বাংলাদেশবিজয়মুক্তিযুদ্ধ

বিজয়ের কোনো বিকল্প নেই

মুহম্মদ নূরুল হুদা

বাঙালির ইতিহাস এই গাঙ্গেয় অবববাহিকায় মানবজাতির মনোদৈহিক বিবর্তনের বিজয়ের ইতিহাস। এই ইতিহাস শুধু জানা-অজানা দেশি-বিদেশি রাজা-রাজড়ার সামরিক শক্তিপ্রদর্শন বা সিংহাসন-দখল বা প্রজাশাসনের শাসক-নির্দেশিত কিসসা-কাহিনী নয়, এই ইতিহাস তৃণমূলীয় ভূমিপুত্র-কন্যার ব্যক্তিক অস্তিত্ব ও মানুষ হিসেবে টিকে থাকার ইতিহাস। আপন ব্যক্তিসত্তা নিয়ে টিকে থাকার এই শক্তিই সর্বকালে সর্বদেশে সর্ব পরিস্থিতিতে মানুষের মূল শক্তি। বাঙালির বিবর্তনজাত বিজয়ের অনেক যুক্তির মধ্যে প্রধান যুক্তিটি এই যে, স্মরণপূর্ব কাল থেকে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে বাঙালি টিকে আছে নিদেনপক্ষে তার ব্যক্তি পরিচয়ে।

তার প্রথম অস্ত্র তার ভাষা, যা তার মায়ের মুখ থেকে শেখা; দ্বিতীয় অস্ত্র তার সদাচার, আর তৃতীয়টি সংঘবদ্ধতা, যা তার পরিবার বা গোত্র তাকে শিখিয়েছে। প্রথমটিকে আমরা বলি মাতৃভাষা, দ্বিতীয়টি সংস্কৃতি আর তৃতীয়টি সঙ্ঘশক্তি। স্মরণপূর্ব কাল থেকে এই ত্রিশক্তির যৌথ সাহসে এগিয়েছে ব্যক্তি বাঙালি, এগিয়েছে তার মৌন ও অনিবার্য ইতিহাস। এই অগ্রযাত্রায় সে যেমন শ্রমসিদ্ধ, তেমনি ধ্যানবিদ্ধ, আর তেমনি ধানুকী যোদ্ধা। হলকর্ষণ বা জলসন্তরণ থেকে শুরু করে কায়িক বা মানসিক কী না করেছে সে। বিশ্বের যে কোনো অঞ্চলের যে কোনো ব্যক্তি-মানুষের মতো তার মূল লক্ষ্য তার ব্যক্তি-সংসার, পরিবার-সংসার ও সঙ্ঘ-সংসারকে টিকিয়ে রাখা। এটিই তার মূল যুদ্ধ। কালে কালে এই যুদ্ধে তার অস্ত্র ও শস্ত্রের বিবর্তন ঘটেছে। সেই অস্ত্র মাটির ঢেলা থেকে বিস্ফোরক গ্রেনেড বা তৎসদৃশ অন্য কোনো আগ্নেয়াস্ত্রে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তার লক্ষ্য অটুট রয়েছে।

এই লক্ষ্য সেদিনই সুনির্ণীত হয়েছে, যেদিন সে তার পরিচয়কে চিহ্নিত করে তার নামায়নও করেছে। কবে কোন বিস্মৃত অতীতে সেই নামায়ন ঘটেছে, তা এখনও অনির্ণীত। নির্ণীত শুধু লিখিত ইতিহাসের সাক্ষ্য। তার বয়স হাজার বছর বলে অনুমিত। চর্যার কবি ভুসুকু নিজেকে যেদিন ‘বঙালী’ বললেন, সেদিন তার শব্দিত ও লিখিত রূপ উন্মোচিত হল। সেই থেকে আত্মপরিচয় ও আত্মক্তিতে ‘বঙালী’ বিবর্তিত হতে হতে আজকের বিজয়ী বাঙালি। এই পথেই সংগঠিত হয়েছে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের জানা-অজানা সব ধাপ।

এই যুদ্ধের পরিণত ধাপে এসেছে ভাষাযুদ্ধ, সংস্কৃতিযুদ্ধ, গণযুদ্ধ, জাতিযুদ্ধ এবং সবশেষে বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। এই যুদ্ধে অংশ নিয়ে আত্মদান করেছেন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা, সম্ভ্রম হারিয়েছেন অসংখ্য মা-বোন, রক্তবন্যায় প্লাবিত হয়েছে গোটা বঙ্গভূমি। এই অনিঃশেষ আত্মদানের ফলেই অর্জিত হয়েছে বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়। ষোলো ডিসেম্বর ঊনিশশ’ একাত্তরে বাঙালি আন্ষ্ঠুানিকভাবে জয় করেছে জাতিপরিচয় ও রাষ্ট্রপরিচয়। জাতিযোদ্ধা বাঙালি এই যুদ্ধের বিজয়ী নায়ক আর জাতিপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চূড়ান্ত বিজয়ের মহানায়ক ও কারুকৃৎ। এই বিজয় চলবে। তবে এবারের যুদ্ধ বাঙালির সর্বৈব মানবমুক্তির যুদ্ধ। এই যুদ্ধে বিজয়ের কোনো বিকল্প নেই।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কবি

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension