বাংলাদেশ

সরকারি কর্মকর্তাদের পকেটে নিয়ে ঘুরতেন গোল্ডেন মনির

রাজউকের ‘সম্রাট’ খ্যাত গোল্ডেন মনির র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার বিস্ময়কর উত্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। দোকান কর্মচারী থেকে মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া আলোচিত এই ব্যক্তির উত্থানের পেছনে রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) ডজনখানেক কর্মকর্তার নামও আসছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাজউক ভবনে তার কলকাঠি নাড়া শুরু হলেও পরে সবময়ই সংস্থাটির ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুদৃষ্টিতে থেকেছেন।

রাজউক কর্মকর্তারাসহ সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে রাজধানীর বাড্ডা, বনশ্রী, বারিধারা, বনানী, গুলশান, উত্তরা ও কেরানীগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশের এলাকায় গড়েছেন হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি। রাজউকের এই প্রভাবশালী ‘নিয়ন্ত্রক’ গ্রেপ্তারের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতকাল রবিবার রাজউক ভবনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল গোল্ডেন মনিরের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের নাম। অনুসন্ধানেও মনিরের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের নাম উঠে এসেছে।

রাজউক কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে মনির দুইশ’র বেশী প্লট নিজের দখলে নিয়েছেন বলে তাকে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান মো. সাঈদ নূর আলম বলেন, ‘মনিরের দুইশ’ প্লটের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। বিতর্কিত এ ব্যক্তির সঙ্গে যারা জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর আদালতে চলমান মামলাও চলবে।’

২০০ প্লট বাগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মনিরের নেপথ্যে কারা ছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা এটা এক দিনের প্রক্রিয়া নয়, দীর্ঘ দিনের প্রক্রিয়া। আমরা এ বিষয়টি উদ্ঘাটন করতে পেরেছি।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাড্ডা এলাকার তৎকালীন কমিশনার কাউয়ুমের সঙ্গে রাজউকে আসতে শুরু করেন মনির। অল্প দিনের ব্যবধানেই বাড্ডা পুনর্বাসন জোনের ৪৩০টি প্লটের মধ্যে প্রায় ১শ’ প্লট হাতিয়ে নেন। এরপর বাকি সব প্লটের মালিকানা হস্তান্তর ও নকশা অনুমোদনসহ সব দাপ্তরিক কাজের দায়িত্ব নিজের কব্জা‌য় নিয়ে আসেন তিনি। বাড্ডার বাইরেও ২০০৩ সালের ৩ ডিসেম্বর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠা আয়তনের নিজ নামে একটি প্লট বাগিয়ে নেন মনির। এরপর তৎকালীন রাজউক চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করে বারিধারা এলাকার জে-ব্লকের ১০ নম্বর সড়কের ৯.৬৪ কাঠা আয়তনের ১০ নম্বর প্লটটি নিজ নামে বরাদ্দ নেন। ২০০৫ সালের ১৪ জুলাই তৎকালীন পূর্তমন্ত্রীর কোটায় ব্যবসায়ী ক্যাটাগরিতে পূর্বাচল এলাকার ৫ নম্বর সেক্টরে ৫ নম্বরের ১০ কাঠার একটি প্লটও তিনি নিজ নামে বরাদ্দ নেন।

উত্তরা এলাকায় গত বছরের ১৯ মার্চ প্রায় শত কোটি টাকা মূল্যের ৯০ দশমিক ২৫ কাঠা জমি কেনেন মনির। রাজউকের সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) মো. আসাদুজ্জামান বিশ্বাসের নামজারি করা পত্রে জমিটির মালিক রাজউক কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতির সভাপতি আব্দুল মালেক ও আওরঙ্গজেব মিল্কির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে স্বদেশ প্রপার্টিজের অনুকূলে আমমোক্তারনামা থেকে মনির জমিটির মালিকানা গ্রহণ করেন। রাজউক কর্মকর্তারা জানান, মনিরের মালিকানাধীন উত্তরা গ্র্যান্ড জমজম টাওয়ারে রাজউকের একটি দল গত ২৯ অক্টোবর পরিদর্শন করে। সেখানে রাজউকের অথরাইজড অফিসার নির্মাণসংক্রান্ত তিনটি অনিয়ম তুলে ধরে মনিরকে চিঠি দেন। কিন্তু মনির এসব কিছুর তোয়াক্কা করেন নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজউকের বর্তমান ও সাবেক মিলে কমপক্ষে এক ডজন কর্মকর্তা গোল্ডেন মনিরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এরমধ্যে সংস্থাটির সাবেক সদস্য (এস্টেট) আমজাদ হোসেন, মো. আজহারুল হক, আব্দুল হাই ও বর্তমান সদস্য মো. মনির হোসেন খানের নাম সবার মুখে মুখে। মনির হোসেন খান সাবেক পূর্ত প্রতিমন্ত্রী মান্নান খানের একান্ত ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) থাকাকালে গোল্ডেন মনিরের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়। এরপর এই কর্মকর্তা রাজউকের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নিলে মনির নিয়মিত তার কক্ষে বসে সব কাজ করতেন। এছাড়াও মনিরের সঙ্গে সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রহমানের ঘনিষ্ঠতা ছিল সবচেয়ে বেশি। তার মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক প্লট হাতিয়ে নিয়েছেন মনির।

সাবেক পরিচালক মো. আবু মূসা, আক্তারুজ্জামান, উপ-পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান, চেয়ারম্যানের সাবেক পিএ তরিকুল ইসলাম, পিএ মামুন, সহকারী পরিচালক সামসুল হক মিল্কী, শ্রমিক নেতা আব্দুল মালেক, নান্না ও স্কাইয়ের সঙ্গেও রয়েছে মনিরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। তবে দাপ্তরিক সব ধরনের তথ্য পেতে মনির রাজউকের অফিস সহকারি হারুন, টাইপিস্ট রফিক ও স্টোর কিপার তুহিনকে ব্যবহার করত। তাদের মাধ্যমে রাজউকের সব ধরনের তথ্য পেত গোন্ডন মনির। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবও মনিরের হয়ে রাজউক কর্মকর্তাদের কাছে তদবির করতো বলে জানা গেছে।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজউকের সবকিছু নিজের কব্জায় নেওয়ার পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠে মনির ওরফে গোল্ডেন মনির। বির্তকিত ঠিকাদার জিকে শামীম আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর তিনি সোচ্চার হন। এক্ষেত্রে একটি কন্সন্ট্রাকশন কোম্পানীর মালিক মানিক নামের এক ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে গণপূর্তে ঠিকাদারী কাজে নেমে পড়েন। মানিক নামের এ প্রভাবশালী ঠিকাদারকে সঙ্গে নিয়ে সরকারের কিছু প্রভাবশালী মহলকে কাজে লাগিয়ে সংস্থাটির শীর্ষ পর্যায়ে তার অনুসারী প্রকৌশলীদের বসানোর জন্য জোর তৎপরতা শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের মাঝামাঝি গণপূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ মেট্রো জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে তার বন্ধু বলে পরিচিত প্রদীপ কুমার বসুকে বসান মনির।

প্রদীপ এ চেয়ারে বসার পর বিসিএস ১৫তম ব্যাচের এ প্রকৌশলী তার ব্যাচে নবম হলেও গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে যেতে মরিয়া হয়ে উঠেন। আর প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করতে সব ধরনের চেষ্ঠা তদবির অব্যহত রাখেন গোল্ডেন মনির। সম্প্রতী প্রদীপ বসু ও মনিরের তদবিরে তাঁদের ঘনিষ্ঠ খুলনার তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সতিনাথকে ঢাকা সার্কেল-২ এ বদলি করে নিয়ে আসেন। এরইমধ্যে গণপূর্তের গুরুত্বপূর্ন ডিভিশন (নগর) এ নিজের পছন্দের প্রকৌশলী বসাতে তৎপরতা শুরু করে মনির। এ পদে বসানোর জন্য সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহীদুলের সঙ্গে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কাজটি হাতে নেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করতে পারে নি।

গতকাল জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা গোল্ডেন মনিরের বিষয়টি জেনেছি। গ্রেপ্তার হওয়া এ বিতর্কিত ব্যক্তির নামে-বেনামে থাকা সব প্লটের বিষয়ে বিস্তর খোঁজ-খবর নিতে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে। সেই কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া সাপেক্ষে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’❐

দেশ রূপান্তর

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension