়িটায় একা বসে
কত যে দুপুর কাটে আমার
এখন উঠানের ওই ম্যাপল ট্রি-ই আমার নারিকেল গাছ
তোমাদের সাথে কত কথা যে বলি
এই ম্যাপল ট্রির ছায়ায় বসে!
শারমিন, শানু, মৌ, লাবণ….
ও হ্যাঁ ভাল কথা,
শানুর সাথে কথা হয় আজকাল?
মেয়েটা কেমন ম্যাজিকের মতো ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে, তাই না?
আচ্ছা, রূপা, বল তো,
কী এত্ত কথা বলতাম আমরা?
ঘন্টার পর ঘন্টা…
দিনের পর দিন
কী এমন জরুরি কথা ছিল আমাদের?
সব কথা কি বলা হয়ে গেছে আমাদের?
ঘন্টার পর ঘন্টা
দিনের পর দিন
এখন কীভাবে কাটে আমাদের কথাহীন দিন?
থাক ওসব!
তারচে’ চল আমার বারান্দায় যাই
এইটা কিন্তু বারান্দা না আসলে,
এইটা আমার ব্রহ্মপুত্রের পাড়
দেখছ না কী বাতাস!
ও, সেদিন কী হয়েছে শোন!
বুশিয়ার স্ট্রিটের পাশে পার্কের ওখানে,
হুম ঠিক ওইখানেই একটা চিকন
ওয়াকিং ট্র‍্যাক আছে।
একদম চাপা রাস্তা
আমি তাকিয়ে দেখি নওমহল
আচ্ছা, নওমহল মানে কী গো?
নতুন বাড়ি?
নাকি ওইখানে নয়টা বাড়ি ছিল কোনকালে?
আমি খুব সিজোফ্রেনিক হয়ে যাচ্ছি রে!
ঘরের মধ্যে উঠান দেখি
শাওয়ারের মধ্যে কলতলা
ম্যাপল ট্রির নিচে নারিকেল গাছের ছায়া
সব্জি কাটার চপার বোর্ডে

আমার গতজন্মের রান্না বাটি খেলা!

 

আমারে মহান বানায়ো না বন্ধু
মহান হইতে চাই না।
আমি দশ হাতে সব সামলাবো এইটা ভাইবো না,
আমার তো দুইটা মাত্র হাত!
আমি বাইক চালাইলে,
আমার পিছনে তুমি বসলে
সেল্ফি তুইল্যা ফেইসবুকে জানান দেয়া লাগবো না;
আমারে স্যালুট দেয়া লাগবো না
খালি টিজ কইরো না
আর ন্যায্য ভাড়াটা দিও।
আমি ঘরে বাইরে সব সামলাইতে পারি- 
এইটা কইয়া আমার রেস্টের সময় কাইড়া নিও না প্লিজ!
আমার এট্টু অবসর লাগে তো!
‘আমি নারী, আমিই পারি!’
আমারে এত ওভাররেটেড কইরো না বন্ধু।
আমারে আমার মতন-
খাইতে দেও
হাঁটতে দেও
বসতে দেও
রেস্ট নিতে দেও
ভুল করতে দেও
ভুলটা শুধরাইতে দেও
অথবা, কিছুই দেয়া লাগবো না
আমি দেখি আমি কী করতে পারি আমার ক্ষ্যাম দিয়া

তুমি, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা দিয়া আটকায়া রাইখো না শুধু!

 

ফারজিনা মালেক স্নিগ্ধা: জন্ম ময়মনসিংহে ১০ জানুয়ারি ১৯৮৩ সালে। জীবনের প্রথম আঠার বছর সেখানেই কাটিয়েছেন। এরপর ঢাকায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল ও পরিবেশ বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেন ২০০৭-০৮ সালে। তারপর হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটি থেকে চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানে মাস্টার্স। দেশে ফিরে ৬ বছর কাজ করেন বিভিন্ন এনজিওতে। এখন বাস করছেন অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে। সেখানে পিএইচডি করছেন ডিসএবিলিটি নিয়ে; কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে।

ফারজিনা মালেক স্নিগ্ধা নিজেকে লেখক বলে দাবী না করলেও চারপাশের সঙ্গতি-অসঙ্গতি, অনুভূতির গভীরে পোঁছে আঘাত করা ঘটনাগুলো নিয়ে কলম তোলেন তিনি। অন্যদিকে ব্যস্ততা ফারজিনাকে লেখালেখির সময় দিতে চায় না। কিন্তু না চাইলেও ফারজিনা ঠিকই সময়টা আদায় করে নেন। লেখেন গল্প, কবিতা অথবা নিবন্ধ। দায়সারা নয়, দায়বদ্ধতাই পাওয়া যায় তাঁর লেখাতে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension