শেখ হাসিনার এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার

ভারতের সংবাদমাধ্যম টাইমস্ নাও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার  একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন টাইমস্ নাও-য়ের জাতীয় সম্পর্ক বিষয়ক সম্পাদক সৃঞ্জয় চৌধুরী। সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর দেশ, তাঁর মাটি কখনও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে প্রশ্রয় দেবে না বলে পুর্নব্যক্ত করেন। সন্ত্রাসবাদ সমর্থনকারী দেশগুলোর প্রতি এক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যদি সন্ত্রাসবাদকে অনুমোদন করি, তার ভোগান্তিতে আমাদের জনগণও ভুগবে। 

রূপসী বাংলা পাঠকদের জন্যে সাক্ষাৎকারটি এখানে তুলে দেওয়া  হল। 

টাউমস নাও: সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ নিয়ে আপনি সবসময়ই সোচ্চার। এই প্রসঙ্গে আপনার সব পদক্ষেপ ভারতে প্রশংসিত হয়েছে। এমনকি ভারতের আগেই আপনি বলেছেন পাকিস্তানে সার্ক সম্মেলনে অংশ নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না। যদি এখন আবারও তেমন একটি সার্ক সম্মেলন হয়, সেখানে যাওয়া কি ঠিক হবে?
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা: আমরা সবসময়ই প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে চলেছি। বিশেষ করে আঞ্চলিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে। যদি তেমন কিছু হয়, বলব হ্যাঁ, যাওয়া উচিৎ। দেখুন সন্ত্রাসবাদ এখন পুরো বিশ্বের জন্যেই সমস্যা। আমার দেশে নিয়ন্ত্রণ করছি, চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু কেউ যদি এটিকে সমর্থন করে, তা কখনই মেনে নেব না। আর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে আমার কথা বলা উচিৎ না। তবে আমাদের প্রত্যেকেরই উচিৎ সাধারণ জনগণের বিষয়ে চিন্তা করা। তাদের ভাবনাকে সম্মান দেওয়া উচিৎ। এক দেশের অভ্যন্তরীন বিষয়ে অন্য দেশের হস্তক্ষেপ করা উচিৎ না।
 
 
টাউমস নাও: ২০১৬ সালের পর আপনার দেশে বড় ধরনের কোনও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে নি। হয়ত চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু আপনার সরকারের দৃঢ়তার কারণেই করতে পারে নি।
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা: আমার পরিবারই সন্ত্রাসের শিকার। শুধু আমি আর ছোট বোন ছাড়া কেউ রক্ষা পায় নি। দেশে ফেরার পর একাধিকবার আমার ওপরে হামলা হয়েছে। আমাকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়েছে, জনসভায় বোমা পোঁতা হয়েছে, জনসভা চলাকালে গ্রেনেড হামলাও হয়েছে।
 
 
টাউমস নাও: সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে আপনি ভারতকে সাহায্য করেছেন একাধিকবার। এখন বাংলাদেশের কোথাও আলফার ঘাঁটি নেই। এছাড়া আপনি বারবার বলেছেন, বাংলােদেশে সন্ত্রাসবাদের কোনও স্থান নেই।
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা: হ্যাঁ, শুধু তাই নয়, কোনও ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আমাদের দেশকে ব্যবহার করতে দেব না। অন্য কোনও দেশকেও সেই সুযোগ দেওয়া হবে না। যখনই এ ধরনের কোন ঘাঁটির খবর পাওয়া যাবে অবিলম্বে তা নির্মূল করা হবে। কারণ আজকে আপনি যদি কোনও দেশের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক কাজে মদদ দেন, ভবিষ্যতে অন্যরাও আপনার বিরুদ্ধে সেই সুযোগটি নেবে। আপনার দেশে অস্ত্র আসবে, পাচারের পথ তৈরি হবে। তাহলে এটা কেন মেনে নেব? কারণ এতে করে আমার দেশের জনগণই ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
 
 
টাউমস নাও: তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে কিছু বলুন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর সঙ্গে কথা বলেছেন। কোনও অগ্রগতি?
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা: উনি (মমতা) বিষয়টি সুরাহার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদিও। কিন্তু হয়ত কোনও কারণে বিষয়টি আটকে আছে। কিন্তু আমাদের দুটো দেশের ভৌগলিক অবস্থানের কারণে কোনও দেশের পক্ষেই পুরো বছর পানি ধরে রাখা সম্ভব নয়, ছাড়তেই হবে। আমরা আমাদের নদীগুলোতে খনন চালাচ্ছি যেন আরও বেশি পানি ধরে রাখতে পারি। যৌথ নদী কমিশন কাজ করছে। অচিরেই একটা সমাধান আসবে।
 
 
টাউমস নাও: বর্তমানে রোহিঙ্গা সমস্যা বেশ বড় আকার ধারণ করেছে। এটা কবে বা কিভাবে সমাধান হবে? তাছাড়া তাদের সঙ্গে তো বাজে লোকজনও ঢুকে পড়ছে।
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা: এটা খুব স্বাভাবিক। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযদ্ধের সময় আমাদের দেশ থেকে এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। যখন রোহিঙ্গারা আসতে শুরু করল তখন নিজেদের কথা স্মরণ করেই মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছি। পাশাপশি মিয়ানমারের সঙ্গে বিভিন্ন লেভেলে আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রীরা গেছেন, তারাও এসেছেন। আলোচনা করে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি। এরইমধ্যে তাদের সঙ্গে চুক্তিও হয়ে গেছে। কিন্তু যারা এখানে আছে তারা এখনো ভীত, ফিরে যেতে চায় না। আমরা মিয়ানমারকে বলেছি, এমন কিছু করুন যাতে এদের এই ভয়টা দুর হয়ে যায়।
 
আমরা একটা কাজ প্রথমেই করেছি, তাদের বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র তৈরি করে দিয়েছি। ভিন্ন রঙের হওয়ার কারণে ওদের পরিচয়পত্র আমাদের দেশের জনগণের সঙ্গে মিলে যাওয়া কোনও সুযোগ নেই। আর প্রতিটা পরিচয়পত্রে জতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের সিল রয়েছে যা মিয়ানমারের অস্বীকার করার উপায় নেই। যেহেতু ভারতও মিয়ানমারের পক্ষে আছে, যদি একটু সহযোগিতা করে এবং তাদের বলে, তোমাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নাও, তাহলে মনে হয় বিষয়টি তরান্বিত হবে।
 
টাউমস নাও: ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে আপনাকে বেশ নির্ভার মনে হচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে জিতবেন?
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা: দেশের জনগণের ওপর সম্পূর্ণ ভরসা আছে। বিশ্বাস আছে। তারা যদি ভোট দেয় তো অবশ্যই জিতব। না দিলেও কোনও আফসোস নেই। দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছি, কাজ করে যাব। আবারও আসতে পারলে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে হাত দিয়েছি সেগুলো সম্পন্ন করতে পারব। যেমন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী পালন, ২০২১ সালে আমাদের স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তী। আমি অবশ্যই চাইব সরকারপ্রধান হিসেবে এই সূবর্ণজয়ন্তী পালন করতে। তাছাড়া গত ১০টা বছর দিনরাত যে পরিশ্রম করেছি, অর্থনৈতিকভাবে একটা জায়গায় ওঠার জন্য, এই সময়টায় যেন বাংলাদেশ আবার পড়ে না যায়। সে জন্য যদি আমরা থাকি তাহলে নিশ্চয়ই এই উত্তরণটা আমরা করতে পারব। যে কর্মসূচি দিয়েছি বাংলাদেশকে আমরা সমৃদ্ধশালী দেশ করব, সেটা অর্জন করতে পারব। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি অন্য কেউ এলে এটা পারবে না। সেজন্য মনে করি জনগণ ভোট দিয়ে আমাদের নির্বাচিত করুক, যেন আমাদের যে কাজগুলো এখনও অসমাপ্ত সেগুলো ঠিক মতো শেষ করতে পারি। যেমন পদ্মাসেতু আমাদের জন্য বেশ বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। নিজেদের অর্থায়নে করছি। একসময়ে অনেকেই বলেছে বিশ্বব্যাঙ্কের সাহায্য ছাড়া সম্ভব হবে না। কিন্তু সেই মেগা প্রজেক্ট আমরা করে যাচ্ছি। আরও কয়েকটি মেগা প্রজেক্ট আছে, যেগুলো কোনওটা শুরু হয়েছে, কোনওটা অর্ধেক গেছে, সেগুলো শেষ করতে হবে।
 
এক পদ্মা সেতু যখন শেষ হবে, জিডিপিতে ১.২ পয়েন্ট যোগ হবে। কারণ দক্ষিণাঞ্চলের ১২টি জেলা এখানে লাভবান হবে। সেখানকার অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। আমি নিজের হাতে এর সম্পূর্ণটা করে যেতে চাই। কারণ এটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এই সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাঙ্ক দুর্নীতির একটা অভিযোগ তোলে। আমাকে, আমার বোনকে জড়ানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। কানাডার আদালতে মামলাও হল। সেই আদালতেই বলা হল, সব মিথ্যা, কোনও ধরনের দুর্নীতিই হয় নি। হয়ত তারা আমার সরকারকে উৎখাত করতে চেয়েছিল। কিন্তু নিজের ওপরে বিশ্বাস ছিল। কারণ আমি তো নিজের ভাগ্য গড়তে আসি নি। নিজের জন্য কিছু করি না, করবও না।
 
টাউমস নাও: অনেক ধন্যবাদ।
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা: আপনাকেও ধন্যবাদ।
 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *