বিনোদনমঞ্চনাটক

ভালোবাসা আর বৈষম্যহীনতার গল্প থিয়েটারের ‘নিখাই’

মুবিন খান

সোমবার ৪ মার্চ সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে মঞ্চায়িত হয়ে গেল থিয়েটারের ৩৪তম প্রযোজনা ‘নিখাই’ নাটকটির ৫৬তম মঞ্চায়ন। নাটকটি রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন গাজী রাকায়েত। গাজী রাকায়েত ‘নিখাই’ নাটকটির মূল্যায়নে বলেন, পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে মানুষের সঙ্গে মানুষের যে ব্যবধান সেটাকে ঘোচাতে হবে—এর কোনও বিকল্প নেই। আর বৈষম্যহীনতা মানবিকতাকে ধারণ করেই এ নাটকের গল্প।

ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলাদেশের কোনও এক গ্রামে এক নারী সম্প্রদায়কে ‘নিখাই’ বলা হতো। পদ্মা পারের সম্ভ্রান্ত ভূঁইয়া বাড়ির রীতি ছিল তারা বিয়ের আগে গরীব কোনও মেয়েকে বিয়ে করত যেন বিয়ের পর বউকে কোনও ধরনের কাজ করতে না হয় । এই মেয়ে সারাজীবন গৃহকর্মী হিসেবেই নিগৃহীত হত। এই গৃহকর্মীর কোনও ছেলে সন্তান জন্ম নিলে মেরে ফেলা হত। অথবা এমনভাবে নির্যাতন করা হতো যার ফলে সে ছেলে মানসিক বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়ত। আর মেয়ে সন্তান যদি হতো, এই মেয়ে সন্তানেরাই নারী হয়ে উঠতে উঠতে ‘নিখাই’ নামে পরিচিত হতো। কেননা এই নারীদের জন্ম সেখানকার উঁচু বংশের গেরস্ত বাড়ির গৃহকর্মীর গর্ভে। ফলে তাঁরা কোনও উত্তরাধিকার তো নয়ই, কোনরকম সামাজিক স্বীকৃতিই পেতেন না। এই নারীরা এক ধরনের হীনমন্যতা ও পরিচয় সঙ্কটে ভুগতেন। এমনিতেই সামাজিকভাবে বাংলাদেশের নারীরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেন। আর অস্তিত্বের এমন সঙ্কট নিখাইদেরকে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করে তুলত। যার ফলে তাঁরা অন্তরালের বাসিন্দা হয়েই থাকতে চাইতেন; থাকতেনও।

নিখাই নারীদের বিয়ে করবার ক্ষেত্রে এক ভিন্নরকম সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো। সমান সামাজিক মর্যাদার পাত্ররা তাঁদেরকে বিয়ে করতে চাইতেন না, অন্যদিকে তাঁরাও সামাজিক কারণেই তাঁদের চাইতে কৃষক বা নিচু সামাজিক মর্যাদার পুরুষদেরকে বিয়ে করতে পারতেন না। এ এক অদ্ভুত আর আরোপিত সঙ্কট। বোধকরি একই বলে উভয় সঙ্কট। যার ফলে নিখাই নারীরা সংসারী হতে চাইতেন না। বিয়ে করতে চাইতেন না।

এই নিখাইদের প্রতিনিধি একজন নিখাইয়ের গল্পই বলেছেন গাজী রাকায়েত। একটা ভালোবাসার গল্প। ব্রিটিশ শাসনামলে এক স্টিমার ঘাটে গল্পের শুরু। ঘাটে হাজারও মানুষের আনাগোনা। আপনাপন প্রয়োজনে নিত্য যাওয়া আসা তাদের। থাকেন না কেউই। কেবল এক বৃদ্ধ ছাড়া। স্টিমার ঘাটটাকে আঁকড়ে পড়ে থাকেন ওই বৃদ্ধ। এক মুহূর্তের জন্যে যান না কোথাও। যান নি গেল দশ বছরেও। একদিন হঠাৎ মাঝরাতে ব্রিটিশ সরকারে এক দারোগা তার স্ত্রীকে নিয়ে আসেন সে ঘাটে। নদী পেরুতে হবে তাদেরকে। ভীষণ জরুরি। কিন্তু পার করে দেওয়ার মতো কোনও মাঝি নেই। অপেক্ষা করতে হয় তাদের। পরিচয় হয় ওই বৃদ্ধের সঙ্গে। আলাপ হয়। তারপর ঘটতে থাকে নানা ঘটনা। বেরিয়ে আসে গল্প। বেরিয়ে একজন মানুষের জন্মের ইতিহাস। এভাবেই এগিয়ে যায় আত্মপরিচয়-সন্ধানী চিরকালীন ভালোবাসার গল্প ‘নিখাই।’

গাজী রাকায়েত একই সঙ্গে ‘নিখাই’ নাটকটি রচনার পাশাপাশি মঞ্চায়নে নির্দেশনা দিয়েছেন। চমৎকার মঞ্চ এবং পোশাক সজ্জার দায়িত্বটিও নির্দেশক ও নাট্য রচয়িতা গাজী রাকায়েত নিজেই পালন করেছেন। মঞ্চ নাটকটির বিভিন্ন চরিত্র রূপদান করেছেন- রফিকুল ইসলাম রফিক, প্রবীর দত্ত, ইউশা আনতারা প্রপা, তৌহিদুল ইসলাম বাদল, মোশাররফ। প্রত্যেকেই নিজের নিজের চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে দারুণ পরিশ্রম করেছেন। বলাবাহুল্য তাদের সে পরিশ্রম সার্থকও হয়েছে। নেপথ্য কন্ঠ দিয়েছেন  শংকর সরকার প্রমুখ। আলো ব্যবস্থাপনায় ছিলেন শামীম আহমেদ। এবং শব্দ নিয়ন্ত্রণে ছিলেন শাহরিয়ার ইসলাম।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension