সাক্ষাৎকার: ফৌজিয়া চৌধুরীর জীবন ও কর্মপরিধি

যুক্তরাষ্ট্রের ভয়েজএলএ পত্রিকা গেল ১০ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্ক অভিবাসী ও তারুণ্যদীপ্ত সমাজসেবক ফৌজিয়া চৌধুরীর একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। সাক্ষাৎকারটির বাংলা অনুবাদ রূপসী বাংলা পাঠকদের জন্যে এখানে প্রকাশিত হলো। ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারটি বাংলায় রূপান্তর করেছেন জাহান আরা দোলন



আসুন, আজ আমরা আপনাদেরকে ফৌজিয়া চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।

হ্যালো ফৌজিয়া, আপনাকে আমাদের প্ল্যাটফর্মে পেয়ে আমরা সম্মানিত বোধ করছি। আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। শুরুতেই, পাঠকদের জানার জন্য আপনার পেছনের গল্পটা বলবেন?

আমেরিকায় বসবাসের  চার বছরে, আমি জীবনের কাছ থেকে শিখেছি এগিয়ে চলার মন্ত্র। জীবনের প্রতিটি পর্বেই বাধা আসবে কিন্তু হাল ছেড়ে দেওয়া চলবে না। আমি সত্যিকার অর্থে বিশ্বাস করি যে জীবনটাকে নিজের ইচ্ছেমতো সাজানোর ক্ষমতা সবার মধ্যেই রয়েছে। আমার জীবনের চার বছর ফাস্ট-ফরওয়ার্ডিং, চারটা বছর বিরামহীনভাবে চলার পরে, আজ আমি আমার কাঙ্ক্ষিত জীবনকে স্বপ্নের রাজ্যে যাপন করছি।

আমি অভিবাসী বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান, জীবনের স্বপ্নগুলো সাকার করতে এগিয়ে চলা একজন কলেজ ছাত্রী। বর্তমানে, সোশ্যাল ওয়ার্কে মাস্টার্স করার জন্য আবেদন করেছি। আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আমি একজন সনদপ্রাপ্ত ক্লিনিকাল সমাজ সেবক হতে চাই। একইসঙ্গে ডান্স মুভমেন্ট থেরাপিতেও আমি লাইসেন্স পেতে আগ্রহী। আমার অন্ধকার দিনগুলো আমাকে জীবনের সত্যিকারের প্যাশন খুঁজে পেতে সহযোগিতা করেছে।

আমি একটি কর্মজীবন বেছে নিতে পেরেছি যেখানে আমি প্রতিদানে কিছু দিতে পারবো। ভুল বুঝবেন না, আমি এমন অনেক সময় পার করেছি যখন আমি হাল ছেড়ে দিতে চেয়েছি কিন্তু মানুষকে সহযোগিতা করতে চাওয়ার ভীষণ বোধ আমাকে পরিচালিত করেছে। একসময় আমি শূন্য থেকে শুরু করেছিলাম আজকে কমিউনিটির জন্য কিছু করার মতো যথেষ্ট রয়েছে আমার, এটা সত্যিই একটা আশীর্বাদ।

আপনার বর্তমান অবস্থানে পৌঁছতে যেসব প্রতিবন্ধকতা এবং শিক্ষণীয় বিষয় সম্পর্কে আমাদের কিছু বলতে পারেন। অতীতের দিকে তাকিয়ে আপনার কি মনে হয়, সেটা সহজ অথবা প্রত্যাশার মতো মসৃণ ছিল?

আমার জীবনের প্রায় অধিকাংশ সময়ই ছিল ওয়াইল্ড রোলারকোস্টার রাইডের মতো অনবরত চড়াই উতরাইয়ে ধাবমান। আমি খুশি যে পথটা আদৌ মসৃণ ছিল না কারণ এই বন্ধুর পথই আমার ভেতরের অনুভূতি বিকাশে সাহায্য করেছে। আমি আমার স্কুলের পাঠ শেষ করেছি ভারতে এবং সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যার কারণে কৈশোর থেকেই আমাকে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচন্ড লড়াই করতে হয়েছে।

নিউ ইয়র্কে আসার পরে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে ধারণাটির সঙ্গে আমি পরিচিত হই। সেসময় আমি প্রচন্ড আর্থিক সঙ্কটে ছিলাম। কলেজের ফি যোগাড় করতে আমাকে ফুল টাইম কাজ করতে হয়েছে। আমার মনে আছে একবার স্কুলের একজন কর্মচারী আমাকে স্কুল থেকে বিরতি নিতে বলেছিল এবং টিউশন ফি দেওয়ার মতো যথেষ্ট টাকা জোগাড় করতে পারলে স্কুলে ফিরে আসতে বলেছিল। সেই মুহুর্তে, আমি ভীষণরকম ভেঙে পড়েছিলাম, অতল অন্ধকার সময় থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু তবুও আমি সঠিক সময়ে কলেজ শেষ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম। আসলে, যে কোনও কিছু শুরু করার আগে প্রথম পদক্ষেপ হলো মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া।

আমি স্কুল কাউন্সিলরের সঙ্গে বৈঠক শুরু করলাম এবং এটা ছিল আমার জীবনের একটা শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত। নিজের জন্য নেওয়া এই একটি সিদ্ধান্তই মানুষকে সাহায্য করার প্যাশনকে খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিল। এবং সেখান থেকেই সবকিছু ভালো হতে শুরু করল। আসলে বলার মতো অসংখ্য গল্পই আছে। আর, এটা হলো নিজের জীবনের সামান্য কিছুটা উপলব্ধি। জীবনের সংগ্রাম নিয়ে বলার অনেক কিছুই আছে। কিন্তু আপনাকে যথাসম্ভব সংক্ষেপে সবকিছু প্রকাশ করতে হবে। আমার মনে হয় গল্পের শক্তি অসীম। আমি সবসময় সবাইকে আমার গল্পগুলো বলি কারণ, এই গল্পগুলো অন্যদেরকে জীবনে ভালো কিছু করতে উৎসাহ যোগায়।

আপনার গল্পটি আমাদের সঙ্গে ভাগ করার জন্য ধন্যবাদ। এবারে কাজ সম্পর্কে আমাদের কিছু বলবেন?

আমার পেশা, মেন্টাল হেলথ্‌ অ্যাডভোকেট হওয়ার পর আমি  যেমন সেটি নিয়ে বলতে ভালোবাসি, তেমনি আমার নাচের প্রতি আগ্রহ নিয়েও আমি বলতে চাই। সেকেণ্ড গ্রেডে পড়ার সময় থেকে আমি নাচ শুরু করি এবং নাচ আমাকে সমস্ত সমস্যা, সবকিছু ভুলিয়ে দেয়। নাচ আমাকে মানসিক যন্ত্রণা মুক্তিতে সাহায্য করেছে। আমি সবসময় নিজেকে আরও ভালো কাজের জন্য উৎসাহিত করেছি কারণ, ভালো কাজ আত্মাকে প্রশান্তি দেয়।

ছোটবেলা থেকে আমি স্কুল দলের হয়ে প্রচুর নাচের অনুষ্ঠান করেছি। পরবর্তীতে, আমি নিজস্ব বিকাশের দিকে মনোযোগী হয়েছি। আমি নিজের জন্য নাচতে চেয়েছি। কয়েক বছর ধরে, আমি আবিষ্কার করেছি যে, শিল্পের যে কোনো ধরণই আপনাকে নিরাময় করতে পারে। বিশ্বাস করুন বা না করুন, নাচ আমার জীবনকে সারিয়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। এছাড়াও, এটা আমার জন্য দুর্দান্ত অবসাদ দূরীকরণ। ভবিষ্যতে, আমি একজন ডান্স মুভমেন্ট থেরাপিস্ট হিসেবে অন্যদের নিরাময় যাত্রায় ভূমিকা রাখতে চাই।

ঠিক আছে। শেষ করার আগে অন্যরা কিভাবে আপনার সাথে কাজ করতে পারে, আপনার সাথে সহযোগিতা করতে বা আপনাকে সমর্থন করতে পারে সে সম্পর্কে আপনি কি কিছু বলতে চান?

এই মুহূর্তে, কাজ এগিয়ে চলেছে। আমার নিজস্ব প্র্যাকটিস শুরু হলে, আপনারা সবাইকে এলসিএসডাব্লু ফৌজিয়া চৌধুরীকে রেফার করতে পারবেন, হাহাহা! তবে আপাতত, সবাই আমাকে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে পরামর্শ দিয়ে সমর্থন করতে পারেন। নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন, নিজের এবং অন্যের প্রতি সদয় হন। এটি করতে পয়সা খরচ হয় না। কমিউনিটিতে আমাদের সকলেরই ভালোবাসা এবং মমতার প্রয়োজনী রয়েছে।❐

Exit mobile version