অঙ্গনাযুক্তরাষ্ট্র

৫০ বছরের পুরনো গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের ছাত্রী

৫০ বছরের পুরনো একটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান এক সপ্তাহের কম সময়ে করে রীতিমতো হৈ চৈ ফেলে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের এক ছাত্রী। তার নাম লিসা পিসিরিলো। অবসর সময়ে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট করার সময় তিনি বিখ্যাত ‘কনওয়ে নট’ বা কনওয়ের গিঁট সমস্যার সমাধান করেন।

যে সমস্যার সমাধান কয়েক দশক ধরে গণিতবিদরা করতে পারেন নি তা কীভাবে একজন গ্রাজুয়েটের ছাত্রী সমাধান করলেন তা ভেবে অনেকেই বিস্মিত হচ্ছেন।

বৈজ্ঞানিক খবরের ওয়েবসাইট কোয়ান্টাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিসিরিলো জানান, সমস্যাটি সমাধান করে খুবই স্বাভাবিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গণিতবিদ ক্যামেরন গর্ডনের সাথে তিনি আলোচনা করছিলেন। তখন শ্বিবিদ্যালয়ের ওই শিক্ষক উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি চিৎকার করে পিসিরিলোর কাছে জানতে চান, ‘তুমি এটি নিয়ে আরও উত্তেজিত নও কেন?’

গণিতবিদ অধ্যাপক গর্ডন বলেছেন, পিসিরিলো কত পুরনো একটি সমস্যার সমাধান করেছেন সে সম্পর্কে তার ধারণা নেই!

ব্রিটিশ গণিতবিদ জন হর্টন কনওয়ে ১৯৭০ সালে কনওয়ে নট সমস্যা উত্থাপন করেন। তবে পিসিরিলো ২০১৮ সালে প্রথমবার এই সমস্যার কথা জানতে পারেন।

এই বছরের শুরুর দিকে গণিত জার্নাল অ্যানালস অব ম্যাথমেটিকসে পিসিরিলোর থিওরি প্রকাশিত হয়। এরপরই তাকে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) তাকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়।

স্পেনের ইনস্টিটিউট অব ম্যাথমেটিকাল সায়েন্সেসের সদস্য ও গবেষক হ্যাভিয়ের আরামায়োনা বলেন, ‘কনওয়ে নট সমস্যা দীর্ঘসময় ধরে সমাধান করা হয় নি। প্রথিতযশা অনেক গণিতবিদ এই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।’

গাণিতিক ‘নট’ হচ্ছে গণিতের টপোলজি নামক বিশেষ একটি ধারার অংশ। সহজ কথায়, কোনও বস্তুকে না ভেঙ্গে সেটির আকার বিকৃত করলে, মোচড়ালে এবং প্রসার ঘটালে ওই বস্তুটি কোন্‌ পরিস্থিতিতে কী ধরণের ব্যবহার করে – সেটি নিয়ে গবেষণা করা হয় টপোলজিতে।

বাস্তব জীবনের উদাহরণগুলোর চেয়ে ‘নট’ এর সমস্যার পার্থক্য হলো, এর শেষভাগ একসাথে যুক্ত থাকে। সবচেয়ে সরল ‘নট’ জাতীয় সমস্যাগুলোও একটি আংটির মত আকারে থাকে, যেটিকে একত্রিত করা যায় না।

সেভিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাথমেটিকস ইনস্টিটিউটের মারিথানিয়া সিলভেরো বলেন, ‘এই ধরনের সমস্যায় সাধারণভাবে একটি দড়ির কথা চিন্তা করা হয়।এই দড়িটি আমরা কতভাবে বিকৃত করতে পারি, সে বিষয়টি গবেষণা করে ‘নট’ থিওরি।’

তিনি আরও বলেন, ‘অন্যভাবে দেখলে, আমরা বোঝার চেষ্টা করি এই দড়িটিকে আমরা কীভাবে পাকাতে, মোড়াতে, ভাঁজ করতে, প্রসারিত করতে, সঙ্কুচিত করতে পারব। যেটা আমরা করতে পারব না, তা হলো দড়িটি কাটা।’

বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে টপোলজির প্রয়োগ রয়েছে এবং অর্থনৈতিক মডেলের গতিপ্রকৃতি থেকে শুরু করে ডিএনএ অণুর আকৃতি পর্যন্ত বিষয় নিয়ে গবেষণা করা হয় থাকে টপোলজি প্রয়োগের মাধ্যমে।

কনওয়ে নট সমস্যার ১১টি ক্রসিং বা বাঁক রয়েছে। পিসিরিলো জানান, এই সমস্যাটির মতো আরেকটি সমস্যা, যেটি মূল সমস্যার চেয়ে কিছুটা সহজ, সেটা তৈরি করে তিনি কনওয়ে নট সমস্যার সমাধান করেন।

কোয়ান্টা ম্যাগাজিনকে পিসিরিলো জানান, দিনের বেলায় তিনি ওই সমস্যার সমধানের পেছনে সময় ব্যয় করেন নি। কারণ এটিকে তিনি আসল গাণিতিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনাই করেন নি।

পিসিরেলো বলেন, আমি এটিকে হোমওয়ার্কের মতো মনে করেছি। তাই যখন বাসায় ছিলাম, তখনই এটা নিয়ে কাজ করেছি।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গ্রামীণ রাজ্য মাইনে জন্মগ্রহণ করেন লিসা পিসিরিলো। বস্টন কলেজে তিনি পড়ালেখা করেন। এরপর ২০১৩ সালে স্নাতক পর্যায়ের ছাত্রী থাকার সময় তিনি ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন থেকে বৃত্তি পান।

গণিত কিংবা এই সংশ্লিষ্ট মতো পেশায় পুরুষদের তুলনায় নারীদের সংখ্যা এখনও অনেক কম। ধারণা করা হচ্ছে, লিসা পিসিরিলো কনওয়ে নটের মতো এত জটিল সমস্যার সমাধান করায় আরও বেশি নারী এ ধরনের পেশায় আসতে উদ্বুদ্ধ হবেন।

নট সমস্যার উদ্ভাবক জন হর্টন কনওয়ে এ বছরের এপ্রিলে ৮২ বছর বয়সে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মারা যান। লিভারপুলে জন্ম নেওয়া এই শিক্ষক অত্যন্ত প্রভাবশালী, ক্যারিশমাটিক এবং দক্ষ গণিতবিদ ছিলেন । তিনি ক্যামব্রিজ ও প্রিন্সটনের মতো খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেছেন।

বিবিসি

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension