মুক্তমত

সংখ্যালঘু কন্যা ও কন্যা দিবস

মুবিন খান


কন্যা দিবস বলে একটা ব্যাপার যে এ দেশে আছে, সেটা আমি জানতাম না। প্রাচীন থেকেই, যখন থেকে সমাজ গঠিত হয়ে গেছে, তারও আগে থেকেই সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত প্রাণী হলো কন্যা। এবং আশ্চর্য ব্যাপার হলো, সমাজের সামাজিক ব্যবস্থাগুলো প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শিক্ষাগত যোগ্যতা যত বেশী বেড়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে কন্যার প্রতি অবহেলা।

হ্যাঁ, প্রতিষ্ঠাই করা হয়েছে। আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম হলো প্রচারমাধ্যম। ফলে যিনিই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসেন, সবার আগে কুক্ষিগত করেন প্রচারমাধ্যমকে। করতে চান আসলে। করাটা তার জন্যে জরুরি। কেননা একমাত্র প্রচারমাধ্যমই রাষ্ট্রর পরিচালকদের বাদ্যবাজনা ঢোলসমেত নাগরিকের শোবার ঘর অবধি পৌঁছে দিতে পারে।

এখন কথা হলো, কন্যা দিবস নাম দিয়ে খুব ঘটা করে এই যে একটা দিন পালন হচ্ছে, এটা কবে কেমনে করে এল! আমি দেখি কিছুই জানি না! প্রেস্টিজের ব্যাপার তো!

একটা গল্প বলি। এক লোক গেছে দেবতা গণেশের মূর্তি কিনতে। তো মূর্তি বানানো লোকেরা মূর্তি বানাবার কাজে ব্যস্ত। ক্রেতা লোকটা গিয়ে একজনকে ডাকলেন। যিনি এলেন তিনি বেশ বয়সি লোক। ফিনফিনে সাদা দাড়ি। তাকে চাহিদা জানাতে তিনি ক্রেতা লোকটাকে নিয়ে গণেশের ছোট্ট একটা মূর্তির সামনে দাঁড়ালেন।

ক্রেতা একটু বিস্ময় নিয়ে বললেন, এটাতে তো গণেশজির চারটে হাত! এটা নয়। ওই যে আরেকটা আছে না, গণেশজির পায়ের কাছে একটা জন্তু বসা?

বয়সি লোকটি একটু স্মিত হাসি হাসলেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন। আসলে গণেশের মূর্তিদের মধ্যে বেশ একটা বৈচিত্র্যর ব্যাপার আছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূর্তিতে পরিবর্তন এসেছে। যেমন দণ্ডায়মান, নৃত্যরত, দৈত্যনাশে উদ্যত, শিশুরূপে পরিবারের সঙ্গে ক্রীড়ারত, মাটিতে বা সিংহাসনে উপবিষ্ট। ক্রেতা যেটি খুঁজছেন সেটি হলো গণেশ ও তার বাহন মূষিকের মূর্তি।

এবার তিনি ইঁদুর আর গণেশের গল্প বলতে বলতে তেমনই একটি মূর্তির কাছে নিয়ে গেলেন। ধর্মীয় গল্পে সকল ধার্মিক মানুষেরই আগ্রহ থাকে; সকল ধর্মেই। ক্রেতা লোকটিও শুনতে শুনতে আগ্রহী হলো। এই লোকের বলতে থাকা অনেক কথা সে জানত না। সে মুগ্ধ হলো। মূর্তি পর্যবেক্ষণ করতে করতে অজানা কথাও দুয়েকটা জানতে চাইল। বয়সি সে লোক অবলীলায় তার কৌতূহল মেটাতে থাকলেন।

এ পর্যায়ে কাছের মসজিদে আজান শোনা গেল। বয়সি লোকটা তখন পকেট থেকে টুপি বের করে মাথায় পরলেন। তার নামাজের সময় হয়েছে। ক্রেতা তখনও পেছন ফিরে। কথা বলতে বলতে এদিক ফিরেই চমকে উঠল। হিন্দুধর্মীয় শাস্ত্র সম্পর্কে প্রায় বিশেষজ্ঞ এ লোকটিকে আর যাই হোক মুসলমান ভাবেন নি তিনি।

এ গল্পটা একটা বিজ্ঞাপন চিত্রর গল্প। ভারতে নির্বাচনে জিতে গিয়ে বিজেপি নামের দলটি সরকার গঠন করার কিছুদিন পর এ বিজ্ঞাপনটি ভারতীয় প্রচারমাধ্যমে ছড়াতে থাকে। শুধু এটি নয়, এমনি আরও বেশকিছু বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে দেয়া হয় তখন। এবং অবধারিতভাবেই তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। এই তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়ার কারণটি হলো- বিজ্ঞাপন চিত্রর ওই গল্পটা সেক্যুলার গল্প। সেক্যুলারিজম মতবাদ গালাগালের জন্যে উৎকৃষ্ট হলেও এই মতবাদ মেশানো গল্পগুলো লোকেরা খুব নেয়।

কিন্তু দেখেন, বাস্তবতা ভিন্ন। বাস্তবতা হলো, বিজেপি উদারনৈতিক দল নয়। কট্টর সাম্প্রদায়িক দল। ১৯৮০ সালের নির্বাচনে বিজেপি মাত্র দুটা আসন পেয়েছিল। এরপর রাম জন্মভূমি আন্দোলন বানালো। তখন লোকেরা তাদের সমর্থনে এগিয়ে এল। তারপর যখন বাবরী মসজিদ ভাঙতে গেল, তখন তো এতই জনপ্রিয়তা অর্জন করল যে রাষ্ট্রীয় শক্তিও তাদের থামাতে পারে নি। তারা ঠিকই বাবরী মসজিদের মতো একটি প্রাচীন স্থাপনা ভেঙে ফেলেছে। কট্টরপন্থী ধর্মীয় আবেগের কাছে দেশ ও রাষ্ট্রের প্রাচীন সম্পদ গুরুত্ব পায় নি।

অথচ এই বিজেপিই ক্ষমতায় এসেই জাতীয় প্রচারমাধ্যমগুলোতে এরকম বিজ্ঞাপন প্রচার করতে শুরু করেছে। কেন শুরু করেছে? বিজ্ঞাপন বলেই করছে। বিজ্ঞাপন হলো প্রচার। এবং প্রচারেই প্রসার। বিষয়টা হলো, কেউ যখন নিজে থেকেই বলবে, বারবার বলবে, ‘আমি অসাম্প্রদায়িক।’এর অর্থ হলো, আসলে সে সাম্প্রদায়িক।

বুঝে নিতে হবে তার আশপাশের লোকজন তাকে সাম্প্রদায়িক বলছে। তারমানে সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ড সে করে বলেই বলছে। এ কারণেই সে যে সাম্প্রদায়িক নয়, এটা প্রমাণ করা তার জন্যে খুব দরকার হয়ে পড়েছে।

এসব বিজ্ঞাপন প্রচারের কদিন পরেই তারা নাগরিক আইন নাম দিয়ে একটা আইন বানিয়ে ফেলল।

ফলে এসব অসাম্প্রদায়িক চেতনাঅলা বিজ্ঞাপন দেখে মুগ্ধ হওয়ার কিছু নেই। উল্টো চিন্তিত হওয়ার ব্যাপার আছে। কেননা, অসাম্প্রদায়িক চেতনার বেশী বেশী বিজ্ঞাপন মানে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর বেশী বেশী চাপ, বেশী বেশী নির্যাতন।

এবং ভারতের সংখ্যালঘু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীটি হলো ওই মূর্তি বেচতে বেচতে আজান শুনেই মাথায় টুপি পরে ফেলা লোকটি- মুসলমান সম্প্রদায়। সেকারণেই মূর্তি বেচার জন্যে তাকেই নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশেও একই কারণে ‘সংখ্যালঘু’ বলে একটি শব্দ প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। জামাল আমার বন্ধু, কামাল আমার প্রতিবেশী, কিন্তু ফটিক আমার সহপাঠী-বন্ধু-প্রতিবেশী হলেও পরিচয় তার ‘সংখ্যালঘু।’ সেকারণে ফটিক আমাদের মতো করে দোর্দণ্ডপ্রতাপে হেথা-হোথা ঘুরে বেড়াতে পারে না। তাকে মিইয়ে থাকতে হয়। তার পৈত্রিক বাড়িটি দখলে নিয়ে কিনে নেয়ার নামে বাজার মুল্যর কয়েকভাগ কম দিলেও ফটিক উচ্চকিত হতে পারে না। কেননা ফটিক অবচেতনে জানে সে সংখ্যালঘু।

ঠিক কন্যাটির মতোই। কন্যাটি জানে সে মেয়ে। তাকে জানিয়ে দেয়া হয় আসলে। সাম্প্রদায়িক পুরুষ সম্প্রদায় দিনের আলোয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলে ঠিকই, কিন্তু ওই আলোতেই তার জন্যে দিবস রচনা করে কন্যাকে জানিয়ে দেয়, কন্যা আসলে দুর্বল। কন্যাকে অন্ধকারে পেলে সে ঠিকই ঝাঁপিয়ে পড়বে।

এখন আমরা কন্যা দিবসের কাছে যাব। বলছিলাম যে ঘটা করে কন্যা দিবস পালিত হচ্ছে, তাতে এ দিবসটা সম্পর্কে না জানাটা প্রেস্টিজের ব্যাপার মনে হলো। প্রেস্টিজ বাঁচাতে আমি কন্যা দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলাম। জানা গেল, ২০১২ সালে প্রথম কন্যা দিবস পালিত হয়। আমি একটু হাফ ছাড়লাম। নাহ্‌, বেশী আগে নয়। প্রেস্টিজ বুঝি রক্ষা পেল।

আমাদের সময়টাতে কন্যা দিবস বলে কোনও ব্যাপার ছিল না। আমাদের সময়টাতে কন্যারাও এতটা অনিরাপদ ছিল না। আমাদের সময়টাতে কন্যারা একলা হেথা হোথা যেতে পারত। আমাদের সময়টাতে কোনও কন্যাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কুপিয়ে মেরে ফেলতে চায় নি কেউ। ছাত্ররা মিলে সংঘবদ্ধ হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেড়াতে আসা কোনও কন্যাকে ধর্ষণও করে নি কখনও।

তো কন্যা দিবস যে ক্ষেত্রটিকে সামনে রেখে বানানো হলো, সে ক্ষেত্রটি হলো, শিক্ষার অধিকার, পরিপুষ্টি, আইনি সহায়তা ও ন্যায় অধিকার, চিকিৎসা সুবিধা, ও বৈষম্য থেকে সুরক্ষা, নারীর বিরুদ্ধে হিংসা ও বলপূর্বক তথা বাল্যবিবাহ।

মানেটা তবে কি দাঁড়াল? মানেটা দাঁড়াল, দেশটাতে এখন কন্যাদের শিক্ষার কোনও অধিকার নেই, কন্যারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অপুষ্টিতে ভোগে, তাদের জন্যে আইনি সহায়তা ও ন্যায় অধিকার বলে কিছু নেই, চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া থেকে তারা বহুদূরে, এবং নিত্যই বৈষম্য ও হিংসার শিকার- এই অভিযোগগুলোকে আমি, আপনি কোনরকম দ্বিমত ছাড়া মেনে নিয়ে ঐক্যমত হলাম যে আমাদের কন্যারা এসব থেকে আসলেই বঞ্চিত।

হ্যাঁ, আমি এই অভিযোগগুলো স্বীকার করে নিয়েছি। কিন্তু আপনি নেন নি। জানি আমি। নিশ্চিতভাবেই জানি। সেকারণেই কন্যা নিয়ে আপনি আদিখ্যেতা করেন। সন্তানটি কন্যা বলে আপনার কোনও আক্ষেপ নেই- একথা কেউ জানতে না চাইলেও আপনি ঘোষণা দিয়ে জানিয়ে দেন। সন্তান পালনে নিয়ম বানাবার সময় পুত্র-কন্যার জন্যে আলাদা নিয়ম বানান। পুত্রটি টো টো করে সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ালো সে খবর না রাখলেও কন্যাটি একলা কোথাও যেতে পারে না।

আপনি বলবেন বাইরেটা একলা একটা কন্যার পক্ষে নিরাপদ নয়। হ্যাঁ, বাইরেটা এখন আসলেই কন্যাদের পক্ষে অনিরাপদ। কিন্তু কেন অনিরাপদ? কারা বানালো অনিরাপদ? বানালো আপনার মতো লোকেরাই যারা কন্যাকে মানুষ হিসেবে না দেখে মেয়েমানুষ হিসেবে দেখে। আর মেয়েমানুষের এ ভাবনা তাদের ভেতরে শিহরণ জাগায়। আর তখনই মেয়েমানুষ ভাবতে থাকা মানুষটা পুরুষ হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িক। এ সাম্প্রদায়িকতা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকেও লজ্জায় ফেলে দেয়।

আর তখনই জাতীয় প্রচারমাধ্যমগুলোতে কন্যা দিবস, নারী দিবস ইত্যাদি বিজ্ঞাপনগুলোর প্রচার শুরু হয়ে যায়। তাতে অংশগ্রহণকারীরা কন্যাকে মহিমান্বিত করে মহান মহান বার্তা প্রচার করে বোঝাতে চায় সে সাম্প্রদায়িক নয়। অথচ মজার ব্যাপার হলো, কন্যাকে ফুটন্ত গোলাপ, প্রেয়সী, ললনা, অনন্যা, প্রেরণা, উপমা, নিরুপমা, অনুপমা, সহধর্মিণী এমনি বহু বহু অভিধায় অভিহিত করলেও কখনও ‘মানুষ’ অভিধায় অভিহিত করে না।

পুত্র ও কন্যা দুয়েই সন্তান হলেও পুত্র দিবস বলে কিছু নেই। কেননা পুত্র অধিকার বঞ্চিত নয়। পুত্রকে আমরা পুষ্টিহীন থাকতে দেই না। পুত্র বৈষম্যর শিকার হয় না। এবং বংশ রক্ষায় পুত্রই আমাদের সহায় এখনও। পুত্র না থাকলে নাকি অর্জিত সম্পদ সাত ভূতে লুটেপুটে খায়। আবার পুত্রকন্যা উভয় থাকলে সম্পদের ভাগটা সমান বন্টন করেন না। সম্পদ বণ্টনের বেলায় তখন তিনি একজন ধার্মিক লোক।

এরমকম ধার্মিক লোকে ছেয়ে আছে বাংলাদেশটা। আছে বলেই বাংলাদেশে কন্যা দিবসের আজ বড় কদর। পাড়ার সকলেই কন্যাটির অভিভাবক। কন্যা যেন নিজের ভালোটা মন্দটা বোঝে না। তাই কন্যা কি পোশাক পড়ছে, কেমনে করে হাঁটছে, কে তার বন্ধুবান্ধব, এসব নিয়ে সকলেই খুব ভাবিত। অথচ এমন বাতাবরণে,‌ কন্যা দিবসের এমন কদর করা এমন এমন লোকভর্তি এদেশটাতে কন্যারা নিরাপদ নয়। কন্যারা বাসা থেকে স্কুল-কলেজে একলা যেতে আসতে পারে না। পছন্দর পোশাক পরতে পারে না। এখানে ওখানে একটু বেড়াতে যেতে পারে না। আগে বন্ধুর সঙ্গে গেলে লোকে পাঁচকথা বলত। এখন স্বামীর সঙ্গে গেলেও স্বামীকে ধরে মারধোর করে বেঁধে রেখে কন্যাটাকে ধর্ষণ করে ফেলে।
কন্যা সন্তান আর কন্যা দিবস নিয়ে যখন এই দেখানেপনা করছেন, তখন এও আসলে দেখিয়ে দিচ্ছেন, কন্যা সন্তান নিয়ে আপনার বুকের গহীনে একটু অপ্রাপ্তি বেদনা হয়ে টলটল করে চলেছে। কখনও ছলকে ছলকে ওঠে। আর ছলকে ওঠার সময়টাতেই আপনার আদিখ্যেতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

কন্যার নামে দিবস গড়ে কন্যাকে আলাদা করে দেয়া নয়। পুত্রর মতো কন্যাকেও মানুষের মতো মানুষ করবার বাসনা থাকা চাই। কন্যাকে ফুটন্ত গোলাপ, প্রেয়সী, ললনা, অনন্যা, প্রেরণা, উপমা, নিরুপমা, অনুপমা, সহধর্মিণী এমনি বহু বহু অভিধায় অভিহিত না করে শুধু ‘মানুষ’ বলুন। পুত্র সন্তানটিকেও সে শিক্ষাটা দেন। সমস্যাটা যেমন পুরুষের ভেতর, সমাধানটাও তেমনি মানুষেরই ভেতর।❐

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension