প্রধান খবরশ্রদ্ধাঞ্জলীসাহিত্য

বঙ্গবন্ধু: সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে

পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় প্রতিটি সফল রাষ্ট্রনায়কই একজন লেখক-বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক-চিন্তাবিদ হিসেবে দারুণ খ্যাতি লাভ করেছেন। এই ধারা প্রাচীন এথেন্সের রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে অধুনিক রাষ্ট্রনায়কদের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, উইনস্টন চার্চিল, আব্রাহাম লিংকন, নেলসন ম্যান্ডেলা, জন এফ কেনেডি, ফিদেল কাস্ত্রো, টমাস জেফারসন তারা সবাই খ্যাতনামা রাষ্ট্রনায়ক, স্বাধীনতাসংগ্রামী এবং মানবতাবাদী লেখক-দার্শনিক এবং চিন্তাবিদ।
 
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও নিজেকে বিন্যস্ত করেছেন ইতিহাসের খাতায় থাকা কিংবদন্তিদের মতো করে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা নামক মহাকাব্যের ‘মহাকবি’, এবং বিশ্ব মিডিয়ার দৃষ্টিতে ‘পোয়েট অব পলিটিকস’।
 
বঙ্গবন্ধু জীবদ্দশায় প্রচুর শিল্প-সাহিত্যের বই পড়তেন। তা তার ভাষণ, বক্তৃতা, চিঠিপত্র থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রমাণ পাওয়া যায় নিজের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, নয়াচীন শিরোনামের প্রকাশিতব্য ভ্রমণকাহিনি এবং আগরতলা মামলার বিবরণসমৃদ্ধ রচনাসমূহের দিকে তাকালেই। এই লেখালেখির মাধ্যমে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন দক্ষিণ এশিয়ার মহান নেতা মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত নেহরু প্রমুখের মতো ভিন্নতর উচ্চতায়।
 
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত প্রথম বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে দারুণ কিছু কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘শিল্প-সাহিত্যে ফুটিয়ে তুলতে হবে এ দেশের দুঃখী মানুষের আনন্দ-বেদনার কথা, সাহিত্য-শিল্পকে কাজে লাগাতে হবে তাদের কল্যাণে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতি শাখা-প্রশাখা বিস্তার করছে, লেখনীর মাধ্যমে তার মুখোশ খুলে দিতে হবে।’
 
তিনি এই সম্মেলনে আরও বলেছিলেন, জনগণই সব সাহিত্য ও শিল্পের উৎস। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনও দিন কোনও মহৎ সাহিত্য বা উন্নত শিল্পকর্ম সৃষ্টি হতে পারে না।’
বঙ্গবন্ধু নিজে সারা জীবন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সংগ্রাম করেছেন। এই জনগণ শুধুমাত্র শহরের নয় গ্রামের এক বিপুল জনগোষ্ঠীও তার সাথে ছিল। তিনি এই সম্মেলনে তাদের বিষয়েও মনোযোগ দিতে বলেছিলেন। তিনি সেদিনকার ভাষণে সচেতন শিল্পী-সাহিত্যিককে উদ্বেলিত করেছিলেন।
 
বঙ্গবন্ধু নিবিড় জনসংযোগের মধ্য দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন ‘রাজনীতি ও মানবতার কবি’। তিনি শিল্প-সাহিত্য ভালোবাসতেন বলেই তার জীবন ও কর্ম নিয়ে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যে দারুণ আলোড়ন তুলতে পেরেছিলেন।
 
জীবদ্দশায় যেমন, তেমনি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের নির্মম ঘটনার পর তিনি হয়ে ওঠেন শিল্প-সাহিত্যের অনুপ্রেরণার উৎস। কারণ, তিনি নিজেই সেই সাধারণ জনগণের প্রতিনিধি ছিলেন। মানুষকে তিনি বড় বেশি বিশ্বাস করতেন, বড় বেশি সারল্যে মাখা ছিল তার ব্যক্তিজীবন। একদিকে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করা, অন্যদিকে দেশের উন্নয়নে, মানুষের অগ্রগতির চিন্তায় উন্মুখ বঙ্গবন্ধুর দিনগুলো একেকটি কবিতা, তার পুরো জীবন একেকটি উপন্যাস আর তার হাসি-কান্নার মুহূর্তগুলো একেকটি ছোটগল্পের প্রেরণা।
 
তার তর্জনি উঁচিয়ে ভাষণ দেওয়া, পাইপ ও চশমার অনন্য মুখচ্ছবি চিত্রকলার বিশিষ্ট উদ্দীপনা। আর তার প্রকৃতি, পশুপাখি ও শিশুদের প্রতি মমত্ববোধ শিশু-কিশোর সাহিত্যের উৎস। এভাবে দেখলে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রভাব ভেতর থেকে উদঘাটন করা সম্ভব।
 
জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান কতটা সাহিত্যপ্রেমিক ছিলেন তা তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটির দিকে তাকালেই বোঝাযায়। তিনি ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের পরপরই কাজী নজরুল ইসলামকে অনুরোধ করে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তিনি ১৯৭২ সালের ২৫ মে ঢাকায় কবি নজরুলের বাসায় যাওয়ার সময় ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর থেকে বের হয়ে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি করতে করতে পথ হেঁটেছেন। তিনি আব্বাসউদ্দীনের ভাটিয়ালি গান শুনে মুগ্ধ হয়েছেন এবং এই কণ্ঠশিল্পীর বাংলা ভাষা রক্ষার আকুতিতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামে অবদান রাখেন। তিনি রাষ্ট্রনায়ক হয়েও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে ‘স্যার’ সম্বোধন করতেন।
 
বঙ্গবন্ধুর জীবনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ছিল বেশ। রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতাই কণ্ঠস্থ ছিল তার। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারির ভাষণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বঙ্গমাতা’ কবিতার পঙক্তি, ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী,/রেখেছো বাঙালি করে মানুষ কর নি’ এবং ১৯৭২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কোলকাতায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করেছেন। ‘নিঃস্ব আমি রিক্ত আমি’ এবং ‘নাগিনীরা দিকে দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস’ তার কণ্ঠে সেদিন উচ্চারিত হয়েছিল। তার অন্তর দখল করে রেখেছিলেন বিশ্বকবি।
 
রাজনৈতিক জীবনে দুঃখ-দৈন্য-সংকটে আবৃত্তি করতেন, ‘বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর প্রার্থনা’ কিংবা ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে…’ বহুল পরিচিত চরণসমূহ। জেলে যাওয়ার সময় ‘সঞ্চয়িতা’ হাতে তুলে নিতেন। বোঝা যায় একমাত্র সঙ্গী বা অনুপ্রেরণা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলা একাডেমি আয়োজিত ১৯৭২ সালের ৮ মে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীতে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে লক্ষ লক্ষ প্রাণ ও অপরিমেয় ত্যাগের বিনিময়ে। কিন্তু সত্য, শ্রেয়, ন্যায় ও স্বাজাত্যের যে চেতনা বাঙালি কবিগুরুর কাছ থেকে লাভ করেছেন, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে তারও অবদান অনেকখানি। বাঙালির সংগ্রাম আজ সার্থক হয়েছে। বাঙালির রবীন্দ্র-সম্মাননার চেয়ে বড় কোনও দৃষ্টান্ত আমার জানা নেই।’
 
বঙ্গবন্ধু বেঁচেছিলেন মাত্র ৫৪ বছর। এর মধ্যে প্রায় এক যুগ কেটেছে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে। বিস্তর কারাবাস এবং পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের বিভিন্ন অত্যাচারও এই আপসহীন নেতার মনোবল ভাঙতে পারে নি। জেলজীবনকেও তিনি অত্যন্ত সৃষ্টিশীলভাবে ব্যবহার করেছেন। তার রচনাসম্ভার মূলত জেলজীবনেরই সৃষ্টি।
 
তিনি তার দ্বিতীয় বই কারাগারের রোজনামচায় জেলের নানা পরিভাষা, রীতি-কেতা, নিয়মকানুন যে অভিনিবেশ ও নিষ্ঠার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তিনি জেলের দুঃখকষ্টের কথা বলেছেন, তার মধ্যেই আবার বাগান করা, রান্নাবান্না, অন্য রাজবন্দীদের খোঁজখবর নেওয়া এবং বিভিন্ন মেয়াদের অন্য কয়েদিদের স্বভাব, আচরণের যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিবরণ তুলেছেন তা সত্যিই বিস্ময়কর।
 
রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও বঙ্গবন্ধু কাজী নজরুল ইসলাম, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, শওকত ওসমান, শহীদুল্লাহ কায়সার, জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল প্রমুখের লেখা পছন্দ করতেন। শুধু সাহিত্য নয় পছন্দ করতেন চিত্রশিল্পীও। ♦
 
 
 
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension