প্রতিক্রিয়ামুক্তমত

‘বিজয়া’ নাটকের পেছনে অন্য কোনও ‘নাটক’ নেই তো?

শি তাং শু   গু হ


বাংলাদেশে পুজার নাটক ‘বিজয়া’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক চলছে। বয়কটের ডাক দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এটি ‘লাভ-জ্বিহাদ’কে উস্কে দিচ্ছে। ঘটনা সেই পুরনো, হিন্দু নায়িকা, প্রেমিক নায়ক মুসলিম। দেশের বিনোদন জগতে এর চাহিদা ব্যাপক। নিন্মমানের নির্মাতারা এ ধরণের ‘কাতুকুতু দেয়া’ নাটক বা সিনেমা তৈরী করে ‘টু-পাইস’ কামায়। ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ এ নিয়ে একটি স্টোরি করেছে, তাতে বলা হয়েছে, নাটকের নাম ‘বিজয়া।’ নির্মাণ করছেন আবু হায়াৎ মাহমুদ। বাংলাদেশের নাটক ভালো, সুনাম আছে। বাংলাদেশ প্রতিদিন ‘শো বিজ’ প্রতিবেদকের ভাষায় নাটকের মূল বক্তব্য হচ্ছে, বিশ বছর বড় প্রভাবশালী স্বামী হরিদাসের নিষ্ঠুর আচরণে বিজয়া ভেঙে পড়লেও একসময় জীবনকে সহজভাবে মেনে নেয়। এরমধ্যে তার ভালোবাসার মানুষের বিয়ে হয়ে যায়। বিজয়াকে নিজের করে না পেলেও নায়ক রাশেদ তাকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়। নির্মাতা সূত্রে জানা যায়, নাটকটি বাংলাভিশনের জন্যে নির্মিত হচ্ছে।

এই নাটকের লেখক শোয়েব চৌধুরী। তিনি কি সাপ্তাহিক ব্লিজ সম্পাদক সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী ওরফে শোয়েব চৌধুরী, বা সালাহ চৌধুরী? ধারণা করি এরা সবাই একই ব্যক্তি এবং যদি তাই হয়, তবে বুঝতে হবে, ঢাকার নাটকের বারোটা বাজতে আর বেশি বাকি নেই। আমি তাকে চিনি। ২০০১-র পর ওয়াশিংটনে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে একটি অনুষ্ঠানে তাঁর সাথে পরিচয় ‘উইকলি ব্লিজ’ সম্পাদক হিসাবে। তার সাথে ছিলেন ড. রিচার্ড বেঙ্কিন, এই ভদ্রলোকের ঘাড়ে ভর করে শোয়েব চৌধুরী অনেকটা উপরে উঠে যান, যদিও এখন এদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। কেন? এর কারণ উইকিপিডিয়া থেকে বলছি। নাটক নিয়ে পরে কথা বলব। শুধু এটুকু বলা যায়, শোয়েব চৌধুরী যেই নাটকের রচয়িতা সেটি সাম্প্রদায়িক ধ্যানধারণা থেকে উৎসারিত, তা বলা বাহুল্য। আর যদি এই শোয়েব চৌধুরী ব্লিজ সম্পাদক সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী না হন, তবে তার সম্পর্কে আমার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। ভালো খবর যে, বাংলাভিশন নাকি নাটকটি দেখাবে না।

উইকিপিডিয়া বলছে, সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী ২৯ নভেম্বর ২০০৩’এ ঢাকা বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার হন। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও অন্যান্য চার্জ গঠন করা হয়। মামলায় বলা হয় তিনি ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ এজেন্ট। ৯ জানুয়ারী ২০১৪ আদালত তাকে ৫০৫(এ) ধারায় দণ্ডিত করে। ২০১১’র মার্চ মাসে ‘দি রুট্ এন্ড ব্রাঞ্চ এসোসিয়েশন’ যা ইসরাইল ও অন্যান্য জাতির সাথে সহযোগিতা করে থাকে, এই সংগঠন এদের ‘ইসলাম-ইজরাইল’ ফেলোশিপ পদ থেকে শোয়েব চৌধুরীকে বহিষ্কার করে। কারণ, ইতোমধ্যে বিভিন্ন রিপোর্ট বেরিয়েছে যে, শোয়েব চৌধুরী ইহুদী মহিলা থেকে হাজার হাজার ডলার আত্মসাৎ করেছেন। ৭ নভেম্বর ২০১২ ঢাকা কোর্ট আর এক আত্মসাৎ মামলায় তাকে জেলে পাঠায়। এই মামলাটি করেন তারই পার্টনার বাংলাদেশ সেন্টার অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন। ২০১৫ সালে এই মামলায় তিনি চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।

শুধু কি এসব কারণেই বলছি যে, ‘শোয়েব চৌধুরী যেখানে, সাম্প্রদায়িকতা সেখানে’? না! মামলার ব্যাপারে শোয়েব চৌধুরী নিজেও বলেছেন, এসব নাকি উদ্দেশ্য প্রণোদিত। উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, শোয়েব চৌধুরী ছিলেন ‘ইনকিলাব টেলিভিশন’-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর। তিনি দৈনিক ইনকিলাবের করেসপন্ডেন্ট ছিলেন। ইনকিলাব টেলিভিশন বিক্রি হয়ে গেলে শোয়েব চৌধুরী ৩০ ভাগ মালিকানার দাবীতে মামলা করেছিলেন, যার মূল্য প্রায় এক মিলিয়ন ডলার। এত টাকা তিনি কোথায় পেয়েছিলেন? ২০০১-র সংখ্যালঘু নির্যাতনের পর তার ভূমিকা দেখেছি। ড. রিচার্ড বেঙ্কিন তাকে ‘অ্যান্টি জেহাদি’ এবং ‘প্রো-ইহুদী’ ভাবমুর্ক্তি গড়ে দিয়েছিলেন। তাকে নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে ‘হাউস রেজুলেশন ৬৪’ পাশ হয়েছিল। তার একটি মামলা বিচারকালে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস ‘পর্যবেক্ষক’ পাঠিয়েছিল। ইউরোপিয় পার্লামেন্ট ১৪ নভেম্বর ২০০৬ তার পক্ষে প্রস্তাব পাশ করেছিল। অনেক দেশের বিভিন্ন সংস্থা তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। এখন আর কেউ নেই, সবাই কেটে পড়েছেন। শোয়েব চৌধুরী কি তাই নাট্যজগতের ওপর ভর করলেন। দেশে নাট্যাঙ্গনে লেখকের কি এতই অভাব?

এবার দেখা যাক ‘বিজয়া’ নাটকটি কি। বলা বাহুল্য, নাটকটি এখনও প্রদর্শিত হয় নি। কিছু মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে যেটুকু এসেছে, তাই থেকে বলা যায়, এর কাহিনী একটি হিন্দু মেয়ের সাথে একটি মুসলিম ছেলের প্রেম। বলতে মানা নেই, বিজয়ার বেশে তিশাকে চমৎকার মানিয়েছে। বিজয়ার হিন্দু স্বামীকে মদ্যপ, বয়স্ক, নিষ্ঠূর, বোকা হিসাবে দেখানো হয়েছে। নায়ক রাশেদ চরিত্রকে দেখানো হয়েছে দেবতাতুল্য! কিছু হিন্দু বলছেন, এটি ‘লাভ-জেহাদ’ উস্কানি। এরা নুসরাত ইমরোজ তিশাকে নাটক থেকে সরে আসার আহবান জানাচ্ছেন। এরা প্রশ্ন করছেন, ঈদের অনুষ্ঠানে কি একটি হিন্দু ছেলের সাথে একটি মুসলিম মেয়ের প্রেম দেখাতে পারবেন? প্রশ্ন উঠছে, ‘ক্রাউন এন্টারটেইনমেন্ট’ কি সরকার ও হিন্দুদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করতে চাইছেন? স্মর্তব্য যে, ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনে কিন্তু ‘শেখ হাসিনা বিরোধী’ কর্মকান্ড দেখা গেছে। ‘বিজয়া’ নাটকের পেছনে অন্য কোনও নাটক নেই তো? নির্মাতা, প্রযোজক, পরিচালক কি দায় এড়াতে পারেন? আপনাদের কেন সাম্প্রদায়িক বলা হবে না?

সাপ্তাহিক ব্লিজ-এ ৯ অক্টোবর একটি খবরে বলেছে, ইস্কন ও রেডিক্যাল হিন্দুরা ‘বিজয়া’ নাটক বন্ধের দাবী জানাচ্ছে। এখানে ইস্কন এল কোত্থেকে? ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়?’ এই পত্রিকাটি এ ধরণের নিউজ সচরাচর কোনও হিন্দু নারীর নামে প্রকাশ করে, ২০০১-র পরও তাই দেখেছি। প্রশ্ন হলো, ওসব নারী কি আদতেই আছেন, না সম্পাদক প্রয়োজনের তাগিদে এদের সৃষ্টি করেন? সময় নিউজ টিভি একটি ফালতু সংবাদ প্রকাশ করে বলেছে, কারা নাকি প্রযোজক, নির্মাতা, নায়ক-নায়িকাকে হুমকি দিচ্ছে। এই নাটক নিয়ে উকিল নোটিশ হয়েছে। হয়ত মামলাও হবে। সাংস্কৃতিক জগতের মানুষগুলোকে একটু উদার হতে হয়। সবাই অনন্ত জলিল হলে কি চলবে? বাংলাদেশের বিনোদন জগতকে টিকে থাকতে বা সামনে এগিয়ে নিতে হলে এটি ‘ধর্মমুক্ত’ রাখা দরকার। সবশেষে বলা যায়, যেহেতু নাটকটি এখনও প্রদর্শিত হয় নি, তাই সুযোগ আছে, এটি সামান্য এদিক-ওদিক করে, কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে, একটি নির্মোহ, আনন্দঘন পুজার নাটক হিসাবে প্রদর্শন করার। এতে আখেরে সবার লাভ। করোনা কালে দেশে এ নিয়ে আবার একটি ঝামেলা বাধুক তা কেউ চায় না।❐

লেখক: নিউ ইয়র্ক প্রবাসী

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension