অণুগল্পছোটদের পাতা

স্বপ্ন

সামিয়া মাহফুজ টিউলিপ

‌জুলেখার শরীরটা ভালো নয়। আজ দু বছর হলো জুলেখা মিলিদের বাড়িতে থাকছে। দশ বছর বয়স তার। এর আগেও সে অনেক বাড়িতে ছিল, কিন্তু বেচারা কোথাও টিকতে পারে না। ছোট্ট জুলেখার ছোট্ট মনটাতে অনেক স্বপ্ন।

জুলেখার ছোট ছোট স্বপ্ন বড়রা বোঝে না তো। বাবার ঘাড়ে চড়ে মেলায় যাবে, লাল চুড়ি কিনবে… আতিয়া, সাবিনাদের সঙ্গে কানামাছি খেলবে, মায়ের আঁচলের গন্ধ নিয়ে শুয়ে থাকবে… এমনি আরও কত কত স্বপ্ন!

মিলিদের বাড়ির সবাই জুলেখাকে ভালোই বাসে, কিন্তু মাঝে মধ্যে কাজে অক্ষমতার জন্যে বেচারিকে মারও খেতে হয়। দুষ্টুমির চূড়ান্ত করে যে! আজ সকাল ৮টা বাজতেই বাড়ির কর্ত্রী মিলির মা এসে ঘুম থেকে ডেকে তুলে দিয়ে গেছে। কিন্তু জুলেখা উঠতে পারছে না। গায়ে তার জ্বর।

কিছুক্ষণ পর বাড়ির বউ এসে দিল এক ধমক। ধমক খেয়ে বেচারি বুকে এক ঝাঁক কষ্ট নিয়ে উঠে পড়ল বিছানা থেকে। তারপর শুরু হলো তার কাজ। শরীর চলতে চাইছে না, তবু অনেক কষ্ট করে কাজ করছে সে আজ। শরীরে জ্বর, ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব, এসবের সঙ্গে সর্দিও এসে যোগ দিয়েছে।

সব কাজ শেষে দুপুরের খাবারের পর সে গেল একটু বিশ্রাম নিতে। বিকালে তার বন্ধুরা খেলতে ডাকলেও গেল না জুলেখা। আজ তার কিছু ভালো লাগছে না।

‌সন্ধ্যায় জ্বর অনেক বেড়ে যাওয়ায় জুলেখাকে ওষুধ দেওয়া হলো। সবাই ওকে অনেক আদর করে। কিন্তু এখন তার দরকার মায়ের আঁচলের সেই গন্ধ।

গেল ডিসেম্বরে এ বাড়ির সকলে বেড়াতে গিয়েছিল। জুলেখাকেও সঙ্গে নিয়েছিল। তারা সকলে অনেক মজা করেছে। কিন্তু জুলেখার ভালো লাগে নি। যারা মজা করছে তারা তো এই পরিবারেরই। জুলেখাও স্বপ্ন দেখে তাদেরও এমনি একটি সুখী পরিবার হবে। যেখানে তারা সবাই মিলে খুব আনন্দে থাকবে। তাদের থাকবে না কোনো অভাব।

এ বাড়ির বাচ্চাদের অসুখ হলে তাদের বাবা-মায়েরা কত আদর করে, মা মুখে তুলে খাইয়ে দেয়। এ বাড়িতে জুলেখাও অনেক যত্নে আছে। কিন্তু তার যে চাই মায়ের আঁচলের গন্ধ আর স্পর্শ।

‌রাতে জুলেখার জ্বর আরও বাড়ে। মাঝরাতের দিকে শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। বাড়ির সবাই খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। এই করোনাভাইরাসের মহামারীর সময়টাতে বাচ্চা মেয়েটার এই অবস্থা!

পরদিন সকালে জুলেখার করোনা টেস্ট করতে দেওয়া হলো। একদিন পর করোনার রির্পোট এলো। টেস্টে জুলেখা করোনা পজেটিভ। বিকেলে জুলেখার শ্বাসকষ্ট আরো বেড়ে গেল। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

জুলেখার চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল মাঠ। সে মাঠ ধরে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে জুলেখা পৌঁছে যাবে মায়ের কাছে।মা যে তার জন্যে চালতা মাখা তৈরি করে রেখেছে!

‌অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দে চারদিকের নীরবতা স্তদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে।❑

লেখক: শিক্ষার্থী, অষ্টম শ্রেণি, বগুড়া ক্যান্টমনেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension