গল্পসাহিত্য

সুগন্ধী

সি রা জু ল ই স লা ম


ঝরঝর করে আমার মাথার চুল ও মুখ ভিজিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে, আর আমি ভাবছি রুবিনা ও কামরান এখন কী করছে?

কী আবার করবে? আমি- আশা খুব ভালোভাবে জানি, আমার ওপর দু’জনে বিরক্ত হচ্ছে। ওদের বাথরুম বহু সময় ধরে আমি দখল করে রেখেছি। বেশি পরিমাণে বিরক্ত হচ্ছে কে? রুবিনা না কামরান?

আমি ড্রাম বা বালতি থেকে প্লাস্টিকের মগ দিয়ে পানি তুলে গোসল করা মেয়ে। আর এখন মাথার ওপর শাওয়ার থেকে ঝরঝর করে বৃষ্টির মতো পানি পড়ে আমাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। আমার মনে হলো এর নাম স্নান।

মনে মনে আমি কামরানকে বললাম, তোমার বাড়িতে না হয় আজ প্রাণভরে একটু স্নানই করলাম।

রুবিনা একটা শাড়ি বের করে দিয়েছে আমাকে। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি।তুঁত রঙ।এই রঙ আমারও পছন্দ। রুবিনা বলেছিল, একবার মাত্র পরেছি পয়লা বৈশাখে, তারপর লন্ড্রি থেকে ধুয়ে এনে রেখেছি। তোমাকে মানাবে।

আমি দরকার নেই, দরকার নেই- বলছিলাম।

রুবিনা বলল, আমার পরনের শাড়ি পরতে তোমার আপত্তি!

না, তা হবে কেন? আমার কোন সময় এরকম কথা মনে হয়নি।

আমার শাড়ি, পেটিকোট, ব্লাউজ ধুয়ে ফেলেছি। রুবিনার শাড়িটা পরলাম বাথরুমের এক কোণে সরে গিয়ে, যে জায়গাটা সামান্য শুকনো। আমার পেটিকোট, ব্লাউজ কোথায় শুকাতে দেবো যে- যেখানে কামরানের চোখ পড়বে না। রুবিনা যা-ই বলুক, আমি বেহায়ার মতো আমার পেটিকোট আর ব্লাউজ এই ছোট বারান্দায় মেলে দিতে পারব না, কামরান তো এখানে বসে সকালে চা খায় ও পেপার পড়ে।

সব ঠিক করা আছে যে, আজ সকাল সকাল তিনজন বাইরে বেরুবে। দুপুরে বাসায় খাওয়া হবে না। তাই রুবিনা কাজের বুয়াকে বলে দিয়েছিল, সকাল সকাল আসতে, নাস্তা আর রাতের জন্য একটা- দুটা কোনো তরকারি রান্না করে চলে যাবে ।বাকি পুরো বেলা ছুটি।

রুবিনাকে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে বুয়া পুরো বেলা ছুটি নিয়ে ফেলেছে, আসেনি।

যে আচার- আচরণই করুক, রুবিনার যে এই কাজের বুয়াকে বাদ দেয়ার উপায় নেই,এই কথা ভেবে রুবিনা খুব ফুঁসছিল, বুয়াই রুবিনাকে বাদ দিতে পারে।

নাস্তার জন্য কামরুল পাউরুটি কিনে এনেছে। বউকে বলেছে, বুয়া নেই তো কি, আমি তোমার কাজের বেটা,তোমরা বসো, আমি ডিম পোঁচ করে আনছি, আর চা বানাচ্ছি।

খুনসুটি করছে রুবিনা ও কামরান, ডিম ভাজার প্যান নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। কামরান রুবিনাকে জড়িয়ে ধরে এনে চেয়ারে বসিয়ে দিলো, বলল, এখানে শান্ত হয়ে বস তো ম্যাডাম। তুমি আর আশা মিলে ফাইনাল করো, কোথায় কোথায় যাবে।

রুবিনা বসল, আর আমার দিকে তাকিয়ে হাসল- দেখ তো কী করে? হয় ডিম পুড়বে, না হয় হাত পুড়বে।

কামরান গলা উঁচু করে বলল, হাত পুড়লে লস নেই। ডিম পুড়লে পুরো চার টাকা গচ্চা।

আমি ওদের দু’জনের কথায় হাহা করে হাসলাম ।কিন্তু আমি জানি এই খুনসুটিটা সত্যিকারের না, লোক দেখানো। আমাকে দেখানোর জন্য।

কামরান সুন্দর ডিম পোচ করল, পাউরুটির টোস্ট করল। চিনি মাখন মাখালো পাউরুটিতে। চা-ও বানালো সুন্দর সোনালী রঙের আর জিভ পুড়ে যাওয়ার মতো গরম। নাস্তায় আর কী চাই!

কামরান আমার হাতে চা খুব পছন্দ করত, চা খাওয়ার জন্য ছুঁকছুঁক করত। চায়ে চিনি দিতে দিত না, বলত, তোমার একটা চম্পাকলি আংগুল ডুবিয়ে দাও।

সব ছেলেরা এরকম বলে, তখনই আমি জানতাম।

রুবিনা বলল, এখন তো কোনোমতে সারা গেল, রাতে রান্না করবে কে? আমি পারব না। না খেয়ে থাকতে হবে‌।

আমি বললাম, আমি রাঁধব। খুব খারাপ হবে না ।

তোমাকে দিলে তো! বুয়ার উপর রাগে মাথায় রক্ত চড়ে আছে, নামাতে পারছি না।

আমি বললাম, তোমার শাড়িতে কেমন লাগছে আমাকে, বললে না তো?

তোমাকে খুব মানিয়েছে। মনেই হচ্ছে না যে, এটা আমার শাড়ি। আমি কিন্তু শাড়িটাড়ি পরতে পারব না।

আমি বললাম, পরো না একদিন বাবা!

না, তোমার কোন তেলে গলব না, শাড়ি পরে আমি মোটা হাঁটতে পারি না।

তাহলে তোমার সবচেয়ে সুন্দর ড্রেসটা পরো, যেটা দেখে, তোমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকবে কামরান।

আমি ইচ্ছে করেই রুবিনাকে ড্রেস কথাটা বললাম। আমি মফস্বল পাড়াগাঁয়ের মেয়ে। শুধু শাড়ি আর ফ্রক, সালোয়ার আর কামিজের নাম জানি। ঢাকার মেয়েরা নানারকম পোশাক পরে। ওদের সুন্দরও লাগে। আমি অতশত নাম জানি না।

আমি যা তা-ই ,রুবিনার কাছে কিছু লুকাইনি। বোকার মতো একেকটা কথা বলে দরকার কী! রুবিনা ছোটখাটো, অল্প বয়সী মেয়ে। চোখ ভরে দেখবার মতো সুন্দর, তবে বয়স কম বলে ওর পুরো সৌন্দর্য এখনো ফোটেনি। বুকটা পাছাটা, এই দুই জায়গা ভারী হলে, দেহটাকে ধনুকের ছিলের মতো টেনে রাখে।

আমি গোলগাল ছিরিছাঁদ নেই। তাই কোনো পুরুষ আমাকে নিলো না। যে কোন পুরুষ কথাটা পুরো ঠিক হবে না। আমি যার তার কাছে যেতেও চাইনি। গলার কাছে হাতের কাজ করা পাঞ্জাবি পরেছে কামরান। জিন্সের প্যান্ট, ওকে সুন্দর লাগছে।

একসময় কামরান নতুন বা ভালো কিছু পরলে, প্রথমে আমাদের বাসায় আমাকে দেখাতে আসত। আমি সাদামাটা কামরানকে নিয়েই সবসময় পাগল থাকতাম। আর ও যখন বিশেষ হয়ে উঠত, তখন চোখে মুখে সারা শরীরে মুগ্ধতা আমার ঝরে পড়ত। এই পূজাটা পাওয়ার জন্য কামরান আমার কাছে ছুটে ছুটে আসত। আমি ওকে পুজাই করতাম। করতাম কী, এখনো করি!

আকুল হয়ে ওই যে জিজ্ঞেস করত, দেখ তো আশা কেমন লাগছে- এই কথা আর কামরানের মনে নেই।
ওর এখন জ্বালা যন্ত্রণার জীবন।

শোয়ার ঘরে রুবিনা ছিল। কামরানও গেছে সেখানে।

আমি চাপা স্বরে ওদের ঝগড়ার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি।

তিন রাত্রি আমি এ বাসায়। পাশের ঘরে শুয়ে থেকে তিন রাতই টের পেয়েছি- ওরা দু’জনে ঝগড়া করছে। আমি আগ্রহ করে ঝগড়ার কথাগুলো বুঝবার মোটেও চেষ্টা করি না। আমার উচিতও না।

তবে রুবিনা আমাকে সব বলেছে।

রুবিনাকে চারদিন আগেও আমি চিনতাম না।নামও জানতাম না। কামরান যে বিয়ে করেছে, তার দাওয়াত সময় মতো পেয়েছি। তবে, ঢাকায় এসে আমার বা আমার মায়ের এই বিয়ে খাওয়ার উপায় ছিল না।

মানুষ যখন উত্তেজিত হয় তার শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত ও ঘনঘন পড়তে থাকে। তখন সাপের ফোঁসফোঁসানির মতো মনে হয়। আমার ভালো লাগছে না, ওরা ঘরের মধ্যে দু’জনে যা করছে তার অস্থিরতা আমাকে এসে স্পর্শ করছে।

অস্পষ্টভাবে মনে হলো, রুবিনা চাপাস্বরে বলছে- তোমাদের নাটকের মধ্যে আমি থাকবো না।

কামরান বলল,তুমি রাজি হয়েছিলে, তোমারই উৎসাহ বেশি ছিল।

আমার কোনো কিছু কানে নেওয়া উচিত না। কিন্তু আর সব মানুষের মতো, আমারও সাপের মত পাতলা জিভ আছে, যা নিজের ভেতর থেকে বের হয়ে বাইরের অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করে। দরকার না থাকলেও নিজের সীমার বাইরের বিষয়ে এত কেন কৌতুহল!

রুবিনা বলল,এখন আমি রাজি না। আমার তোমার সাথে বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে না। আমি চাই না বাইরের কেউ আমাদের দু’জনকে আর একসাথে দেখুক।

হাতের কড় গুনে দেখলাম। আর একত্রিশ দিন। রুবিনা বলেছে আমাকে, বিয়ের এক বছর পুরোবার আগেই ওদের দু’জনের আপোষে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাচ্ছে।

কামরান ওদের দাম্পত্য জীবনের কোনো কথা আমাকে বলেনি।আসলে কামরানের সাথে এই ক’দিন আমার তেমন কোনো কথাই হয়নি।।

আমি যেদিন ঢাকায় এলাম, গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নেমে, সেখান থেকে লোকাল বাস ধরে মৌচাক। তারপর রিকশায় রামপুরায় ঠিকানা খোঁজাখুঁজি। অনেক সময় লাগল। এই চারদিন ঢাকায় থেকে দেখেছি, এখানে পদে পদে অনেক বিপদ। কিন্তু ওই যে গাবতলী বাস থেকে নামলাম, বাস বদলানো, রিকশায় ঘোরাঘুরি, শেষ পর্যন্ত কামরানের বাসায় এসে ওঠা, -তখন আমার মোটে কোনো ভয় করেনি। আমার সব সময় মনে হয়েছে, এখানে কামরান আছে, আমার ভয় কী! কিন্তু তখন অফিসের সময়, কামরান ছিল না বাসায়। একলা মেয়ে বলে ঘরে ঢুকতে দিলো রুবিনা বসতেও দিলো। কিন্তু আমার কথা সে তেমন কিছু জানে না। আমি নম্বর জোগাড় করে গাইবান্ধা থেকে মোবাইল করেছিলাম কামরানকে।

কামরান মোবাইলে হ্যালো বলতে, আমার কানটা ভরে গেল। বৃষ্টি নামলো।

আমাকে কামরান চেনেনি মোবাইলে , চিনবার কথাও না।

আমার তাকে ফোন করবার কথাও না। সে আমাকে কবে ভুলে গেছে।

আমি আশা, আশা।

কোন্‌ আশা?

আমি তো বেশি দিন নেই। অভিমান হলো। সাহসও হলো। আমাকে যে কোনোভাবে তার কাছে পৌঁছাতে হবে।

আমি ফস করে বললাম, তোমার আশা।

কামরান চমকালো।

আমি তারপরে হেসে বললাম, তোমার ফুফাতো বোন, আশা।

হুঁ, চিনেছি। এতদিন পর আমাদের মনে পড়ল, কেমন আছে সবাই?

আমি বললাম, ঢাকায় আমার জরুরী কাজ। ওখানে আমার তেমন কেউ নেই। তোমার বাসায় উঠবো।

ভালোই তো।

ঠিকানাটা বলো।

কামরান ঠিকানা বলল, আমি লিখে নিলাম।

ব্যস্ত মানুষ কামরান, তার মনে ছিল না,অথবা আমি যে চলে আসব, তার বিশ্বাস হয়নি।

আমার এরকম লম্বা বাসের রাস্তায় ঘোরাফেরার অভ্যাস নেই । গাড়িতে চড়ারও। তাই কাহিলও লাগছিল।
আমাকে বসতে দিল কামরানের বউ। কিন্তু পাশে সেঁটে সেও বসে রইল। ওঠে না। আমাকে কিছু বলেও না।
ওই ভাব দেখে আমি বললাম, আমি কিন্তু থাকবো বউ।

কামরান আসুক।

কখন আসে সে?

আসতে আসতে সন্ধ্যা।
আমি হেসে ফেললাম, এতক্ষন আমাকে বসিয়ে রাখবে? আর দুই মিনিটে আমার কাপড়-চোপড়ে পেশাব হয়ে যাবে।
অল্পের মধ্যে আমি বাথরুম সারলাম।

ফিরে দেখি একইভাবে রুবিনা বসা।

ভাব জমানোর জন্য ওকে বললাম, তোমার স্বামী তোমাকে কখনো আমার কথা বলেছে?

বিয়ের আগে বলেছে আমাকে, দেশে এক মেয়ে আছে, তার জন্য পাগল, কোনদিন বিয়েই করলো না আর। আপনার পরিচয় পেয়ে বুঝলাম, সেটাই আপনি।

আমি বললাম, পাশাপাশি বড় হলে ওরকম হয়। কারো কম হয়, কারো বেশি। তবে হাততালি দিতে দুই হাত লাগে।

রুবিনা বলল, ও, এই কথা বলতে এসেছেন, আপনার পুরনো বন্ধুকে?

আমি বললাম, না, না, আমার অন্য কাজ আছে।

আপনি এসেছেন ভালো হয়েছে। জানি না, নিজের ইচ্ছায় না অন্য কারো ইচ্ছায় এসেছেন। ক’দিনের মধ্যে তালাক দিয়ে আমাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাচ্ছে। তখন দু’জন খুশিমতো হাততালি দিতে পারবেন।

একটু চুপ করে থেকে, হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো রুবিনা। এক লহমায় পুরো বদলে গেল। আমার হাত ধরে টেনে বললো,আসো।

কামরান সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে দেখল, আমিও রুবিনা পাশাপাশি বসে দু’জনে চা খাচ্ছি‌।

হাজার হলেও আমি মেয়ে, আমার স্বভাব যাবে কই? কান পেতে শোনার চেষ্টা করছি। ঘরের ভেতর কোনো সাড়াশব্দ নেই। কিভাবে দু’জনের সন্ধি হলো? ওদের একটা নিয়ম আছে নিশ্চয়ই।

হঠাৎ করে আমার মাথায় ভাবনা খেললো, আচ্ছা,আমার আর কামরানের মধ্যে যদি বিয়ে হতো, তাহলে আমরা দু’জনও কি কোন কিছু নিয়ে ঝগড়া করতাম?

আমার এক মন বলছে, করতাম না। আরেক মন বলছে, অবশ্যই করতাম। ঘর-সংসারে একটা মশলাপাতি বললে মশলাপাতি, না হয় জোড়া দেয়ার আঠা। রুবিনা বেরিয়ে এলো ওর ঘর থেকে। ওদের দুই ঘরের সংসারে আমি বসেছিলাম দুই নম্বর ঘরে।

রুবিনার হাতে ওর কাপড়- চোপড়। আমাকে বলল, তুমি বারান্দায় যাও। আমি কামরানের সামনে কাপড় বদলাবো না। এখানে কাপড় পরবো।

আমি রান্নাঘরের পাশে এসে দাঁড়ালাম। একটা জানালা। রুবিনা ঘরের দরজা বন্ধ করলো। আরেক ঘরে কামরান।
রুবিনার দরজা বন্ধের আওয়াজে আমার গা কেমন শিরশির করে উঠল। একা পেয়ে, আগের দিনের মতো কামরান যদি আমাকে জাপটে ধরে। আমার রোম দাঁড়িয়ে গেছে, গা শিরশির করছে।

না, এরকম আর হয় না।

তিন চাকার বেবিট্যাক্সিকে দেখি সিএনজি বলে, তিনজন এক গাড়িতে যেতে হবে বলে, কামরান একটা সিএনজি নিলো।

ঢাকা আমার স্বপ্নের শহর। ভাবনার জায়গা। কারণ সেখানে কামরান থাকে। আর এ শহরে মনে মনে আমি আর কামরান ঘুরে বেড়াই।

কারো বাড়িতে দেয়ালে ক্যালেন্ডার ঝোলে, ক্যালেন্ডারের বড় করে বায়তুল মোকাররমের ছবি। সেখানেও আমি কামরানকে দেখি।

আমি দু’এক বেলার জন্য মাঝে মধ্যে ঢাকা এসেছি, তাও বেশ আগে।

তবু আমার হাতের তালুর মতো ঢাকার সব চেনা।

আমি গল্পের বই পড়ি। সে গল্পে ঢাকা শহরের কথা না থাকলে, আমার আর পড়তে ইচ্ছা হয় না। টিভির নাটকেও তাই। সিএনজি যাচ্ছিল আমাদের তিনজনকে নিয়ে। সবকিছুই আমার চেনা, আমি আর কামরান কল্পনায় কত ঘুরেছি এসব রাস্তায়।

কার্জন হল, হাইকোর্ট- সব আমার চেনা, দোয়েল চত্বরের সামনে আসতে আমি বললাম, আগে আমি শহীদ মিনার দেখব। গত একুশে ফেব্রুয়ারিতেও মাঝ রাতে, পরে সকাল বেলায় টেলিভিশনে যখন প্রভাত ফেরি, মানুষ, ফুল দেখাচ্ছিলো- আমি চোখ ভরে দেখছিলাম। আমি খেয়াল করে দেখলাম, আমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল, একবার, অন্তত একবার, আমি আর কামরান যদি ঐরকম ভোর বেলায় একসাথে, পাশাপাশি, শহীদ মিনারে…।

শহীদ মিনারের পেছনে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবস্থান,আগে কোনদিন তেমন করে মনে হয়নি।এখন হাসপাতাল দেখে বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

আগামী একুশে ফেব্রুয়ারি, অনেক দেরি, অতদিন আমি থাকবো না। টিএসসি, রোকেয়া হল, শামসুন্নাহার হল- সব হেঁটে হেঁটে দেখছিলাম, ঘোরলাগা মানুষের মতো। আমার সাথে যে আর কেউ আছে তেমন খেয়ালও থাকছে না।
কামরান মহসিন হলে থেকে এখানে পড়ত, আমি ওর চিঠিতে সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইতাম,ওর চারপাশের সমস্ত কথা।

লেখার ভেতরে যে মানুষটা থাকে সে বড় পবিত্র থাকে তার কোন মন্দ থাকে না। লেখাকে মনের অজান্তে পবিত্র জ্ঞান করার কারণে মনে হয় এরকম হয়।

আমি আর কামরান এক ক্লাস উপর-নিচে পড়তাম। কামরান ওর ক্লাসে প্রথম হতো, আমি আমার ক্লাসে।

সবাই বলতো, এই দু’জনের অনেক মাথা, ওরা ঢাকায় পড়তে যাবে। আমি আর কামরানও জানতাম।ন কেন জানি না, দু’জনে ঠিক করেছিলাম, দু’জনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবো।

আমার বাবা মরে গেল, কামরানও সরতে সরতে দূরে চলে গেল।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জোড়ায় জোড়ায় ছেলে মেয়েরা বসে আছে। আমার মনে হলো, আমি আর কামরান যদি এভাবে বসে থাকতে পারতাম।

আমি রুবিনাকে বললাম, তোমরা দু’জন তো এখানে পড়তে। এরকম বসে প্রেম করতে না!

করতাম। আরো কি রগরগরগরি করতাম, সব শুনতে চাও না ?

এই মেয়ে রেগে যাচ্ছ কেন?

তুমি শুনতে না চাও, তোমার পাশের জনকে শোনাতে পারি।

আমি বললাম, বাদ দাও তো।

বাদ কেন দেব? এক বয়সে তোমাকে নিয়ে খেলেছে। এখন বুঝতে পারি, আমাকে নিয়েও খেলেছে। মহা বিশ্বপ্রেমিক, বিয়ের দুদিনের মাথায় বুঝলাম, এ অন্য লোক। বাজে লোক, স্বামী হিসেবে অচল। আমি কী দেখে যে ভুলেছিলাম! তোমাকে বলেছি,আমি ভেবে-চিন্তে, ঘর ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার জীবন আমি নষ্ট করব না। এখনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নি, জীবন আবার নতুন করে সাজাতে পারব। আমাকে বেশি কষ্ট করতে হয়নি, দয়া করে তিনিও রাজি হয়েছেন, আমাকে ছেড়ে দেবে।

আমার কামরানের জন্য মায়া লাগছে, আমার রুবিনার জন্য মায়া লাগছে। আমি এ দু’জনের জন্য কিছু করতে পারি না?

কামরান আর রুবিনা যে কী ভাগ্য নিয়ে এসেছে, তারা তো বুঝতে পারছে না এখন।

আমি যদি ওদের থামিয়ে দিয়ে বলি, দেখো জীবন কী সুন্দর!

বেঁচে থাকা কী সুন্দর!

কামরানকে জোর করে কোনদিন আমার জন্য চাইনি। এখন যদি রুবিনার জন্য চাই।

কামরানের জন্য আমার যত ভালোবাসা,তা যদি আমি রুবিনার ফোনে ঢুকিয়ে দিতে পারি।

তাহলে হয় না?

যদি ওদের দু’জনকে বলি, আমার আয়ু আর বড় জোর এক মাস বা দু’মাস। এই মৃত্যুপথযাত্রীর কথাটা রাখো, আরেকবার চেষ্টা করো, একবার, দু’বার- পাশাপাশি থাকো, কাছে থাকো-আবার একটা কিছু হবে, এই দু’জনে মিলে অন্তত আরেকটা মানুষ পুতুল জন্ম দেবে না?

ওরা বিশ্বাস করবে না? আমার কথার কোন মূল্য দেবে না?

আমি বলব , শোনো বউ, আমার ব্রেষ্ট ক্যান্সার। গাইবান্ধায়ই ডাক্তার বলেছিল। বলেছিল, ঢাকায় গিয়ে দেখান। ঢাকায় আসার সাহস করতে তিন চার মাস চলে গেল। ঢাকার ডাক্তারের চেম্বারের ঠিকানা নিয়ে এসেছিলাম। আমি যে দু’দিন তোমাকে বলে বাইরে বেরিয়েছিলাম বাসা থেকে আসলে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য গিয়েছিলাম।

ডাক্তার আমাকে বলেছিল, আপনার সাথে কেউ নেই?

আমি বলেছি, না।

ডাক্তার বলেছে, অনেক দেরি হয়ে গেছে, ক্যান্সার অনেক ছড়িয়ে গেছে। বেশি কিছু করার নেই। চেষ্টা করা যেতে পারে।

কি চেষ্টা ?

অপারেশন, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, অনেক টাকা লাগবে, কয়েক লাখ।

আমি হেসে বলেছিলাম, বিশ হাজার টাকাও আমি একসাথে জোগাড় করতে পারব না।

তাহলে কী করবেন?

আমি এই কয় মাস খুব ভয়ের মধ্যে বাস করছিলাম, যখন প্রথম গাইবান্ধার ডাক্তার আমাকে বলল-ক্যান্সার।

হঠাৎ করে আমার ভয় কেটে গেল। আমি ডাক্তারের চোখে চোখ রেখে বললাম, অপেক্ষা।

ডাক্তার দয়া করে আমার কাছ থেকে আর সেদিনের ভিজিটের টাকা নিলেন না।

আমি জানতাম, মাঝপথে থেমে থাকবে না, কামরান আর আশার গল্প কোনো একভাবে শেষ হবেই।

কামরানের পাশে কয়েকটা মুহূর্ত থাকার জন্য বড় তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিলাম।

আমার এ গল্প কামরান আর রুবিনা বিশ্বাস করবে না।

ছায়া দেখে লাইব্রেরীর সিঁড়িতে ওদের দুজনকে বসালাম।

মাঝখানে আমি। আমার ব্যাগ খুলে ডাক্তারি কাগজপত্রগুলো বের করে কয়েকটা রুবিনাকে দিলাম, কয়েকটা কামরানকে দিলাম।

কামরান আর রুবিনা দু’জনে কিছুক্ষন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।

তারপর রুবিনা কামরানকে বলল, তোমার কয়েক লাখ টাকা নেই?

কামরান রুবিনার একটা হাত আঁকড়ে ধরলো। রুবিনার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। মুখ নামিয়ে রেখেছে, বুঝতে পারছি, আমার মুখ দেখতে তার সাহস হচ্ছে না।

কামরান বলল, রুবিনা তুমি আশাকে নিয়ে বাসায় যাও। আমি পত্রিকা অফিসে যাব-ওরা আশাকে নিয়ে পত্রিকায় লিখলে কাজ হবে। অনেক মানুষ চাইলে, দেখবে, আশার কিছু হবে না।

রুবিনা আমাকে বলল, তুমি সুস্থ হয়ে গেলে, সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু আমাদের কাছ থেকে চলে যাবে- কামরানের চোখের সামনে তোমাকে রাখতে আমার আর সাহস হবে না। ❏


▰সত্তর দশকের লেখক সিরাজুল ইসলামের ‘সুগন্ধী’ গল্পটি ২০০৬ সালে ‘প্রথম আলো’র সাহিত্য পাতায় ‘সুগন্ধী’ গল্পটি প্রথমে ছাপা হয়।পরে লেখকের গল্পগ্রন্থ ‘সুগন্ধী’ বইয়ে প্রকাশিত হয়। বইটি এখন বাজারে সহজলভ্য। এ বছর বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে লেখকের উপন্যাস ‘পলাতকা’ ও ‘পাথরগুলো’। আসছে ২০২১ বইমেলায় তাঁর প্রকাশিতব্য উপন্যাস ‘গুহা’ ও ‘আবছায়া’ বেরুবে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension