‘যজ্ঞ’ – পঁচিশে মার্চের গল্প

যজ্ঞ

মু বি ন   খা ন

এক.
রাত সাড়ে দশটা। নিউ প্যালেস সিনেমায় লেট নাইট শো চলছে।সিনেমা হল চত্বরটায় ঢুকেই পিচকারীর মত পানের পিক ফেলল হাকিম। তারপর নতুন কেনা শার্টের বুক পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে অনভ্যস্ত ভঙ্গীতে দেশলাই জ্বেলে সিগারেটটা জ্বালল। হাকিম অভ্যস্ত ধুমপায়ী নয়। তবে খুব সৌখিন মানুষ। সৌখিনতার টানে কখনও কখনও সিগারেটের প্যাকেট কিনে শার্টের পকেটে রাখে। রাখতে হাকিমের বড় ভালো লাগে। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে হাকিম মতিনের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল।
 
মতিনের দোকানকে ঠিক দোকান বলা যাবে না। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের দিকে যেতে সদ্য পাকা করা রাস্তার ধারেই নিউ প্যালেস সিনেমা। পাকা রাস্তা থেকে নেমে শ’ দুয়েক গজ হাঁটলেই পৌঁছে যাওয়া যায়। চারপাশে কোনো প্রাচীর নেই। কোনো আড়ম্বর নেই। হঠাৎ চার পাঁচ কাঠা জায়গা জুড়ে একটা ভবন তুলে সিনেমা হল বানিয়ে ফেলা হয়েছে। তারই একটা কোণা ঘেঁষে জলচৌকি পেতে মতিন ডাব সাজিয়ে বসেছে। মতিন পেশাদার ব্যবসায়ী নয়। দিনে ঢাকা শহরে রিকশা চালায়। সন্ধ্যায় এখানে বসে ডাব বেচে।
 
হাকিম এগিয়ে গিয়ে মতিনের সামনে দাঁড়াল। হাতের সিগারেটটাতে কষে একটা টান দিল। তারপর মাটিতে ফেলে স্যান্ডেল দিয়ে পিষতে গিয়ে মনে হল এক জোড়া ডারবি জুতাও কিনে ফেলতে হত। পরেরদিন কেনা যাবে ভেবে মনের ভেতর ডারবি জুতার আফসোসটা চাপা দিতে দিতে হল ভবনের সামনে টানানো বিশাল ব্যানারটার দিকে তাকালো। হাতে আঁকা ব্যানারে নায়ক রাজ্জাক পাশ থেকে কবরীর কাঁধে হাত রেখে কানে কানে যেন কিছু বলছে। রাজ্জাকের বাহু কবরীর বুক ছুঁয়েছে। দেখে হাকিমের খুব মেজাজ খারাপ হল। রাজ্জাক কবরী থেকে সামান্য দুরত্বে নায়ক আজীম দুজনের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আহা! বেচারা! হাকিম নায়ক আজীমের সঙ্গে নিজের কোনো ভেদ খুঁজে পেল না। হাকিম উদাস ভঙ্গীতে মতিনের কাছে জানতে চাইল,
 
-‘আজকা কি বই লাগছে রে মতিন?’
 
আজ রবিবার। রবিবারে নিউ প্যালেস সিনেমায় নতুন সিনেমা ওঠে। সব রবিবারে আসে না অবশ্য। তিন চার সপ্তাহ পর একটা বাংলা সিনেমা এল। মতিন দা হাতে একটা একটা ডাব তুলে মসৃণ করে ক্রেতার উপযোগী করে রাখছিল। হাকিমের প্রশ্নে একবার মাথা তুলে হাকিমকে দেখল, তারপর আবার ডাব মসৃণ করতে করতে বলল,
-‘গায়ের বদু। গেরামের মাইয়ার গল্প। বিরাট দুঃখের রে।’
 
-দুঃখের হইলে তো কানতে হবে। কানলে শরীলেত্ তে পানি বাইর হইয়া যাবে। তাইলে তো শরীলে পানি ভইরা লইতে হবে রে মতিন! দে, একটা ডাব দে। শরীলে পানি ভইরা লই।’
 
মতিন কোনো জবাব দেয় না। ভাবলেশহীনভাবে ডাব ছাঁটতে থাকে। হাকিম আবার বলে,
-‘কিরে মতিন! ডাব চাইলাম ডাব দেস্ না ক্যান!’
 
-‘হ, দিব তরে ডাব। আগের তিনটা ডাবের পয়সা পাই। কালকা দিবি কইয়া গেলি, গিয়া হাওয়া হইয়া গেলি। পনরো দিন কোনো খবর নাই। পনরো দিন পরে আইসা আবার ডাব চাস্!’ মতিনের কন্ঠে উত্তাপ।
 
হাকিমের খুব মেজাজ খারাপ হল। এ তো রীতিমত অপমান! মতিনের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পকেটে হাত ঢোকায় হাকিম। মতিনকে দেখিয়ে একটা ঝাঁকুনি মারে। ঝুনঝুন শব্দে পকেটে রাখা ধাতব মুদ্রাগুলো বেজে ওঠে। পকেট থেকে মুঠো করা হাত বের করে। মুঠো খুলে তালু থেকে বেছে এক পয়সার তিনটা মুদ্রা তুলে ছুঁড়ে দেয় মতিনের লুঙ্গিতে,
-‘এই ল ছয়টা ডাবের দাম। আগের তিনটা, এখনকার দুইটা আর তুই খাবি একটা।’ হাকিমের কন্ঠে অহঙ্কার ঝরে।
 
-‘বাব্বাহ্! আজকার আমদানি দেখা যায় খুব ভালো হইছে রে হাকিম..!’ বলতে বলতে চোখ যায় হাকিমের শার্টের দিক,
-‘…নয়া শার্ট কিনলি নাকি! তরে তো রাজ্জাকের মত দেখাইতেছে! কবরী দেখলে তো তর উপ্রে লাফ দিয়া পড়বে রে হাকিম!’
 

হাকিমের মনটা ভালো হয়ে যায়। ওর মনে হতে থাকে শার্ট কেনাটা সার্থক হয়েছে। চকিতে ডারবি জুতার আফসোসটা আবার উঁকি দেয় মনে। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে খুলে বাড়িয়ে ধরে মতিনের দিকে। এভাবে সিগারেটের প্যাকেট বাড়িয়ে ধরা সে দেখেছে পনেরো দিন আগে দেখা এক উর্দু সিনেমায়। শবনমকে বিয়ে করতে চাওয়া ভিলেন নায়ক রহমানের দিকে এভাবে প্যাকেট বাড়িয়ে ধরেছিল। রহমান সেদিন বাড়িয়ে দেওয়া প্যাকেট থেকে একটা সিগারেটই তুলে নিয়েছিল। বিড়ি ফোঁকা ছোটলোক মতিনের মত তিন চারটা নেয় নি। এরা যে কবে শিক্ষিত হবে! মতিনের জন্যে করুণা বোধ করে হাকিম।

 
 
 
দুই.
হাকিম একজন পকেটমার। বেশি পুরনো নয় অবশ্য। বছর দেড়েক ধরে এই কাজ করছে। আগে ছিল সিঁধেল চোর। আক্ষরিক অর্থেই সিঁধ কেটে চুরি করত। শেষ চুরিটা করতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছিল। ভয়াবহ মার খেয়ে সিদ্ধান্ত নিল আর সিঁধ কেটে চুরি করবে না। তবে চুরি করতে ধরা পড়ে যাওয়াতে হাকিম নিজের দোষ খুঁজে পায় না। খবরদাতা ওকে জানিয়েছিল বর ষাট বছরের বৃদ্ধ। ভোর তিনটায় যখন বাসর ঘরের সিঁধ কেটে ঢুকল, দেখল তাগড়া জোয়ান এক লোক। তারপরও হাকিম পালাতে পারত। কিন্তু গায়ে মাখা তেল বেঈমানি করল। পিছলানো গেল না। হাকিম বিশ্বাস করে তাকে ইচ্ছে করে গঞ্জের দোকানদার দুই নম্বর তেল ধরিয়ে দিয়েছিল। বিশ্বাসের কোনো মূল্য নাই! তারপর গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমালো। ঢাকায় এসে পকেটমার হয়ে উঠল।
 
হাকিম লোকটা একটু অলস প্রকৃতির। যখনই বড় কোনো কাজ করে। কিছু ভালো আয় করে। সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর কাজে যায় না। খায় দায় ঘুমায় আর ঘুরে বেড়ায়। শেষবার কাজ করেছিল গেল সাত তারিখে। আজ পঁচিশ তারিখ। আঠার দিন। সেদিনের আয় দিয়ে হাকিম আঠার দিন চলেছে।
 
সাত তারিখ সকালে নাজিমুদ্দীন রোড গিয়েছিল হাকিম। পথে দেখে শত শত মানুষ। কিন্তু কোনো হৈচৈ নেই কিছু নেই। সবাই একটা দিকেই যাচ্ছে। এক লোককে জিজ্ঞেস করতে জানা গেল সবাই রেসকোর্সের মাঠে যাচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমানের এক লোকের ভাষণ শুনতে।
 
রেসকোর্স মাঠটা হাকিম চেনে। গেছে কয়েকবার। বাজিও ধরেছিল। কিন্তু হাকিমের ঘোড়া কোনোদিনই জিততে পারে নি। মাঝখান থেকে টাকাগুলো গচ্চা গেছে। এখন আর যায় না। হাকিম না হয় লোকের পকেট থেকে এমনি এমনি টাকা তুলে নেয়, কিন্তু যাদের টাকা তারা তো পরিশ্রম করেই টাকাগুলো আয় করেছিল। পরিশ্রমের টাকা বাজিতে হেরে যাওয়া কোনো কাজের কথা না।
 
শেখ মুজিবুর রহমান লোকটাকে হাকিম চেনে না। তবে নাম শুনেছে অনেকবার। শুনেছে শেখ মুজিবের নাম শুনলে নাকি আইয়ুব খান পেশাব করে দেয়। ভুট্টোর পাতলা পায়খানা শুরু হয়। শুনেছে শেখ মুজিব একলাই নাকি পূর্ব পাকিস্তানকে তার মাটিতে ধরে রেখেছে। শেখ মুজিব ধরে না রাখলে পূর্ব পাকিস্তানকে বহু আগেই পশ্চিম পাকিস্তান উঠিয়ে নিয়ে যেত।
 

হাকিমের খুব কৌতুহল হল। শেখ মুজিবকে দেখতে ইচ্ছা করল। সেও মিশে গেল লোকেদের ভীড়ে। রেসকোর্স এলাকায় পৌঁছে দেখল এলাহী কারবার! লক্ষ লক্ষ মানুষ। শান্তভাবে হেঁটে আসা লোকগুলোই চেঁচিয়ে গলার রগ ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে। সেদিন হাকিমও জয় বাংলা বলে গলার রগ ফুলিয়েছিল। সঙ্গে নিজের কাজও চালিয়ে গেছে। আহা! শেখ মুজিব লোকটা যেন জাদুকর। নিজেদের পকেটের দিকে কারও লক্ষ্য নেই। সবাই শেখ মুজিবে যেন সন্মোহিত হয়ে গিয়েছিল। ইস! শেখ মুজিব যদি পনেরো দিনে বা মাসে একটা ভাষণ দিত তাহলে হাকিমের, হাকিমের মত লোকেদের কত উপকার হত।

 
 
 
তিন.
রাত সাড়ে এগারোটা। একটু পরেই নাইট শো ভাঙবে। ‘গাঁয়ের বধু’ দেখতে আসা লোকেরা গাঁয়ের বধুর বিরাট দুঃখের আবেশ নিয়ে নিয়ে সিনেমা হল থেকে বেরুবে। এমন সময় দূর কোথাও থেকে গুলির শব্দ পাওয়া যেতে লাগল। ক্রমাগত। হাকিম আর মতিন দুজনেই বিস্মিত হল।
 
-‘এত্ত রাইতে পটকা ফুটায় কেডা রে মতিন!’ কৌতূহল আর বিস্ময় মেশানো কন্ঠে বলল হাকিম।
 
-‘পটকা না, সইলতা বোম হইতে পারে।’ বিভ্রান্ত দেখায় মতিনকে। পটকা কিংবা বোমা, যাই হোক, একসঙ্গে এত ফাটানোর কোন যুক্তি নেই।
 
-‘না রে মতিন! সইলতা বোম না, অন্যকিছু। গুল্লি না তো!
 
হাকিমের কন্ঠে আশঙ্কা প্রকাশ পায়। অন্যসময় হলে হাকিমের এই কথায় মতিন হাহা করে হেসে উঠত। এখন হাসতে পারে না। তার মুখটা থমথমে হয়ে ওঠে। পেশী টানটান হয়। জলচৌকি ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। আর তখনই বিদ্যুৎ চলে যায়। পুরো ঢাকা শহর অন্ধকারে তলিয়ে যায়। গুলির শব্দ আসতে থাকা দিকটার আকাশ অন্ধকারে আলোকিত হয়ে ওঠে। যেন ও জায়গাটাতে আগুন লেগেছে।
 
বিদ্যুৎ চলে যাওয়াতে সিনেমা দেখতে থাকা লোকেরা খুব বিরক্ত হয়েছে। কেউ কেউ রেগেও উঠল। তাদের মধ্য থেকে কজন আবার সে রাগ প্রকাশও করতে লাগল। কাঠের চেয়ার ভাঙচুর হতে লাগল। একটা হুলস্থূল অবস্থার মধ্যে সকলে বেরিয়ে আসতে লাগল। ততক্ষণে রাতের অন্ধকারের ঢাকা শহরটার অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
 
বাহাদুর শাহ্‌ পার্কের কাছে পৌঁছে সেনাবাহিনীর একটা দল দুভাগ হয়ে একটা অংশ গেল শাঁখারি বাজারের দিকে, আরেকটি অংশ আসতে লাগল সদরঘাটের দিকে। হাকিম-মতিনরা দেখল নিউ প্যালেস সিনেমা হলের কাছে বুড়িগঙ্গা নদী তীরে কায়েদে আযম ফিজিক্যাল ফিটনেস ক্লাবের পাশেই সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কোরের ছাউনির সামনে সেনাবাহিনীর একটা লরি থামল। লরি থেকে বিশ তিরিশ জন খাকি পোশাক পরা আর্মি নেমে ঢুকল। কিছুক্ষণ পরেই দ্বিগুণ সেনা বেরিয়ে এল। রাস্তায় নেমেই তারা গুলি ছুঁড়তে শুরু করল।
 

মুহূর্তেই সিনেমার দর্শকদের কয়েকজন লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। বাকিরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দিকবিদিক দৌড়ে পালাতে লাগল। কিন্তু বুলেটের চেয়ে দ্রুত কি দৌড়নো যায়! পালাতে থাকা মানুষগুলো বৃষ্টির মত গুলির বর্ষণে মাটিতে পড়ার আগেই লাশ হতে থাকল।

 
 
 
চার.
হাকিম আর মতিন তখনও আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিল। নিউ প্যালেস সিনেমার দর্শকদের ভীড়টার ওপর গুলি শুরু হতেই দুজনে উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে শুরু করল। এলাকাটা মতিনের খুব ভালো চেনা। সে অনেকটা পথ ঘুরে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের পাশ দিয়ে বাংলা বাজার ঢুকে গেল। অলিগলি পেরিয়ে সদরঘাট পোস্ট অফিসের পেছনের দেয়াল টপকে রাস্তা পেরিয়ে গার্লস স্কুলে পড়ল। সেখানে থামল দুজনে। নর্থব্রুক হল রোড সমান্তরাল রেখে বাড়ি ঘরের অলিগলি বেয়ে পাঁচিল টপকে পৌঁছে গেল রাস্তার মোড়ে। ওখান থেকে ভিক্টোরিয়া পার্ক দেখা যায়। ওরা দেখল ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে সেনাবাহিনীর একটা লরি এসে থামল। লরি থেকে নেমে সেনারা দুটা ভাগে ভাগ হয়ে একটা অংশ রওনা হল সদরঘাটের দিকে। আরেকটা অংশ নর্থ ব্রুক হল রোডের দিকেই আসতে লাগল।
 
ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে নর্থ ব্রুক হল রোডে আসার পথটার গজ পঞ্চাশেক দূরে ঘোষ বাড়ির চিত্ত মাঠা তৈরি করছিল। রোজ সকালে পার্কের গেটে চিত্ত মাখন আর মাঠা নিয়ে বসে। এক ঝাঁক বুলেট এসে চিত্তর বুকটা ঝাঁঝরা করে দিল। চিত্ত জানতেও পারল না কেন তাকে মেরে ফেলা হল।
 
ভিক্টারিয়া পার্কের সামনের রাস্তায় পঁচিশ তিরিশটা হলুদ রঙের ট্যাক্সি পার্ক করা ছিল। সেনারা লাইট মেশিনগান দিয়ে ট্যাক্সিগুলোর ওপর ব্রাশ ফায়ার করতে লাগল। ভাড়ায় চলা ট্যাক্সগুলোর অনেক ড্রাইভার ট্যাক্সির ভেতরে ঘুমিয়ে ছিল। তারা সকলেই মারা পড়ল।
 
গলির মোড়ে দেয়ালের ওপাশের আড়াল থেকে হাকিম আর মতিন চিত্তকে হত্যার দৃশ্য দেখল। দুজনে ওখানেই শুয়ে পড়ল। কোমরে বাঁধা গামছায় আড়াআড়ি করে রাখা ধারালো দা’টা টেনে হাতে নিয়ে মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল মতিন। যেন অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রর আক্রমণ ওই দা দিয়েই প্রতিহত করবে সে।
 
গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে নর্থ ব্রুক হল রোডে ঢুকল সেনারা। বাড়ি ঘরে আগুন দিতে দিতে এগুতে লাগল। আগুন থেকে বাঁচতে কেউ বের হলেই তাকে গুলি করে মেরে ফেলছে। সেনারা গলির ভেতর ঢুকে যেতে দুজনে মাটি থেকে উঠে দাঁড়াল। মতিন সাবধানে চারপাশে চোখ বুলাতে বুলাতে এগিয়ে যেতে লাগল ভিক্টোরিয়া পার্কের উল্টোদিকের দেয়াল ঘেঁষে। হাকিম মতিনের অনুসরণ করতে লাগল। চাপা স্বরে মতিনকে বলল,
-‘ওই মতিন! কই যাস্!’
 
মতিন কোন জবাব দিল না। সন্তর্পণে হাঁটতে থাকল। ভিক্টোরিয়া পার্কের মোড়টায় এসে ডানে দিকে সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের রাস্তা ধরে এগুতে লাগল। হাকিম গন্তব্য ধরতে পারছে না। অনিশ্চিত যাত্রা হাকিমের ভালো লাগল না। সে খিস্তি করে উঠল,
-‘ওই মতিন্যা, বাইনচোত কই যাস!’
 
মতিন থমকে দাঁড়াল। তার হাতে খোলা দা। চোখে অদ্ভুত দৃষ্টি। হাকিমের দিকে মুখ ফিরিয়ে চাপা কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলল,
-‘মাদারচোদ আমি কি তরে আমার লগে আইতে কইসি? পোষাইলে আয়, নইলে নিজের রাস্তা নিজে দেখ।’

বলে হাঁটতে লাগল। হাকিমও আর কোন কথা বলল না। চুপচাপ মতিনের পেছন পেছন চলল।

 
 
 
পাঁচ.
লক্ষ্মীবাজার মোড়টার কাছে এসেই রাস্তার পাশের একটা বাড়ির দেয়াল টপকাল মতিন। আস্তে করে দেয়াল বেয়ে নামল বাড়ির উঠানে। হাকিমও এল একই ভাবে। বেশ বড় বাড়ি। বিদ্যুৎবিহীন ঢাকা শহরের ঘুটঘুটে অন্ধকারে সাদা দোতলা বাড়িটা অন্ধকারে জ্বলছে যেন। মতিন পা টিপে বারান্দায় উঠে সামনের দরজায় না গিয়ে বাঁ দিকে এগুলো খুব পরিচিত ভঙ্গীতে। কয়েক পা এগুনোর পর ডানে একটা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
 
এই ঘরটা সিঁড়ি ঘর। বাড়ির সাদা রঙটা আলোর বিকল্প হিসেবে ভালোই কাজ করছিল। কিন্তু দরজার ভেতরটায় সাদা রঙ তেমন কাজ করছে না। কাজ করতে হলে তার আলো লাগবে। অল্প আলো পেলে সে সেটা প্রতিফলিত করে বাড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু আলো উৎপাদন করতে পারে না। অন্ধকারে কিছু ঠাহর করতে না পেরে ফিসফিস করে মতিন বলল,
-‘ম্যাচ ধরা হাকিম।’
 
হাকিম পকেট থেকে ম্যাচ বের করে একটা কাঠি জ্বালতে না জ্বালতে একটা হাত এসে কঠিনভাবে হাকিমের কব্জি ধরে ফেলল। আরেকটা হাত তার গলা চেপে ধরল। ক্ষীণ একটা আলো জ্বলে উঠল। একটা টর্চ। টর্চের আলোটা হাতে চেপে কমিয়ে রাখা আছে। একটা কন্ঠ চাপা ফ্যাসফ্যাসে গলায় ঢাকার আঞ্চলিক উচ্চারণে বলল,
‘-তরা ক্যাঠা? এই বাইততে্ কি করতে আইছস্?’
 
টর্চের ওই সামান্য আলোতেও মতিন কন্ঠর মালিককে চিনতে পারল। এর নাম কালু। এই এলাকার সবাই একে কালু গুন্ডা বলেই চেনে। ভয়াবহ মানুষ এই কালু গুন্ডা। দিনে দুপুরে মানুষ মেরে ফেলে। পুলিশ তাকে কিছু বলে না। জামায়াতে ইসলামি পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে কালু গুন্ডার বেশ খাতির। কালু গুন্ডা জানে এইসব লোকেরা নিজেদের প্রয়োজনেই তারে খাতির করে। তাই নিয়মিত তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত না। ফলে আজকের আক্রমণ বিষয়ে কিছু জানতও না। হামলা যখন শুরু হল কালু গুন্ডা তখন তিন চারজন সাগরেদসহ ভিক্টোরিয়া পার্কের মোড়টাতেই দাঁড়িয়ে। যখন হলুদ ট্যাক্সিগুলোর ওপর ব্রাশ ফায়ার করা হচ্ছিল তখনই দৌড়ে দেয়াল টপকে এ বাড়িতে ঢুকেছে।
 
-‘ওস্তাদ! আমারে চিনেন নাই! আমি মতিন।’ চাপা কন্ঠে উচ্ছাস প্রকাশ করল মতিন।
 
কালু গুন্ডা মতিনকে চিনতে পারে নি। তবে মতিন তাকে চিনেছে বলে পেশীতে ঢিল দিয়ে বলল,
-‘পলাইছস্।’
 
মতিন যেন ঘোরের মধ্যে রয়েছে। যে কালু গুন্ডাকে দেখলে সে সালাম ঠুকে মাথা হেঁট করে রাস্তা থেকে সরে যায়, এখন তারই চোখে চোখ রেখে বলল,
-‘না ওস্তাদ। ডাকাতি করুম।’
 
কালু গুন্ডা আলো আঁধারে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মতিনের দিকে। মতিনকে সে চিনতে পারে নি। তবে মতিনের চিন্তা তার ভেতরে ক্রিয়া করতে শুরু করেছে। মতিন বলল,
-‘ওস্তাদ আপনে নিচতালায় যান। আমি উপরে যাইতাছি।’
 
কালু গুন্ডা কিছু বলল না। তাকিয়ে রইল। মতিন ততক্ষণে সিঁড়ির ধাপ বেয়ে উঠতে শুরু করেছে। কালু গুন্ডা হঠাৎ ঘুরেই নিচতলার দরজায় লাথি মারতে শুরু করল। প্রাচীন কাঠের শক্ত দরজা। নড়ল না। বাকি দুই সঙ্গীও ঝাঁপিয়ে পড়ল দরজার ওপর।
 
সিঁড়ি বেয়ে খোলা দা হাতে দোতলার বারান্দায় এল মতিন। হাকিমও উঠে এসেছে তার পেছন পেছন। কেউ কোনো কথা বলছে না। লম্বা বারান্দা। ডান পাশে ধবধবে সাদা রঙ করা রেলিং। বাঁ দিকে ঘর। মতিনের যেন বাড়ির মানচিত্র মুখস্ত। প্রথম দরজাটা পেরিয়ে দ্বিতীয় দরজায় থামল সে। হাত রেখে ধাক্কা দিল। খুলল না। ভেতর থেকে বন্ধ।
 
-‘কে!’ ভেতর থেকে একটা নারী কন্ঠ শোনা গেল।
 
-‘সুরাইয়া আপা আমি। মতিন। দরজা খোলেন। পলাইতে হবে।’
 
একটু পরেই দরজা খুলে গেল। দরজার সামনে সুরাইয়া দাঁড়িয়ে। বিশ বাইশ বছর হবে বয়স। আন্দাজ করল হাকিম। সুরাইয়াকে দেখে তার মনে হল মেয়েটা মাখন দিয়ে তৈরি। মনে হল এইমাত্র উড়তে উড়তে আকাশ থেকে নেমে ঘরে গিয়ে ডানা জোড়া খুলে রেখে এসে দরজা খুলল। এই মেয়ে কবরীকে কাজের বুয়া করে রাখতে পারে। শবনম এর পা টিপে দিতে পারলে ধন্য হয়ে যাবে। হাকিম হা করে চেয়ে রইল। তার মনে একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খেতে লাগল, ‘মানুষ কি করে এত সুন্দর হয়!’
 
মতিনের মত রিকশাওয়ালা এই মেয়েকে চেনে কি করে! এইটাও একটা রহস্য। হাকিম রহস্য বুঝতে পারে না। বিভ্রান্ত বোধ করে। মেয়েটা ফেরদৌসি রহমানের চাইতেও শতগুণ মিষ্টি কন্ঠে বলল,
-‘মতিন! তুমি এই সময় কোত্থেকে এলে! বাইরে কি হচ্ছে! পালাতে হবে কেন!’
 
মতিন কোনো উত্তর দিল না। মেয়েটাকে ঠেলে ঘরে ঢুকে গেল। ঘরের জানালায় ভারী আর মোটা পর্দা। একটা কোণায় সলতে ছোট করে দেওয়া হারিকেনের চিমনি ঘোলাটে হয়ে জ্বলছে। তবুও ঢাকা শহরের সকল অন্ধকার যেন এখন এই ঘরে গিয়ে জমাট বেঁধেছে।
 
সুরাইয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। মতিন রোজ সকালে রিকশা নিয়ে আসে। সুরাইয়াকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দেয়। দুপুরে ক্লাস শেষে আবার বাসায় পৌঁছে দিয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে মতিন কাজটা করছে। সুরাইয়া ঘুণাক্ষরেও কোনোদিন মতিনের দৃষ্টি কিংবা ভাবনা বুঝতে পারে নি।
 
মতিন সুরাইয়াকে ঠেলে ঢুকতেই সুরাইয়া ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল। হারিকেনের ঘোলাটে আলোয় ওর ভয় পাওয়া মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তবু কণ্ঠ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে আবারও বলল,
-‘পালাতে হবে কেন মতিন! তুমি কেন এসেছ? কি চাও?’
 
-‘আর্মি সবাইরে মাইরা ফালাইতেছে আপা। এই বাড়িতেও আসবে। সবাইরে মাইরা ফেলবে। আমি আপনেরে বাচাইতে আইছি। আপনেরে নিয়া বহুত দূরে পলায়া যামু।’
 
সুরাইয়ার চোখে মুখে আতঙ্ক ফুটে ওঠে। মতিন এগিয়ে যায় সুরাইয়ার দিকে। তখন হারিকেনের ঘোলাটে আলো পড়ে চমকে ওঠে মতিনের হাতের দা। সুরাইয়াকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে মতিন। নিজেও ঝাঁপিয়ে পড়ে। হ্যাঁচকা টানে ছিঁড়তে থাকে সুরাইয়ার পোশাক। সুরাইয়া ধস্তাধস্তি করতে থাকলে সজোরে একটা ঘুষি মারে সুরাইয়ার মুখে। রক্ত বেরিয়ে আসে সুরাইয়ার নাক আর ফেটে যাওয়া ঠোঁট থেকে।
 
এতক্ষণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দেখছিল হাকিম। কেউ একজন কাঁধে হাত রাখতে চমকে তাকাল। কালু গুন্ডা তার সঙ্গীদের নিয়ে দাঁড়িয়ে। হাকিম তাকাতেই দাঁত বের করে হাসে কালু গুন্ডা। বলে,
-‘হুমুন্দির পো আমগোরে নিচে দুই লম্বর মাল ডেকাইতি করতে কইয়া তোমরা উপ্রে এক লম্বর মাল ডেকাইতি করবার লাগছ?’
 
সুরাইয়া হার মানে না। ধস্তাধস্তি চলতে থাকে। মতিন সুরাইয়ার মুখে আরও একটা ঘুষি মারে। থপ করে নাকের হাড় ভাঙার শব্দ হয়। গল গল করে রক্ত বেরিয়ে আসে সুরাইয়ার ভাঙা নাক থেকে। গজ দুয়েক ব্যবধানে দাঁড়িয়ে চারজন মানুষ লোভাতুর দৃষ্টিতে দেখতে থাকে ধস্তাধস্তি। সুরাইয়া মরিয়া হয়ে লাথি চালায়। পায়ের দিকে ছিটকে পড়ে মতিন। তখনই ছুটে যায় হাকিম। ঝাঁপিয়ে পড়ে সুরাইয়ার ওপর। প্রায় নিস্তেজ হয়ে থাকা সুরাইয়া আর বাধা দিতে পারে না।
 
 
 
ছয়.
প্রায় ঘন্টাখানেক পর পাঁচজনে বেরিয়ে আসে সুরাইয়ার ঘর থেকে। ভোর হতে বাকি তখনও। সকলের শরীরেরই রক্ত লেগে আছে। সুরাইয়ার রক্ত। কেউ কোনো কথা বলে না। সিঁড়ি বেয়ে নেমে তারা নিচতলায় যায়। প্রথম ঘরটা বসার ঘর। ঘরটা আসবাবগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। দুজন মানুষ মেঝেতে পড়ে। সুরাইয়ার বাবা মা। পুরো মেঝে রক্তে ডুবে গেছে। কালু গুন্ডা মৃতদেহ ডিঙিয়ে ওপাশের বাথরুমে ঢুকে শরীর থেকে রক্ত ধুয়ে ফেলল। বাকিরাও ধুলো। তারপর বাইরে বেরিয়ে এল। কালু গুন্ডার সঙ্গী দুজনের হাতে দুটা চামড়ার ব্যাগ। হাকিম আর মতিনের হাতে কাপড়ের পুটুলি। সবাই একসঙ্গে চলতে লাগল। এখন তাদের মালামাল গুলো বাটোয়ারা করতে হবে। ভোরের আলো একটু একটু করে ফুটছে তখন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *