সাক্ষাৎকারসাহিত্য

৫০ বছরে নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়

সিরাজুল ইসলাম আবেদ

ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে উত্তপ্ত দেশ। বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্রনেতা আসাদ পুলিশের গুলিতে নিহত। তার রক্তাক্ত শার্ট নিয়ে মিছিলে নেমেছে ছাত্ররা। পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছে নবকুমার ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মতিউর। ছুরিকাঘাতে নিহত রুস্তম। নাখালপাড়ায় ঘরের ভেতরে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় সেনা ও ইপিআরের বেপরোয়া গুলিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে মা আনোয়ারা বেগম। এত হত্যা আর রক্ত- জনরোষে ফুঁসে ওঠে ঢাকা। এমনি অগ্নিগর্ভ দিনের এক সকালে সবাই দেখল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি দেয়াল ছেয়ে গেছে একটি কবিতার পঙ্‌ক্তিমালায়- ‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়…।’

কবি হেলাল হাফিজের ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়।’ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা প্রথম কবিতা, যেখানে আহ্বান জানানো হয় সশস্ত্র যুদ্ধের; এখনও যে কবিতা লাখো তরুণের রক্তে জাগায় নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস। আমাদের প্রতিটি আন্দোলন ও সংগ্রামে যার পঙ্‌ক্তিমালা বিজয়ের পথ দেখায়। কীভাবে লেখা হলো সেই কবিতা? যুদ্ধবিরোধী শাশ্বত শান্তির কণ্ঠস্বর, অস্তিত্বের কোন প্রগাঢ় আহ্বানে হয়ে উঠল যুদ্ধের ঘণ্টাধ্বনি! ঘোর কাটাতে কালজয়ী ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’র বয়স যখন ৫০, আমরা মুখোমুখি কবি হেলাল হাফিজের।

১৯৬৯ থেকে ২০১৯- এই ৫০ বছরে বদলে গেছে অনেক কিছু। পরাধীনতার শিকল ছিঁড়ে আমরা স্বাধীন হয়েছি, তাও ৪৭ বছর কেটে গেছে। কবির সেই সময়ের আবাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল এখন শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল। খুব স্বাভাবিকভাবেই বদলে গেছে হলের বাসিন্দা। সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন, আ স ম আবদুর রবের জায়গায় এসেছে নতুন মুখ। পুনর্বিন্যাসে কবির ব্যবহূত ১১৬ নম্বর কক্ষটিও আগের অবস্থানে নেই। হলের পুকুরটি আছে; বদলে গেছে দিবস-রজনীর বহু স্মৃতিময় ঘাটটি। হেলাল হাফিজও সদ্য কৈশোর পেরুনো তরুণটি নেই। দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র হলেও, যাকে দেখে কিশোর বলেই বিভ্রম হতো, সেই তিনি বয়স আর রোগে কিছুটা ন্যুব্জ। বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির কোণে শরিফ মিয়ার ক্যান্টিন। যেখানে সকাল-সন্ধ্যা বসত কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীদের আড্ডা- আহমদ ছফা, হুমায়ুন কবির, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, নীলুফার ইয়াসমিন, ক্যামেলিয়া মুস্তাফা- কে না আসত! সেই ক্যান্টিনও নেই। নতুনের সমারোহে সবই অচেনা। এরই মধ্যে কেউ কেউ কবিকে চিনতে পেরে এগিয়ে ধরেন অটোগ্রাফের খাতা; তোলেন সেলফি। সময় বয়ে চলে। কবি ধীর-শান্ত চোখে লাইব্রেরির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত সেই হারিয়ে যাওয়া মুখগুলোই যেন খুঁজে ফেরেন। এক সময় তার চোখের তারায় ধরা দেয় সেই আশ্চর্য দিনগুলো।

‘ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান যারা না দেখেছে তাদের বলে বোঝানো যাবে না এর রূপ। যদিও ছাত্ররাই নেতৃত্ব দিয়েছেন, তবে অল্প কিছু মানুষ ছাড়া বাকি সবাই দুর্বার এই আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন। পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয় শেখ মুজিবকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে।’

কবির চোখে একে একে ধরা দেয় ঊনসত্তরের সেই দৃশ্য। কণ্ঠস্বর ঋজু- ‘তখন পূর্ব পাকিস্তানে সুবিধাভোগী মধ্যবিত্ত একটা শ্রেণি তৈরি হয়ে গেছে- সিএসপি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ব্যবসায়ী। তারা যে সবাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সমর্থন করত, তা নয়। অনেকে বাঁকা চোখেও দেখার চেষ্টা করত। কিন্তু আন্দোলন এমন এক পর্যায়ে মানুষকে নিয়ে যায় যে, সবাই স্বতঃস্ম্ফূর্ত অগ্নিগর্ভ সেই স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেয়।

যে আমি কোনদিন মিছিলে যাই নি, চিরদিন অপছন্দ করি রক্তক্ষয়, হত্যা, যুদ্ধ; সেই আমাকেও এই আন্দোলন আলোড়িত করেছিল। মানুষের ওপর পীড়ন, মিছিল, স্লোগান আমাকেও দ্রোহী করে তোলে। সেই সময়ের সিংহভাগ মানুষের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশই ছিল এ কবিতা। ঊনসত্তরের উত্তাল সময় আমাকে দিয়ে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ লিখিয়ে নিয়েছে।

প্রায় এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে কবি এবার থিতু হলেন। কণ্ঠ নামিয়ে এনে স্বভাবসুলভ হালকা চালে আবার শুরু করলেন- ঊনসত্তরের জানুয়ারি মাসের প্রথমদিকের ঘটনা। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। পুরান ঢাকা থেকে রিকশায় হলে ফিরছি। তখন ফুলবাড়িয়ায় ছিল রেলস্টেশন। স্টেশন পেরিয়ে গুলিস্তান চৌরাস্তায় দেখি ইপিআর এবং কিছু পুলিশ বিক্ষোভকারীদের [অধিকাংশই ছাত্র] বেদম পেটাচ্ছে। আমার রিকশার পাশে এক মধ্যবয়সী রিকশাওয়ালা এসে দাঁড়াল। সে এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলছে, ‘মার, মার ওদেরকে। কিছু কিছু প্রেম আছে মার্ডার করাও জায়েজ।’

একটু থামলেন হেলাল হাফিজ। নিজেকে আরেকবার গুছিয়ে নিলেন। তারপর চোখ বন্ধ করে কবি যেন সেই সন্ধ্যায় ফিরে গেলেন। অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে কবির কণ্ঠ- ‘আমি তখন কিছুটা অব্যবস্থিত চিত্তে রিকশায় বসা। তারপরও রিকশাওয়ালার ওই কথাগুলো আমার ভেতরে আশ্চর্য রকম তরঙ্গ তুলল। আমাকে ভাবনায় আচ্ছাদিত করে ফেলল। কতটা দেশপ্রেম থাকলে একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবর্জিত মানুষ এমন কথা বলতে পারে…!

হলে ফিরে ভাত খেলাম, পুকুরঘাটে যেয়ে দাঁড়ালাম; ওই কথাগুলো আমার কানে ক্রমাগত বেজে চলেছে। আমার ভেতরে নতুন এক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে তখন- যুদ্ধ, রিকশাওয়ালার কথাগুলোকে কীভাবে শিল্পে রূপ দেব তার!

যন্ত্রণার রেখা কবি রেখায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিচলিত কবি বলে চলেন, ‘আমি ঘুমুতে পারি না, ক্লাস করি না। শরিফের ক্যান্টিনে যাই; কলাভবন, ইকবাল হল, নিউমার্কেটে মনিকো রেস্টুরেন্টে ঘুরে বেড়াই। এভাবে আট-দশ দিনে তিন পৃষ্ঠার একটা কবিতা দাঁড়ায়।’

এবার শীতের সকালের মিষ্টি রোদ খেলে যায় কবির মুখাবয়বে।- ‘আমি শরিফের ক্যান্টিনে যেয়ে ছফা ভাই [আহমদ ছফা] আর কবি হুমায়ুন কবিরকে কবিতাটা দেখালাম। কবিতা পড়ে তারা আমাকে বুকে টেনে নিলেন। আমাদের চা-নাশতার বিল ছফা ভাই দিলেন। দুপুরে বিরিয়ানি খাওয়ালেন। এর পর ছফা ভাই বললেন, ‘কবিতাটা এত বড় রাখা যাবে না। কিছু জায়গায় ঝুলে গেছে। আমরা কিছুই বলব না; তুমি তোমার মতো করে এডিট কর।’ আরও পনেরো-বিশ দিন সময় নিয়ে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ বর্তমান রূপে আনলাম। নিয়ে গেলাম ছফা ভাইয়ের কাছে। হুমায়ুন কবিরও ছিলেন। পড়ে বললেন, ‘এবার ঠিক আছে।’ তারা আমাকে নিয়ে সোজা চলে গেলেন দৈনিক পাকিস্তান অফিসে, সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীবের কাছে।

ছফা ভাই-ই কবিতাটা তার হাতে দিলেন। আমরা উদগ্রীব হয়ে বসে আছি। তিনি নিবিষ্ট মনে পড়ছেন। পড়া শেষে আমাদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি এখন যা বলব তাতে ও কষ্ট পাবে; আমি এই কবিতা ছাপতে পারব না।’ একটু ধাক্কা খেলাম। কিন্তু এর পর যেটা বললেন তাতে আর কোনও কষ্ট থাকল না। তিনি বললেন, ‘আমি ছাপতে পারলাম না। কিন্তু এই কবিতায় হেলালের অমরত্ব নিশ্চিত হয়ে গেছে। এটা সরকার এবং রাষ্ট্রবিরোধী কবিতা। আমি ছাপলে নিশ্চিত, আমার চাকরি যাবে। পত্রিকাও বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’

কথা যখন শেষ করলেন, হেলাল হাফিজের মুখে তখন হাসি। বুঝতে বাকি থাকে না, এ হাসি কবিতার বিজয়ের, এ হাসি কবির অমরত্ব প্রাপ্তির। আহসান হাবীব তো ভুল কিছু বলেননি। যে সমাজে পীড়ন-দমন থাকবে, সেখানে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ জীবন্ত থাকবে। আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’কে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। যৌবনের ধর্মই প্রেম, প্রতিবাদ, আপসহীনতা। তাই, এ কবিতা যৌবনের কণ্ঠস্বর হয়ে আছে। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ঢুকতেই আলমগীর নামে এক তরুণ এগিয়ে এসে কবির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বলে ওঠেন, ‘এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’। ডাক-হাঁক দিয়ে একই ভাষায় পরিচয় করিয়ে দেন তার অন্যান্য বন্ধু-সহপাঠীর সঙ্গে।

দেখতে দেখতে ভিড় বাড়ে। আমরা প্রসঙ্গে ঢুকি। কবিতা তো ছাপা হলো না; তাহলে মানুষের কাছে পৌঁছাল কীভাবে? মৃদু হেসে কবি আবার শুরু করলেন, ‘আহসান হাবীবের কাছ থেকে এসে ছফা ভাই আর হুমায়ুন কবির সিদ্ধান্ত নেন, ‘এই কবিতা দিয়ে দেয়ালে দেয়ালে চিকা মারা হবে।’ অর্থাৎ নাগরিক ভাষায় যাকে বলা হয় দেয়াল লিখন। মাত্র দুই রাতেই কলাভবন, কার্জন হল, আর্ট কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি- পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছেয়ে দেওয়া হলো কবিতার পঙ্‌ক্তিমালায়। সভা-সমাবেশে তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাহজাহান সিরাজরা তুলে ধরলেন আমার কবিতা। নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় ছড়িয়ে পড়ল দেশময়।’- বলতে বলতে কবির চোখ দুটো যেন জ্বলে ওঠে।

পরের ইতিহাস সবারই জানা। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, তারপর ৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ যত গণতান্ত্রিক আন্দোলন হয়েছে, ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কণ্ঠে-কণ্ঠে ফিরেছে। বাম ধারার দলগুলো তো একে সূচনা সঙ্গীতের মতো ব্যবহার করেছে। দেশের ভূখণ্ড পেরিয়ে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ ছড়িয়ে পড়েছে ভিন্ন ভূখণ্ডে, ভিন্ন ভাষায়। মানুষের জন্য প্রেম, নিজ ভূখণ্ডের জন্য প্রেম, অধিকারের জন্য প্রেম থেকেই তো দ্রোহ। তাই সহজেই বলে দেওয়া যায়, সর্বকালে, সব সমাজে নিপীড়িত-নিগৃহীত মানুষ এই কবিতাটিকে আশ্রয় করে ঘুরে দাঁড়াতে চাইবে। মাত্র ৫০ বছর নয়; আহসান হাবীবের ভাষায়- হেলাল হাফিজের অমরত্ব নিশ্চিত হয়ে আছে এই কবিতায়।

যৌবনে তরঙ্গ তোলা সেই সময়, সেই স্থান এবং তরুণ শিক্ষার্থীদের বিদায় জানিয়ে কবিকে নিয়ে গাড়িতে উঠেছি। গন্তব্য জাতীয় প্রেস ক্লাব, যেখানে কাটে কবির সকাল-সন্ধ্যা। হঠাৎ দরজার কাঁচে আলতো টোকা। এতক্ষণ সঙ্গী হয়ে থাকাদের একজন জামিত জামিরুল লাজুক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। সঙ্গে নিজের লেখা একটা কবিতা। হেলাল হাফিজ হাত বাড়িয়ে কবিতাটা নিলেন। শিরোনামে চোখ আটকে গেল- ‘বিজয় পতাকায় যেভাবে বাংলাদেশ’। কবির তৃপ্ত হৃদয়, প্রসন্ন দৃষ্টি ছুঁয়ে যায় তরুণ জামিরুলে মুখ-মন। এরই নাম বুঝি ফিরে ফিরে আসা।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension