বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদের সাক্ষাৎকার

এম এ খালেক: আওয়ামী লীগ নির্বাচনের আগে একটি চমৎকার ইশতেহার প্রদান করেছে। এতে অর্থনৈতিক ইস্যুগুলো বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। আওয়ামী লীগের এ ইশতেহারে যে সব অর্থনৈতিক কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে, সেগুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
 
ড. নাজনীন আহমেদ: প্রথমেই আমাদের মনে রাখতে হবে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহার প্রকাশ করে থাকে। এটা নতুন কোনও বিষয় নয়। রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়ে ভবিষ্যতে জনকল্যাণে কি কি কাজ করবে, তা ইশতেহারের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ভোটাররা ইশতেহারের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর ভবিষ্যৎ কর্মসূচি সম্পর্কে জানতে পারে। নির্বাচনি ইশতেহার ভোটারদের ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি অনেকটাই প্রভাবিত করে থাকে। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়, তখন তারা নিজস্ব পলিসি অনুসারে কাজ করে থাকে। তাদের দলীয় নীতি বা আদর্শের প্রতিফলন ঘটে থাকে বার্ষিক বাজেটের মধ্যে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আগামী ৫ বছরের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হতে যাচ্ছে। তারা বিগত ১০ বছর যেহেতু ক্ষমতায় ছিল, তাই তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে বিগত দিনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতাই প্রাধান্য পেয়েছে। কাজেই সরকার যদি তাদের চলমান বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে থাকে, তাহলে ইশতেহারে বর্ণিত অনেক অঙ্গীকার এমনিতেই পূরণ হবে। সে কারণেই আমি মনে করি, চলতি অর্থবছরের বাজেটে যে সব পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করা আছে, সেগুলোকে আগামী ৬ মাসে সঠিকভাবে নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নের জন্য এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। এটা করা হলে তাদের ইশতেহারে বর্ণিত অনেকগুলো কার্যক্রমের বাস্তবায়নের সূচনা হবে। যেমন, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। গত অর্থবছরে যেহেতু এর চেয়ে বেশি মাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, তাই আমি মনে করি চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যেভাবে এগিয়ে চলেছে, তাতে নির্ধারিত জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে বলে মনে হয় না। চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা যদি অর্জিত হয়, তা হলে ইশতেহারে বর্ণিত আগামী ৫ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে এতে কোনই সন্দেহ নেই। সরকার যেসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তার মধ্যে কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এ বছর কিছু টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই টার্গেট যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি, তা হলে সার্বিকভাবে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের যে টার্গেট নির্ধারিত আছে তা অর্জন করা সম্ভব হতে পারে। ২০১৯ সালকে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছে। এটা যদি অর্জন করা যায়, তা হলে ইশতেহারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে আমরা অনেকটাই এগিয়ে যাব। অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া বা বিনিয়োগ বাড়ানোর অঙ্গীকার বাজেটেই রয়েছে। কাজেই এটা অর্জিত হলে ইশতেহারের লক্ষ্যমাত্রা অনেকটাই পূরণ হবে। আমি বলতে চাই, গত ১০ বছর অর্থাৎ দুই টার্ম ধরে যে সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আছে, তারাই নতুন করে সরকার গঠন করছে। কাজেই তাদের চলমান যে সব উন্নয়ন প্রকল্প আছে এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় গৃহীত উন্নয়ন কার্যক্রম যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা হলে নতুন সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের বর্ণিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ সুগম করবে। কাজেই সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারকে আলাদা করে দেখার কিছু আছে বলে মনে হয় না।
 
এম এ খালেক: আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে আগামী ৫ বছরের মধ্যে ১ কোটি ২৮ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির কথা বলেছে। এটা কীভাবে সম্ভব হবে বলে মনে করেন?
 
ড. নাজনীন আহমেদ: দেশের শ্রমশক্তির জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থানের ইস্যুটি আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে। ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাটা আমাদের অর্থনীতির জন্য বর্তমানে একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতি বছর ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে চ্যালেঞ্জ সরকার বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে, তার ধারাবাহিকতায় ইশতেহারে আগামী ৫ বছরে ১ কোটি ২৮ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। সঙ্গত কারণেই আমরা জানি যে, এই ব্যাপকভিত্তিক নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কিন্তু সরকার একা তৈরি করবে না। ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার ঘটানোর মাধ্যমেই নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সরকার ব্যবসায়-বাণিজ্য বা বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবে। আর ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগকারী বা ব্যবসায়ীরা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাকাকে চালিত করবে। ফলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে সরকার সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। সরকার কৃষি উপকরণ সময়মতো জোগান দেবে, আর তা ব্যবহার করে কৃষক উৎপাদন বাড়াবে। কৃষি খাতে যদি ফলন বৃদ্ধি পায়, তা হলে সেখানেও নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বর্তমান মুহূর্তে কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই আমি মনে করি, সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অত্যন্ত ভালো একটি কাজ করেছে। কারণ কর্মসংস্থানের সঙ্গে অর্থনীতির আরও অনেক খাত যুক্ত। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা না গেলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সুকঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ব্যক্তিখাতের ব্যবসায়-বাণিজ্যের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে। সরকার কখনোই ভালো ব্যবসায়ী হতে পারে না। সরকার শুধু ব্যবসায়-বাণিজ্যের উপযুক্ত পরিবেশ এবং সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পারে। ব্যক্তিখাতের উদ্যোক্তারা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নসাধন করবেন, এটাই প্রচলিত রীতি। কাজেই আগামীতে সরকারকে এমন সব নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে, যা দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিবেশকে আরও উন্নত করতে সহায়তা করে। ব্যবসায়-বাণিজ্যের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তাৎক্ষণিকভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ব্যবস্থা করা জরুরি। আগামীতে কোনও কারণেই যেন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিপন্ন না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূল না হলে ব্যবসায়-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হতে পারে না। কোনো কারণে ব্যবসায়-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ বিঘ্নিত বা বিপন্ন হলে, তা নিশ্চিতভাবেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পথ রুদ্ধ করবে। ব্যবসায়-বাণিজ্যের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আমাদের দেশের অবকাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। এ সমস্যা দূরীকরণের জন্য ইতিপূর্বে গৃহীত মেগা প্রকল্পসমূহ দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের যে টার্গেট আছে, তা যথাযথভাবে পূরণ করতে হবে। এটা করা গেলে তা আমাদের ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিবেশকে উন্নত করবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাকাণ্ডে গতিশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাই আমাদের এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা যদি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি গতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারি, তা হলে আগামীতে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। আগামী ৫ বছরে নতুন করে ১ কোটি ২৮ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা তেমন একটা কঠিন হবে বলে মনে হয় না।
 
এম এ খালেক: নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে উপযুক্ত শিক্ষার গুরুত্ব কতটুকু বলে মনে করেন?
 
ড. নাজনীন আহমেদ: আগামীতে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতিশীল হলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে দেশের বাইরেও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। ট্রেডভিত্তিক কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে হবে। যে কাজের জন্য যে ধরনের জনশক্তির প্রয়োজন, সেই ধরনের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। বিদেশে জনশক্তি রফতানির বিপরীতে আয় বাড়ানোর জন্য আমাদেরকে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি প্রেরণের উদ্যোগ নিতে হবে। অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত জনশক্তি রফতানি করার ফলে এ খাতে আমাদের আয় সেভাবে বাড়ছে না। দেশের বিভিন্ন স্থানে জনশক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য সরকারিভাবে সহায়তা করা যেতে পারে।
 
এম এ খালেক: নির্বাচনি ইশতেহারে দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দারিদ্র্যের হার প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। অতি দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে বলে অঙ্গীকার করা হয়েছে। এটা কীভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে বলে মনে করেন?
 
ড. নাজনীন আহমেদ: আমি মনে করি, আমরা যদি আগামীতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিতকরণের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারি, তা হলে দারিদ্র্য বিমোচনে সফলতা অর্জন করা সম্ভব। দারিদ্র্য বিমোচন হয় যখন মানুষের আয় বাড়ে। আর মানুষের আয় বাড়ে তখনই, যখন কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত হয়। কাজেই বলা যায়, দারিদ্র্য বিমোচনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গটি। যদিও কর্মসংস্থানই দারিদ্র্য বিমোচনের একমাত্র উপায় নয়। দারিদ্র্য বিমোচন করতে হলে এখন যারা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে আছেন, তাদের বিষয়ে আরও বেশি পরিমাণে মনোযোগ দিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কর্মমুখী শিক্ষা বিস্তারের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ আমাদের এমন শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, যা মানুষকে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা প্রদান করে। বর্তমান সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা কোনভাবেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। কর্মমুখী শিক্ষার জন্য কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। আমাদের অর্থনীতিতে যে ধরনের শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে, আমাদের সেই কাজের উপযোগী জনবল তৈরি মতো শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা যেমন পাওয়া যাবে, তেমনি দেশও প্রশিক্ষিত ও উপযুক্ত শ্রমশক্তি পাবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি প্রদানের মাধ্যমে কখনোই বেকার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। বেকার সমস্যা সমাধানর জন্য ব্যক্তিখাতের বিকাশ ঘটাতে হবে।
 
এম এ খালেক: নির্বাচনি ইশতেহারে প্রথমবারের মতো বলা হয়েছে, শহরের সুবিধা গ্রামে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা কীভাবে সম্ভব বলে মনে করেন?
 
ড. নাজনীন আহমেদ: আওয়ামী লীগ সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে পরিকল্পনা বা কার্যক্রম, সেটার শহরের সুবিধা অনেকটাই গ্রামে নিয়ে যাওয়ার পথকে উন্মুক্ত করেছে। শহরের সুবিধা গ্রামে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে খাতটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে, তা হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। ইতোমধ্যেই গ্রামীণ সমাজে যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক উন্নয়ন ঘটেছে। গ্রামীণ অর্থনীতি সাম্প্রতিক সময়ে অনেক উন্নত হয়েছে। এ উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত এবং গতিশীল করতে হলে সড়ক যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিকে গ্রামে আরও সহজলভ্য করতে হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আমাদের দেশের গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। এমন গ্রাম খুব কমই আছে, যেখানে রাস্তাঘাট নেই। এসব রাস্তাঘাটকে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, বিশেষ করে মোবাইল ফোন, মোবাইল ব্যাংকিং এখন গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। গ্রামে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছানোর ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। আগামীতে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি গ্রামে সহজলভ্য করতে হবে। আমরা যদি এগুলো করতে পারি, তা হলে আগামীতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে গ্রামগুলো। ইতোমধ্যেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে লক্ষণীয়ভাবে গতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের একটি বিষয় মনে রাখতে হবে তা হলো, শহরের সুবিধা গ্রামে নিয়ে যাওয়ার অর্থ কিন্তু এই নয় যে, আমরা প্রতিটি গ্রামকে শহরে পরিণত করব। গ্রাম গ্রামের মতোই থাকবে। গ্রামের সেই মায়াবী পরিবেশ অক্ষুণ্ণ থাকবে। গ্রাম বলতে আমরা যে পাখি ডাকা, ছায়া ঢাকা একটি জনপদকে বুঝি- সেটা অক্ষুণ্ণ রেখে গ্রামের উন্নয়ন ঘটাতে হবে। গ্রামে আধুনিক সব সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আধুনিক এবং যুগোপযোগী করতে হবে। গ্রামের মানুষ হাত বাড়ালেই যাতে শহরের মতো আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। ডাক্তাররা গ্রামে থাকতে চান না। তারা যাতে গ্রামে থাকেন সেই ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামের চিরকালীন শান্ত পরিবেশ, নদ-নদী, খাল-বিল নষ্ট না করে উন্নয়ন ঘটাতে হবে। গ্রামের মানুষ যদি গ্রামে বসেই শহরের সুবিধা পেতে পারে, তা হলে তাদের মাঝে শহরে আসার প্রবণতাও কমে যাবে। গ্রামে যে তথ্যকেন্দ্রগুলো আছে, তাকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করতে হবে। রাস্তাঘাট যাতে সারা বছরই ভালো থাকে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামীণ পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখে সেখানে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারিত করতে হবে। যদি ভালো শিক্ষাসেবা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়- তা হলে শহরের অনেক সুবিধা গ্রামে বসেই পাওয়া যাবে। আমাদের শহর এবং বড় বড় নগর যেভাবে অপরিকল্পিত উপায়ে গড়ে উঠছে, গ্রাম যেন সেভাবে গড়ে না ওঠে তার ব্যবস্থা করতে হবে। গ্রামের কৃষিজমি এবং জলাশয়গুলো যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। গ্রাম এবং উপশহর ঘিরে পরিকল্পনা থাকতে হবে- কোথায় বাড়িঘর করা যাবে কোথায় যাবে না। পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা কেমন হবে, তাও বিবেচনায় রাখতে হবে। আমি মনে করি, গ্রামীণ পরিবেশ ঠিক রেখেও শহুরে সুবিধা গ্রামে সম্প্রসারিত করা সম্ভব। সেটাই করতে হবে। গ্রামে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে সেখানে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। গ্রামীণ জীবনে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগবে। গ্রামের কাছাকাছি উপশহরে অ্যাগ্রো প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ গ্রামে যে সব কৃষিসামগ্রী উৎপাদিত হয়, তা যাতে প্রক্রিয়াকরণ করা যেতে পারে তার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গ্রামীণ কৃষিব্যবস্থা যান্ত্রিকায়নের কথা বলা হয়েছে। এ মুহূর্তে কৃষি যান্ত্রিকায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। অনেকেই মনে করেন, কৃষি যান্ত্রিকায়ন করা হলে কৃষি খাতে উদ্বৃত্ত শ্রমিকের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। কৃষি খাতে যে উদ্বৃত্ত শ্রমিকের সমস্যা সৃষ্টি হবে, তা নিরসনের জন্যই অ্যাগ্রো প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে হবে।
 
এম এ খালেক: নির্বাচনি ইশতেহারে দুর্নীতির ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্নীতি ও অনিয়মের কথাটি সেভাবে আসেনি। বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করবেন কি?
 
ড. নাজনীন আহমেদ: বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, এটা কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। তারপরও বলতে হয়, অর্থনীতির যে জায়গাগুলোতে দুর্বলতা রয়েছে তার মধ্যে সবার আগে উল্লেখ করতে হয় ব্যাংকিং খাতের কথা। শুধু ব্যাংকিং খাতই নয়, আসলে পুরো আর্থিক খাতই এক ধরনের সমস্যার মধ্যে রয়েছে। সরকার যদি এ মুহূর্তে আর্থিক খাতের দুর্বলতা নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ না করে, তা হলে তাদের অনেক উদ্দেশ্য বা পরিকল্পনাই বিঘ্নিত হতে পারে। ব্যাংকিং খাত সঠিকভাবে না চললে ব্যক্তিখাতের বিকাশ কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হতে পারে না। ব্যাংকিং খাতের সাপোর্ট না পেলে ব্যক্তিখাতের উত্থান ঠিকমতো হবে না। ব্যাংকিং সেক্টরে যদি প্রচুর খেলাপি ঋণ থাকে অথবা সুদের হার বেশি থাকে, তা হলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা সমস্যায় পড়বে। ব্যাংকিং সেক্টর সুশৃঙ্খল অবস্থায় না থাকলে কোনোভাবেই ব্যবসায়-বাণিজ্যের পরিবেশ ভালো থাকতে পারে না। এ দিকের প্রতি সরকারকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন আদালতে ব্যাংকিং খাতের যে সব অনিষ্পন্ন মামলা আছে, তা দ্রুত নিষ্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা যেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *