অঙ্গনাযুক্তরাষ্ট্র

১ লাখ ২৬ হাজার মার্কিন নারী গর্ভকালীন সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছেন

আসছে তিন নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের যে বাস্তবতা বিরাজমান তাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান অনেকটাই নাজুক। তিনি দেশটিতে বর্ণবাদ এবং অভিবাসী বিরোধী কর্মকান্ড শুরু করেছেন। সবক্ষেত্রেই একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করছেন।

প্রথম দফা অভিবাসী ও মুসলিম বিরোধী কর্মসূচিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জয়লাভ করেছিলেন। তার প্রধান লক্ষ্য ধনিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা এবং দরিদ্রদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। যেন তিনি শ্বেতাঙ্গদের নিরঙ্কুশ সমর্থনে আগামী নির্বাচনে বৈতরণী পেরিয়ে যেতে পারেন। একারণেই একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তারই অংশ হিসাবে ওবামাকেয়ারের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রে গর্ভনিরোধক যে সুবিধা নারীরা পেতেন, এখন তারা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

গত ১৪ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের এক রুলে বলা হয়েছে, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান ও মালিক তার কর্মীদের ধর্মীয় ও নৈতিকতার কারণ দেখিয়ে স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনার মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণকে বাদ দিতে পারবে। এ কারণে এখন যেসব নারী গর্ভনিরোধক সুবিধা পান, আগামীতে তা নাও পেতে পারেন।

অনেকদিন ধরেই ট্রাম্প প্রশাসন এই খাতে খরচ কমানোর চেষ্টা করছিল। সেই সঙ্গে এই সুবিধা প্রদানের বিষয়টি চাকরিদাতারা যাতে ধর্মীয় ও নৈতিকতার কারণ দেখিয়ে কমাতে পারেন, সেই চেষ্টাও ছিল। এখন তারা সফল হলো।

গণমাধ্যম বলছে, এই রুলের ফলে ট্রাম্পের জয় হলো। এখন সুপ্রিম কোর্ট ওবামাকেয়ারের গর্ভনিরোধক কভারেজে ধর্মীয় লিমিট অনুমতি দেবে। এই রুলের কারণে আরও অনেক ধরনের চাকরিদাতারা ধর্মীয় ও নৈতিক কারণ দেখিয়ে হেলথ কেয়ার প্ল্যান থেকে বার্থ কন্ট্রোল বাদ দিতে পারবেন। মোদ্দা কথা ট্রাম্পের জয়, সুপ্রিম কোর্ট ওবামাকেয়ার গর্ভনিরোধক কভারেজের ধর্মীয় সীমাবদ্ধতার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। রায়টি এমন ধরনের নিয়োগকর্তাদের ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েছে, যেগুলো তাদের স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনার মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণকে অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকার করে ধর্মীয় বা নৈতিক আপত্তিগুলোকে উদ্ধৃত করতে পারে।

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে সাশ্রয়ী মূল্যে আইনের অধীনে তাদের শ্রমিকদের নিজ খরচায় জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রদান করতে অস্বীকার করে দেশটির নিয়োগকর্তাদের আরও স্বস্তি দেওয়ার পথ পরিষ্কার করেছে। এই রায় প্রশাসনের যে ধরনের নিয়োগকর্তা তাদের স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গর্ভনিরোধককে অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকার করার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বা নৈতিক আপত্তি তুলে ধরতে পারে, তার প্রসারকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করার পরিকল্পনার একটি বিজয়।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনার আওতায় দেশব্যাপী ১ লাখ ২৬ হাজার নারী জন্মনিয়ন্ত্রণ/ গর্ভাবস্থায় সুবিধা হারাবেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। প্ল্যান প্যারেন্টহুড বলেছিলেন, ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জন তাদের জীবনে কোনও রকমের জন্য গর্ভনিরোধক যত্ন গ্রহণ করেন বা বলা যায়, ১০ জন নারীর মধ্যে ৯ জন নারী তাদের জীবনে কোনও না কোনও সময়ে কন্ট্রাসেপটিভ কেয়ার চান।

ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে ওবামাকেয়ারের গর্ভনিরোধক সুবিধা সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। আদালতের ৭-২ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পক্ষে বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস বলেছেন, অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট বা সাশ্রয়ী মূল্যের কেয়ার অ্যাক্ট, ওবামাকেয়ার নামে সুপরিচিত, সরকারকে ধর্মীয় ও নৈতিক আপত্তি তৈরি করার ক্ষমতা দেয়।

জাস্টিস রুথ ব্যার্ডার জিন্সবার্গ এবং সোনিয়া সোটোমেয়র বিচারক, যারা এই রুলিংয়ের বিরুদ্ধে ছিলেন, তারা বলেছেন, অতীতকালে কোর্ট এমন রায় দিয়েছে রিলিজিয়ন ফ্রিডম মামলায়, যাতে করে কয়েকজনের বিশ্বাস অন্যদের অধিকারকে প্রভাবিত না করে।

তারা বলছেন, অতীতে আদালত ধর্মীয় স্বাধীনতা মামলায় ভারসাম্য রক্ষা করেছে, যাতে কারও বিশ্বাস অন্যের অধিকারকে কাটিয়ে উঠতে পারে না। আজ কোর্ট প্রথমবার ধর্মীয় অধিকার বহাল করতে গিয়ে অন্যের অধিকার সাইডে সরিয়ে দিচ্ছে এবং নারীদের নিজেদের দেখাশোনার ব্যাপার তাদের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ধর্মীয় অধিকার সুরক্ষার উদ্যোগের প্রতি পাল্টা অধিকার এবং স্বার্থকে পুরোপুরি বাদ দিয়েছে এবং গর্ভনিরোধক পরিষেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের নিজের প্রতিরক্ষা করতে বাধ্য করেছে।

মহিলা গ্রুপ এই রুলিং মানছে না। তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়েছে। তারা এটাকে নেতিবাচক বলছে। ন্যাশনাল ওমেন্স ল’ সেন্টার বলেছে, প্রায় ৬১ মিলিয়ন নারী ওবামাকেয়ারের মধ্য দিয়ে বার্থ কন্ট্রোল কভারেজ পান। তারা বলছে, এই রুলিংয়ের কারণে এখন তারা এই গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাবেন কি না তা নির্ভর করবে তাদের চাকরিদাতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর। এই সিদ্ধান্ত চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে কম বেতনের চাকরিজীবী, বিভিন্ন বর্ণের নারী ও এলজিবিটিকিউদের ওপর অনেক বড় বাধা।

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং বর্তমান ডেমক্রেটিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বলেছেন, স্বাস্থ্যসেবা এমন একটি অধিকার, যেটা মানুষের রেস, জেন্ডার, আয় বা জিপকোড আর ডিপেন্ডেন্ট দিয়ে হওয়া উচিত নয়। তার পরও এই সিদ্ধান্তের কারণে অনেক নারী অ্যাফোর্ডাল প্রিভেনটিভ কেয়ার পাওয়ার ক্ষেত্রে এখন ঝুঁকিতে আছেন।

তিনি আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় যেমন হতাশাজনক, তেমনি এটিকে সংশোধন করারও একটি স্পষ্ট পথ রয়েছে। তা হলো নতুন একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা, যিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক অ্যাফোর্ডাল কেয়ার অ্যাক্টের সেবা বন্ধের পথটি প্রতিহত করতে পারবেন। ❑

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension