মুক্তমত

‘রেলওয়ে’কে যেতে হবে আরও অনেক দূর

ফারুক মাহমুদ
 
তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, ভাড়া কম এবং পরিবেশবান্ধব হওয়ায় সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে রেল ভ্রমণের কদর সবার শীর্ষে। অন্যান্য যানের মতো হাত-পা গুটিয়ে আঁটোসাঁটো পরিবেশে বসে থেকে ভ্রমণের আনন্দের পরিবর্তে বিরক্ত হওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকায় রেলওয়ের যাত্রীসংখ্যা বেশি। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নেই।

আমাদের দেশে একসময় যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল জলপথ। অসংখ্য নদ-নদীর উপস্থিতি থাকায় মানুষের যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনের ভরসাটি ছিল নৌপথের ওপর। কালের পরিক্রমায় দেশের অনেক নৌপথ শুকিয়ে গেছে, নাব্য হারানোর ফলে অনেক নদীতে যান চলাচল করতে পারে না। নদীপথে গন্তব্যে পৌঁছানো কিছুটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপারও। সড়কপথের উন্নতি হয়েছে। মানুষের চলাচল বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় জলপথের গুরুত্ব কিছুটা হলেও কমে এসেছে। তবে দেশের কয়েক জেলায় এখনো যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে জলপথ। রেলপথ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এখনো যাতায়াতের শীর্ষ মাধ্যম হিসেবেই বিবেচিত হয়।

বাংলাদেশ রেলওয়ের কার্যক্রম শুরু হয় ব্রিটিশ শাসনামলে, ১৮৬২ সালে। যদিও এর ৩৭ বছর আগে অর্থাৎ ১৮২৫ সালেই যুক্তরাজ্যে রেল চলাচলের অভিষেক হয়ে যায়। শুরুতে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন রেল কোম্পানি ভারতবর্ষের নানা প্রদেশে ছোট ছোট রেলপথ সেকশন চালু করতে থাকে। প্রথম দিকে শুধু অর্থনৈতিক কাজের জন্য রেলপথ চালু করা হয়। ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে নামক কোম্পানি প্রথম বাংলাদেশে রেলপথ স্থাপন করে। দর্শনা থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেলপথ স্থাপনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রেল যুগে প্রবেশ করে।

 

 

নানা কারণে একটা সময় রেলওয়ে বা রেলপথ সরকারের কাছে এর গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। অলাভজনক হওয়ার অজুহাতে অনেক রেলপথ বন্ধ হয়ে যায়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যরা দেশের রেলব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। গুরুত্বপূর্ণ বড় বড় সেতুসহ ছোট ছোট সেতু ধ্বংস করে দেয়। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রেলব্যবস্থাকে প্রায় ধ্বংস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়াতে হয়েছে। যদিও বিপুল টাকার লোকসানের কথা বলা হয়, কিন্তু রেলব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগে ভাটা পড়েনি। দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ থাকা অনেক রেলপথই নতুন প্রাণ পেয়েছে। রেলপথের সংস্কার, নতুন বগি, ইঞ্জিন সংযোগসহ রেলব্যবস্থায় যথেষ্ট উন্নতি যে হচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া ছোট-বড় রেলস্টেশনগুলোর অধিকাংশ ছিল অবহেলাজীর্ণ। কিন্তু সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্য দিয়ে স্টেশনগুলো জীর্ণদশা কাটিয়ে নতুন রূপ পেয়েছে। নতুন নতুন ট্রেন চালু করা এবং রেলপথের উন্নয়নের মধ্য দিয়ে রেল ভ্রমণকে অধিকতর আকর্ষণীয় করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে যদি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথকে ধরি, উন্নয়নের উচ্চতাটি সহজে অনুমান করা যায়। ক্রসিংয়ের বিড়ম্বনা ছাড়াই কম সময়ে উল্লিখিত রেলপথে যাতায়াত করা যায়। এর জন্য দীর্ঘ এই রেলপথের পুরোটাকে দুই লাইনে উন্নীত করতে হয়েছে। ছোট-বড় মিলিয়ে অনেকগুলো সেতু নির্মাণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। আগে ভৈরবের মেঘনা নদীর ওপর রেলওয়ের একটি সেতু ছিল। গভীর খরস্রোত এই নদীতে নতুন সেতু নির্মাণ আমাদের সাফল্যের একটি উদাহরণ।

সময়ের হাত ধরে রেলওয়েকে পরিবর্তনের পথে অগ্রসর হতে হয়েছে। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বর্ধমান রয়েছে। বেশ কয়েকটি রেলস্টেশনে কম্পিউটারাইজড সিট রিজার্ভেশন অ্যান্ড টিকেটিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। কম্পিউটারাইজড ট্রেন ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম চালু রয়েছে কয়েকটি স্টেশনে, ২০১৪ সালে চালু করা হয়েছে রিয়েল টাইম ট্রেন ট্যাকিং অ্যান্ড মনিটরিং সিস্টেম। বাংলাদেশ রেলওয়ের বেশ কয়েকটি স্টেশনে ই-টিকেটিং সেবা চালু রয়েছে। শুধু অভ্যন্তরীণ রুটেই নয়, আন্তর্জাতিক রুটেও ট্রেন চলাচল করছে। অনেক আগে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ট্রেন সংযোগের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় সেই ট্রেন সংযোগটি বন্ধ হয়ে যায়। সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের বেনাপোল ও দর্শনা এই পথে রেল যোগাযোগ ছিল। দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর ২০০৮ সালে ঢাকা-কলকাতা রেলপথ চালু হয়েছে। পরিবহন ব্যবস্থায় ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো ইত্যাদি উন্নয়নের সঙ্গে যাত্রীসেবার মানোন্নয়নটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রীসেবার মান যে একেবারেই উন্নয়ন হয়নি, তা নয়। কিন্তু তা যৌক্তিক এবং প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছেছে কিনা, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ট্রেনের জীর্ণ-ম্লান বগির উন্নতি হয়েছে, বাতি জ্বলে, পাখা চলে। বাঁধা সময় ধরে চলতে না পারার যে ‘ঐতিহ্য’ রেলওয়ের ছিল, তা অনেকটাই কেটেছে। ‘দশটার ট্রেন কয়টায় আসবে’- এমন রঙ্গ এখন আর চলে না। এখন ১০টার ট্রেন ১০টার কিছু পরে হলেও পৌঁছায়। সারাবিশ্বে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি অব্যাহত রয়েছে। দ্রুতগতির যান, বিশেষ করে আকাশপথে মানুষের যাতায়াতের দ্রুততা বিস্ময়কর। রেলেরও উন্নতি হয়েছে। একসময় ছিল বাষ্প ট্রেন। এখন আছে চোখের পলকের চেয়েও দ্রুতগতির বুলেট ট্রেন। ঐতিহ্য তো আছেই, রেল ভ্রমণ বা ট্রেনের যাতায়াত নিয়ে যুগ যুগ ধরে মানুষের যে আনন্দ অভিজ্ঞতা, তা নিয়ে কত গল্প-কবিতা, উপন্যাস রচিত হয়েছে, নির্মিত হয়েছে বহু চলচ্চিত্র। ঝনঝন করে চলা রেলগাড়ি বা এর ইঞ্জিনের হুইসেল যে কোনো ভাবুক মনে নতুন আবেশের জন্ম দেয়। বাংলা সাহিত্য-চলচ্চিত্রে ট্রেন বা রেল ভ্রমণ নানা ব্যঞ্জনায় চিত্রিত হয়েছে।

 

 

বাঙালির প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেশ-বিদেশে ভ্রমণের প্রিয় যান ছিল রেলগাড়ি- যাত্রাবাহী ছুটন্ত রেলগাড়ি, দিনে অথবা রাতের গাড়ি। তার অনেক লেখায় ইঙ্গিত মেলে, তিনি পছন্দ করতেন ছুটে চলা গাড়ির জানালার ধারটিতে বসতে। কোনো দীর্ঘ রেল ভ্রমণে গাড়ির কামরায়, তার খাওয়া-দাওয়া, স্নান, কবিতা, গান, চিঠিপত্র লেখা, বইপড়া, প্রুপ দেখা, সংগীতের সঙ্গে গল্প পরিহাস সবই চলত। জানা যায়, রাতের বেলায় চলন্ত ট্রেনের বিছানায় শুয়ে বাতি নিভিয়ে কল্পনার রাজ্যে গাড়ির ছন্দে তাল মিলিয়ে বিচরণ এবং সেই সঙ্গে মনে মনে নানা গল্প-উপন্যাস-নাটকের প্লট প্রস্তুত করা কাজটি চলত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রেলে চড়া এক বিখ্যাত যাত্রী। তার কাছে রেল ভ্রমণ শুধু গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি যুগ যুগ ধরে মানবসমাজ যে সীমা থেকে অসীমের দিকে অবিরাম ছুটে চলেছে, বিশ্বকবির কাছে রেলগাড়ি হলো সেই ছুটে চলার আশ্চর্য প্রতীকী রূপ। সারাজীবন রেল ভ্রমণ করতে করতে শেষ বয়সে রেলের গাড়িই হয়ে উঠল তার কাব্যিকতার একটি প্রধান বিষয়। রেলগাড়ি নিয়ে লিখলেন একের পর এক অসামান্য কবিতা। ‘এ প্রাণ রাতের রেলগাড়ি’ এই উচ্চারণের মধ্যে যে কাব্যিক দার্শনিকতা রয়েছে, তার সৃষ্টিসম্ভারের নানা স্থানে কখনো স্পষ্ট, কখনো সংকেত বা ইঙ্গিতময়তায় বিধৃত হয়েছে। ভ্রমণরসিক, বিশ্বভ্রামণিক এই কবি সারাজীবনে দেশে-বিদেশে কত হাজার মাইল যে রেল ভ্রমণ করেছেন, হিসাব করলে বিস্মিত হতে হয়। আর আশি বছরের জীবনে আটষট্টি বছরব্যাপী তিনি রেল ভ্রমণ করেছেন। জীবনের শেষ পাঁচ বছর রেলগাড়ি যেন রবীন্দ্রনাথের কাব্যে আলাদ্য এক বাণীশিল্পে পরিণত হয়েছিল।

রেলগাড়ি যেন স্টেশনের বাঁধানো প্লাটফর্ম পার হয়ে তার নির্দিষ্ট পথ অতিক্রম করে রবীন্দ্র কবিতার মর্মে প্রবেশ করেছে। উদাহরণ হিসেবে ‘শ্যামলী’ কাব্যের কথা উল্লেখ করা যায়। এ কাব্যে ‘হঠাৎ দেখা’ পুরুষের উক্তিতে লেখা কবিতায়- ‘রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা। ভাবিনি সম্ভব হবে কোনোদিন।’ ভাবতে ইচ্ছে হয়, ‘বঞ্চিত’ ও ‘অপরপক্ষ’ কবিতার মেয়েটি ও ছেলেটিরই কি এতদিন পর রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা। কামরায় হাহাকারের মতো উচ্চারিত হচ্ছে- ‘আমাদের গেছে যেই দিন/ একেবারেই কি গেছে, কিছুই কি নেই বাকি।’

অন্তচেতনার এমন মর্মছোঁয়া উচ্চারণ রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতায় আছে। ‘সকাল-বিকাল ইস্টেশনে আসি/দেখতে ভালোবাসি।’ রবীন্দ্রনাথ রেলের স্টেশনে জীবনের আসা-যাওয়ার চিরন্তনতা প্রত্যক্ষ করেছেন গভীর মনোনিবেশে। এগারো বছর নয় মাস বয়সী রবীন্দ্রনাথ হাফ টিকিটের যাত্রী হয়ে যে পথে রেল ভ্রমণ করেছিলেন, আশি বছর দুই মাস বয়সে এই রেলপথে জীবনের শেষ ভ্রমণ।

রবীন্দ্রনাথসহ অনেক লেখকের রচনায় ‘রেলওয়ে’ এসেছে। আমাদের অনেকের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিতে রেল ভ্রমণ আছে। নতুন জীবনের ভ্রমণ সহযোগী রেলওয়ের এগিয়ে চলা উল্লেখ করার মতো। তারপরও কথা আছে, কথা থেকে যায়। ‘রেলওয়ে’কে যেতে হবে আরও অনেক দূরের পথ। রেলপথের বিস্তার ঘটলেও বাংলাদেশের অনেক জেলায় এখনও শোনা যায় না রেলগাড়ির ঘোরলাগা ঝমাঝম শব্দ। এসব জেলাগুলো রেলপথের আওতায় এনে রেলযাত্রা সুগম্য করা প্রয়োজন। ব্যাপক চাহিদার মুখে রেলের টিকিট ‘সোনার হরিণ’ হয়ে আছে। যদিও অগ্রিম টিকিটের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে কালোবাজারিদের হাতে চলে যায়। টিকিট যদিও মেলে, ‘স্ট্যান্ডিং টিকিট’-এর দৌরাত্ম্যে গাড়িতে ওঠা, নির্বিঘ্নে বসা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। চাহিদা থাকলে পুঁজিলগ্নিতে বাধা থাকবে কেন? ট্রেনের সংখ্যা বাড়ান।

আন্তর্জাতিক রেলপথের বেলায়ও একই কথা। ঢাকা-কলকাতা পথে এখন সপ্তাহে তিন দিন ট্রেন চলে, সেটি ছয় দিন করা যেতে পারে। বিষয়গুলো রেল কর্তৃপক্ষ যাচাই করে ব্যবস্থা নিলে আমরা আমজনতা বড়ই কৃতার্থ হব।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

Show More

Related Articles

One Comment

  1. International politics and policies made by some financial institutions such as IMF and World Bank are some of the major barriers behind the improvement of our rail sector. But recently our rail sector has improved and it’s visible.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension