আঞ্চলিকবাংলাদেশ

মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার তদন্ত শুরু

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারীতে মানসিকভাবে অসুস্থ আবু ইউনুস মো. সহিদুন্নবী জুয়েলকে পিটিয়ে ও পরে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ও প্রশাসন।

ঘটনা তদন্তে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। লালমনিরহাটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট টিএমএ মমিনকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মো. আবু জাফর শুক্রবার বলেন, কমিটির বাকি দুই সদস্য হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম ও পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেগম কামরুন্নাহার। তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। সন্ধ্যায় তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা আলামত সংগ্রহ করছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে। ১ নভেম্বর তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগসহ (সিআইডি) বিভিন্ন সংস্থাও মাঠে নেমে তদন্ত শুরু করেছে বলে লালমনিরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম জানান।

এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তির সঙ্গে থাকা যুবককে হেফাজতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানায় পুলিশ।

নিহত আবু ইউনুস মো. সহিদুন্নবী জুয়েলের শ্যালক মিলন হক তালুকদারের সঙ্গে শুক্রবার বিকেলে পাটগ্রাম থানা কম্পাউন্ডে কথা হলে তিনি জানান, তার দুলাভাই একজন সৎ এবং ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

তিনি জানান, নিহত সহিদুন্নবী জুয়েল রংপুর শহরের শালবন মিস্ত্রী পাড়ার আবু ওয়াজেদ মিয়ার ছেলে। তিনি রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের গ্রন্থাগার বিভাগে ২০১৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি থেকে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। জুয়েলের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, নিহত জুয়েল দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (অব.) সাইকিয়াট্রি ডা. রফিকুল ইসলামের কাছে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

আহত ব্যক্তিও রংপুর নগরীর বাসিন্দা। ওই ব্যক্তি বৃহস্পতিবার জানিয়েছিলেন, তিনি তার ব্যক্তিগত কাজে বুড়িমারী এসে মারধরের শিকার হয়েছেন।

শুক্রবার সরেজমিন ঘটনাস্থল পাটগ্রামের বুড়িমারীতে গিয়ে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার আসরের নামাজ শেষে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় বাজার জামে মসজিদে সহিদুন্নবী জুয়েলের বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে ভেতরে এবং বাইরে থাকা মুসল্লীরা তার ওপর চড়াও হয়। এ খবর মুহূর্তে বাইরে ছড়িয়ে পড়লে বুড়িমারী বাজারের লোকজন মসজিদের দিকে ছুটতে থাকেন।

এ সময় স্থানীয় বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাফিজুল ইসলাম নিহত জুয়েলসহ আরেক ব্যক্তিকে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদে নিরাপদে সরিয়ে নেন। এরপর বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদে শত-শত লোক উপস্থিত হয়ে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পাটগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ ও বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তারা উপস্থিত হয়ে বিক্ষুব্ধ মানুষকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হয়নি। এ সময় বিক্ষুব্ধ স্থানীয়রা বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের ভবনের গ্রিল ও দরজা ভেঙে জুয়েলকে মারতে মারতে বাইরে নিয়ে আসে। এরপর তাকে রশিতে বেঁধে টেনে নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাঁচ শ’ গজ দূরে জয় ট্রেডার্সের সামনে প্রথম বাঁশকল এলাকায় পেট্টল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে।

পুলিশ জানায়, তারা এ সময় অপর আহত এক ব্যক্তিকে আহত অবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে উদ্ধার করে। এরপর বিক্ষুব্ধরা ইউনিয়ন পরিষদে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে সেখানে অগ্নিসংযোগ করে। তারা একটি মোটরসাইকেলে আগুন দেয়।

বৃহস্পতিবার রাতে লালমনিরহাট জেলার পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা জানান, তিনি শুনেছেন বুড়িমারী কেন্দ্রীয় বাজার জামে মসজিদে মোটরসাইকেল নিয়ে দুজন ব্যক্তি আসরের নামাজ পড়তে আসেন। নামাজ শেষে কোনও কারণে তাদের সঙ্গে মসজিদে যারা ছিল, তাদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তখন অনেক লোকজন জড়ো হয়ে যায়। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের একজন মেম্বার তাকে নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের একটা রুমের মধ্যে আটকে রাখে। পরে পুলিশের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ আসতে আসতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অনেক লোক জড়ো হয়ে ইউনিয়ন পরিষদের গ্রিল ভেঙে বিভিন্ন দিক দিয়ে লোকজন ঢোকে।

পুলিশ সুপার বলেন, দু জন ছিল। ওসি একজনকে সরিয়ে নিয়ে যান। আরেকজনকে তারা ওইখানে পিটিয়ে মেরেছে। লাশটা তারা নিয়ে যায় এবং আগুনে পুড়িয়ে দেয়।

জানতে চাইল বুড়িমারী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাফিজুর রহমান শুক্রবার গণমাধ্যমকে বলেন, উত্তেজিত মানুষের হাত থেকে রক্ষা করতে ওই দুই ব্যক্তিকে ইউনিয়ন পরিষদে এনে তালা বন্ধ করে রেখে ইউএনও, উপজেলা চেয়ারম্যান, পুলিশ এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে সংবাদ দিই।

বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সাঈদ নেওয়াজ নিশাত বলেন, এমন ঘটনায় আমরা স্তম্ভিত ও ব্যথিত। পরিষদের দেয়াল ও গ্রিল ভেঙ্গে দুষ্কৃতিকারীরা একজনকে বের করে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। তারা ইউনিয়ন পরিষদে ব্যাপক ধ্বংস চালিয়ে পরিষদে আগুন ধরিয়ে দেয়। আমরা পরিষদের পক্ষ থেকে ভিডিও ফুটেজ দেখে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

লালমনিরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম বলেন, উত্তেজিত লোকজন ওই দুই ব্যক্তিকে মসজিদ থেকে বাইরে এনে ঘটনাটি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করলে জনতা আরও উত্তেজিত হয়। পুলিশ পৌঁছলেও ঘটনা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে নি।

তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় পুলিশের ১০ সদস্য আহত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত থানায় কোনও মামলা না হলেও মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। পুলিশ নিহত জুয়েলের দেহভস্ম উদ্ধার করেছে। তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছে।❐

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension