ছড়াব্যক্তিত্বসাহিত্য

স্বাজাত্যবোধে ভাস্বর জগলুল হায়দার

আজ ৮ অক্টোবর বিশিষ্ট ছড়াকার জগলুল হায়দারের ৫৫তম জন্মদিন। বর্তমান সময়ে বাংলা ছড়া সাহিত্যের অনন্য প্রাণপুরুষ ছড়াকার জগলুল হায়দার। রূপসী বাংলাসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও পত্রিকায় লেখালেখি করে চলেছেন নিত্যনতুন বিষয় আর সময়কে ধারণ করে। ছড়াকার জগলুল হায়দারের জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে লিখেছেন বিশিষ্ট ছড়া গবেষক ও নিখিল ভারত শিশুসাহিত্য সংসদের সাধারণ সম্পাদক আনসার উল হক।

আ । ন । সা । র । উ । ল । হ । ক

এক হাঁড়ি ভাতের মধ্যে একটা মাত্র ভাত টিপে যেমন হাঁড়ির সমস্ত ভাতের খবর পাওয়া যায়, ঠিক তেমনি কবি জগলুল হায়দারের অসংখ্য রচনার মধ্যে দু’একটা ছড়া পড়লে মালুম হয়ে যায় তিনি কত বড় মাপের ছড়াশিল্পী। শুধু তাই নয়, তিনি কতটা আধুনিক কিংবা কতটা অত্যাধুনিক। বাংলা ছড়া-সাহিত্যের সুনীল আকাশে তিনি কতটা অপরিহার্য, তা পাঠকমাত্রই অনুভব করেন। অর্থাৎ বলা যেতে পারে ছড়ার উত্তরাধুনিকতার সাম্রাজ্যে তিনি এক নিবেদিতপ্রাণ, ছড়া গড়ার শক্তিমান কারিগর এবং একচ্ছত্র সম্রাট।

ছড়া মানুষের কথা বলে, ছড়া সময়ের কথা বলে, ছড়া আন্দোলনের কথা বলে, ছড়া মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে। সেসব কথা অসম্ভব গতিময়তায় উঠে এসেছে জগলুলের কলমে। চিরন্তন আবেদনে তিনি স্বপ্নতুলি বুলিয়ে দেন শিশুদের সহজ-সরল মনে, মায়ার কাজল পরিয়ে দেন কিশোরদের বিস্ফারিত জিজ্ঞাসু চোখে। আর বড়দের চোখে আঙুল দিয়ে সমাজের অসঙ্গতিগুলোকে তুলে ধরেন হাসতে হাসতে। সেগুলো মজায় মোড়া আনন্দনাড়– হয়ে পৌঁছে যায় সবার কাছে। সমস্ত শ্রেণির পাঠকের হৃদয়ে।

গত একশ’ বছরের প্রথম দিকে বাংলা শিশুসাহিত্য ছিল লোকজ উৎসজাত এবং সংস্কৃত ও আরব্য-পারস্য গল্পগাথা থেকে সংগৃহীত। ঈশপস্‌ ফেবলস্‌, লাঁ ফতে কিংবা ক্লিলফের নীতিগল্প থেকেও কিছু কিছু উপকরণ সংগ্রহ করা হয়েছিল। আশা গঙ্গোপাধ্যায় ‘বাংলার ব্রতকথা’য় ছড়ার শিশুসাহিত্য অন্বেষণ করেছেন। শিশুসাহিত্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন:‘যথার্থ শিশুসাহিত্য বলিতে তাহাই বুঝিব, যাহা সর্ববয়সের নরনারীর কাছেই একটি রসাস্বাদ আনিয়া দেয়, বয়সের পার্থক্য অনুসারে আস্বাদনের ব্যাপারে কিছু বিভিন্নতা ঘটিতে পারে কিন্তু সর্বস্তরের মানুষকে আনন্দদান করিবার মতো শিল্পগুণ তাহাতে থাকিবে।’

আশা গঙ্গোপাধ্যায়ের এই কথা জগলুল হায়দারের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে প্রযোজ্য। তাঁর ছন্দ ও অক্ষরের ফাঁকে যে মজা ও শিল্পগুণ লুকিয়ে থাকে, তা ঘাপটি মেরে বসে থাকা নয়, বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসারিত হয়ে পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের কাছে। তাই তিনি মানুষের কবি। খেটে খাওয়া জনগণের প্রতিনিধি। কারণ প্রত্যেক ছড়াকারই তো কবি, কিন্তু প্রত্যেক কবি ছড়াকার নয়। প্রসঙ্গত প্রতিটি ছড়াই কবিতা, কিন্তু সব কবিতাই ছড়া নয়।

গদ্য-পদ্য মিলিয়ে তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ত্রিশটির বেশি। ছড়া-কবিতা, অনুকাব্য, গল্প, লিমেরিক, হাইকু, কাব্যছড়া, শিশুতোষ ছড়া, লোকজ ছড়া, সনাতন ছড়া, আধুনিক ছড়া, উত্তরাধুনিক ছড়া- সবটাতেই তিনি সাবলীল, সহজ। উত্তরাধুনিকতায় তিনি যে সাহস দেখিয়েছেন তা ক’জনের পক্ষে সম্ভব হয়েছে জানি না, ‘পাওয়ার প্লে’ তার উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রথম ছড়াগ্রন্থ ‘বাংলার মুখ বাংলার মিথ’ লিখে তিনি তাঁর গৌরবময় আবির্ভাবের কথা জানান দেন। অনার করলে অনার পাবি, চুম্বক, টুইন টাওয়ার রুইন টাওয়ার, আন্তনেটের ডটকম, সেকালের গল্প একালের ছড়া, স্বাধীনতার কাব্য ইতিহাস, অদ্ভুত বদ ভূত ইত্যাদি তো সাহিত্যের সম্পদ। মান্যতা পেয়েছে ছোট-বড় সবার কাছে। মেঠোপথ থেকে সরাসরি উঠে এসেছেন রাজপথে।

ছন্দের জাদুকররাই তো ছন্দ নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন, মেতে ওঠেন ছড়া-কবিতার পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। গতানুগতিকতার বেড়া ভাঙচুর করতে পছন্দ করেন। জগলুলও এর ব্যতিক্রমী নন। তাঁর ছড়ার ভুবন এতটাই বিস্তৃত যে, আশপাশের পরিবেশ, নিত্যদিনের ঘটনা- সবই জীবন্ত হয়ে ধরা দেয় তাঁর লেখনীতে। যাপিত জীবনের সঙ্গতি-অসঙ্গতির খণ্ডচিত্র, সমাজ বাস্তবতা, রঙ্গব্যঙ্গ কিংবা নীতিহীন রাজনীতি- সবই থরে-বিথরে সাজানো থাকে তাঁর ছড়ায়। দু’একটা উদাহরণ দেওয়া যাক :

চালের দামে চান্দি গরম/ বাজার গরম বাগুনে/ চুলাই শুধু হয় না গরম/ ভাত চড়ানোর আগুনে। [একটা কিছু করেন] অথবা
লোকটা বড় মানি, তার/পাহাড়-প্রমাণ মান/দু’একখানা জুতার ঘায়ে/হয় না অপমান। [ফাংকোলা] কিংবা
পরিসংখ্যান বোর্ড বসেছে/হিসেব কিতেব নিতে/বাংলাদেশের ছাগল কত/ভূমির বিপরীতে।
সেই মোতাবেক নামল কাজে/দুই জুনিয়র কর্মী/রিপোর্ট দিল বোর্ডের কাছে/সার্ভে করে বর্মি।
হিসেব শুনে রাগে সাহেব/কাঁপছে থরো থরো/হয়নি বাপু, তিনটে ছাগল/ওর সাথে অ্যাড করো।/থতোমতো কর্মীরা কয়/বাদ গেল ফের কে?/সাহেব বলেন, তোমরা দুটো/এবং আমি হে! [ছাগল শুমারি]

সমাজ সচেতনতা ও ভাব-ভাবনায় ঋদ্ধ এইসব ছড়া মানুষকে ঘুম থেকে জাগায়। ঘুমগোড়েদের চাবুক মেরে মাঠে-ময়দানে ছোটায়। উপরোল্লিখিত ছড়াংশের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নি®প্রয়োজন। কারণ এগুলো এতটাই সহজবোধ্য যে, যেকোনো পাঠক বুঝতে পারেন। এখানে জগলুল হায়দার সার্থক, এখানেই তিনি শিল্পী।

রবীন্দ্রনাথ মনে করেন : ‘গাম্ভীর্য নয়, অর্থের মারপ্যাঁচ নয় সুষমা ধ্বনিই ছড়ার প্রাণ। ছড়া হলো গভীর কথা, হালকা চালে পায়ে নূপুর বাজিয়ে চলে, গাম্ভীর্যের গুমর রাখে না। ছড়া পরিবর্তনশীল, বিবিধ বর্ণে রঞ্জিত।’ আর রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের কথায়: ‘কবিতারই আরেকটা রূপ ছড়া। কবিতার বক্তব্য একটু ঘুরিয়ে বলা হয়, যাতে পাঠকের জন্য ভাবনার খোরাক থাকে। ছড়ার রস আস্বাদন করতে পাঠককে খুব গভীরে যেতে হয় না। এর মানে এই নয় যে, ছড়ায় চিন্তার খোরাক থাকে না। থাকে, তবে তা সহজ-স্বচ্ছ, জটিল নয়।’ রবীন্দ্রনাথ ও দাদাভাইয়ের রাস্তায় জগলুল হেঁটেছেন স্বচ্ছন্দে, অনায়াস ভঙ্গিতে। তাই তিনি তাঁদের সার্থক উত্তরসূরি।

তিনি জলকে জল আর দুধকে দুধ কিংবা কোদালকে কোদাল বলেন বলেই, তিনিই জগলুল। তিনি প্রতিনিয়ত নিজেই শুধু নিজেকে অতিক্রম করেন না, উত্তরসূরিদের এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা দেখান, অনুপ্রেরণা জোগান। তাঁর গদ্যশৈলীও প্রাবন্ধিকদের ভাবায় ‘ছড়ার শত্রু-মিত্র’ কিংবা ‘ছড়ার সাম্প্রতিক ভাষারীতি’ তার প্রমাণ। তাঁর কলমে আপস থাকে না, সংগ্রাম থাকে। থামতে চায় না, টগবগে ঘোড়ার মতো শুধু ছুটতে জানে। ছড়ার ব্যাপারে একশ্রেণির কবিদের নাক সিটকানোয় তিনি অবাক হন কিন্তু কোনো পাত্তা দেন না।

তাঁর কথায়: ‘বিস্ময়ের ব্যাপার হলো ছড়ার মূল শত্রু সন্ধানও আমাদের সেইসব কাগজ থেকেই। এই কাগজগুলোর মধ্যে যারা তীর্যক উন্নাসিকতায় ছড়ার দিকে নাক সিটকিয়ে থাকেন তারাই বোধহয় সাহিত্য সম্পাদক। হয়তো অনেক সাহিত্য সম্পাদকই ব্যক্তিগতভাবে এন্টিরাইম তথা ছড়াবিদ্বেষী নন। কিন্তু তাদের আচরিত নীতিমালা, ট্র্যাডিশন, প্র্যাকটিস বা অভ্যাস ছড়ার প্রতি নিদারুণ বিমাতাসুলভ বৈশিষ্ট্যদুষ্ট। তাই তো ভালো ভালো হাজারো ছড়া থাকা সত্ত্বেও খুব অল্পই ছাপা হতে দেখা যায় অথবা আদৌ দেখা যায় না। আশ্চর্য! কবিতার এত সমগোত্রীয়, এত নিকট-পড়শি হওয়ার পরও ছড়ার মতো একটি শিল্প শাখার প্রতি এ ধরনের ঔদাসীন্য কোন যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? এই রীতি বা ট্র্যাডিশনের আশু পরিবর্তন আবশ্যক।’ [ছড়ার শত্রু-মিত্র]

আর একটি উদাহরণ অবশ্যই দেয়া দরকার। সাধারণ কিংবা শিক্ষিতদের অনেকেই নতুনকে স্বাগত জানাতে কুণ্ঠাবোধ করেন। অতীত আঁকড়ে বসে থাকতে পছন্দ করেন। সেইসব ব্যাপারে জগলুল পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন:
‘নতুন পথ নির্মিত হতে দেখলেই অস্বস্তিতে ভোগেন অনেকে। চেনা পথের বাইরে কেউ চললেই এরা ভেবে বসেন বিপথগামী। কিন্তু যে যুগের পথিক, তাকে তো পুরনো পথরেখায় ট্রেইল করে গেলেই চলবে না। তাকে তো নতুন ট্র্যাক নির্মাণ করতে হবে। তার নিজের জন্য, তার উত্তরানুজদের জন্য। ঠিক এখানে এসেই ভেঙে যায় তথাকথিত শাশ্বতের মাহাত্ম্য। ভেঙে যায় ছড়ার পুরনো শরীর। বাসি অবয়ব। ছেঁদো ছন্দ-তাল। বহু চর্চিত শব্দ সোপান। একঘেয়ে বাকরীতি। আর সে জায়গায় প্রতিস্থাপিত হতে থাকে নয়া সৌষ্ঠব, নতুন সৌকর্য। এই ভেঙে পড়া নিছক ভাঙার জন্যই নয়, বরং এটি মূলত নতুনকে গড়ে তোলার এক নতুন জেহাদ, নতুন ক্রুসেড। আদতে এটি চিরকালীন সংগ্রামের সমকালীন অভিঘাত (Impact) মাত্র।’

সবশেষে বলব, তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতার কথা। ছড়ার সম্রাট সুকুমার রায় যেমন ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে একশ’ বছর এগিয়ে, তেমনি জগলুল হায়দারও ভাবনা প্রকরণ ও আধুনিকতায় এখন থেকে একশ’ বছর এগিয়ে আছেন। কারণ, তিনি জানেন বিজ্ঞান ছাড়া দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়। ছোটদের বিজ্ঞানমনস্ক করার জন্য ননসেন্স রাইমের পাশাপাশি বিজ্ঞানের ছড়াও দরকার। সেই কথা চিন্তা করে তিনি পাঠকদের মাথায় ঢুকিয়ে দিলেন মিসিং লিংক, বিগ ব্যাঙ, ই-লার্নিং, সোডিয়াম বাতি, কিংবা ক্লোন বা ফিউজ কাট ইত্যাদি।

কোষে কোষে বিভাজনে নয়া প্রাণের যাত্রা/ শ্যাওলা থেকে পেল তারা আরো নতুন মাত্রা। [মিসিং লিংক] বার্ষিক আহ্নিক দুইখানা গতিতে/বর্ষ দিবস রাত হয় শুভ মতিতে। [গতির নিয়ম] ছড়াশিল্পের সচেতন এই আনন্দ-পথিক নব নব আবিষ্কারের সাধনায় মেতে উঠুক আর আমরা সাধারণ পাঠক যেন তাঁর নিত্যনতুন আবিষ্কারের রসাস্বাদন থেকে বঞ্চিত না হই।

জগলুলের ৫৬তম জন্মদিনে আমার প্রিয় কবি আসাদ চৌধুরীর সেই বিস্ফোরক মন্তব্য আজও মনকে নাড়া দেয়, ভাবায়। তিনি বলেন, ‘জগলুল প্রচণ্ড আধুনিক মানুষ। প্রচণ্ড আন্তর্জাতিক। [বিশ্বায়নের কথা বলছি না]। পৃথিবীকে আপন ভাবা, প্রতিটি মানুষকে আপন ভাবা, ভাই ভাবা, পৃথিবীর সংকটকে নিজের সংকট ভাবা কিংবা এই বাংলাদেশে বসে পৃথিবীর সংকটকে তিনি খুব গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। তিনি অস্ত্রের বিরুদ্ধে লড়েন, যুদ্ধের বিরুদ্ধে লড়েন, শান্তির স্বপক্ষে লড়েন। আমি ওর লেখা পড়ে খুবই অভিভূত হয়েছি। তার হাত আরো শক্তিশালী হোক, মজবুত হোক। আমাদের জাতিকে চাবুক মেরে মেরে বিজ্ঞানের প্রতি, প্রযুক্তির প্রতি, আধুনিকতার প্রতি এবং আধুনিক বিশ্বের উপযোগী নাগরিক করার প্রতি, তিনি যেন এগিয়ে আসেন।’

ছোটদের ছন্দরসিক, কিশোরদের কথামালার জাদুকর জগলুল হায়দারকে তার ৫২তম জন্মদিনে ভারত থেকে পাঠালাম একবুক শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা। তিনি ভালো থাকুন সুরক্ষিত থাকুন।❐

লেখক: বিশিষ্ট ছড়া গবেষক। সাধারণ সম্পাদক, নিখিল ভারত শিশুসাহিত্য সংসদ।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension