কবিতাসাহিত্য

ফারুক মাহমুদের গুচ্ছ কবিতা

প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে কাব্যচর্চায় লিপ্ত কবি ফারুক মাহমুদ। এবং তিনি আমাদের সামনে প্রকাশিত আছেন কমপক্ষে চার দশক ধরে। বাঙালি কবিরা সাধারণত পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্ন বছরের ভেতর ফুরিয়ে যান। সত্তরের ঝরে পড়া অসংখ্য কবির বেলাতেও এ কথা প্রযোজ্য। কবি ফারুক মাহমুদ কিন্তু এখনও যথেষ্ট কাব্যমনস্ক এবং সৃষ্টিশীল। পঁয়ষট্টি যোগ জীবনেও তিনি লিখে চলেছেন তরুণ কবিসুলভ সাগ্রহে। এখনও তিনি কবিতায় দেখতে পান ‘নতুন চিন্তার মতো অনিঃশেষ জলের প্রপাত’ কিংবা মেয়েদের ‘পালতোলা’ বুক। ভোরবেলার শিউলিতলাকে তার মনে হয় ‘থালাভরতি ধোঁয়া ওঠা শঙ্খসাদা ভাত।’
 
বস্তুত কবি ফারুক মাহমুদ সর্বদাই একজন প্রেমিক কবি। বাংলাদেশের সত্তরের প্রজন্মের চার-পাঁচজন অগ্রগণ্য কবির একজন কবি ফারুক মাহমুদ। কবিজীবনের গোড়া থেকেই ফারুক মাহমুদ কবিতার প্রকরণ ও ছন্দ বিষয়ে যত্নবান। এই শৃঙ্খলা তাঁর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে। পাশাপাশি গভীর জীবনদৃষ্টি ও কবিশোভন জীবনদর্শন তৈরি করে দিয়েছে তাঁর কাব্যমেজাজ।
 
রূপসী বাংলা পাঠকদের জন্যে কবি ফারুক মাহমুদের ধোঁয়া ওঠা পাঁচটি টাটকা সদ্য কবিতা।
 
 

ধন্বন্তরি

প্রেম হেঁটে চলে এল আমাদের বাড়ি

রান্নার ঘরটি ওর বহু পরিচিত

দু’পেয়ালা কফি হাতে এল

বসেছে সে পাশের চেয়ারে

 

গল্প করল ইলিশের হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ে

মানুষের আয়ু বেড়ে হয় যদি দেড়শ বছর

সমাজের ভারসাম্য কতটুকু নষ্ট হতে পারে-

এমন তর্কের জলে ছুড়ে দিল যুক্তিতথ্যতাপ

 

আমার অসুখ নিয়ে কোনো কথা নয়

ছোট্ট শব্দে একবার শুধু-

‘কবিতা কি নিয়মিত হয়?’

 

দেহ-মনে আজ আর ক্লান্তিচিহ্ন নেই

তৈরি হচ্ছি। যথাবেলা বের হবো অফিসের পথে

 

তর্ক

কে লিখেছে? তারচেয়ে বেশি মুগ্ধ চিঠির ভাষায়

 

আলো চোখ অশ্রু গন্ধ সবকিছু অমূল্য সুন্দর।

রিক্ত উৎকণ্ঠায় ফেলে প্রকৃতির আড়াআড়ি ভাঁজে

সমুদ্র পেয়েছে প্রাণ, নদীরেখা উল্লাসমুখর…

 

ঘোলাটে না স্বচ্ছতোয়া- তর্ক হতে পারে

নোনা। মিঠা। যা-ই হোক, দুটোই কিন্তু জল

 

মাটিতে আকাশগন্ধ। প্রেম হল প্রমিত, সফল

 

নির্বিকল্প

আকাঙ্ক্ষা নিভিয়ে রাখি, আমি তাই যথেষ্ট স্বাধীন

যে কোনো প্রাপ্তির মধ্যে একটা কিছু প্রশ্নচিহ্ন থাকে

লঘু পাপ, গুরু পুণ্য- চিন্তাগুলো ধারণাপ্রবণ

যতটা যাওয়ার কথা- যেতে হলে চলে যেতে হবে

প্রশ্নের উপরে নয়- ক্ষুন্নিবৃত্তি- ভালোবাসা- স্নেহ

যার জন্য মৃত্যু ভোলে পথ- চাই তাকে এবং তাকে

 

 

 

একটি পুরোনো গল্প

সকাল। দুপুর। সন্ধ্যা। রাত্রি।-

সময়কে কত নামে ভাগ করে নিই!

যখনই তুমি আস-না কেন

সঙ্গে করে নিয়ে আস আনন্দিত ভোর

 

আবারও সেই পুরোনো গল্প-

তুমি হও ব্রজগোপী, আর আমি মুগ্ধ ননীচোর

 

 

 

 
 
 

শব্দ

নৈঃশব্দ্যের মুখরতা (মাঝে মাঝে) মন্দ কিছু নয়

 

জলের ঠোঁটের হাসি, মাঠে মাঠে সবুজ হাওয়া

ভালো নয়- কোন মুখে বলি

 

যার জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা আমার

কোনোকিছু না দেখার মতো

পিছনে তাকিয়ে একবার সেই মেয়ে যদি

দ্রুত চলে যায়

তার সে নিঃশব্দ চরণের ধ্বনি বুকে তুলে রাখি

 

তবে ‘শব্দ’ যে আমার অতিশয় প্রিয়

এ-কথা বলায় আমি মুখচোরা নই

 

শব্দ হচ্ছে অস্তিত্বের চাক্ষুষ প্রমাণ

শব্দ হচ্ছে ছন্দসুরে কবিতা ও গান

শব্দ হচ্ছে প্রকৃতির ঝলোমলো হাসি

শব্দ হচ্ছে উচ্ছ্বসিত আলো রাশি-রাশি

শব্দ হচ্ছে চলে যাওয়া, ফিরে চলে আসা

শব্দ হচ্ছে স্নেহপুণ্য প্রীতিভালোবাসা

 

দোষণের ঝুঁকি আছে, তবু আমি উঁচু-নিচু বহুবিধ শব্দ শুনতে চাই

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension