আন্তর্জাতিকসাহিত্য

অরুন্ধতীর ‘দ্য আর্কিটেকচার অব মডার্ন এম্পায়ার’ যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

সুখদেব সান্ধু

২০০১ সালের দিকে মার্কিন লেখক ও ব্রডকাস্টার ডেভিড বারসামিয়ানের সঙ্গে যখন তাঁর এই ১২টি সাক্ষাৎকারের সূচনা হয়, এর আগেই অরুন্ধতী রায় সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হতে থাকেন। নামজাদা বামপন্থি সমালোচকদের মধ্যে এজাজ আহমেদ বুকার পুরস্কার বিজয়ী ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ (১৯৯৭) এ কমিউনিজম বিরোধিতার জন্য তাঁকে আক্রমণ করেছিলেন। কেরালার যেখানে এটি পাওয়া যেত, সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে ‘জনসাধারণের নৈতিকতা নষ্ট করার’ অভিযোগ আনা হয়।

প্রবন্ধ সংকলন ‘দ্য অ্যান্ড অব ইমাজিনেশন’ (১৯৯৮) বইয়ে তিনি ভারতের পারমাণবিক জাতীয়তাবাদে রূপান্তর হওয়া এবং দিন দিন দেশের পরিবেশ ও গ্রামীণ জনসংখ্যার জন্য ক্ষতিকর মেগা-বাঁধ প্রকল্প বেড়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে তিনি প্রগতিবিরোধী, দেশপ্রেমবিরোধী ও অনারীসুলভ স্বভাবের।

এগুলোর কারণে কি তিনি কথা বলার ক্ষেত্রে সাবধান হয়ে গিয়েছিলেন? না। আদতে তাঁর কথাবার্তা আরও জ্বালাময়ী হয়ে ওঠে। ‘দ্য আর্কিটেকচার অব মডার্ন এম্পায়ার’জুড়ে রয়েছে এর প্রমাণ, এসব বক্তব্য তিনি কি দিল্লিতে বসে দিচ্ছেন, না লাস ভেগাসে? অথবা বার্কলে হাই স্কুল অথবা বোস্টনজুড়ে চলমান গাড়ির পেছনের সিটে বসে– সেটা কোনো ব্যাপারই না। কখনও তিনি হাসেন, কখনও রাগেন, কখনও দুটোই করেন। অ-ভারতীয় কেউ হলে তিনি তাঁর দেশকে প্রাচ্যবাদী বলে তুলে ধরেন। কৃষ্ণকায়াবিরোধিতা, অশিক্ষা ও পুষ্টিহীনতার ব্যাপকতা, লাখ লাখ তরুণী হত্যা, ধর্ষণের সর্বব্যাপিতা, সামন্তবাদ, হেফাজতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু, মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’, বায়ুদূষণ, নদীতে বিষক্রিয়ার বিষয়ে তিনি কথা বলেন; বলা যেতে পারে এ এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘটনার সূচিপত্র।

অরুন্ধতী রায় ভারতকে এভাবে চাঁচাছোলা ব্যবচ্ছেদ করার প্রশ্নে বেশ কঠোর ও নির্দয়, যেখানে ‘খাদ্য, বাসস্থান ও মর্যাদা নিয়ে শান্তিতে থাকাটা দৈনন্দিন যুদ্ধে’ পরিণত হয়েছে। তিনি বিশ্বায়ন নিয়ে উদ্বিগ্ন; তাঁর মতে, এটি রাজনৈতিক মত ও বিশ্বাসের রূপান্তরকারীদের মতো নয়, আধ্যাত্মিক ভাইরাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমে ‘রাস্তায় হাঁটা প্রত্যেক ব্যক্তি চলমান একেকটা বারকোড’। বিশেষত মার্কিনিদের ‘একটি বিকল্প বাস্তবতা দিয়েই গড়ে তোলা হচ্ছে, অনেকটা খোয়ারে ব্রয়লার মুরগি অথবা শুয়োর পালার মতো। আসল প্রশ্নটা কী? ভারত খুব ভালোভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো হয়ে উঠছে, অত্যন্ত আত্মমগ্ন। ভারতীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণিটি দিন দিন হয়ে পড়ছে উদ্ধত ও সংকীর্ণ।

২০১৭ সালে ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব অ্যাটমোস্ট হ্যাপিনেস’ প্রকাশের আগ পর্যন্ত বোঝার উপায় ছিল না, রায় আর কোনো উপন্যাস লিখবেন কিনা। এখানে তিনি পালাক্রমে বিদ্রোহী, উদ্বিগ্ন, ধীরস্থির। তিনি বিপুল পরিমাণ চিঠিপত্র পেয়ে থাকেন এবং এগুলো সামলানোর জন্য তিনি কাউকে নিয়োগ দিতে রাজি নন; যেমনটা তিনি বলেছেন, ‘আমি লেখালেখিকে পেশা কিংবা কর্মক্ষেত্র হিসেবে দেখি না।’ যদিও তিনি তাঁর সব ননফিকশন রয়্যালটি দিয়ে শক্তপোক্ত একটি ট্রাস্ট গড়ে তুলেছেন, যার টাকা সারা দেশে প্রগতিশীল সংস্থাগুলোর কাজে লাগানোর ব্যবস্থাও নেওয়া আছে। তাঁকে একজন বিভ্রান্ত র‌্যাপারের মতো শোনাতে পারে (‘আমি একাকী; আমাকে যা বলতে হবে, আমি কেবল তাই বলি… লোকেরা কী শুনতে চায়, তা বলার জন্য আমি এখানে আসিনি’) এবং রোমান্টিক (‘এ পর্যন্ত কল্পকাহিনীই হলো সবচেয়ে সত্য বস্তু।’)

অর্ধেকের বেশি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল ২০০৯ সালের আগে। এ এমন সময়ের ঘটনা যখন হাওয়ার্ড জিন, নোয়াম চমস্কি, এডওয়ার্ড সায়ীদের মতো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বামচিন্তার ব্যক্তিরা সক্রিয় ছিলেন; মাইকেল মুরের ফারেনহাইট ৯/১১ ডকুমেন্টারি জনপ্রিয় এক বিদ্রোহের সূচনা ঘটায়। রায় স্পষ্টভাবে আত্মবিশ্বাসী যে, ‘মূলধারার করপোরেট মিডিয়ার’ ‘মহিষ’ বিকল্প প্রত্যাশী অ্যাকটিভিস্ট ও ইন্টারনেটের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এ কারণে কি তিনি সেই ২০১২ সালের শুরুর দিকে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, নরেন্দ্র মোদি জনসমাবেশেও রেকর্ডকৃত বক্তৃতা দেবেন, অথবা মৌলবাদীদের হাতে সামাজিক নেটওয়ার্কগুলোর অপব্যবহার হতে পারে?

রায়ের সবক’টি ক্ষুরধার সমালোচনা শক্তি হারিয়ে ফেলেনি। ২০০২ সালে তাঁর প্রবন্ধ ‘কাম সেপ্টেম্বর’-এর আলোচনায় তিনি উল্লেখ করেন, ১৯২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ব্রিটেন ফিলিস্তিনের ওপর একটি আদেশ জারি করেছিল: ‘আশি বছর পরেও ফিলিস্তিনিরা এখনও জিম্মি রয়ে গেছে। কীভাবে কেউ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অবৈধ দখলের কথা উল্লেখ না করে থাকতে পারে? মার্কিন সরকার এতে আর্থিক সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে সমর্থন দিচ্ছে। এটা একটা অপরাধ।’

২০০২ সালে মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, যখন একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ১ হাজারের বেশি মুসলমান খুন হয়েছিল। অরুন্ধতী লিখেছেন, ‘আদালত, সংবাদপত্র, সংসদ ভারসাম্য রক্ষা করে কাজ করছে না। যদি এসব প্রতিষ্ঠান কাজ করত, তাহলে মোদি আজ জেলে থাকতেন।’ তাঁর মতে, মোদির দল বিজেপি ও বিশ্বব্যাংক উন্নয়নের একই দর্শন প্রচার করে, ২০২০ সালের শেষের দিকে দিল্লিতে জড়ো হওয়া হাজার হাজার হতাশ কৃষকের কাছে সাধুবাদ পায়।

এই বইটি রায়ের শিল্প বা রাজনীতি বিষয়ে কিছু বলে না, এতে তাঁর দীর্ঘকালের ভক্তরা অবাক হতে পারেন। বারসামিয়ান একজন জ্ঞানী কথোপকথনকারী, কিন্তু তিনি মতবিরোধ বা ভিন্নমতের মূল্যে বিশ্বাস করেন না বলে মনে হয়। তিনি ‘অভিজাতদের’ তার খুব সহজে খারিজ করা নিয়ে অরুন্ধতীকে প্রশ্ন করতে পারতেন- আক্রমণের এ ধারা এখন ডানপন্থিরা অনুসরণ করে। পাদটীকায় কিছু রাজনৈতিক বিষয় তুলে দিলেও ভালো হতো।

তবুও রায় যেসব মর্মান্তিক বিষয় তুলে ধরেছেন, সেগুলো দেখে আমি তাঁর সেই অপ্রতিরোধ্য বিশ্বাসে আস্থা রাখি, এখনও ভারতের আশা জাগিয়ে তোলার ক্ষমতা আছে। তিনি এটিকে বড় শহরগুলোর বাইরে ‘সহজাত নৈরাজ্যের’ মধ্যে দেখেন: ‘কুম্ভ মেলায় (তীর্থযাত্রা) গেলে দেখবেন, লক্ষাধিক লোকে থিক থিক করছে, এবং সেখানে একজন নাগা সাধু (ধর্মীয় তপস্বী) তাঁর পুরুষাঙ্গ দিয়ে জেলা কালেক্টরের গাড়ি টানার চেষ্টা করছেন। তবে আপনি তাঁকে বলতে পারবেন না যে করপোরেট বিশ্বায়ন তোমার সমস্যা সমাধান করে দেবে।’

লেখক: অধ্যাপক ও লেখক। দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন ইফতেখারুল ইসলাম।

দৈনিক সমকালের সৌজন্যে

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension