সম্পাদকীয়

বঙ্গবন্ধুর অন্তর্লোকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা

জাতীয় শোক দিবসে রূপসী বাংলার শ্রদ্ধা

জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও শোকাহত চিত্তে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের কালরাতে শাহাদাতবরণকারী সবাইকে। প্রতি বছর আমরা যেভাবে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালির ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতিকে স্মরণ করি, এবারের প্রেক্ষিত তা থেকে ভিন্ন।

এ বছর জাতীয় শোক দিবস পালিত হচ্ছে এমন সময়, যখন চলছে স্বাধীনতার এই মহানায়কের জন্মশতবার্ষিকী। যদিও বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে জন্মশতবার্ষিকীর সব আয়োজন স্থগিত রয়েছে; বঙ্গবন্ধু স্মরিত হবেন কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে। সমকালের পক্ষ থেকেও আমরা এবার বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাকে স্মরণ করছি।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন, তাকে কাছ থেকে দেখেছেন- এমন রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী-সাহিত্যিক, প্রশাসকের সাক্ষাৎকার নিয়েছি আমরা। আমরা জানতে চেয়েছি, তারা কীভাবে দেখেছেন এই ক্ষণজন্মা পুরুষকে। সদ্য স্বাধীন শিশুরাষ্ট্র বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু কীভাবে তার আজন্মলালিত স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়তে চেয়েছিলেন।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা এসব সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে বুঝতে চেয়েছি, বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশিত বাংলাদেশ কোন পথে। তার ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধাদের কথামালার মধ্য দিয়ে আমরা অনুধাবন করতে চেয়েছি জাতির পিতার অন্তর্লোক। আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে দেখতে পাচ্ছি, বঙ্গবন্ধুর অন্তরজুড়ে ছিল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা। তিনি চেয়েছিলেন, রাজনৈতিক মুক্তির পর বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি আসবে। বিশ্বের বুকে মর্যাদার সঙ্গে মাথা তুলে দাঁড়াবে বাংলাদেশ।

দুর্ভাগ্য আমাদের। পঁচাত্তরের পর ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র থেকে গণতন্ত্র, মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রীতির সুমহান আদর্শ মুছে ফেলার অপচেষ্টা চলেছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় তা ব্যর্থ প্রমাণ হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া আওয়ামী লীগ তারই আত্মজার নেতৃত্বে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর ক্রমেই ফিরেছে মুক্তিযুদ্ধের ধারা। একদিকে যেমন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া অনেকাংশে সম্পন্ন হয়েছে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দৃশ্যমান অর্জন সম্ভব হয়েছে।

অর্থনৈতিকভাবে নিম্নআয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উত্তরণ ঘটেছে বাংলাদেশের। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যে প্রত্যয় বারংবার ব্যক্ত করতেন; নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ তারই সার্থক রূপায়ণ। আমরা দেখেছি, খোদ বঙ্গবন্ধুও ক্রমে আমাদের জাতীয় ও সামাজিক জীবনে ফিরে এসেছেন স্বমহিমায়।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিঃশেষ করতে পারে নি খুনিরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সংহতির প্রতীক বঙ্গবন্ধু এখনও তার জীবন, কর্ম ও বাণী দিয়ে জাতিকে শক্তি জুগিয়ে চলেছেন। আমরা নিশ্চিত, অনাগত দিনগুলোতেও বঙ্গবন্ধু হয়ে থাকবেন বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য প্রেরণার অনিঃশেষ বাতিঘর। আমরা এবারের বিশেষ আয়োজনের শিরোনাম তাই করেছি- ‘প্রেরণায় বঙ্গবন্ধু, হৃদয়ে বাংলাদেশ’।

এক শতাব্দী আগে বাংলার প্রত্যন্ত পল্লীতে জন্মগ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু যেভাবে উপমহাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন, তা বিশ্বেরও বিস্ময়। কিন্তু প্রতি বছর ১৫ আগস্ট সেই বিস্ময় ছাপিয়ে আমাদের মধ্যে নিখাদ বেদনার জন্ম দেয়।

বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী উদযাপনের নানা আয়োজনের মধ্যেও তাই আমাদের হৃদয়ের তন্ত্রীতে বেজে ওঠে সকরুণ সুর। বস্তুত পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ললাটে যে অমোচনীয় কলঙ্ক লেপ্টে দিয়েছিল, তা থেকে যেন বাঙালি জাতির মুক্তি নেই। বরাবরের মতো এবারের শোক দিবসেও আমাদের প্রথম চাওয়া- বঙ্গবন্ধুর বাকি খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়ে উঠুক।

আমরা এও দেখতে চাই, বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমিত থাকছে না। তার জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে মুক্তি ও মানবতার পক্ষে কাজ করছে সবাই- এই আহ্বান দল-মত নির্বিশেষে সবার প্রতি। আমরা বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু নির্দিষ্ট কোনও দলের নন। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সবাই যদি বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে দেশ গড়ায় আত্মনিয়োগ করি, সেটাই হবে তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। করোনা পরিস্থিতিতে এই উপলব্ধি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।❐

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension