লুৎফুল হোসেনের তিনটি অণুগল্প

১ চিঠিটার ভাঁজ খুললেই প্রতিটা অক্ষরকে ছুঁয়ে দেবার প্রবল এক ইচ্ছে পাগল করে তোলে সুহৃদকে। দৃষ্টিতে সাড়ে তিন যুগের পুরনো শব্দগুলোকে দেখে মনেই হয় না কোথাও একটুও মলিনতা ছুঁয়েছে তাদের। যতবার পড়ে সে ততবারই ফাউন্টেন পেনের নীল রঙের সেই অক্ষরগুলোর গায়ে তার চোখজোড়া যেন পরম আদরের ছোঁয়া বুলিয়ে যায়। এখনও মনে আছে স্পষ্ট, সেই দিনটার কথা। নরম এক রেশমী আঁচল অসতর্কে তাকে ছুঁয়ে যাবার অনুভূতি। তারপর অগণিত দিন জুড়ে নাকের ভেতর অচেনা কোনো সুরভির লাগামহীন দৌরাত্ম্য। অন্যদিকে সেই শাড়ীর ভেতরের মানুষটারও বুকের ভেতর চলছিল যে ধুকপুকানি তার জের ধরে নিয়তিই বুঝি জুড়ি বেঁধে দিয়েছিল তাদের দুজনের।   দেখতে দেখতে প্রেম পরিণয় সংসার গৃহশৈলী জুড়ে ডানা গজানো সাহচর্যের বাবুই আর চড়ুই ডেকে আনলো পূর্ণতার ছোঁয়া। বৈশাখের প্রথম দিনে যখন পৃথিবীতে নেমে এলো সম্পর্কের নতুন সেতুবন্ধন, স্মৃতি প্রথম। সুকন্যা বুকের গভীর থেকে আশ্চর্য এক কণ্ঠে বলেছিল, ‘তুমি পাশে থাকবে, আমি আর তুমি একসাথে স্পর্শ করব আমাদের প্রথম উত্তরাধিকারকে।‘ সুহৃদ বিস্ফোরিত চোখে অবাক তাকিয়েছিল সুকন্যার সেই চোখজোড়ার অতল গভীরতায়। অন্য অনেকদিনের মতোন চিঠিখানা হাতে আত্মমগ্ন ধ্যানস্ত হয় সুহৃদ। চলমান সেলুলয়েডের মতোন কথারা বিরামহীন অনুরণিত হতে থাকে তার মস্তিষ্কময়। আর কেউ না হোক সে নিজেই সেই চিরচেনা শ্রোতা। ‘. . . আমরা একসাথে একহাতে স্পর্শ করেছিলাম আমাদের পরষ্পরকে। আর অন্য হাতে স্পর্শ করেছিলাম আমাদের আবেগ–ভালোবাসার স্বর্গ, প্রথম সন্তান, স্মৃতি প্রথমকে। ঠিক তখনই সে তীব্র শব্দে কেঁদে উঠে আমাদের সাথে ভাগাভাগি করেছিল বুঝি পৃথিবীর বুকে তার প্রথম লগ্ন, প্রথম কথা। এখনো সমস্ত করতল জুড়ে, আঙুলের গায়ে গায়ে, লেগে আছে সেই স্পর্শের বিভা, আশ্চর্য সব অনুভূতির অনন্য প্রভা। স্পর্শের সেই অলৌকিক ক্ষণে বুঝিনি আদৌ ওই প্রথমেই যে টানা ছিল জীবনের যতি। প্রতিটা ক্ষণ চায়ের কাপ হাত বদলের ছুতায় আলতো ছুঁয়ে যাওয়া প্রিয় আঙুলের মতো তোমার স্মৃতিরা ছুঁয়ে যায় আমায়। কখনও একা হলে, আত্মমগ্ন হলে, এক একটি দিন সেই স্পর্শস্মৃতিকে বড়ই হন্তারক মনে হয়। দীর্ঘশ্বাস ডিঙিয়ে তবু সারসের মতো গলা উঁচু করে শান্তনারা – আমার তো তবু কিছু আছে অনন্য অবিনশ্বর স্মৃতি। স্মৃতি প্রথমের তো জোটেনি তার এক রত্তি।‘ ২ শঙ্খচিলের স্বপ্ন ডানা গলুইয়ের উঁচু আড়ালটায় বেশ খানিকটা ছায়া। দড়ি পাতা খাটিয়ায় হাতবালিশে কাত হয়ে আধঘুমে শুয়ে জমির শেঠ। সকালের রোদটা এখনো তেজ পায়নি। বাতাসটা থেকে থেকে হালকা পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। সাথে আঁশটে নোনা গন্ধের আমেজটা মনের মধ্যে এলোমেলো ভাবনাগুলোয় তুফানের ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে।  সেই হাফ প্যান্ট পরা বয়স থেকে এই গন্ধ, এই বাতাসের সাথে দিন–রাত রোদ–বাদলা ঝড়–তুফান। যেন এইটাই জীবনের সবচাইতে বড় প্রেম। দেখতে দেখতে একুশটা বছর গেছে। সারেঙের ঘরটার দিকে তাকায় সে চোখ খুলে। কি ঝকঝকা রোদ ঝিকমিক করা কাঁচে ঘেরা সেই ঘরখানা। মনের মধ্যে তুমুল স্বপ্ন ছিল, সারেঙ হবে। তীব্র ঝড়ের মধ্যে ওই ছ্য় হাতের চাকার হাতল দাবড়ে শক্ত হাতে জলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চালাবে ট্রলার, এঞ্জিন বোট, হয়ত আরও বড় কিছু, জাহাজ। দিনে দিনে বুঝতে পারে শুধু বয়স বাড়লেই সে সুযোগ হাতে আসবে না। স্বপ্নের ঘুড্ডির লেজগুলো তাই জীবন থেকে খসতে থাকে ধীরে ধীরে। কিন্তু এই নোনা জল, আঁশটে গন্ধ আর মাতাল ঢেউয়ের দোলায় জান বাজী রাখা সাগরের গান এতদিনে শরীরের কোষে কোষে মিশে গেছে। মুটে থেকে খালাসীর সহকারী। তারপর খালাসী। শেষে সর্দার। সেই একঘেঁয়ে জীবনে নতুন তকমা জুটলো, যখন মাছধরা ট্রলারের পাশাপাশি সমুদ্রে নামলো ছোট ছোট ঝা চকচকা এঞ্জিন বোট। পর্যটক যাত্রীরা ঘোরে তাতে চেপে। কাছাকাছি দ্বীপে যায় আসে, গন্তব্যহীন ভাসে দিনে রাতে।  মনে মনে হেসে ওঠে মানুষটা। অনেকের চেয়ে ম্যালা ভালো আছে সে। কোনো আক্ষেপ নেই। খালাসী সর্দার হয়েই তো এক প্রকার সুখী ছিল। এখন আবার পোশাকেও কেতা হয়েছে। কোম্পানির পাটভাঙ্গা ড্রেস পরে ডিউটি করে। সাহেব সুবো মানুষ–ম্যামদের নিয়ে দিন কাটে। মাছের আঁশটে নোনাজলে ভিজে আর দিন যায় না তার।  কষ্টের দুই যুগে যা শিখেছে তাতে এমন একখানা বোট সে চালাতে পারে ভালোই। অবশ্য তাতে খুব হেরফের আর কি! লেখাপড়া যে জানা নেই মোটেই। ওটুকু না থাকলে তো জো নেই ওই কাপ্তানের চাকা হাতে নেয়। 

Read more